নব্বই দশকের শেষ ভাগে ‘গুগল সার্চ ইঞ্জিন’ চালু হলেও তখন চাহিদা মাফিক ছবি দেওয়ার সামর্থ্য সেটির ছিল না। পত্রিকায় ছাপার মতো ভালো একটা ছবির জন্য তখন তো বটেই, নতুন শতাব্দীর পুরো প্রথম দশকেও ব্রোমাইটই ছিল ভরসা। প্রথম আলোর সাপ্তাহিক খেলাধুলা নিয়ে আয়োজন স্টেডিয়াম-এ ছাপানোর জন্য কী একটা ছবি খুঁজতে গিয়ে টেবিলের ওপর সব ব্রোমাইট ফেলে রেখেছিলাম। সেখান থেকে একটা ছবি বিভাগীয় প্রধান আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই ছবিটা আলাদা করে রাখেন, যখন-তখন লাগতে পারে।’

সাদা-কালো একটা পোর্ট্রেট। আগে কখনো দেখেছি বলে মনে হলো না—‘এটা কার ছবি দাদা?’ ছবির মানুষটিকে নিয়ে যতটা না আগ্রহ, তার চেয়ে অন্য একটা তাগিদ থেকেই নামটা জানতে চাওয়া। ব্রোমাইটের পেছনে নামটা লিখে রাখতে হবে, পরে যাতে ওই নামে ছবিটিকে সহজেই শনাক্ত করা যায়।

‘নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটের নাম শুনেছেন? গাঁটের টাকা খরচ করে এই লোকটাই বছরের পর বছর ধরে দেশজুড়ে করে এসেছেন ক্রিকেটার গড়ার এই টুর্নামেন্ট--কে জেড ইসলাম।’

আবার ছবিটার দিকে তাকাই। দিলওয়ালা, খোলা ও বড় মনের মানুষেরা সাদাসিধে হয়। তাঁদের চেহারায় সবসময় একটা শুভ্র আভা লেগে থাকে। পারসেপশন বদলে যাওয়ার কারণেই কি না, সেই নিষ্কলুষ শুভ্র আভা ছবির মুখটাতে দেখতে পাই। সেই প্রথম কে জেড ইসলামের সঙ্গে আমার ‘পরিচয়’! ভালো লাগাও। গত সপ্তাহে ‘নীরবে-নিভৃতে’ দুনিয়া ছেড়ে যাওয়া মহান সেই মানুষটিকে নিয়ে লিখতে চাওয়ার কথা বলতেই উৎপলশুভ্রডটকম-এর সম্পাদক কে জেড ইসলামকে নিয়ে কিছু লেখার লিঙ্ক দিলেন হোয়াটসঅ্যাপে। সবকিছু পড়ে মনে হলো লেখাটা শুরু করা যায় এভাবে:

দেশের খেলাধুলা বলতে তখন ছিল কেবল ফুটবল। স্বাধীনতা লাভের পর গ্রামে-গঞ্জে দেশজ খেলার চল ছিল, আজকের মতো তখনও হাডুডু ছিল জাতীয় খেলা। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে ঢেউ তোলা খেলা বলতে কার্যত ফুটবলের বাইরে তখন কিছু ছিল না। ক্রিকেট হলেও সেটি হতো ফুটবলের ফাঁকে ফাঁকে। সত্তর দশকের শেষ থেকে আশির দশকের শুরুতে হামাগুড়ি দিয়ে চলা ক্রিকেট আজকের যে অবস্থানে উঠে এসেছে, তাতে এই কে জেড ইসলামের অনেক বড় অবদান। ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া, তারও আগে ওয়ানডে স্ট্যাটাস লাভ, ২০১৬ সালে দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডকে এবং পরের বছর অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেওয়া; দেশের ক্রিকেটের অগ্রযাত্রায় এই যে এক একটি বাঁক, এই পথচলার শুরুটা কিন্তু হয়েছিল কে জেড ইসলামের হাত ধরেই।

কে জেড ইসলাম: বাংলাদেশের ক্রিকেটে তাঁর অবদান বোঝাতে পারে, এমন শব্দ কোথায়!

