কুইন্স পার্ক ওভালে টানা দ্বিতীয় ম্যাচ শুরু হলো এক মিনিট নীরবতা পালন করে। শনিবার বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচের আগে মানজারুল ইসলাম রানার স্মরণে। কাল ভারত-বারমুডা ম্যাচের আগে স্মরণ করা হলো বব উলমারকে।

মৃত্যুকে উইকেট দেওয়া সবচেয়ে কম বয়সী টেস্ট ক্রিকেটার মানজারুল ইসলাম রানা। এমন অকালমৃত্যু যে কাউকেই ব্যথিত করে। করেছেও। কিন্তু বাংলাদেশের খেলোয়াড়-সাংবাদিক ছাড়া আর কাউকে শোকস্তব্ধ করে দেয়নি। ব্যক্তিগত স্মৃতি থাকলে তবেই না শোকের তীব্রতাটা বেশি হয়। বব উলমারের ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে সামান্য সংশ্রব আছে, বলতে গেলে এমন সবারই তো পরিচয় ছিল তাঁর সঙ্গে। বিশ্বকাপ এখন তাই শোকের চাদরে ঢাকা।

শুধু কোচ বললে তাঁর পরিচয়টা সম্পূর্ণ হতো না। ক্রিকেট-পণ্ডিত বললে কিছুটা কাছাকাছি হতো। বব উলমারের খেলার বাইরে কোনো সময় স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও তা হতো বড় খবর। আর এখানে, বিশ্বকাপে কোচ হিসেবে এসে এভাবে মৃত্যু বিস্ময়-অবিশ্বাস-শোক... মিশ্র অনুভূতিতে আচ্ছন্ন করে দিয়েছে সবাইকে।

আমার নিজের অবস্থাও এমনই হয়েছে। খবরটা শুনে প্রথমে তো বিশ্বাসই করতে পারিনি। যখন নিশ্চিত হলাম, কিংস্টনে তাঁর হোটেল রুমে নিঃসঙ্গ বব উলমার মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে আসলেই চলে গেছেন, স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। রানার মৃত্যুসংবাদের মতো চোখে জল আনেনি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণ ঠিকই হচ্ছিল। শুধু যে দূর থেকে চিনতাম না, কত জায়গায় দেখা হয়েছে, কথাও হয়েছে অনেকবার। চোখের সামনে সেসব স্মৃতির মিছিল।

জ্যামাইকার পেগাসাস হোটেলের একটি গেস্ট রুম, এমনই এক রুমে পাওয়া গিয়েছিল উলমারের নিথর মরদেহ। ছবি: গেটি ইমেজেস

এক বিশ্বকাপে চলে গেলেন উলমার। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখাও আরেকটি বিশ্বকাপেই। ইংল্যান্ডে ১৯৯৯ বিশ্বকাপে লিডসে দক্ষিণ আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের আগের দিন প্র্যাকটিস শেষে মাঠে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম তাঁর। পরিচয় দিয়ে সাক্ষাৎকার চাইতেই সঙ্গে সঙ্গে রাজি। ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে কখনোই তাঁর ক্লান্তি ছিল না। সেই সাক্ষাৎকারের একটি অংশ এখনো মনে আছে। ক্রিকেটকে তিনি মনে করেন অনন্ত সম্ভাবনার খেলা। সেসব এখনো কাজে লাগাতে বাকি। সম্ভাবনা বলতে অন্যভাবে খেলার কথাই বুঝিয়েছিলেন। ওয়ারউইকশায়ারেই থাকুন বা দক্ষিণ আফ্রিকায়—উলমারের সেই চিন্তাভাবনার প্রতিফলন ঠিকই দেখা গেছে মাঠে।

দেখা হয়েছে ২০০৩ বিশ্বকাপেও। ডারবানে বাংলাদেশ-কানাডা ম্যাচ দেখলেন প্রেসবক্সে আমার দুই আসন দূরে বসে। স্টেডিয়ামে আসার পথেই দেখা হয়েছে। হেসে বলেছেন, ‘তুমি রাগ করতে পারো! কিন্তু আমি আজ কানাডাকে সাপোর্ট করব।’ রাগ করার কোনো কারণ ছিল না। কারণ কানাডা ছিল তাঁরই দল। সেই বিশ্বকাপের আগে সহযোগী দেশগুলোকে তৈরি করে তোলার দায়িত্ব ছিল উলমারের ওপর।

প্রেসবক্সে বসে বলছিলেন, সুযোগ পেলে বাংলাদেশে যেতে চান। বাংলাদেশের কোচ হলে তিনি কী করতেন—এ প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হননি। ‘আমি তো বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছুই জানি না। গিয়ে দেখলে হয়তো বলতে পারতাম।’ বাংলাদেশে গিয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত। নতুন নতুন চিন্তাভাবনার কথা জানিয়ে অবাক করে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের কোচ-খেলোয়াড়দের।

এই নতুন নতুন চিন্তাই তাঁকে বাকি কোচদের চেয়ে আলাদা করে দিয়েছিল। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত ইংলিশ কাউন্টি দল ওয়ারউইকশায়ারের কোচ হিসেবে ওয়ানডে খেলার ধরনই বদলে দেন অনেকটা। ক্রিকেট রোমান্টিক হয়েও নিয়মের বাইরে যেতে তাঁর আপত্তি ছিল না। এ কারণেই উলমারের নেটে নিয়মিত রিভার্স সুইপের অনুশীলন হতো। এ কারণেই ১৯৯৯ বিশ্বকাপে হানসি ক্রনিয়েকে মাঠে নামিয়ে দিয়েছিলেন কানে ইয়ারপিস দিয়ে। তাঁর যুক্তি ছিল পরিষ্কার, খেলা চলাকালে অধিনায়কের সঙ্গে কোচের যোগাযোগ থাকলে সমস্যা কী! আইনে তো কোনো নিষেধ নেই।

কানে ইয়ারপিস, মাঠে ক্রনিয়ে, আইডিয়াটা উলমারের! ১৯৯৯ বিশ্বকাপে। ছবি: গেটি ইমেজেস

উলমার-ক্রনিয়ের ওই ঘটনার পর থেকে ‘নিষেধ’ থাকল। সেই বিশ্বকাপের আগে আগে একটি সাময়িকীতে ২০১০ সালের ক্রিকেট কেমন হবে, এর একটি কাল্পনিক বর্ণনা দিয়েছিলেন বব উলমার। সব মনে নেই। তবে মনে আছে, তাতে ছিল বিচিত্র সব উদ্ভাবনী চিন্তার প্রকাশ। ব্যাট করতে নামার আগে প্র্যাকটিস করার জন্য ড্রেসিংরুমের পাশেই উইকেট থাকার সুপারিশের কথা মনে পড়ছে।

ক্রিকেটই ছিল তাঁর জীবন। মৃত্যুর পর যদি কিছু থেকে থাকে, সেখানেও ক্রিকেটটা আর কীভাবে খেলা যায়, সে কথাই হয়তো ভাববেন বব উলমার। মানজারুল ইসলাম রানার সঙ্গে দেখা হলে তাঁর ব্যাটিংয়ের গ্রিপটা ঠিক করে দেবেন।

আরও পড়ুন: শুধু বিশ্বকাপেই তো উলমারকে নিয়ে কত স্মৃতি!
                    বব উলমারের একান্ত সাক্ষাৎকার