‘তোমাদের বাংলাদেশে বিচ আছে?’

—এমন টুকরা-টাকরা নেই। একটাই আছে, তোমাদের ক্যারাবিয়ানের সব বিচের সমান।

টনি কোজিয়ার ভাবলেন, রসিকতা করছি। টিভিতে কমেন্ট্রি করার মাঝের সময়টায় সেন্ট ভিনসেন্ট প্রেসবক্সে ঠিক আমার পেছনে এসেই বসতেন। আমার কথাবার্তায় কীভাবে যেন রসবোধের পরিচয় পেয়ে বেচারার একটা সমস্যাই হয়েছে। কোন কথাটা সিরিয়াস আর কোনটা মজা করে বলা—প্রায়ই গুলিয়ে ফেলেন। গত পরশু সন্ধ্যায় আমার কথা শুনেই যেমন পাশে বসা ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্বর্ণযুগের উইকেটকিপারকে বললেন, ‘জেফরি, দেখো ও কী বলছে। ভেরি ফানি ম্যান!’

কিসের ফানি? কক্সবাজারের সমুদ্র-সৈকত যে আসলেই বিশ্বের দীর্ঘতম, কোজিয়ার-ডুজনকে তা বিস্তারিত বোঝালাম। প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের ভোটের ব্যাপারে জানতেন না। কোজিয়ার তো কোজিয়ার, ডুজনের কাছ থেকেও কক্সবাজারকে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করে ফেললাম!

টনি কোজিয়ার। ছবি: গেটি ইমেজেস

কাজটা অবশ্য সহজ হলো না। কোজিয়ার আমার রসিকতা বুঝতে না পেরে মহা সিরিয়াস হয়ে বেশ ক'বার বললেন, ‘না দেখে কীভাবে ভোটটা দিই, বলো তো!’

প্রশ্নটা যৌক্তিকই। টিভি কমেন্ট্রি করতে বাংলাদেশে তিনবার গেছেন। এরপর গেলে কক্সবাজারে বেড়াতে নিয়ে যাব, দেখে-টেখে পছন্দ হলে তারপর ভোট দেবেন—এভাবে যার একটা সমাধান হলো।

গ্রেনাডার গ্র্যান্ড আনসে বিচ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট যেন বিশাল এক বাগানবাড়ি। বাংলাদেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ দুই দল, টেলিভিশনের লোকজন, কমেন্টেটর--সবাই এই হোটেলেই উঠেছেন। এই অধমও। বিশাল জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দোতলা হোটেলের ১৮৩টি রুম। আমার রুম থেকে প্রাতরাশের জন্য রেস্টুরেন্টে যেতেই ছয়-সাত মিনিট হাঁটতে হয়। হোটেলের নামটা সৈকতের নামে—গ্রেনাডার সবচেয়ে বিখ্যাত সৈকত—গ্র্যান্ড আনসে বিচ। পাকিস্তানি ক্রিকেট ইতিহাসে অবশ্য এটি যত না বিখ্যাত, কুখ্যাত তার চেয়েও বেশি। এখানেই তিন সঙ্গীকে নিয়ে গাঁজা খাওয়ার সময় ধরা পড়েছিলেন ওয়াসিম আকরাম। গ্রেনাডায় মাদক আইন খুব কঠোর। পাকিস্তান কূটনৈতিক প্রভাব না খাটালে আকরামদের বড় বিপদেই পড়তে হতো।

এই সেই গ্রেনাডা আনসে বিচ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট

সেই গ্র্যান্ড আনসে বিচটা বলতে গেলে দখলই নিয়ে নিয়েছে এই হোটেল। সেই বিচের পাশেই বারে পানরত কোজিয়ার-ডুজনের সঙ্গে দেখা। রাতের খাবারের সন্ধানে বেরিয়েছি জেনে কোজিয়ার তাঁদের সঙ্গী হওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। তাঁরাও ডিনার করতে যাচ্ছেন।

