ওয়ানডেতে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরির মতো ঐতিহাসিক একটা ঘটনা, অথচ সেই মুহূর্তটার কোনো ছবি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কী কাণ্ড! এই সেঞ্চুরি নিয়ে বাবার সঙ্গে মেহরাব হোসেন অপির দারুণ এক গল্প নিয়ে লেখাটা রেডি করে বসে আছি, অথচ ছবিটা পাচ্ছি না বলে তা ওয়েবসাইটে আপলোড করতে পারছি না।

 ্আহা, সহজ বুদ্ধিটা কেন মাথায় আসেনি! সেঞ্চুরিয়ানের সঙ্গেই যখন ভালো পরিচয় আছে, তাঁর কাছে চাইলেই তো হয়! জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় কীর্তির ছবিটা অপির কাছে তো অবশ্যই থাকবে। আমাকে মহাবিস্মিত করে অপি জানালেন, সেঞ্চুরির ছবিটা তাঁর কাছেও নেই। যা আছে, তা হলো ওপেনিং পার্টনার শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুতের সঙ্গে একটা ছবি। সেটিও আসল ছবি নয়, একটা পেপার কাটিং! মনটাই খারাপ হয়ে গেল। ছবিটা এখন কোথায় পাই?

ছবি ছাড়া লেখাটা দিলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত, এমন নয়। কিন্তু আমার রীতিমতো রোখ চেপে গেল।এটা কেমন কথা, বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ানের ছবি যদি এখনই না পাওয়া যায়, তাহলে আরও কয়েক বছর পর কী হবে? বাংলাদেশের ক্রিকেটের অমর এই মুহূর্তের ছবি দেখতেই পাবে না পরবর্তী প্রজন্ম? এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে! প্রতিজ্ঞা করে ফেললাম, যেভাবেই হোক, এই ছবিটা পেতেই হবে। যে সব কথা বলে বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে উৎপলশুভ্রডটকম শুরু করেছি, এটাকেও মনে হতে লাগল তারই একটা অংশ। যে কাজগুলো হচ্ছে না বলে আমরা নিয়ত আক্ষেপ করি, তার কিছু কিছু তো আমরা নিজেরাই করে ফেলতে পারি। আমি তাই হারিয়ে যাওয়া বা হারিয়ে যেতে বসা এমন সব ছবি উদ্ধার করাটাকে একটা প্রকল্পের অংশ বানিয়ে ফেললাম।

বানিয়ে ফেলেছি আসলে আগেই। আইসিসি ট্রফি জয়ের দুই যুগ পূর্তির দিনে এই ওয়েবসাইটে এমন কিছু ছবি প্রকাশিত হয়েছে, যার অনেকগুলোই এই প্রজন্ম আগে দেখেনি। আমি নিজেই তো অনেক ছবি দেখে প্রথম দেখছি বলে মনে হলো। কৃতিত্বের কিছুটা আমার নাছোড়বান্দা স্বভাবের, বেশিটাই বন্ধু  শামসুল হক টেংকুর। কিন্তু অপির সেঞ্চুরির ছবির ব্যাপারে টেংকুও সাহায্য করতে পারল না। প্রথম আলোতে কাজ করার সময় এই ছবির ব্রোমাইট (প্রিন্ট করা ছবির সংবাদীয় নাম) আমি অনেক বছর যত্ন করে রেখে দিয়েছি বলে আমার স্পষ্ট মনে আছে। তাহলে প্রথম আলোতে একটা ফোন করলেই তো হয়!

করলাম এবং জানলাম, ছবিটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের শততম সেঞ্চুরির সময় এই প্রথম সেঞ্চুরির ছবিটা অনেক খোঁজা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তা না পেয়ে বাধ্য হয়ে গ্রাফিকস বানিয়ে কাজ সারতে হয়েছে। 

তাহলে উপায় কী? ছবিটা কি আর পাওয়াই যাবে না? শুধু এই ছবি না, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের স্মরণীয় অনেক ঘটনারই ছবি এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। যে কারণে এই ওয়েবসাইটের ছবির সেকশনটাও একটু স্থবির হয়ে আছে। অনেক চেষ্টা করেও নতুন ছবি যোগ করতে পারছি না। পাচ্ছিই না যে! চেষ্টা কিন্তু অনেকভাবেই করছি। অনেক সাধনায় জেতা সাফ গেমস ফুটবলে প্রথম সোনাজয়ী বাংলাদেশ দলের ছবিটাই যেমন কোনো ফটো সাংবাদিকের কাছ থেকে না পেয়ে একটু আনঅর্থোডক্স পথে জোগাড় করতে হয়েছে। তা পেয়েছি সেই দলের গোলকিপার বিপ্লব ভট্টাচার্যের কাছ থেকে।

ছবির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝতে না পারা একটা কারণ। আরেকটা বড় সমস্যার হয়ে দাঁড়িয়েছে যুগের বদল। ১৯৯৯ সালে সাফ ফুটবলে সোনা জয় বা অপির ওই সেঞ্চুরির সময় ক্যামেরায় ফিল্ম ভরে ছবি তোলার যুগ, 'নেগেটিভ' কথাটা যখন এই করোনাকালের মতো পজিটিভ অর্থ বহন করে আনত। ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করার পর অবহেলা-অযত্নে অমূল্য সব ছবির নেগেটিভ হয় হারিয়ে গেছে, অথবা ফটোগ্রাফার নিজেই জানেন না থাকলেও তা কোথায় আছে। ছবি নিয়ে বিপদে পড়লেই অনেক বছরের বন্ধুত্বের দাবিতে শামসুল হক টেংকুর ওপর বেশি চাপ দিয়ে ফেলছি কি না, এই অস্বস্তি থেকে আবদুল হান্নান, মোহাম্মদ মানিক, খন্দকার তারেকের মতো কয়েকজনের দ্বারস্থ হই, তাঁরাও সাহায্য করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁরাও কখনো কখনো অসহায়, অপির এই সেঞ্চুরির ছবিটাই যেমন তাঁদের কাছেও নেই। অথবা হয়তো কোথাও আছে, কিন্তু এখন খুঁজে পাচ্ছেন না। 

ওয়ানডেতে প্রথম সেঞ্চুরির পর মেহরাব হোসেন অপি। অনেক সাধনায় পাওয়া এক ছবি। কৃতজ্ঞতা: ফিরোজ চৌধুরী

মনটা এত খারাপ হয়ে গেল যে, কী বলব! শেষ ভরসা হিসেবে মনে পড়ল ফিরোজ চৌধুরীর কথা। ১৯৯৯ সালে মেরিল ইন্টারন্যাশনাল টুর্নামেন্টে অপির ওই সেঞ্চুরি, ফিরোজ তখন প্রথম আলোতে আমার সহকর্মী। অনেক বছর স্পোর্টস ফটোগ্রাফি করার পর খেলার মাঠকে বিদায় জানিয়েছেন সেটাও আজ অনেক দিন হয়ে গেছে, তারপরও যদি তাঁর কাছে কোনো কারণে ছবিটা থাকে...। গর্ডন গ্রিনিজের সঙ্গে আমার কোনো ছবি নেই জানতে পেরে কিছুদিন আগেই তো ১৯৯৯ সালে বিকেএসপিতে গর্ডনের সঙ্গে আমার একটা ছবি পাঠিয়ে দিয়েছেন। অপির প্রথম সেঞ্চুরিটা তো এর কাছাকাছি সময়েই।

