বারংবার ব্যবহারে বোধ হয় ক্লিশেই হয়ে গেছে। কিন্তু কেউ যদি অভিষেকের আগের দিন যাঁর উইকেট পেতে চান বলে জানিয়েছিলেন, ঠিক তাঁরই উইকেট পেয়ে যান; ওয়ানডে অভিষেকে ভারতের বিপক্ষে পেয়ে যান ৫ উইকেট, প্রথমবার বিশ্বকাপে গিয়েই হয়ে যান দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী, 'ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব' শব্দবন্ধ তাঁকে নিয়ে ব্যবহৃত না হলে কোথায় হবে?

তাসকিন আহমেদের উত্থানের গল্পটা কিন্তু এমনই ছিল। পেস বোলিং নিয়ে বাংলাদেশের দুর্ভাবনাও যে তাঁর হাত ধরেই ফুরোচ্ছে, বোলিং দিয়ে এমন স্বপ্নও দেখিয়ে ফেলেছিলেন অনেককে। কিন্তু সেই স্বপ্নটা সত্যি হবার আগেই পুড়তে হয়েছে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায়। বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা, হঠাৎ পাওয়া অর্থ-খ্যাতিতে একটু চোখ ঝলসে যাওয়ার সঙ্গে একের পর এক চোট মিলিয়ে তাসকিন তাঁর প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছুতে পারেননি কখনোই। উত্থানের মতো আচমকা না হলেও তাই পতনও হলো এক সময়। জায়গা হারালেন জাতীয় দলেও।

শুভ্র.আলাপে এসে তাসকিন আহমেদ স্বীকার করে নিলেন, পতনের পেছনে কিছুটা দায় তাঁরও ছিল। অমন দারুণ শুরুর পর ভালো খেলতে থাকায় নাম-খ্যাতি, টাকাপয়সা, বিজ্ঞাপনী চুক্তি--এসব এমন সহজে আসতে শুরু করেছিল যে, তাসকিন ভেবেছিলেন, চিরদিন বোধ হয় এমন সহজেই সব পেয়ে যাবেন। পরিশ্রমটাও প্রয়োজনমাফিক করেননি তখন। এমনকি বাংলাদেশ দলে সিনিয়ররা  'এটা আরেকটু বেটার করো', 'পরে কিন্তু স্ট্রাগল করবা' এসব বলে সতর্ক করার চেষ্টা করলেও আমলে নেননি তাঁদের সতর্কবাণী।

'শুরুর দিকের দুই-আড়াই বছর তো ফেইম-নেইম-এনডোর্সমেন্ট সবকিছু স্মুদলি আসা শুরু করল। আমার মাথায় আসেইনি, আমারও ইনজুরি-অফ ফর্ম আসতে পারে। তখন মনে হয়েছে, ভালো খেলাটা, এনডোর্সমেন্ট করাটা--এটাই নরমাল লাইফ, এটাই সবকিছু।' উৎপল শুভ্রর প্রশ্নের জবাবে অকপটে সেই সময়ের কথা খুলে বললেন তাসকিন।

এই অপরিপক্ক ভাবনাটাই ডেকে এনেছিল পতন। তবে খারাপের মধ্যেও কোনো না কোনো ভালো দিক থাকে। পতনের কারণেই নিজের খামতির জায়গাটাও বুঝতে পেরেছেন। ক্যারিয়ারের দৈর্ঘ্যটা যদিও সাত বছর ছাড়িয়েছে, তবে বয়সটা এখনো ২৬ বলে নিজের ভুল সংশোধনের জন্য সময়ও পাচ্ছেন যথেষ্ট। সংশোধনকল্পে কিছুটা কাজ তিনি এরই মধ্যে করেও ফেলেছেন। করোনা মহামারীর সময়টায় শারীরিক-মানসিক, দু'দিকেই উন্নতি করেছেন নিজের। শৈশবের কোচ মাহবুব আলী জ্যাকির সঙ্গে স্কিল ট্রেনিংয়ের কাজ করার আগে সেশন করেছেন মাইন্ড ট্রেনার সাবিত রায়হানের সঙ্গেও।

উৎপল শুভ্র জানতে চেয়েছিলেন, মাইন্ড ট্রেনিংয়ের দুয়েকটা টোটকা শুভ্র.আলাপের দর্শকদের সঙ্গে শেয়ার করা যায় কি না। তাসকিন মোটামুটি বিস্তারিতই জানালেন। যার মধ্যে সবচেয়ে চমক লাগানোর মতো তথ্যটা হলো, মনের ভয় দূর করার জন্য জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার আপাত অসম্ভব কাজটাও করেছেন তিনি। প্রথমে যদিও ভয় করছিল তাঁর, কিন্তু সাবিত তাঁকে মেডিটেশনের মাধ্যমে পুরোপুরিভাবে তৈরি করেই নামিয়েছিলেন কাজে। তাসকিন পেরেছেন। তাতে যেটা হয়েছে, অসম্ভব বলে মনে হওয়া কাজটা করতে পেরে মনের জোরটা অনেক বেড়ে গেছে তাঁর।

