মাঠে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা, দল এখনো পিছিয়ে। উৎকন্ঠিত সমর্থকদের হৃৎপিন্ডটা যেন ফেটেই পড়বে! কিন্তু তিনি নির্বিকার। ডাগআউটে বসে তিনি বারবার তাকাচ্ছেন ঘড়ির দিকে। ভাবলেশহীন মুখে কোন অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু মনের ভেতরে যে তুফান বইছে সেটা অনুমান করতে কষ্ট হয় না। অন্তিম সময়ে যখন গোল করে দল উৎসবে মাতোয়ারা, তখন তাঁর ঠোঁটের কোনায় এক চিলতে হাসি। বোঝাই যায়, এই হাসিটা জিগীষার নয়, এই হাসি স্বস্তির। ২০১৩ সালের আজকের এই দিনের পর ইংলিশ ফুটবলে এই দিন আর দেখা যায়নি। সেদিনই যে ডাগআউটকে শেষবারের মতো বিদায় বলে দিয়েছেন স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন।

আমরা যারা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাথে বেড়ে উঠেছি, বড় হয়েছি–তাদের জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে আছেন স্যার অ্যালেক্স। ডাগআউটে বসে স্যার অ্যালেক্সের চুইংগাম চিবুনোর দৃশ্য হয়ে গেছে চোখ বুঁজলেই দেখতে পাওয়া যায় এমন একটা দৃশ্য। স্যার অ্যালেক্স কত বড় ম্যানেজার, সেটা ফুটবল যারা কম-বেশি দেখেন, সবাই জানেন। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে আগলে রেখেছিলেন ইউনাইটেডকে, জিতেছেন সম্ভাব্য সবকিছুই–সেটাও অনেকেই জানে। তাকে অনেকেই বলেন সর্বকালের সেরা ম্যানেজার- এটাও হয়তো নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে ফার্গুসন কেন সেরা, সেটা শুধু ট্রফির সংখ্যা দিয়ে বোঝা যাবে না। দুই যুগেরও বেশি সময় একটা শীর্ষ ক্লাবের দায়িত্বে ছিলেন, সেটা থেকে কিছুটা বোঝা যেতে পারে। তবে তাঁর আসল মহিমা বোঝা যাবে, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে তিনি হার না-মানার যে মানসিকতার বীজ বুনে দিয়েছিলেন, তা থেকে।

অ্যালেক্স ফার্গুসন: সেই চেনা ছবি

ইউনাইটেডের কামব্যাক বললে সবার সেই ন্যু ক্যাম্পের রাতের কথাই মাথায় আসে। বায়ার্নের কাছে এক গোলে পিছিয়ে থাকার পর হেরে যাওয়াটা যখন মনে হচ্ছিল সময়ের ব্যাপার, তখন শেরিংহামের গোলে সমতা ফেরে। আর পরে ওলে গানার সোলশারের করা গোলে প্রায় অবিশ্বাস্য একটা জয়। যে ম্যাচের পর ফার্গির বলা ‘ফুটবল, ব্লাডি হেল’ কথাটা হয়ে গেছে ফুটবল পুরাণের সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তিগুলোর একটি। আর এই ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের নামই হয়ে গেছে 'ফার্গি টাইম'।

এখনো ফার্গির বিদায়ী মৌসুমের কথা মনে পড়ে। সেবার সাউদাম্পটনের বিপক্ষেও ২-১ গোলে পিছিয়ে ছিল ইউনাইটেড। রবিন ফন পার্সির গোলে শেষ মুহূর্তে জয় এলো। ওই মৌসুমে এরকম একের পর এক ম্যাচে পিছিয়ে পড়ার পরও জিতছিল ইউনাইটেড। প্রথম আলোতে শিরোনাম হয়েছিল, ইউনাইটেড মানে ফিরে আসা।

এতদিন পর সেই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটাই যেন ঘুরে ঘুরে আসছে। ন্যু ক্যাম্পের নায়ক সেই সোলশার এখন দলের কোচ, এই মৌসুমেই তো প্রিমিয়ার লিগে এরকম একের পর এক ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও জিতেছে ইউনাইটেড। ফার্গুসন এখন আর ডাগআউটে নেই,,তবে এখন গ্যালারি থেকে মাস্ক পরে দেখেন প্রিয় দলের এই ঘুরে দাঁড়ানোর দৃশ্য। এই যে হারার আগে হার না মানা, পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার পরেও ঘুরে দাঁড়ানো–এটাই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। আর এই মানসিকতাটা ওল্ড ট্রাফোর্ডের প্রতিটি ঘাসে ছড়িয়ে গেছেন সেই বুড়ো মানুষটাই। এতদিন পরেও তাই ফার্গুসন তাই ইউনাইটেডে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

ন্যু ক্যাম্পে অবিস্মরণীয় সেই চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের পর ফার্গুসনের আলিঙ্গনে সোলশার। কোচ সোলশারের মধ্যেও একটু হলেও 'ফার্গুসন' আছেন

বছর কয়েক আগে ফার্গুসনের গুরুতর অসুস্থতার একটা খবর এসেছিল। জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে গিয়েছিলেন, অলৌকিকভাবে ফিরে এসেছেন সেখান থেকে। এরপর আবার সুস্থ হয়ে ফিরেছেন নিজের প্রিয় ওল্ড ট্রাফোর্ডে। এখনো ওল্ড ট্রাফোর্ডের ডাগআউট, প্রতিটি ঘাস তাঁকে মিস করে। তবে ইউনাইটেড সমর্থকদের পরম সৌভাগ্য, প্রেরণার বাতিঘর হয়ে এখনো তিনি আছেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো যেমন প্রায়ই ফার্গুসনের প্রভাবের কথা বলেন তাঁর ক্যারিয়ারে। ২০১৬ সালে ইউরোর সেই মহাকাব্যিক ফাইনালের পর ফার্গুসন ঠায় দাঁড়িয়ে গ্যালারিতে অপেক্ষা করছিলেন রোনালদোর জন্য। দেখার সঙ্গে সঙ্গেই রোনালদো জড়িয়ে ধরেছিলেন তাকে, যেমন যুদ্ধজয়ী ছেলে ঘরে ফেরার পর আলিঙ্গন করে বাবাকে। কোচ-খেলোয়াড়ের চেয়েও সম্পর্কটা যে অনেকটাই পিতা-পুত্রের মতো, তা বুঝতে কারও সমস্যা নেই। শুধু রোনালদো নয়, ইউনাইটেডের আরও অনেকের কাছেই ফার্গুসন শুধু কোচ নয়, একটি প্রকাণ্ড বটবৃক্ষ।

আরও অনেকদিন যেন এই বটবৃক্ষ ওল্ড ট্রাফোর্ডে ছায়া দিয়ে যান। ডাগআউট থেকে স্যার অ্যালেক্সের বিদায়ের দিনে চাওয়ার আছে শুধু এটুকুই। তা-ই চেয়ে রাখলাম। 

অম্লান মোসতাকিম হোসেন: প্রথম আলোর সাবেক সহ সম্পাদক ও Pavilion.com.bd এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক।