জহুরুল ইসলাম কাজটা ঠিক করলেন না! টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম স্কোরিং শটটিই ছক্কা। সেটিও কখন? টেস্ট অভিষেকেই ‘পেয়ার’ যখন চোখ রাঙাচ্ছে। পেয়ারের মুখে দাঁড়িয়ে এক টেস্ট অভিষিক্তর ছক্কা মেরে সেই দুঃস্বপ্নকে সীমানাছাড়া করা—বীররসে টইটম্বুর এক ক্রিকেটীয় রূপকথা!

কিন্তু সেটিতে যে একটু জল ঢেলে দিলেন জহুরুল নিজেই! কোথায় বলবেন—ছক্কা মেরেই চেপে বসা বিষম চাপটা উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম—তা না—বললেন, ফিল্ডাররা সব ঘিরে ধরেছিল বলে এক রান নেওয়া কঠিন ছিল। তাই ওভার দ্য টপ মেরেছেন, উদ্দেশ্যটা ছক্কা মারা ছিল না। কী দরকার ছিল বাপু ও কথা বলার!

উদ্দেশ্য যা-ই থাক, সোয়ানের বলে ওভার দ্য টপ ওই শটেই লং অনের ওপর দিয়ে ছক্কা। ছয় বল পর টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর দ্বিতীয় স্কোরিং শটটিও ছক্কা, এবার বোলার ট্রেডওয়েল। এক বল পর চার। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫ বল খেলার পর নামের পাশে ১৬ রান। স্কোরিং শট মাত্র ৩টি—দুটি ছয় ও একটি চার!

আপ শি গৌজ.... ছবি: পোপারফটো

ইতিহাস হয়ে গেছে ওতেই। চারটার কথা বাদই দিন, টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম দুটি স্কোরিং শটই ছক্কা—এই কীর্তিই কি আর কারও আছে? ক্রিকেট ইতিহাস আঁতিপাতি করে খুঁজেও আর কাউকে পেলাম না। ছক্কা মেরে টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম রান—এই ঘটনা আছে। তবে সেটিও জহুরুলের আগে মাত্র চারজনের। শুধু দুই ছক্কাই নয়, জহুরুল এগিয়ে থাকছেন আরও একটি কারণে। ছক্কা মেরে টেস্ট ক্রিকেটে রানের খাতা খোলার ওই চারটি ঘটনাই প্রথম ইনিংসে। অভিষেকেই ‘পেয়ার’-এর লজ্জা ধাওয়া করছিল না আর কাউকেই।

‘পেয়ার’ পেয়ে গেলে জহুরুলকে সান্ত্বনা খুঁজতে হতো অন্যভাবে। টেস্ট ক্রিকেটে ৩৭ জনের হয়েছে এই দুর্ভাগ্য। তবে তাঁদের মধ্যে অন্তত তিনজন ভালোভাবেই প্রমাণ করতে পেরেছেন যে প্রভাত সব সময় দিনের সঠিক পূর্বাভাস দেয় না। অভিষেকে ‘চশমা’ পাওয়া গ্রাহাম গুচ ক্যারিয়ার শেষ করেছেন ৮৯০০ রান করে। এখনো ইংল্যান্ডের পক্ষে টেস্টে সবচেয়ে বেশি রান তাঁর। মারভান আতাপাত্তু শুধু অভিষেকেই নয়, প্রথম তিন টেস্টের দুটিতেই পেয়ার পাওয়ার পর রান করেছেন ৫৫০২। সেঞ্চুরি ১৬টি, যার ৬টিই ডাবল। সাঈদ আনোয়ারের অভিষেকে দুই গোল্লা পরপর দুই দিনে। টেস্ট ক্রিকেটে দু দিন পর যাঁর রেকর্ড ছিল ৫ বল খেলে শূন্য, ক্যারিয়ার শেষে তাঁর নামের পাশেই ৪০৫২ রান!

জো ডার্লিং, টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন যিনি। ছবি: জর্জ বেলডাম

দ্বিতীয় ইনিংসে জহুরুল ৪৩ রান করে ফেলায় এই আলোচনাটা এখন অপ্রাসঙ্গিকই। এটা বাদ দিয়ে বরং টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম স্কোরিং শটেই ছক্কায় ফিরে যাই। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে পরিসংখ্যানবিদেরা অবশ্য শুরুতেই একটা টীকা দিয়ে নেন—টেস্ট ক্রিকেটের শুরুর দিকের অনেক ম্যাচের বল বাই বল স্কোর পাওয়া যায় না বলে দু-একটা ঘটনা বাদও পড়ে গিয়ে থাকতে পারে। ছক্কার নিয়মও তো অন্য রকম ছিল শুরুতে। ছক্কা মারতে বল মাঠের বাইরে পাঠাতে হতো, বল শুধু বাউন্ডারি পেরোলে হতো ৫ রান। প্রথম ছক্কা দেখতে টেস্ট ক্রিকেটকে তাই অপেক্ষা করতে হয়েছে ৫৫তম টেস্ট পর্যন্ত। ১৮৯৭-৯৮ অ্যাশেজ সিরিজের অ্যাডিলেড টেস্টে সেটি মেরেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার জো ডার্লিং। বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে টেস্ট সেঞ্চুরি করার প্রথম কৃতিত্বও এই ভদ্রলোকের।

টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম স্কোরিং শটেই ছক্কা মারায় জহুরুলের পূর্বসূরি চারজনের কেউই তেমন বিখ্যাত কেউ নন। এই কীর্তি গড়ায় প্রথম অস্ট্রেলিয়ার এরিক ফ্রিম্যান (১৯৬৮ সালে ভারতের বিপক্ষে ব্রিসবেনে) খেলেছেন সবচেয়ে বেশি ১১টি টেস্ট। বাকি তিনজন—ওয়েস্ট ইন্ডিজের কার্লাইল বেস্ট ও ডেল রিচার্ডস এবং জিম্বাবুয়ের কিথ দাবেংওয়া টেস্ট খেলেছেন যথাক্রমে ৮, ২ ও ৩টি।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুজনকে একসঙ্গে রাখতে ডেল রিচার্ডসের নামটা আগে লিখতে হলো। তবে ঘটনার ক্রম হিসেবে চার নম্বরে আসবে এই ওপেনারের নাম। বাংলাদেশ আছে এখানেও। গত বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে সেন্ট ভিনসেন্ট টেস্টে ডেল রিচার্ডসের ওই কীর্তি—মাশরাফির করা ইনিংসের প্রথম তিনটি বলে রান নিতে না পারার পর চতুর্থ বলেই ছক্কা!

মুশফিককে তো চেনেনই, ডেল রিচার্ডসকে মনে আছে? ছবি: এএফপি

ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের মুখে তখনই শুনেছিলাম কার্লাইল বেস্টের বীরত্বগাথা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯৮৫-৮৬ সিরিজে কিংস্টন টেস্ট। ইয়ান বোথাম প্রথম বলটিই দিলেন বাউন্সার। সেটি এড়ালেন বেস্ট। দ্বিতীয়টিও বাউন্সার, সেটি লাগল কাঁধে। তৃতীয় বলটিও যখন শরীরের দিকে ধেয়ে এল, বেস্টের ভাষায় ‘আত্মরক্ষা করতে’ হুক করলেন তিনি। লং লেগের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে দর্শকের মধ্যে হারিয়ে গেল বল। টেস্ট ক্রিকেটে তৃতীয় বলেই ছক্কা, অথচ ৮ টেস্টের ক্যারিয়ারে আর মাত্র একটিই ছক্কা মারতে পেরেছেন বেস্ট।

জিম্বাবুইয়ান অলরাউন্ডার কিথ দাবেংওয়ার প্রথম স্কোরিং শটেই ছক্কাটাকে বলতে পারেন গলায় চেপে বসা শূন্যের ফাঁস থেকে বাঁচার মরিয়া চেষ্টার ফসল। ২০০৫ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বুলাওয়ে টেস্টে ১৫ বল খেলেও রান করতে না পারার পর ‘যা আছে কপালে’ বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন। তাতেই সীমানার বাইরে আছড়ে পড়লেন ড্যানিয়েল ভেট্টোরি।

টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম স্কোরিং শটেই ছক্কার কীর্তি খুঁজতে গিয়ে কিছু মজার ব্যাপার চোখে পড়ল। এর একটাকে মজার না বলে অবিশ্বাস্য বলাই ভালো। সুনীল গাভাস্কারের দীর্ঘদিনের ওপেনিং পার্টনার চেতন চৌহান টেস্ট ইতিহাসে প্রথম ব্যাটসম্যান, যিনি একটাও সেঞ্চুরি না করে দুই হাজার করেছেন। রক্ষণাত্মক ব্যাটসম্যান হিসেবেই পরিচিতি, অথচ টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর প্রথম দুটি স্কোরিং শট ছিল চার ও ছয়। চৌহানের ৪০ টেস্টের ক্যারিয়ারে ওই একটিই ছয়!

টেস্ট অভিষেকে একজন ব্যাটসম্যান নিশ্চয়ই সেঞ্চুরির স্বপ্ন দেখেন। জহুরুলও হয়তো দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় আফসোস করার কী আছে! টেস্ট অভিষেকে সেঞ্চুরি আছে ৮৮ জনের, প্রথম স্কোরিং শটেই ছক্কা তো মাত্র পাঁচজনের!

………………………………

ঘর হইতে শুধু দুই পা ফেলিয়া ধানের শীষের ওপর শিশির বিন্দু না দেখার মতো একটা ঘটনা ঘটে গেছে কালকের থার্ডম্যান থেকে কলামে। টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম স্কোরিং শটেই ছক্কার খোঁজে টেস্ট ইতিহাস ঘেঁটে ফেলেছি, কিন্তু চোখ এড়িয়ে গেছে মাত্রই মাস দুয়েক আগে ভারতের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টে শফিউল ইসলামের কীর্তিটা। সে টেস্টের প্রথম ইনিংসে অমিত মিশ্রকে ছক্কা মেরে টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম রান করেছিলেন শফিউল। আউট হয়ে গিয়েছিলেন পরের বলেই। দ্বিতীয় ইনিংসেও তাঁর প্রথম স্কোরিং শটটি ছিল একই বোলারের বলে ছক্কা! টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম দুটি স্কোরিং শটেই ছক্কার কীর্তি সম্ভবত শুধুই বাংলাদেশের জহুরুল আর শফিউলের। প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে শফিউলের কথাটা মনে করিয়ে দিয়েছেন তাপস চক্রবর্তী—আপনাকে ধন্যবাদ।

(এই লেখায় ব্যবহৃত সব তথ্য ঠিকই আছে। তবে এই লেখা প্রকাশিত হওয়ার পরের ১১ বছরে টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম স্কোরিং শটেই ছক্কা মারার কীর্তিতে যোগ হয়েছেন আরও সাতজন। তাতে কিছু ইন্টারেস্টিং নামও আছে। আরেকটি লেখার জন্য তা তোলা থাক, তা নতুন করেই লিখতে হবে)।