দল বনাম দলের যুদ্ধের আবরণে ক্রিকেটে লড়াইটা তো আসলে ব্যক্তিগতও। ব্যাট বনাম বল মানে তো ব্যাটসম্যান বনাম বোলারই। ক্রিকেটের মতো আর কোনো দলীয় খেলায় ব্যক্তিগত দ্বৈরথটা এমন গুরুত্ব দাবি করে কি না, প্রশ্ন হতেই পারে। বলের পর বল করে ব্যাটসম্যানের হাতে তুলোধুনো হতে হতেও বোলার হতোদ্যম হন না স্রেফ এই ভরসাতে, 'আউট করতে তো একটা বলই লাগে!'

কেন উইলিয়ামসনের বিপক্ষে তাসকিন যেমন ৩৪ বারের চেষ্টায় সেই 'এক বল'-এর দেখা পেয়েছিলেন। আগের ৩৩ বলে উইলিয়ামসন করেছিলেন ৩৬, অতঃপর পঞ্চম স্টাম্প লাইনে পিচ করা বলটা সামান্য সোজা হয়ে ছুঁয়ে গেল কেন উইলিয়ামসনের ব্যাটের কানা, জমা পড়ল বিকল্প উইকেটকিপার ইমরুল কায়েসের গ্লাভসে। তাসকিন আহমেদ ওই উইকেটের স্মৃতি ভোলেননি এখনো, খুব সম্ভবত ভুলবেন না কোনোদিনই। সেটি যে তাঁর প্রথম টেস্ট উইকেট!

কেমন লেগেছিল তখন? অপেক্ষার প্রহর ফুরোবার আগে যে উতলা হয়ে উঠেছিল তাঁর মন, শুভ্র.আলাপে এসে তাসকিন স্বীকার করে নিলেন তা। তবে উইকেট পাবার পরের মুহূর্তটুকুর অনুভূতি ভাষায় প্রকাশের চেষ্টা বৃথা বলে স্রেফ 'ভালো লেগেছিল' বলেই তা সেরে ফেলতে চাইলেন। 'এক্সাইটেড ছিলাম, কখন উইকেট পাব-কখন উইকেট পাব। তারপর যখন কট বিহাইন্ড হলো, তখন… এক্সপ্লেইন করাটা ডিফিকাল্ট, ভালো লেগেছিল।'

প্রথম টেস্ট উইকেট পাবার পর তাসকিন। ওয়েলিংটন, ২০১৭। ছবি: গেটি ইমেজেস

এমন ভালো লাগার অনুভূতির স্বাদ তাসকিন খুব বেশি পাননি। যে সাতটা টেস্ট খেলেছেন এখন পর্যন্ত, তাতে  উইকেট ১৫টি। ৬৩.১৩ বোলিং গড়টা বলছে, লাল বলে ব্যাটসম্যানদের বিপাকে ফেলাটা তাঁর জন্য কঠিন মনে হয়েছে বরাবরই। তবে এর মাঝেও কোন ব্যাটসম্যানকে বল করতে গিয়ে একটা 'ম্যাজিক' বলের দেখা পাওয়াটা অসম্ভবের নামান্তর মনে হয়েছে? মনে হয়েছে, ব্যাটসম্যান যেন অটো পাইলট মুডে চলছেন। ঝড়-ঝঞ্ঝা যা-ই আসুক, তাঁকে উইকেট থেকে সরানো কোনোক্রমেই সম্ভব হবে না!

উৎপল শুভ্র মনে করিয়ে দিলেন, ২০১৭ সালে হায়দরাবাদ টেস্টে বিরাট কোহলির ব্যাটিং দেখে তাঁর এমনটাই মনে হয়েছিল যে, তাঁকে বোধ হয় আউট করা সম্ভব নয়। তাসকিন জানালেন, ভারতের মাটিতে ভারতের সব ব্যাটসম্যানই ঘরের মাঠের সুবিধা কাজে লাগায়, বিরাট কোহলিও এর ব্যতিক্রম নন। বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে বলা তাসকিনের কথাটা সহজ করে মূলত বাংলায় বললে তা হবে এমন:  'কোনো সন্দেহই নাই, বিরাট কোহলি বিশ্বের অন্যতম বড় একজন ব্যাটসম্যান।  এসব বড় ব্যাটসম্যান যখন সেট হয়ে যায়, সামান্যতম আলগা বলও করার সুযোগ থাকে না। কোয়ালিটি প্লেয়ারদের বিপক্ষে ভুল করার মাত্রাটা (মার্জিন অব এরর) খুব কম থাকে। একটু এদিক-সেদিক হলেই স্কোরিং শটস্ খেলে।'

হায়দরাবাদে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন কোহলি, যা ছিল টানা চার সিরিজে চার নম্বর। ছবি: বিসিসিআই

তবে বিরাট কোহলি নন, কিংবা টেস্ট ক্রিকেটে মুখোমুখি হওয়া কোনো ব্যাটসম্যানও নন; তাসকিনকে এক দক্ষিণ আফ্রিকান সমস্যায় ফেলেছিলেন সীমিত ওভারের ক্রিকেটেই। তাসকিনই বললেন, এবি ডি ভিলিয়ার্সের বিপক্ষে বল করতে গিয়ে রীতিমতো অসহায় লেগেছে তাঁর। খুব বেশিবার মুখোমুখি অবশ্য হননি, দুই ওয়ানডেতে ডি ভিলিয়ার্সকে বল করেছেন মাত্র ১৯টি। কিন্তু এতেই তাসকিন বুঝে গিয়েছেন এবির মাহাত্ম্য। তাসকিনের মাত্র চারটি বলেই এবি রান নেননি। বাকি ১৫ বলে রান তুলেছেন ৪০, যার ২৮-ই এসেছে চার-ছক্কায়।

এ পর্যন্ত যেসব ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে বোলিং করেছেন, তাঁদের মধ্যে কাকে বোলিং করা সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে? শুভ্রর এই প্রশ্নের জবাবে তাসকিন তাই বলছেন, 'সাউথ আফ্রিকার মাটিতে (এবি) ডি ভিলিয়ার্সকে বল করতে প্রব্লেম হচ্ছিল। দেখা যাচ্ছিল, ভালো বলে এক নিচ্ছিল। আর একটু এদিক-ওদিক হলে বাউন্ডারি মারছিল। ওকে আটকানো কষ্ট হচ্ছিল। তো ও আসলে যখন সেট থাকে, তখন খুব ডিফিকাল্ট হয় ওকে বোলিং করা। ওর শটসের অপশন অনেক।'

এই ব্যাটসম্যানকে বল করতে কোন বোলারেরই না অসহায় লাগবে! ছবি: গেটি ইমেজেস

যা শুনে উৎপল শুভ্র একটু যেন সান্ত্বনাই দেওয়ার চেষ্টা করলেন এই বলে যে, এবির সামনে এমন অসহায়ত্বের অনুভূতির কথা বললে বিশ্বের অনেক বোলারকেই সঙ্গী হিসাবে পাবেন তাসকিন। '৩৬০ ডিগ্রি ব্যাটসম্যান, আপনি (ওকে) কোথায় আটকাবেন! নিজের মতো করে এত শট বানিয়ে নেয়…'

সব ভুলে কেবল পরিসংখ্যানেই তাকান না! ওয়ানডেতে পঞ্চাশ ছাড়ানো গড় না হয় আরও কয়েকজনেরই আছে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ১০০ স্ট্রাইক রেট ওই এবি নামের অতিমানব ছাড়া আর কে রাখতে পেরেছে!