টাটেন্ডা টাইবুকে চেনেন? 

যারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মোটামুটি খোঁজখবর রাখেন, নিশ্চয়ই কুঁচকে গেছে তাঁদের ভুরু–এটা কোনো প্রশ্ন হলো! বিড়বিড় করে হয়তো উত্তরটাও দিয়ে ফেলেছেন তাঁরা : টাটেন্ডা টাইবু জিম্বাবুয়ের উইকেটকিপার, আরেকটু বিশদ বললে জিম্বাবুয়ের উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান।

এখানেই টাইবুর আপত্তি। উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিচিত হওয়ার কোনো ইচ্ছাই তাঁর নেই। তিনি চান, সবাই তাঁকে চিনুক ব্যাটসম্যান হিসেবে। ব্যাটসম্যান, যে কিপিংও করতে পারে।

শেষ বাক্যটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চয়ই অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের মুখটি ভেসে উঠেছে আপনার চোখের সামনে। যাঁর কাছ থেকে কিপিং গ্লাভস হাতে তুলে নিয়েছেন টাইবু, সেই অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের উইকেটকিপার হিসেবে পরিচিতিটা একেবারেই ঢাকা পড়ে গেছে তাঁর ব্যাটসম্যানশিপের আড়ালে। টাটেন্ডা টাইবুও তা-ই চান। 

১২ টেস্টে তাঁর দুটি ফিফটি, ব্যাটিং অ্যাভারেজ ২০.৯৫। ৫১টি ওয়ানডেতে ফিফটি ৩টি, অ্যাভারেজ ২৪.১৫। এটা আর যা-ই হোক, একটা দীর্ঘ সময় র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানে থাকা অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার হওয়ার স্বপ্নের সঙ্গে যায় না। টাইবুও তা মানেন। তবে টাইবুকে যারা ছোটবেলা থেকে দেখছেন, তাঁরা সবাই এটাও মানেন যে, এই পরিসংখ্যানে টাটেন্ডা টাইবুর ব্যাটিং প্রতিভা একদমই প্রতিফলিত হয়নি। ব্যাটসম্যান টাইবুকে চিনতে হলে তাকাতে হবে দুটি ইনিংসের দিকে। হারারেতে একটি টেস্ট ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১০ ঘণ্টা ব্যাটিং করে ৮৩ আর শারজায় একটি ওয়ানডেতে পাকিস্তানের বিপক্ষে অপরাজিত ৭৪। তাদের কাছে সেই দুটি ইনিংসই আসল টাইবু। 

উইকেটকিপিং তাঁর কাছে ব্যাটিংয়ের বাইরে দলের জন্য বাড়তি একটা কাজ, আর কিছু নয়। এ কারণেই কোনো উইকেটকিপার টাইবুর মন রাঙাতে পারেনি, তাঁর স্বপ্নের ক্রিকেটারও কোনো উইকেটকিপার নন। তিনি শচীন টেন্ডুলকার। অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারও আছেন, তবে সেটি শুধুই তাঁর ব্যাটিংয়ের কারণে। 

 উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান না, ব্যাটসম্যান হিসেবেই পরিচিতি পেতে চেয়েছিলেন টাটেন্ডা টাইবু। ছবি: গেটি ইমেজেস
জিম্বাবুয়েতে ক্রিকেট যখন শুধুই ‘সাদাদের খেলা’ হিসেবে বিবেচিত, আর সব কৃষ্ণাঙ্গ শিশু-কিশোরের মতো টাইবুরও প্রথম প্রেম ছিল ফুটবল। বিপুল কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াতেই জিম্বাবুইয়ান ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিহিত, এটি বুঝতে পেরে প্রাইমারি স্কুলগুলোতে ক্রিকেট প্রচলন করার যে সিদ্ধান্ত, তারই ফসল টাটেন্ডা টাইবু। ক্রিকেট খেলতে গিয়ে টাইবুর যেটা হলো, সেটিকেই বলে, প্রথম দর্শনে প্রেম। ক্রিকেট স্কলারশিপ পেয়ে ভর্তি হলেন হাইস্কুলে, পেলেন ভালো কোচিং। টাইবু কিন্তু তখনো শুধুই ব্যাটসম্যান। 

