ক্রিকেটারদের কাছে একেকটা মাঠ একেক রকম স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। কারও সুখস্মৃতি, কারও বা দুঃখের। আবার কখনো একই মাঠ দুই রকম অভিজ্ঞতাই উপহার দিয়ে মিশ্র অনুভূতির স্মারক হয়ে থাকে। শুধু একটা স্মৃতি চিরদিন অমলিন থেকে যায়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের স্মৃতি।

হারারে স্পোর্টস ক্লাবে দাঁড়িয়ে সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল বা মুশফিকুর রহিমের চোখ তাই স্বপ্নাতুর হয়ে ওঠে। মনের সরণিতে স্মৃতির মিছিল—আশৈশব স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগে সেই বিনিদ্র রাত। একটু পরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রবেশাধিকার পেয়ে যাওয়ার রোমাঞ্চ নিয়ে ওয়ার্মআপে নামা। সারাক্ষণ উত্তেজনায় কাঁপানো সেই অনুভূতি—আমি এখন বাংলাদেশ দলে খেলি!

কী আশ্চর্য, তামিম ইকবালের নাকি কিছুই মনে পড়ে না। সেই বিনিদ্র রাত মনে আছে, মনে আছে রোমাঞ্চের সেই অনুভূতিও। কিন্তু ম্যাচের কথা ভাবলেই নাকি সব ঝাপসা হয়ে যায়! ‘আমার ৯৮টা ওয়ানডের ৯৭টার কথাই আপনাকে বলতে পারব। কিন্তু ওই একটা ম্যাচের কিছুই আমি মনে করতে পারি না। এত নার্ভাস ছিলাম যে, কী খেলেছি, কী করেছি, কিছুই মনে নেই।’

২০০৭ বিশ্বকাপের আগে আগে জিম্বাবুয়েতে তামিম ইকবালের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক। ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ক্যাচ দেওয়ার আগে প্রথম ম্যাচে করেছিলেন মাত্র ৫ রান। মনে করিয়ে দেওয়ায় তামিম শুধু ‘হু’ ‘হু’ করে যান। ৩২ বলে ৩০ রান করে দ্বিতীয় ম্যাচেই চিনিয়েছিলেন নিজেকে। দুটি ছয় মেরেছিলেন, এর মধ্যে লং অনের ওপর দিয়ে মারা ছক্কাটায় ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন এক তারকার আবির্ভাবের ঘোষণা। তামিমের সব মনে আছে, ‘হ্যাঁ, ওটা মনে আছে। ছক্কাটা মেরেছিলাম আয়ারল্যান্ডের বলে।’

তামিমের মাস ছয়েক আগে এই হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠেই সাকিবেরও আন্তর্জাতিক অভিষেক। পাঁচ বছরের মধ্যেই অধিনায়ক হয়ে সেই মাঠে প্রত্যাবর্তন। সেই অভিষেক-লগ্নের কোন স্মৃতিটা বেশি মনে পড়ে? এখানেও তামিমের সঙ্গে মিল, ‘একটা কথাই মনে পড়ে, খুব নার্ভাস ছিলাম। জীবনে আর কখনো এত নার্ভাস লাগেনি। গায়ের জোরে বল মারি, বল দেখি মিড অফেও যায় না! আসলে তো কাঁপছিলাম।’

সেই কাঁপাকাঁপিকে জয় করেই ৩০ রানে অপরাজিত। অভিষেক ম্যাচেই দলকে জিতিয়ে ব্যাট তুলে ড্রেসিংরুমে ফেরা। তবে হারারে মাঠটা এর আগেই চেনা হয়ে গিয়েছিল সাকিবের, ‘আমি ‘এ’ দলের হয়ে জিম্বাবুয়ে সফরে এসেছিলাম। বাংলাদেশ দলে ডাক পেয়ে এখানে থেকে যাই।’

সাকিবের সঙ্গে একই ম্যাচে মুশফিকুর রহিমেরও অভিষেক। তবে বড় একটা পার্থক্য ছিল। ১৫ মাস আগেই লর্ডসে তাঁর টেস্ট অভিষেক হয়ে গিয়েছিল। উইকেটকিপার নয়, টেস্ট অভিষেক স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে। ওয়ানডে অভিষেকে অবশ্য উইকেটকিপারই। স্মৃতি বলতেও সেই কিপিংই। কারণ, ব্যাটিংয়ের সুযোগই পাননি। ‘আমরা সিরিজ জিতে যাওয়ার পর শেষ ম্যাচে সুযোগ পেয়েছিলাম। আগেই টেস্ট অভিষেক হয়ে গিয়েছিল বলে খুব বেশি নার্ভাস লাগেনি। তবে প্রথম ওয়ানডে, উত্তেজনা তো একটা ছিলই’—স্মৃতির সরণি বেয়ে পেছনে হেঁটে যান মুশফিকুর।

জিম্বাবুয়েতে এলে মোহাম্মদ আশরাফুলও একইভাবে প্রতিবার পেছনে হেঁটে যান। অনেক পেছনে। ১০ বছর আগে এখানেই তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক। তবে সেটি হারারেতে নয়, বুলাওয়েতে। কী মনে পড়ে তাঁর? ‘শুধু অভিষেক বলে নয়, আরও অনেক কারণেই ওই সফরটা আমি কোনো দিনই ভুলতে পারব না। বাংলাদেশ দলের হয়ে সেটিই আমার প্রথম সফর। আমি ছিলাম দলে সবচেয়ে ছোট। ট্যুরটায় তাই খুব মজা করেছিলাম।’

এটা যে টেস্টের ছবি, তা তো বোঝাই যাচ্ছে। এই তিনজনের মধ্যেও ওই একই মিল। তিনজনেরই অভিষেক জিম্বাবুয়ের হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে। ছবি: মো. মানিক

অভিষেক ইনিংসে ৮ বলে ৯ রান, যাতে ছিল দুটি চার। নেমেই পুল মারতে শুরু করেছিলেন। সে কথা মনে হলে আশরাফুল হাসেন, ‘এমন নার্ভাস ছিলাম যে, কী বলব! নার্ভাস ছিলাম বলেই প্রতি বলে চালাচ্ছিলাম। পরে শুনলাম, টিভিতে কোন কমেন্টেটর নাকি বলেছেন, দেখে তো মনে হচ্ছে এই ছেলে ১৫০তম ওয়ানডে খেলতে নেমেছে!’

নাসির হোসেন ও শুভাগত হোম চৌধুরীর কাছেও এই জিম্বাবুয়ে অন্য রকম এক অনুভূতির স্মারক হয়ে থাকবে। ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের ১৬ সদস্যের দলে এই দুজনই শুধু অভিষেকের অপেক্ষায়। প্রথম ওয়ানডের একাদশ ঠিক হয়ে গিয়ে থাকলেও সেটি কাল জানানো হয়নি। তবে নাসির হোসেনের অভিষেক হয়ে যেতে পারে বলেই আভাস। তা যদি হয়েই যায়, হারারে স্পোর্টস ক্লাব চিরদিন তাঁর মনে অনির্বচনীয় একটা অনুভূতি বয়ে আনবে, যেমন আনে সাকিব-তামিম-মুশফিকুরের মনে। শুধু হারারে না বলে জিম্বাবুয়ে বললে মোহাম্মদ আশরাফুলের মনেও।

অভিষেক যে একবারই হয়!

(নাসির-শুভাগত দুজনের অভিষেকটা হারারেতেই হয়েছিল। তবে প্রথম ওয়ানডেতে নয়, সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে অভিষেক নাসিরের, তৃতীয়টিতে শুভাগতর)।