লিয়াটের কল্যাণে এক রাত কাটিয়ে বিকেলে গ্রেনাডা পৌঁছেছি। লিয়াট এয়ারলাইনস ফ্লাইটে খাওয়া-দাওয়ার মতো ফালতু ব্যাপার নিয়ে একদমই মাথা ঘামায় না। দুপুরে খাওয়া হয়নি, পেট খিদেয় চোঁ চোঁ করছে। চোখে ভাসছে সাদা ভাত, পাঁচমিশালি গুঁড়া মাছের চচ্চড়ি আর পিঁঁয়াজ ভাসতে থাকা মসুরির ডাল। সেটি তো আর এখানে মিলবে না, কাছাকাছি কিছু পাওয়া যায় কি না দেখতাম। এখন এরা দুজন কোথায় নিয়ে যাবেন, কে জানে!

তার পরও সানন্দে সঙ্গী হলাম। জীবনে বহু খাওয়া যাবে। ডুজন-কোজিয়ারের সঙ্গে ডিনার করার সুযোগ তো আর প্রতিদিন আসবে না। হোটেল থেকে মিনিট দশেক হেঁটে আমরা যেখানে হাজির হলাম, তা একটা ইতালিয়ান রেস্টুরেন্ট। সর্বনাশ! এর আগে দু-একবার ইতালিয়ান রেস্টুরেন্টে খেতে বাধ্য হওয়ার স্মৃতি এমনই বিবমিষাময় হয়ে আছে যে, মুখটা হাসি হাসি রাখতে খুব কষ্ট হলো।

মেন্যু এল। কোজিয়ার জানতে চাইলেন, কী খাব? আমি একেবারে সুবোধ বালক, ‘তুমি যা খাবে, আমার জন্যও তা-ই অর্ডার দাও।’ মেন্যুতে চোখ বুলিয়েই বুঝেছি, এখানে আমার জন্য যাহা বাহান্ন তাহাই তিপ্পান্ন। পাস্তা ছাড়া আর একটা খাবারও চিনি না।

আলাপ হয়েছিল ডুজনের উইকেট কিপিং, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের একাল-সেকাল নিয়েও! ছবি: গেটি ইমেজেস

শেষ পর্যন্ত যা খেতে হলো, সেটির নাম বোলোনি আর স্প্যাগেটি (উচ্চারণে ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা করে দেবেন প্লিজ)। প্লেটভর্তি মোটা মোটা নুডলস আর মাংসের কিমা। এমনিতেই ভাত-মাছের জন্য প্রাণে হাহাকার, তার ওপর নুডলস আমার দু চোখের বিষ। কিন্তু কী করব, বাঁচতে হলে খেতে হবে! এক চামচ মুখে তুলতেই কোজিয়ার জানতে চাইলেন, কেমন লাগছে? মনে মনে বললাম, জঘন্য, তুই আমাকে এ কোথায় নিয়ে এলি! আর মুখে, ‘দারুণ! এই ট্যুরে এমন ভালো খাবার আর খাইনি।’ খবার আসতে আসতে জেফরি ডুজনের সঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেই সময় আর উইকেটকিপিংয়ের অতীত-বর্তমান নিয়ে জমাট আড্ডা হয়েছে।

তিনি বললেন, ‘আমি জানতাম, এটা তোমার খুব পছন্দ হবে।’

তুই-তোকারিতেই থেকে মনে মনে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী বলছিস তুই, এটা কি পছন্দ হওয়ার মতো কিছু? তোরা খাচ্ছিস কীভাবে?’

মুখে অন্য কথা, সঙ্গে হাসি, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ খুব ভালো। প্রতিদিনই এখন এটা খাব।’

মানুষ যদি কোনোভাবে মনের কথা বুঝে ফেলার বিদ্যা আয়ত্ত করে ফেলে, এই পৃথিবীতে আর বাস করা যাবে না রে ভাই!