ফুটবলের গোলকিপার আর ক্রিকেটের উইকেটকিপারদের সঙ্গে কথা বলুন, সবচেয়ে বেশি শোনা যাবে যে গল্পটা, টাটেন্ডা টাইবুর গল্পটাও তা-ই। ম্যাশনাল্যান্ড আর কান্ট্রি ডিস্ট্রিক্টসের জুনিয়র দলের মধ্যে একটি ম্যাচ। ম্যাচ শুরু হতে যাচ্ছে, ম্যাশনাল্যান্ডের উইকেটকিপারের কোনো খোঁজ নেই। বাধ্য হয়েই উইকেটের পেছনে দাঁড়ালেন টাইবু। সেই ম্যাচটি যিনি আয়োজন করেছিলেন, তিনি ক্রিকেট কোচ। কিশোরদের এমন ম্যাচ আয়োজন করাটা তাঁর নেশা। সেই ম্যাচের এক আম্পায়ারও তিনি। টাইবুর কিপিং তাঁর এত পছন্দ হলো যে, ম্যাচশেষে টাইবুকে বললেন, ‘তোমার হ্যান্ড-আই কো-অর্ডিনেশন তো খুব ভালো। তুমি ভালো উইকেটকিপার হতে পারবে।’

এটা অনেক পরের ছবি। টাটেন্ডা টাইবু যখন ইংল্যান্ডে 'নির্বাসিত' জীবন কাটাচ্ছেন। পরে অবশ্য আবারও ফিরেছিলেন জিম্বাবুয়ে দলে
তাতেই টাইবু উইকেটকিপার হয়ে যেতেন না, যদি সেই ভদ্রলোকের নাম বিল ফ্লাওয়ার না হতো। নামের শেষে ফ্লাওয়ার দেখে যে ভাবনাটা মনে আসছে আপনার, সেটিই সত্যি। ফ্লাওয়ার ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে বললে পুরোটা বলা হয় না। বিল ফ্লাওয়ার অ্যান্ডি আর গ্রান্টের বাবা। টাইবুকে উৎসাহ দিয়েই থামলেন না তিনি, অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের কাছ থেকে তাঁর কিপিং গ্লাভস আর প্যাড এনে উপহারও দিলেন। ১৩-১৪ বছরের এক কিশোর ক্রিকেটার, অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার তো তাঁর কাছে প্রায় ‘ক্রিকেট-ঈশ্বর’। তাঁর গ্লাভস আর প্যাড পাওয়ার পর টাইবুর তাই উইকেটকিপার না হয়ে কোনো উপায় থাকল না। 

তা না হয় হলেন, কিন্তু টাটেন্ডা টাইবু এখনো এমন কোনো নাম নয় যে, তাঁকে নিয়ে এমন দীর্ঘ লেখা লিখতে হবে। তারপরও যে লেখা হচ্ছে, তার মূল কারণ জিম্বাবুয়েতে টাটেন্ডা টাইবু শুধুই একজন ক্রিকেটারের নাম নয়। তাঁর মূল পরিচয়, বিশাল কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, জিম্বাবুইয়ান ক্রিকেটের ভবিষ্যতের প্রতীক। এবং এ কারণেই এত সব সিনিয়র খেলোয়াড়কে টপকে ১৯ বছর বয়সেই টাইবু জিম্বাবুয়ে দলের সহ-অধিনায়ক। টাইবুর নিজের জন্যও বিস্ময় হয়েই এসেছিল এটি। ‘আমি ভেবেছিলাম, সহ-অধিনায়ক হবে গ্রান্ট ফ্লাওয়ার’।

