উৎপল শুভ্র: প্রথম আলোর চোখে ২০০০ সালের ‘বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ’ নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রথমেই আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

আমিনুল ইসলাম বুলবুল : ধন্যবাদ। আমিও এটিকে বড় একটি সম্মান বলেই মনে করছি।

শুভ্র: মজার ব্যাপার হলো, মনে হচ্ছে স্রেফ দুটো দিনের কৃতিত্ব আপনাকে এই বর্ষসেরার সম্মান এনে দিয়েছে। কারণ নভেম্বরের আগ পর্যন্ত আপনি আমাদের তালিকাতেই ছিলেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমন এক কাজ করেছেন, যা আগের সব ব্যর্থতাকে ধুয়ে-মুছে দিয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে আপনার জন্য ‘স্বপ্ন হলো সত্যি’ গোছের ব্যাপার। মানে সারা বছর যেভাবে কাটল, সে বিচারে এটা তো দুর্দান্তভাবে ফিরে আসা!

আমিনুল: বছরটা একেবারে জঘন্য কেটেছে তা বলব না। কিছু কিছু ইনিংস যেমন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩০ রান, মাঝে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একটা ইনিংস আমি মনে করি ভালোই খেলেছি। তবে সবচেয়ে খারাপ কেটেছে গত জাতীয় লিগে, যেখানে ভালো খেলতে পারিনি। কিছু কিছু দিন আসে, যেমন মনে পড়ছে নাইরোবিতে ইংল্যন্ডের বিপক্ষে ম্যাচের দিনটির কথা। সকাল থেকেই মনে হচ্ছিল আজ আমি সেঞ্চুরি করতে পারি। হয়তো শেষ পর্যন্ত পারিনি, কিন্তু নিজের ওপর বিশ্বাস এনে দিয়েছিল--এ রকম বেশ কিছু দিন এসেছে। তবে অভিষেক টেস্টের দিনটায় সবকিছুই আমার পক্ষে গেছে। সকাল থেকেই মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, কিছু একটা ঘটা উচিত, যা অনেক দিন ধরেই পাওনা হয়ে আছে। শেষ পর্যন্ত ঘটেছেও তা-ই। আমার ফর্ম, আমার পারফরম্যান্স, যেভাবে ব্যর্থ হচ্ছিলাম গত এক বছরে--সবকিছু মুছে দিয়েছে অভিষেক টেস্টের ওই একটা ইনিংস। সবচেয়ে বড় কথা, আত্মবিশ্বাসের যে অভাবটা আমার খেলার মধ্যে প্রকটভাবে দেখা দিয়েছিল, তা পুরোপুরি ফিরে পেয়েছি এই ইনিংসটি খেলার মাধ্যমে। এই আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়াটাই আমি বলব আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।

ইতিহাস গড়া সেই সেঞ্চুরির পর। ছবি: শামসুল হক টেংকু

শুভ্র: তাৎক্ষনিক সেই উচ্ছ্বাস এখন অনেক থিতিয়ে এসেছে। এখন এই দু'মাস পরে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন ওই ইনিংসটিকে?

আমিনুল: অবশ্যই আমি ভীষণ সন্তুষ্ট ইনিংসটি খেলতে পেরে। বিশেষ করে সে সময় আমার যে মনঃসংযোগ বা কনসেনট্রেসন লেভেলটা ছিল, তা-ও আমাকে বেশ খুশি করেছে। বাংলাদেশের একজন ব্যাটসম্যান হিসেবে নয় ঘণ্টা ক্রিজে কাটাতে পেরেছি, যা কি না টেস্ট ম্যাচের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটা অনুষঙ্গ। সবচেয়ে বড় কথা, আমার বড় একটা ঘাটতি ছিল মনঃসংযোগের, যেটা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পেরেছি সেই ইনিংসটি খেলার মাধ্যমে। তার ওপর রয়েছে অভিষেক ম্যাচে সেঞ্চুরি পাওয়া, যেটা ছিল একটা স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্নটা সত্যি হয়েছে।

শুভ্র: ’৯৬-'৯৭-এর দিকে বাংলাদেশের অবিসংবাদিত সেরা ব্যাটসম্যান মনে করা হতো আপনাকে। আপনিও কি আপনার সেরা সময় বলে মনে করেন ওইটাকে?

