সবার আগে সব খবর। সব নিউজ পোর্টালেরই স্লোগান এটাই। যে সব নিউজ পোর্টালে স্লোগানটা লেখা নেই, তাদেরও অলিখিত নীতিমালা--যখনই ঘটনা তখনই খবর। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টগ্রামের এই যুগে নিউজ পোর্টালগুলোর পলিসি তো এটাই হওয়া উচিত। যেকানো ঘটনা সম্পর্কে পাঠকদের আগে জানানো। কিন্তু সবার আগে ঘটনা জানাতে গিয়ে যে এক নিউজ পোর্টালের নিউজ অন্যান্য সাইটেও ইন্ট্রো এবং কিছু শব্দ পরিবর্তন হয়ে বসে যাচ্ছে!

এটা হয়তো একটু বেশি সরলীকরণ হয়ে গেল, সব সাইটই যে এমনটা করে, তা নয়। তাছাড়া ছোট পরিসরের লেখা অনেক সময় একটা ওয়েবসাইটের সঙ্গে আরেকটা ওয়েবসাইটের মিলে যেতেই পারে। কিন্তু অনলাইন নিউজ পোর্টালে খেলাধুলা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, নেইমারের চোটে পড়া, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর করোনায় আক্রান্ত হওয়ার যে খবর সবার আগে কোনো সাইটে ছাপা হয়, সেটাই একটু-আধটু পরিবর্তিত হয়ে জায়গা করে নেয় অন্যান্য সাইটেও!

লেখা যে কপি করে পেস্ট করা এবং তার ওপর একটু হাত খেলানো হয়েছে, সেটা বোঝা যায় ভুল তথ্যে! জনপ্রিয় কোনো নিউজ পোর্টালের খবরে ধর্মতলার জায়গায় হয়তো ভুলে লেখা হলো ধর্মশালা। ব্যস, অন্যান্য বেশির ভাগ সাইটের নিউজেও তা যথারীতি ধর্মশালা! খেলার কোনো খবরে সাকিব আমেরিকা থেকে রাত ৩টায় ঢাকায় ফিরেছেন বলে ভুল লেখা হলে অন্যান্য সাইটেও সঠিক সময় রাত ২টা না হয়ে দেখবেন ৩টাই লেখা আছে!

যে সব নিউজ পোর্টালের লোকবল বেশি, কপি-পেস্টের প্রচলিত রীতি অনুসরণ করে না, তারাও সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। থেকে থেকে যখন একটা ম্যাচের আপডেট দিতে হয়, তখন প্রথম রিপোর্টটাকে কপি করে নিয়েই তা করা হয়। তাতে মুশফিক আর সাইফউদ্দিনের পার্টনারশিপটা একবার ভুল লেখা হলে প্রতিবারই ভুল থেকে যায়। ব্যাটসম্যানের রান ভুল লেখা থাকলে পাঠক ফোন করে তা জানিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে তা ঠিক করা হয়, কিন্তু ছোটখাটো পার্টনারশিপে রানের ‘ভুল’ পাঠকের ধরতে বয়েই গেছে! 

এর চেয়েও বেশি কষ্ট লাগে ‘পাবলিক ডিম্যান্ড’ আছে বলেই একই নিউজ নিয়ে বারবার কচলানোটা মেনে নিতে। কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একাধিক প্রসঙ্গ থাকলে একটার আড়ালে আরেকটা যাতে না চলে যায়, সেজন্য আলাদা আলাদা নিউজ করা সময়ের দাবি। কিন্তু বিষয় তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হলেও চার-পাঁচটা শিরোনাম দিয়ে নিউজের সংখ্যা বাড়ানোর কোনো কারণ দেখি না। এটা অবশ্য আমার ব্যক্তিগত মতামত।

যাঁরা নিউজ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত, ওনাদের অবশ্য অন্যদের মতামত নিয়েও ভাবতে হয়! দেশের সবচেয়ে প্রচারিত দৈনিক-এর দাবিদার পত্রিকায় কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে আমার। একদিন খেলার একটা নিউজের ভাষা নিয়ে কথা বলতে সম্পাদক এলেন আমাদের বিভাগে। বিভাগীয় প্রধান সেদিন ছিলেন না। সম্পাদক মহোদয়ের সঙ্গে ছিলেন নিউজ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ‘জ্বি হুজুর’ ধরনের একজন। সম্পাদক বললেন, ‘দেখো তো, শব্দগুলো আরও সহজ করে লেখা যেত কি না।’ সূর্যের চেয়ে বালি গরম হয়ে উঠল! সম্পাদকের সঙ্গী বলে বসলেন, ‘রিক্সাওয়ালা, আলু-পটল বিক্রেতারাও এই পত্রিকার পাঠক। এটা মাথায় রেখেই লিখতে হবে আমাদের।’

