বাংলাদেশ দল শ্রীলঙ্কা সফরে যাবে। কোনো দিন জাতীয় দলে খেলেননি, এমন একজনকে ডেকে আনা হলো নেটে। নাম নাহিদুল হক শাওন। অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলেছেন। তবে সবচেয়ে বড় যোগ্যতা তিনি বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং লাইনআপে বাঁহাতিদের ছড়াছড়ি। তাঁদের বিপক্ষে ভিন্ন লাইনে বোলিং করার প্রস্তুতিটা তো নিতে হবে বোলারদের। দলে যে কোনো বাঁহাতি স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান নেই।

মাত্র বছর চারেক আগের ঘটনা, অথচ এখনই তা অবাস্তব বলে মনে হতে শুরু করেছে। বাঁহাতিদের বিপক্ষে বোলিং প্র্যাকটিস করার জন্য মাঝেমধ্যে যে দুই স্পিনার মোহাম্মদ রফিক ও এনামুল হককে বাংলাদেশের নেটে আগে ব্যাটিং করানো হতো, সেটি তো আরও। বাংলাদেশ দলে যে এখন বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের ছড়াছড়ি!

ব্যাটিংয়ে ডানহাতি-বাঁহাতি কম্বিনেশন ক্রিকেটের সেই আদিকাল থেকেই সব দলের কাছে প্রার্থিত হয়ে আছে। দুই রকম দুজন ব্যাটসম্যান মানেই বোলারদের জন্য বলের লাইন পরিবর্তন করার ঝামেলা, আর প্রতিপক্ষের ঝামেলা মানেই তো নিজেদের লাভ। মিডল অর্ডারে কখন কার সঙ্গে কার পার্টনারশিপ হবে, সেটি তো আর আগেভাগে বলার উপায় নেই। একমাত্র ওপেনিং জুটিতেই তা নিশ্চিত করা যায়। ডানহাতি আর বাঁহাতির কম্বিনেশনকে আদর্শ ওপেনিং জুটি মেনে সব দলই তাই সেটি খুঁজে বেড়ায়।

‘খুঁজে বেড়ায়’ না লিখে অবশ্য ‘খুঁজে বেড়াত’ লেখা উচিত। ম্যাথু হেইডেন আর জাস্টিন ল্যাঙ্গার যে প্রমাণ করে দিয়েছেন, দুজন ডানহাতির ওপেনিং জুটি যদি সফল হতে পারে, দুই বাঁহাতির পক্ষেও তা হওয়া সম্ভব। বাংলাদেশ দলে তিনজন বাঁহাতি ওপেনার নির্বাচন করার পেছনেও হেইডেন-ল্যাঙ্গারের সাফল্যগাথার কোনো ভূমিকা থাকলেও থাকতে পারে।

জাভেদ ওমরকে সরিয়ে মেহরাব হোসেন শাহরিয়ার নাফীসের পার্টনার হয়েছেন আজ বেশ কিছুদিন। এই সফরে তৃতীয় ওপেনার হিসেবে দলে এসেছেন তামিম ইকবাল। সাকিব আল হাসান তো চার নম্বরে একরকম স্থায়ীই হয়ে গেছেন। বাংলাদেশের এই দলে আট স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যানের মধ্যে চারজনই বাঁহাতি!

বাংলাদেশের তিন ওপেনার মেহরাব জুনিয়র-তামিম ইকবাল-শাহরিয়ার নাফীস, সঙ্গে আছেন সে সময়ের অধিনায়ক হাবিবুল বাশারও। ছবি: ফিরোজ আহমেদ

আশ্চর্যবোধক চিহ্নটা দিলাম, ব্যাপারটা ধরিয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশ দলের সবাইও আশ্চর্য হচ্ছেন বলে। ‘তাই তো!’ বলার পর অধিনায়ক হাবিবুল বাশার হাসতে হাসতে স্মৃতিচারণ করলেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে (২০০৪ সালে) ফয়সাল দলে আসার পর আমাকে সব ইন্টারভিউয়েই একজন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান দলে থাকায় কী লাভ, এ নিয়ে কথা বলতে হয়েছিল।’

হওয়ারই কথা। ফয়সাল হোসেনের অন্তর্ভুক্তির মূল তাৎপর্য যে ছিল সেটাই। বাংলাদেশ দলে প্রথম বাঁহাতি স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান। শুধু জাতীয় দলই বা কেন, বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটেও বাঁহাতি ব্যাটসম্যানকে ‘ডুমুরের ফুল’ বাগধারার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেত। এটা শুধু গত আট-দশ বছরের কথা হচ্ছে না। ১৯৭৫ সালে ঢাকার ক্রিকেটে খেলতে শুরু করা গোলাম নওশের প্রিন্স যেমন তাঁর সময়েও বাংলাদেশে কোনো বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ছিল কি না, তা খুঁজতে গিয়ে রীতিমতো গলদঘর্ম হলেন। হঠাৎ করেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের এমন ছড়াছড়িতে প্রিন্সও তাই একটু বিস্মিতই। নির্বাচক বলে বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গেও তাঁর ভালোই পরিচয় আছে, সেসব দলেও নাকি চার-পাঁচজন করে বাঁহাতি ব্যাটসম্যান!