আক্ষরিক অর্থেই কম্পিত বক্ষে ফিরোজকে ফোন দিলাম। আনন্দে ভাসিয়ে দিয়ে ফিরোজ জানালেন, ছবিটা তাঁর কাছে আছে। আমাকে আরও খুশি করে দিয়ে বললেন, তাঁর মাঠের সাইডলাইনের জীবনের সব নেগেটিভই তিনি যত্ন করে রেখে দিয়েছেন। কিন্তু নেগেটিভ থাকলেই তো হবে না, ডিজিটালের এই জমানায় নেগেটিভ থেকে ছবি করা এখন রীতিমতো দুঃসাধ্য ব্যাপার। দুই-তিনটা ল্যাবই সম্ভবত এখনো এই ঐতিহ্যটা ধরে রেখেছে। সেজন্য আবার মতিঝিলে দৌড়াতে হয়। নিজের কাজ ফেলে ফিরোজ চৌধুরী আমার অনুরোধে এই কষ্টটা করলেন। ফিরোজকে ধন্যবাদ তো দেবই, একই সঙ্গে যে অন্য ফটো সাংবাদিকদের নাম বললাম, তাঁদেরকেও। 

আমার মনে শুধু একটা প্রশ্নই জাগছে, এই ছবিটা পেতে আমি যেমন প্রাণান্ত চেষ্টা করেছি, এটা তো আসলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের করার কথা। বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্মরণীয় সব মুহূর্তের ছবি সংগ্রহে রাখা কি বিসিবির দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না?

আমার মনে শুধু একটা প্রশ্নই জাগছে, এই ছবিটা পেতে আমি যেমন প্রাণান্ত চেষ্টা করেছি, এটা তো আসলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের করার কথা। বাংলাদেশ নামে খেলতে নামা প্রথম ক্রিকেট দলের ছবি, ওয়ানডেতে বাংলাদেশের প্রথম হাফ সেঞ্চুরিয়ান-সেঞ্চুরিয়ানের ছবি, প্রথম জয়ের ছবি...এসব সংগ্রহে রাখা কি বিসিবির দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না? বিসিবির কেন একটা সমৃদ্ধ আর্কাইভ থাকবে না, যেখান থেকে মিডিয়া চাইলেই তাদের চাহিদামতো ছবি নিয়ে ব্যবহার করতে পারবে? পরবর্তী প্রজন্মকে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস জানানোটাও কি বিসিবির অবশ্য পালনীয় কর্তব্য নয়? এজন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সদিচ্ছার, এরপর যদি কিছুর প্রয়োজন হয়, তা হলো টাকা। বিসিবিতে দ্বিতীয়টার কোনো অভাব নেই বলেই জানি। প্রথমটার যে বড় অভাব, কেন তা ভাবব না?

বিসিবির বর্তমান সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনকে একদিন আমি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বলেছিও, মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে বাংলাদেশের বিশ্বসেরা হওয়াটা অনেক কঠিন। কোনোদিন যদি তা সম্ভব হয়ও, তা তিন-চার বছরে হওয়ার নয়। এটি অনেক সময়সাপেক্ষ এবং অনিশ্চিত একটা ব্যাপার। কিন্তু একটা ক্ষেত্রে তো বিসিবি চাইলে এখনই ক্রিকেট বিশ্বে অনন্য হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের সেরা ক্রিকেট মিউজিয়াম বা বিশ্বের সেরা ক্রিকেট লাইব্রেরি করতে তো ওই যে দুটি জিনিসের কথা বললাম, শুধু তা-ই লাগে। বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই, সদিচ্ছা আর টাকার কথা বলছি। এমন তো হতেই পারে, ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়াও অবাক হয়ে বলবে, বাংলাদেশ একটা ক্রিকেট মিউজিয়াম বানিয়েছে বটে, এমন ক্রিকেট লাইব্রেরিও আর কোথাও নেই।

বিসিবি সভাপতি কথাটা মন দিয়ে শুনলেন, তবে কথাটা কাজে পরিণত করার কথা সিরিয়াসলি ভাববেন কি ভাববেন না, এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রতিক্রিয়া পেলাম না। 