আমিনুল: ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানে যদি যাই, সেই ’৮৮ সাল থেকেই আমি আমার ক্যারিয়ার বেশ ওঠা-নামার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। খু্ব ভালো দুটো মৌসুম কাটাবার পর খুব খারাপ কেটেছে পরেরটা। মোহামেডানে পাঁচটা সিজন কাটালাম, যার মধ্যে তিনটা বেশ ভালো খেললেও দুটো মৌসুম আবার প্রত্যাশা মতো খেলতে পারিনি। আবার বিমানে গত দু'বছর দেখেন, প্রথম বছর খুবই ভালো খেলেছি, এর পর আবার গত বছর কিছুই করতে পারিনি। তবে ’৯৪ থেকে ’৯৮-তে বিশ্বকাপের ঠিক আগ পর্যন্ত আমি মনে করি আমার বেশ ভালো একটা সময় গেছে। আমার পারফরম্যান্স, ব্যাটিং সবকিছুই ছিল সন্তোষজনক। আবার এখন যে সময়টা চলছে, এখন আমার কিছু শট, যেমন কাভার ড্রাইভ, অফ ড্রাইভ, আমি মনে হয় আগের চেয়েও ভালো খেলছি। নির্দিষ্ট করে হয়তো বলতে পারব না কখন ভালো খেলেছি, কিন্তু যেটা বললাম শুরু-আমার ক্যারিয়ারটাই এগিয়েছে ওঠা-নামার মধ্য দিয়ে।

শুভ্র: খারাপ সময় সবারই যায়, আবার তা কাটিয়েও ওঠে সবাই। আপনার ক্ষেত্রে সময়টা বেশি লাগার কারণ কী?

আমিনুল: কারণ বাড়তি চাপটা আমি বেশি নিতাম। যখনই ব্যর্থ হতাম, তার পর আমার ওপর মানুষের, দলের এবং আমার নিজের প্রত্যাশা মিলিয়ে খুব সিরিয়াস হয়ে যেতাম। ফলে পরের ম্যাচে অনেকখানি চাপ নিয়ে ব্যাট করতে নামতাম, যা আমার বিপক্ষে গেছে। এই ধরনের ব্যাপারগুলো কাটিয়ে উঠতে না পারাই খারাপ সময়টা কাটিয়ে উঠতে আমাকে খানিকটা দেরি করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখন ব্যাপারটা বদলে গেছে, পরিবর্তন এসেছে আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে। এখন একটা-দুটি ইনিংস খারাপ খেললে তেমন কিছু মনে হয় না। নিজেকে সান্ত্বনা দিই যে, সামনে আরও ইনিংস আছে নিজেকে ফিরে পাওয়ার জন্য।

১৯৯৬ সালের এমসিসির বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে বিসিবি বের করা স্যুভেনির। প্রচ্ছদের ছবিতে বাঁয়ে বুলবুলকে জড়িয়ে ধরে আছেন আতহার আলী খান

শুভ্র: আমাদের অনেকেরই ধারণা আপনি আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরতে পারেননি, এটা কি আপনার মানসিক শক্তির ঘাটতির কারণে?

আমিনুল: এটা আমিও বিশ্বাস করি যে আমার প্রতিভা, আমার সামর্থ্য যে রকম, সে রকম ভালো ক্রিকেট আমি খেলতে পারিনি। তবে আমি মনে করি সামনে আরও সময় পড়ে রয়েছে এবং আমি নিজেকে ঠিকই প্রমাণ করতে পারব। আর মানসিক যে শক্তির কথা বললেন, তার কিছুটা ঘাটতি আমার আছে স্বীকার করছি। ক্যারিয়ারের শুরুতে যদি মানসিকভাবে আরেকটু শক্ত হতে পারতাম, তাহলে নিশ্চয়ই আরও ভালোভাবে এগোতাম। আসলে আমাদের ক্রিকেট কাঠামোটা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। আমাদের ক্রিকেটীয় শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট অন্য সবকিছুর দৈন্যও আমাদের মানসিকভাবে শক্তপোক্তভাবে গড়ে ওঠায় বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। তবে আমরা এখনও শিখছি। আমাদের খেলোয়াড়, দর্শক, অফিসিয়াল সবাই এখন শিখছেন; তাই সময়ের সাথে সাথেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি।

শুভ্র: আপনার শুরুর সময়টাতে আসি। আপনার নির্দিষ্ট কোনো আইডল ছিল?

আমিনুল: আসলে আমাদের গোটা পরিবারটাই ছিল ভীষণ ক্রীড়ামনস্ক। ভাইদের সবাই ছিলেন ক্রিকেটপ্রেমী, ওই আমলে রেডিওতে টেস্ট ম্যাচ শোনার একটা চর্চা ছিল আমাদের বাড়িতে। ছোট থেকেই আমার গড়ে ওঠায় একটা বড় ভূমিকা রেখেছিল তা। তবে আমি কিন্তু চেয়েছিলাম ফুটবলার হতে। সে সময় অর্থ-খ্যাতি সবকিছুতেই অনেক এগিয়ে ছিল ফুটবল। আমার সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছিলাম ফুটবলার হতেই। একই সময়ে বাড়িতে ক্রিকেটের পরিবেশটাও খুবই ভালো ছিল; ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ম্যাচগুলো নিয়মিতই শোনা হতো রেডিওতে। বিশেষ করে ক্লাইভ লয়েড যখন ভারত এলেন, তারপর অস্ট্রেলিয়া গেলেন দল নিয়ে, একের পর এক টেস্ট জিতে রেকর্ড গড়লেন। সবকিছু মিলিয়ে এই ক্লাইভ লয়েড আমার আইডল ছিলেন বলতে পারেন। আর দেশে তখন রকিবুল হাসানের নাম শুনতাম খুব, তবে তাঁর ব্যাটিং খুব একটা দেখা হয়নি। তার পরও তাঁর একটা বড় প্রভাব ছিল আমার ওপর। তাই দেখে বা শুনে যতটুকু, তাতে ক্লাইভ লয়েড আর রকিবুল হাসানই আমার আইডল ছিলেন বলা যায়।

অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরির পর অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের আলিঙ্গনে

শুভ্র: '৮৮-তে আইসিসি একাদশের হয়ে যুব বিশ্বকাপে খেলার সুযোগটা নিশ্চয়ই স্মরণীয় হয়ে আছে। আপনার জীবনে বড় ব্রেক বলে কি এটাকেই মনে করেন?

আমিনুল: শুধু ব্রেক নয়, এটিই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তখন আমি ভিক্টোরিয়া দলের নিয়মিত ফুটবলার, যে দলে তখন পাঁচজন বিদেশি খেলে। রহিম ভাই বলতেন, ‘তুমি হচ্ছ নেক্সট লিটন’। লিটন তখন ঢাকা লিগে দুর্দান্ত স্ট্রাইকার, ব্রাদার্সে খেলেন। কিন্তু যখন যুব বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেলাম, তখন ক্রিকেট নিয়ে নতুন করে ভাবতে হলো আমাকে। সে সময়ে ক্রিকেট-ফুটবল একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল, কারণ ফুটবল হতো গরমে আর ক্রিকেট হতো শীতে। ’৮৮-র বছরটাই আমার দারুণ কাটছিল। লিগে ৫টা গোল করলাম, যুব দলে ডাক পেলাম, ব্রাদার্স ইউনিয়নে ডাক এলো ফুটবল-ক্রিকেট একসঙ্গে খেলার। সব মিলিয়ে বেশ ভালো অবস্থা। ঠিক আগের মৌসুমে আজাদ বয়েজের হয়ে দারুণ খেললাম ক্রিকেটেও। তাই যুব বিশ্বকাপে যখন সুযোগ পেলাম, তখন মনে হলো আমার ক্রিকেটকেই বেছে নেওয়া উচিত। যুব বিশ্বকাপ শুধু যে আমাকে জাতীয় দলে ঢোকার সুযোগ করে দিল তা নয়, আমার গোটা জীবনের মোড়টাই দিল ঘুরিয়ে।

শুভ্র: এরপরে তো ১৯৮৮ এশিয়া কাপে জাতীয় দলে প্রথম সুযোগ পেলেন। এই সুযোগ পাওয়ার ব্যাপারটি কি আগেই অনুমান করেছিলেন?

আমিনুল: কিছুটা। তবে মনে আছে, প্রথম ট্রায়াল ম্যাচে আমি ১০ রান করেছিলাম। মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। বন্ধুবান্ধব, পরিবার-পরিজন সবাই এরপর খুব উৎসাহ দিল। এর পরের ম্যাচে করলাম ৮২, তখনই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেলাম এশিয়া কাপ দলে থাকছি আমি। এর পর ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে অভিষেক হলো আমার, ১০ রান করলাম। পরের ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে শূন্য রানেই আউট। আবদুল কাদিরের একটা গুগলিতে স্কয়ার কাট করতে গিয়ে বোল্ড হয়ে গিয়েছিলাম। মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মনে পড়ে ঢাকা এয়ারপোর্টে শুকনো মুখে বসে আছি। এমন সময় কাদির এগিয়ে এসে বললেন, ‘মন খারাপ কেন? জানো, তুমি আবদুল কাদিরের বলে আউট হয়েছ। কাদিরের বলে অনেক বড় বড় ব্যাটসম্যানও বোল্ড হয়।’ শুনে মনটা ভালো হয়ে গেল। এর পর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে আমার খেলার কথা ছিল না। জাহাঙ্গীর শাহ বাদশা ভাইর ডায়রিয়া হয়ে গেল ম্যাচের আগে। তখন সুযোগ পেলাম সেই ম্যাচে খেলার, রান করলাম ২৭। সেটাই আমাকে স্থায়ী করে দেয় জাতীয় দলে।

দ্বিতীয় পর্ব: 'আইসিসি ট্রফি জয়ে গ্রিনিজের চেয়ে লিপু ভাইয়ের অবদান বেশি'

(চলবে)