অলিম্পিক স্টেডিয়ামে ছিল ৭২ হাজার আর টেলিভিশনে দেখেছেন চার বিলিয়ন। টেলিভিশনের বক্স অফিসে অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের চেয়ে বড় কিছু তো নেই-ই, এর ধারে কাছেও কিছু নেই। তা টেলিভিশনের সামনে উন্মুখ হয়ে বসে থাকা পুরো বিশ্বকে কী দেখাল গ্রিস?

দেখাল সবই। পশ্চিমা সভ্যতার আঁতুড়ঘর এই গ্রিস, হাজার বছর আগে এখানেই রাজনীতি, সমাজ, দর্শন, নাট্যকলা, এমনকি বিজ্ঞান নিয়েও মানুষের প্রথম মৌলিক চিন্তাভাবনাগুলোর শুরু। এথেন্স ২০০৪-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূর্ত হয়ে উঠল সেই তিন হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাস। এলো বর্তমান, এমনকি ভবিষ্যৎও। অলিম্পিক আয়োজকরা বারবার বলে এসেছেন, গ্রিস যে শুধু অতীত গৌরব রোমন্থন করেই বেঁচে নেই, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়েও চলছে— সেটিও বুঝিয়ে দেওয়া হবে এই অলিম্পিকে। অতীত গৌরবের ইতিহাস এমন আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উপস্থাপিত হলো যে, সেই লক্ষ্যও পুরোপুরিই সফল। 

গ্রিসের চারপাশে সাগর। গ্রিকদের ইতিহাস তাই সাগরের সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রামের ইতিহাস, ভালোবাসারও। এ কারণেই প্রতীকী সাগরই হয়ে থাকল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্যমণি। স্টেডিয়ামে ঢুকতেই স্বাগত জানাল মাঠের মাঝখানে বিশাল এক সাগর। এই সাগরটাকে চমক হিসেবে রাখলে নিশ্চয়ই আরো ভালো হতো। কিন্তু উপায় ছিল না। মাঠের মাঝখানে ৯ হাজার ৬৪৫ বর্গমিটার জায়গা ২১ লাখ ৬২ হাজার লিটার জল দিয়ে ভরে ওই ‘সাগর’ বানাতে সময় লাগে ৬ ঘণ্টা। সেই জলে আগুন দিয়ে তৈরি করা হলো অলিম্পিক বৃত্ত। যা দেখে ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র কবি হেলাল হাফিজের কথা মনে পড়া স্বাভাবিক। এই জলের কথাই কি বলেছিলেন তিনি?

দেবতাদের কাছ থেকে প্রমিথিউস চুরি করে এনেছিলেন আগুন, সেই আগুন জ্ঞান আর মানুষের নিজের ভাগ্য-নির্ধারক হওয়ার ক্ষমতার প্রতীক হয়ে ছিল প্রাচীনকালে, আর জল তো সব সময়ই জীবনের প্রতীক। অলিম্পিক চেতনার অবিনশ্বরতা বোঝাতে তাই মিলে গেল আগুন আর জল।

সেই সাগরে কাগজের নৌকার মতো দেখতে এক নৌকায় গ্রিক পতাকা হাতে ভেসে এলো এক কিশোর, সেই সাগরের মাঝখান থেকেই উঠে এলো প্রতীকী সব ভাস্কর্য। গ্রিক ভাস্কর্যের ক্রমপর্যায় বোঝাল তা, প্রতিফলিত হলো মানুষের চিন্তাচেতনার উন্মোচনের ইতিহাসও। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল অংশটা হলো আরো দারুণ। মাঠের মাঝখানে তৈরি করা ‘সাগর’-এর চারপাশ দিয়ে ঘুরতে লাগল ইতিহাসের আদি থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত মানবজাতির বিবর্তনের ইতিহাস। খোলা গাড়িতে নানা রঙে রঞ্জিত মানুষগুলোকে দেখাল ভাস্কর্যের মতো। একেকটি অংশে ফুটে উঠল ইতিহাসের একেকটি অধ্যায়। গ্রিক পুরাণের দেব-দেবী থেকে শুরু করে হারকিউলিস, আলেকজান্ডার, পিথাগোরাস, ইউক্লিড— কে না থাকলেন সেখানে! বাদ গেল না প্রাচীন অলিম্পিক গেমসও। 

ইতিহাস থেকে ঘুরে এসে বর্তমান, তারপর ভবিষ্যৎ। তারই প্রতীকী রূপ নিয়ে সাগরে নামলেন সন্তানসম্ভবা এক মহিলা। মানুষের বংশগতির ধারক ডিএনএর প্রতীকী চিত্র ফুটে উঠল তার সামনে। সাগরের মাঝখান থেকে এবার উঠে এল এক জলপাই গাছ, শান্তির চিরন্তন প্রতীক। 