এখন সেই বিস্ময়ের জায়গা নিয়েছে আত্মবিশ্বাস, ‘আমি জানি, আজ হোক কাল হোক, আমি জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক হতে যাচ্ছি এবং আমি হবো জিম্বাবুয়ের প্রথম কালো অধিনায়ক, ইতিহাসে আমার নাম উঠে যাওয়াটা তাই নিশ্চিত। তবে আমি শুধু জিম্বাবুয়ের প্রথম কালো অধিনায়ক হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। পরিচিত হতে চাই সফল এক অধিনায়ক হিসেবে। আর এটাও জানি যে, জিম্বাবুয়ের পক্ষে খেলার মাধ্যমেই বিশাল এক জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিচ্ছি আমি। তবে আমি সেটিকে চাপ হিসেবে না দেখে দেখছি অনুপ্রেরণা হিসেবে।’

এখানে টস করছেন নিউজিল্যান্ডের স্টিভেন ফ্লেমিংয়ের সঙ্গে। এর আগেই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজে টেস্ট ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ অধিনায়ক হয়ে গেছেন টাইবু, ১৫ বছর পর যে রেকর্ড ভেঙেছেন আফগানিস্তানের রশিদ খান। ছবি: গেটি ইমেজেসযাঁর বয়স ২১ হতে এখনো মাস তিনেক বাকি, তাঁর মুখে এমন কথা শুনলে একটু চমকে যেতেই হয়। টাইবুর সঙ্গে কথা বলার পর কৈশোরের সারল্যমাখা মুখ, বুদ্ধির দীপ্তি ছড়ানো দু চোখ ছাপিয়ে আপনার মনে সবচেয়ে বেশি ছাপ রেখে যাবে এই আত্মবিশ্বাসটাই। 
 
সহ-অধিনায়ক অর্থই যেকোনো সময় অধিনায়কত্বের জন্য প্রস্তুত থাকা। ইনজুরি বা অন্য কোনো কারণে হিথ স্ট্রিক খেলতে না পারলেই তো টাইবু অধিনায়ক। ব্যাপারটা যদি এই টেস্ট সিরিজেই ঘটে, তাহলে টেস্ট ক্রিকেটের কনিষ্ঠতম অধিনায়ক হিসেবে মনসুর আলী পতৌদির (রেকর্ডটি ২১ বছর ৭৭ দিন) জায়গায় লেখা হবে তাঁর নাম। এই ভাবনাও টাইবুকে মোটেই নার্ভাস করছে না, ‘অধিনায়কত্ব তো আমার জন্য নতুন কিছু নয়। ২০০২ সালে নিউজিল্যান্ডে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে আমি ছিলাম জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক। আমার ক্লাবেরও অধিনায়ক আমি। আর স্কুলে থাকতে তো শুধু ক্রিকেট নয়, অধিনায়ক ছিলাম স্কোয়াশ আর টেবিল টেনিস দলেরও।’ 

সহ-অধিনায়ক টাইবুর অধিনায়কত্ব সম্ভাবনা লিখতে লিখতে মনে পড়ল, রাজিন সালেহ তো তাঁর চেয়েও এগিয়ে। বাংলাদেশ দলের সহ-অধিনায়ক তো এই গত নভেম্বরে বিশ পূর্ণ করে একুশে পা দিলেন (বয়সটা অবশ্যই অফিসিয়াল)। র‍্যাঙ্কিংয়ের সবচেয়ে নিচে থাকা দুই দলের লড়াই, এর বাইরেও এই সিরিজ নিয়ে কৌতূহলের কারণ থাকছে। যদি কোনো কারণে হিথ স্ট্রিক আর হাবিবুল বাশার দুজনই খেলতে না পারেন, এই সিরিজেই সবচেয়ে কম বয়সী অধিনায়ক-যুগলের দেখা পেয়ে যাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। 

টাইবুকে তো প্রস্তুতই মনে হলো, রাজিন কি প্রস্তুত?