আগুনের ওপরে হাঁটছেন তাসকিন। ছবি: ফেসবুক

শারীরিক ও মানসিক এই প্রস্তুতি ফল পেতে তাসকিনকে খুব বেশি অপেক্ষাও করতে হয়নি। দীর্ঘ বিরতির পর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ দিয়ে ফিরেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় দলে। পরিসংখ্যান যদিও দেখাবে, তিন ম্যাচে উইকেট পেয়েছেন মাত্র দুটি, তবে গতির সঙ্গে আপস না করে এমনই দুর্দান্ত বোলিং করেছেন যে, ফের উঠেছে 'তাসকিন' 'তাসকিন' রব। সেই ধারা বজায় রেখেছেন শ্রীলঙ্কা সফরেও। টেস্ট সিরিজে বাংলাদেশের প্রাপ্তি বলতে এক তাসকিন আহমেদই।

তবে তাসকিন নিজে আর গলে যাচ্ছেন না এসব প্রশংসাবাণীতে। বরং তিনি যে কথাগুলো বলছেন, সেগুলোই প্রমাণ করছে, বোলার তাসকিনের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেট নিয়ে চিন্তা-ভাবনাতেও তিনি এখন অনেক পরিণত। এবার যত প্রলোভনই আসুক, ফাঁদে পা আর আটকাবে না বলেই আত্মবিশ্বাসটাও জন্ম নিয়েছে তাঁর মধ্যে, 'সাকিব ভাই, তামিম ভাই, মুশি (মুশফিক) ভাই, রিয়াদ ভাই--যাঁর সাথেই কথা বলি, সবাই বলেন, "এত খুশি হওয়ার কিছু নাই। ইম্প্রুভ করতে হবে প্রত্যেক সিরিজে সিরিজে।" তামিম ভাই তো আমাকে কিছু হোমওয়ার্কও দিয়েছেন, বলে দিয়েছেন শর্টার ফরম্যাটের জন্য ইয়র্কারটা ঠিক করতে হবে।'

আবারও জেগেছে এমন গর্জে ওঠা তাসকিনের দেখা পাবার প্রত্যাশা। ছবি: গেটি ইমেজেস

তাঁর ক্রিকেট-ভাবনা বদলের আরেকটা প্রমাণ পাওয়া গেল উৎপল শুভ্রর পরবর্তী প্রশ্নেই। ক্রিকেট থেকে কী পাওয়ার লক্ষ্য, ক্যারিয়ার শেষে নিজেকে কোথায় দেখতে চান, এসব প্রশ্নের উত্তরটা বুঝিয়ে দিল, এসব নিয়ে না ভেবে তাসকিন এখন মন দিয়েছেন নিজের কাজটা ঠিকভাবে করে যাওয়ায়। লক্ষ্যটাও তাই উইকেট-টাকাপয়সার বদলে সাফল্যের পূর্বশর্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন কাটানো, 'পার্টিকুলার এত কয়টা উইকেট পেতে হবে, এরকম কোনো টার্গেট করি নাই। ডেফিনিটলি আমার লক্ষ্য লিমিটলেস। তবে নেক্সট পাঁচ-সাত বছর ফুলটাইম প্রফেশনাল ক্রিকেটারের মতো লাইফ লিড করতে চাই। এটাই ফার্স্ট গোল। '

খারাপ সময় সামনেও আসতে পারে, তবে জীবন-যাপনে পুরোদস্তুর পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে পারলে সেই খারাপ সময়টা খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলেই বিশ্বাস তাঁর। শুভ্র.আলাপের মাধ্যমে কঠোর পরিশ্রমের গুরুত্বটা তাই বুঝিয়ে দিতে চাইলেন বাংলাদেশের অন্য পেস বোলারদেরও, 'আমি, ফিজ (মোস্তাফিজ), সাইফুদ্দিন যদি (ডিসিপ্লিন লেভেলটা) হাইলি মেইনটেইন করি; এমনকি আরও যারা উঠে আসছেন, সবাই যদি মেইনটেইন করে, তাহলে স্ট্রাগলিং পিরিয়ডটা অনেক ছোট হয়ে আসবে।'

কেউ দেখে শেখে, কেউ ঠেকে শেখে। ঠেকে শেখা তাসকিনের উদাহরণ কাজে লাগিয়ে কে কোন নৌকায় পা রাখেন, তা তো এক সময় না এক সময় জানা যাবেই।