সবই লেখা হলো। আসলেই কি হলো? সব লেখার পরও মনে হচ্ছে, বাকি রয়ে গেল অনেক কিছুই। আসলে এথেন্স ২০০৪ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আলো, শব্দ আর হাজারো মানুষের কলরবে মুখরিত এমন এক অভিজ্ঞতা যে, সেটিকে ভাষায় ধরাটা একটু কঠিন বলেই মনে হচ্ছে। 

টেলিভিশনে পুরো স্টেডিয়াম মাঝেমধ্যেই যে তারকাখচিত আকাশ হয়ে যাচ্ছিল, স্টেডিয়ামে বসে সেই দৃশ্যটিকেই তো মনে হলো অপার্থিব কিছু। আধিভৌতিক কিছু নেই এর মধ্যে, ঢোকার সময়ই দর্শকদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল ছোট্ট একটা গোল টর্চলাইট। সেগুলোর কল্যাণেই স্টেডিয়ামের বাতি নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অমন তারায় সাজানো আকাশ হয়ে যাচ্ছিল গ্যালারি।

সাড়ে তিন ঘণ্টার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রায় পৌনে দু্ই ঘণ্টা জুড়েই থাকল অ্যাথলেটদের মার্চপাস্ট। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঝুলে পড়ার সবচেয়ে বড় আশঙ্কাটা থাকে এখানেই। কিন্তু চাইলে এটিও হয়ে উঠতে পারে অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা। একের পর এক দেশ আসছে। বাতাসে আন্দোলিত হচ্ছে ২০২টি পতাকা। কত বিচিত্র দেশ, পোশাক-আশাকে কত বৈচিত্র্য। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কথা বাদ দিলে আর কারো সঙ্গে কারোর পোশাকের মিল নেই। আফগানিস্তান দল এলো আগের দিন বাংলাদেশের ফোক সিনেমার শাহজাদাদের পোশাকে, বাহরাইনের মেয়েরা যেন শাহজাদী। বুরুন্ডির চার অ্যাথলেটের পরনে পশুর চামড়া, হাতে তীর-ধনুক। সুদানিরা পুরো শরীর সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে। 

এই বিশ্বে যে এত দেশ আছে, এটিই তো এক বিস্ময়। গিনি বিসাউ, মালাউই, ভানাটুর নাম যদি আগে শুনেও থাকেন, কুক আইল্যান্ডের নাম শুনেছেন আগে? পালাউ নামেও একটি দেশ আছে, সেটিই বা কজনের জানা ছিল!

এই সব দেশের অ্যাথলেটরা মাঠ ঘুরে গিয়ে যখন মাঠের মাঝখানে গিয়ে জনসমুদ্র বানিয়ে ফেলল, সেটিও হলো দেখার মতো একটি দৃশ্য। কিন্তু মাঠের মাঝখানে না জলেরই সমুদ্র ছিল! ছিল, তবে সেটি ততক্ষণে শুকিয়ে গেছে! যে সাগর তৈরি করতে ছয় ঘণ্টা লাগে, সেটি শুকিয়ে ফেলতে তিন মিনিটই যথেষ্ট! আধা মিটার ব্যাসের ১০টি ড্রেনেজ ভালব প্রতি সেকেন্ডেই তিন হাজার লিটার জল ফিরিয়ে দেয় মাঠের নিচের ৪১ মিটার ব্যাসের জলাধারে।

অতীত গৌরব দেখাতে চেয়েছিল গ্রিস, দেখাতে চেয়েছিল আধুনিক গ্রিসকেও। যেভাবে জ্বলে উঠল অলিম্পিক মশাল, সেটি ভালোমতোই দেখাল দ্বিতীয়টিকে। মশাল নিয়ে স্টেডিয়ামে দৌড় শুরু হতেই হাতে মশাল নিয়ে অনেক মানুষ অ্যাথলেটদের মাথার ওপর দিয়ে শূন্যে ভাসতে ভাসতে যেতে শুরু করলেন কেন্দ্রের দিকে। মশাল জ্বালালেন অলিম্পিকে সোনাজয়ী গ্রিক অ্যাথলেট নিকোস কাকলামানাকিস, মশালই তার কাছে নেমে এসে যেন জয় ঘোষণা করল মানুষের। 

এর একটু আগে বিশাল এক অলিম্পিক পতাকার নিচে ঢাকা পড়েছে মাঠের ওই জনসমুদ্র। এত বিচিত্র দেশ, এত বিচিত্র মানুষ...সবাই এক পতাকার নিচে! 

স্বর্গ থেকে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে নিশ্চয়ই আনন্দাশ্রু বেরিয়ে এসেছে ব্যারন পিয়েরে ডি কুবার্তিনের চোখে। মাথার ওপর উড়তে থাকা বিশাল এক গোয়েন্দা বিমান আর ছোট ছোট হেলিকপ্টারগুলো দেখার পর থেকে যে বিষন্নতা ভর করেছিল তাঁর ওপর, সেই অনুভূতিটাও তখন উধাও।