ফয়সাল হোসেন ডিকেন্স, বাংলাদেশ দলে প্রথম বাঁহাতি স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান। ছবি: বিসিবি

একসময় একদমই ছিল না, এখন ছড়াছড়ি—এর কারণ ব্যাখ্যা করা কঠিন। একসময় কেন ছিল না, সেটির ব্যাখ্যাটা মেনে নিলে অবশ্য একটা কারণ খুঁজে পেলেও পেতে পারেন। ব্যাখ্যাটা শুনেছিলাম রকিবুল হাসানের মুখে। বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক ক্রিকেট মাঠে এক আড্ডায় বাঁহাতি ব্যাটসম্যান না থাকার কারণ হিসেবে দায়ী করেছিলেন বাংলাদেশের সামাজিক মূল্যবোধকে। সেটি কেমন? বাংলাদেশে কোনো শিশু-কিশোর প্রকৃতিগতভাবে বাঁহাতি হলেও বাবা-মা, অভিভাবকরা তাকে ডানহাতি বানানোর চেষ্টা করেন। প্রিন্সের নিজের অভিজ্ঞতাতেও প্রমাণ মিলছে এর। ছোটবেলায় বাঁ হাতে লেখার চেষ্টা করলেই তাঁর মা বাঁ হাতের আঙুলের ফাঁকে পেন্সিল রেখে চাপ দিতেন। এই শাস্তির ভয়ে শুধু বোলিং ছাড়া আর সবকিছুই ডান হাতে করতে শিখতে বাধ্য হন তিনি।

এটা শুধু বাংলাদেশেরই সমস্যা ছিল না, এক সময় সব দেশেই বাঁহাতিদের দেখা হতো অশুভর প্রতীক হিসেবে। ইংরেজিতে যে ‘সিনিস্টার’ শব্দটির অর্থ নিন্দনীয় বা লজ্জাজনক, সেটির উৎপত্তিও এভাবেই। এক সময় ‘সিনিস্টার’ শব্দটা বাঁহাতি অর্থেই ব্যবহৃত হতো। দেরিতে হলেও বাংলাদেশেও এই অবৈজ্ঞানিক ধারণার মৃত্যু হয়েছে বলেই কি এখন বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের এমন সংখ্যাধিক্য?

শুধু ব্যাটিং ছাড়া শাহরিয়ার বাকি সবকিছুই করেন ডান হাতে। এমনকি ফিল্ডিংয়ের সময় থ্রোও। তামিম ইকবালেরও একই ব্যাপার। সাকিব আল হাসান অবশ্য ক্রিকেট আর ক্রিকেটের বাইরের জীবন আলাদা করে নিয়েছেন। ক্রিকেটে যা কিছু করেন—ব্যাটিং, বোলিং, থ্রো—সবই বাঁ হাতে। ক্রিকেট মাঠের বাইরে তিনি পুরোপুরি ডানহাতি।

শাহরিয়ার-মেহরাব-তামিম-সাকিবের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর না থাকারই কথা। নেই-ও। এক শাহরিয়ার নাফীস ছাড়া আর কেউ তাঁকে ডানহাতি বানানোর চেষ্টা হয়েছিল বলেও মনে করতে পারেন না। ছোটবেলায় কাজিনদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলার সময় শুরুতে ব্যাটের গ্রিপে হাত বদলে শাহরিয়ারকে ডানহাতি বানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হতো, কিন্তু তাঁকে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুরে গিয়ে আবার বাঁহাতি হয়ে যেতে দেখে সেই চেষ্টায় ক্ষান্ত দেওয়া হয়। মজার ব্যাপার হলো, শুধু ব্যাটিং ছাড়া শাহরিয়ার বাকি সবকিছুই করেন ডান হাতে। এমনকি ফিল্ডিংয়ের সময় থ্রোও। তামিম ইকবালেরও একই ব্যাপার।

সাকিব আল হাসান অবশ্য ক্রিকেট আর ক্রিকেটের বাইরের জীবন আলাদা করে নিয়েছেন। ক্রিকেটে যা কিছু করেন—ব্যাটিং, বোলিং, থ্রো—সবই বাঁ হাতে। ক্রিকেট মাঠের বাইরে তিনি পুরোপুরি ডানহাতি। মেহরাব হোসেনের ঘটনা একটু মিশ্র। ব্যাটিং-বোলিং বাঁ হাতে করলেও থ্রো করেন ডান হাতে। হাতে খেলে ডান হাতে খান, চামচ দিয়ে খেলে বাঁ হাতে। ‘বামপন্থী’ হওয়ায় পরিবারে তাঁর কখনোই কোনো সমস্যা হয়নি, কারণ মেহরাবের বাবাও ছিলেন বাঁহাতি। বাকি তিনজনের আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে বাঁহাতি কেউ নেই। ও হ্যাঁ, তামিমের একজন আছেন। ফাইজান ইকবাল নামে তাঁর সেই চাচাতো ভাইও ক্রিকেট খেলেন।

টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি রান এখন এক বাঁহাতির। লারা যাঁর রেকর্ড ভেঙেছেন, সেই অ্যালান বোর্ডারও তা-ই ছিলেন। টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ চারটি ইনিংসই এসেছে বাঁহাতিদের ব্যাট থেকে। গত কয়েক বছরে টেস্টে ট্রিপল সেঞ্চুরি করেছেন, এমন ব্যাটসম্যানদের তালিকায়ও বাঁহাতিদের ছড়াছড়ি। ব্রায়ান লারা, ম্যাথু হেইডেন, সনাৎ জয়াসুরিয়া, ক্রিস গেইল...। একসময় বাঁহাতিদের অন্য চোখে দেখা হলেও ক্রিকেটে অনেক আগেই ‘লেফট ইজ রাইট’ কথাটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও এখন তা সত্যি।

(শেষ অনুচ্ছেদটা পড়ার সময় লেখার সময়টা মনে রাখা জরুরি)।