আপনিও অবশ্য প্রশ্ন করতেই পারেন, ক্রিকেট মিউজিয়াম আর লাইব্রেরি করে কী লাভ? তাতে কি বাংলাদেশের মাঠের পারফরম্যান্স ভালো হয়ে যাবে? অবশ্যই এই দুটি সরাসরি সম্পর্কিত নয়। তবে একটা দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য এসবের মূল্য বলে শেষ করা যাবে না। মাঠের খেলা নিয়ে যেমন, ওই ক্রিকেট সংস্কৃতি গড়ে তুলতেও বাংলাদেশে অনেক কাজ করার আছে। আমি স্বপ্ন দেখি, স্বাধীনতা-পূর্ব সময় থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাস, বিশ্ব ক্রিকেটের পরম্পরাকে মূর্ত করে তোলা একটা মিউজিয়াম হবে মিরপুরে। সেই মিউজিয়ামের দেয়াল জুড়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্মরণীয় সব মুহূর্ত আর কীর্তিমানদের ছবি। শিশু-কিশোরদের মনে যা স্বপ্নের বীজ বুনে দেবে। স্বপ্নাতুর চোখ দেখবে দূরের এক বাতিঘর: একদিন আমি আমার ছবিটা ওই দেয়ালে দেখতে চাই।

প্রথম সেঞ্চুরির স্মৃতি বলতে অপির কাছে ছিল শুধু এই পেপার কাটিংটা!

বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে জরুরিভিত্তিতে করার মতো কাজ নিশ্চয়ই আরও অনেক আছে। সেসবও হোক, তা তো চাই-ই, তবে এটাও হোক। আগেই তো বলেছি, মাঠের পারফরম্যান্স চাইলেই রাতারাতি বদলে দেওয়া যায় না; কিন্তু মিউজিয়াম বা লাইব্রেরির মতো রাতারাতি যা করা যায়, তা করতে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হয়তো একটাই, এসবের গুরুত্ব বোঝার অক্ষমতা। নইলে যে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলেছে, সেখানেই বা কেন এই কীর্তির স্মারক একটা ফলক অন্তত থাকবে না? বিসিবি অন্তত একবারও তা ভেবেছে বলে বিশ্বাস করতে পারলে বড় ভালো লাগত। 

একটা ছবির গল্প বলতে গিয়ে কথায় কথায় কত কিছুই না বলে ফেললাম। হয়তো তা অরণ্যে রোদন-ই। তবে একটা দাবি এখনই জোরেসোরে জানাতে চাই, বিসিবি এখনই যেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের ঐতিহাসিক সব মুহূর্তগুলো ধরে রাখা ছবিগুলো সংগ্রহের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। 'ঝাঁপিয়ে পড়া' কথাটা গুরুত্ব বোঝাতে বললাম, নইলে কাজটা তো এমন কঠিন কিছু নয়। বিসিবি ফটোগ্রাফারদের কাছে ছবি চাইবে, উপযুক্ত মূল্যে তা কিনে নেবে। অনেক ছবি পেতে নির্ঘাত এখনই সমস্যা হবে। আর যতই সময় যাবে, ততই আরও দুরূহ হয়ে উঠবে কাজটা। কিছুদিন পর দেখা যাবে, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অনেক কিছুই কালের (পড়ুন অবহেলার) গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

তা কল্পনা করেই আমি যেমন আঁতকে উঠছি, যাঁদের এসব করার কথা, তাঁরা আদৌ এসব নিয়ে ভাবেন কি না, আসল প্রশ্ন তো এটাই।

আরও পড়ুন...
বাবাকে দেওয়া কথা রাখতে দেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান
রমন লাম্বাকে কীভাবে ভুলবেন অপি!
অপির চোখে তাঁর সময়ের অন্য তিন ওপেনার বিদ্যুৎ-জাভেদ-রোকন