শৌখিন পরিমণ্ডলে শুরু হওয়া ক্রিকেটের একটা শক্ত ভিত তৈরি করতে, খেলাটাকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে ১৯৮২ সালে নিজের প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ইন্টারন্যাশনালের নামে চালু করেছিলেন নির্মাণ স্কুল ক্রিকেট। মাত্র ২২টি স্কুল নিয়ে টুর্নামেন্টটি শুরু হলেও শেষ দিকে সংখ্যাটা ৪০০ ছুঁয়েছিল। অংশগ্রহণকারী এত স্কুলের জন্য ক্রিকেট সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা কে জেড ইসলাম করতেন নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে। এখানেই শেষ নয়; সৈয়দ আশরাফুল হক, শফিকুল হক হীরা, ইউসুফ রহমান বাবুর মতো ক্রিকেটারকে চাকরি দিয়েছিলেন তাঁর প্রতিষ্ঠানে, যাতে তাঁদের ক্রিকেট মেধার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয়!

১৯৯৩-৯৪ নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে (পেছনে বাঁ থেকে অষ্টম)। ছবি: সংগৃহীতশুধু শখের বশেই এসব করেননি। সূদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েই এগিয়েছেন তিনি। স্কুল প্রতিযোগিতা থেকে উঠে আসা ক্রিকেট কলিরা যাতে ফুল হয়ে ফোটার আগেই ঝরে না পড়ে, সেই ব্যবস্থাও করেছিলেন। প্রতিশ্রুতিশীল ক্রিকেটারদের নিয়ে নির্মাণ একাদশ নামে একটা দল গড়েছিলেন, আলাদাভাবে তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করেছিলেন। কোচ রেখে তাঁদের আধুনিক অনুশীলনের সুযোগ সুবিধা করে দিয়েছিলেন। সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে দ্বিতীয় বিভাগে খেলিয়েছেন সেই দলকে। দ্বিতীয় বিভাগ থেকে পরে যে দলটি প্রথম বিভাগ হয়ে উঠে আসে প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেটেও। ওই সময়ে কারও এমন ব্যক্তি উদ্যোগের কথা ভাবাও কঠিন। সবাই ভাবতে পারেনও না। কিন্তু তিনি পেরেছিলেন। লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে, পরের প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে কেউ কেউ এমনটা ভাবতে পারেন বলেই থমকে থাকা স্বপ্নগুলো ডানা মেলে। মসৃণ হয়ে যায় আগামীর পথ। 

সমসাময়িক ধনাঢ্য ব্যক্তিরা যখন আরও বেশি সম্পদ গড়ার প্রতিযোগিতায় মেতেছেন, বাংলোবাড়ির জন্য  দূর দূরান্তে একরের পর একর জায়গা-জমি কিনেছেন, কোনো শিল্পে অর্জিত অর্থের সমুদয়ই পুনঃবিনিয়োগ করেছেন; তখন ক্রিকেটার তৈরি করতে কে জেড ইসলামের এই উদ্যোগ তাঁর ভেতরের মানুষটিকেই সামনে নিয়ে আসে। ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ মানুষের দেখা আজকাল আর পাওয়া যায় না। সব কিছুতেই প্রতিদান চাই সবার। এখানেই তিনি ছিলেন সবার চেয়ে আলাদা। কোনো প্রতিদানের আশা না করে তিনি কেবলই ঋণী করে গেছেন ক্রিকেটকে। ১৯৮১ সাল থেকে সে সময়ের ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিবির (বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড) সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। ’৮৩ থেকে ’৮৭ পর্যন্ত ছিলেন সভাপতিও। তাঁর সময়েই এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সদস্য পদ পেয়েছে বাংলাদেশ। ’৮৬-এর এশিয়া কাপ ক্রিকেটে হয়েছে স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছে বাংলাদেশের। যতদিন বোর্ড সভাপতি ছিলেন, টাকার অভাবে নিয়মিত প্রতিযোগিতাগুলো যাতে মুখ থুবড়ে না পড়ে, সে জন্য সব প্রতিযোগিতার স্পনসর নিজেই যোগাড় করতেন। কখনো নিজের প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করেছেন, কখনো বা প্রতিযোগিতার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন শিল্পপতি কোনো বন্ধুকে। যে ব্রত নিয়ে শুরু করেছিলেন স্কুল ক্রিকেট, সেটি ধরে রাখতে ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির পদ ছাড়ার পরও এক দশক পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন সাড়া জাগানো সেই টুর্নামেন্টের।

এখন বিসিবির অনেক টাকা। দুঃস্থ অন্যান্য অনেক ফেডারেশনকেই সাহায্য করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু আশির দশকে নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটের মতো যে কাজটা করার কথা ছিল ক্রিকেট বোর্ডের, নিজ খরচে যুগান্তকারী সে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন কে জেড ইসলাম। তাঁর ক্রিকেট-প্রেম ও বাংলাদেশের ক্রিকেটে তাঁর অবদান বোঝাতে আরেকটি উদাহরণ না দিলেই নয়। ১৯৮৯ সালে নিজ খরচে তিনি নির্মাণ ক্রিকেট একাদশের ইংল্যান্ড সফরের ব্যবস্থা করেছিলেন। পরে সেই দলে ঢোকানো হয় অন্য দলের খেলোয়াড়দেরও। ইংল্যান্ডে সে সফরটা  বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ব্যানারে হলেও সমস্ত খরচ বহন করেছিল তাঁর প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ইন্টারন্যাশনাল।

বিসিবি পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববির সাথে। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

এ পর্যন্ত এসে মনে হলো, লেখাটা একটু থামিয়ে যা লিখতে চেয়েছি, তা হয়েছে কি না--একটু পড়ে দেখা দরকার। সাড়ে সাত শ শব্দের বেশি লিখে ফেললেও ওই মানুষটার মনের বিশালত্বকে কি তুলে ধরতে পারলাম? পুরোটা পড়ে একটা অতৃপ্তি মনের মধ্যে খচ খচ করে। না, যেভাবে চেয়েছি, সেভাবে হয়নি। লেখাটা শেষ করার জন্য একটা পাঞ্চ লাইনও দরকার। হোয়াটসঅ্যাপের লিঙ্কগুলো আবার ওপেন করি। চোখ আটকে যায় বিসিবির ক্রিকেট পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল ববি ভাইয়ের এক লেখায়। ঢাকা ট্রিবিউন-এ ‘কে জেড ইসলাম, দ্য ম্যান, দ্য লিজেন্ড’ শিরোনামে তাঁর লেখার শুরুটা দিয়েই শেষ করা যেতে পারে এই লেখা। ইংরেজিতে লেখা সেই শ্রদ্ধার্ঘ্যের বাংলা করলে দাঁড়ায় এরকম--কিংবদন্তি, অগ্রদূত, স্বপ্নদ্রষ্টা শব্দগুলো এত বেশি ব্যবহৃত হয় যে, সেগুলো ক্লিশে হয়ে গেছে। আবেদন হারাতে বসেছে। কিন্তু কারও কারও ক্ষেত্রে এই শব্দগুলোও অপর্যাপ্ত মনে হয়। তাঁদের লিগ্যাসি, অবদানের ব্যাপকতা এই সব সুশোভিত শব্দ দিয়েও বোঝানো অসম্ভব। দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে কে জেড ইসলাম নামেই সম্যক পরিচিত কামাল জিয়াউল ইসলামের অবদানকেও মেলে ধরার সাধ্য কোথায় এই সব শব্দের!’

সত্যিই কখনো কখনো শব্দের পর শব্দ সাজিয়েও একজন মানুষকে পুরোপুরি ফুটিয়ে ধরা যায় না। যদি সেই মানুষ কে জেড ইসলামের মতো হন!

শাহরিয়ার ফিরোজ: ক্রীড়া সাংবাদিক। প্রথম আলোর সাবেক সহকারী ক্রীড়া সম্পাদক।