বরাবরই নরম কিসিমের মানুষ আমি। কখনও কোনো কিছুর প্রতিবাদ তো করিই না, পাল্টা যুক্তি দেখাতেও অনীহা। তবু সাহস করে বললাম, ‘আমি তো এখানে কোন সমস্যা দেখি না।’ ‘এই তো একটা সমস্যা’-সম্পাদকের সঙ্গী বলে গেলেন, ‘কোনো ভিন্নমতকো আমরা সহজভাবে নিতে পারি না।’ ওনারা চলে যাবার পর নিউজটা আরও দুবার পড়লাম। সামান্যতম খটকা লাগার মতো কিছুও চোখে পড়ল না আমার। কিন্তু সম্পাদকের সঙ্গীর কথাটা তুষের আগুনের মতো জ্বলতে থাকে মনের ভেতর। রিক্সাওয়ালা, আলু-পটল বিক্রেতারা পত্রিকার কি ২০ পাতার সব খবরই পড়েন? ইউনিভার্সিটি হলে থাকার সময় থেকেই যে পত্রিকা পড়েছি, সময়োপযোগী লেখা এবং লেখার ধরনে ভালো লাগা থেকেই সেই পত্রিকাটির ভক্ত। সেই পত্রিকাতে এতদিন কাজ করার পর লেখা শিখতে হবে নতুন করে!

দোহাই, কুপমুন্ডুক ভাববেন না আমাকে। নতুনত্বকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা সব সময়ই ছিল, এখনও আছে। কিন্তু অন্তর থেকে সায় দেয় না, চাপিয়ে দেওয়া এমন কিছু মেনে নিতে কষ্ট হয়। না পারি সইতে, না পারি কইতে! কওনের জায়গা কোথায়? 'অনলাইনে বড় নিউজ পাঠক পড়ে না' রায় দিয়ে ছোট ছোট করে লেখার নির্দেশ আসে। নিউজ একটু বড় হলেই ওপর থেকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, এত বড় নিউজ পড়ার ধৈর্য আছে পাঠকের? কিছুদিন পরই আসে আবার নতুন নির্দেশনা, অনলাইনে জায়গার অভাব নাই, নিউজ বড় হওয়া চাই, ৭০০/৮০০ শব্দেরও হতে পারে! হচচকিয়ে যাই, পাঠকের মানসিকতা কী হঠাৎ করেই বদলে গেল! বদলায়নি, আসলে ফায়দা লুটতে বদলেছে নিজেরাই। নিউজের ফাঁকে ফাঁকে বিজ্ঞাপন ঢোকাতে হবে যে! কলেবর বড় না হলে একই নিউজে দুই-তিনটা বিজ্ঞাপন যে ঢোকানো যায় না! তাছাড়া বড় নিউজ হলে পাঠককেও অনেকক্ষণ সাইটে ধরে রাখা যাবে বলে নতুন উপলব্ধি হয়েছে কর্তাদের।

প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে টাকার দরকার, সেই টাকা আসে বিজ্ঞাপন থেকে। এটা না হয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু নিউজ ব্যবস্থাপকদের মাথায় ‘পাবলিক ডিমান্ড’ ঢুকে গেলে তো মুশকিল। এই কথাটাই কখনো কখনো কথ্য বাংলায় বলা হয়, 'পাবলিক খাবে'। 

এক নিউজ পোর্টালে কিছুদিন কাজ করার কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। খেলাধুলার বিভাগটা আমিই দেখতাম। দ্রুত নিউজ তোলার তাগাদা দেওয়ার লোক থাকলেও ‘এটা কী হলো’, ‘ওটা এখনও হয়নি কেন’ বলার কেউ ছিল না।

তারপরও একদিন অফিস থেকে ফোন, 'একটা চাহিদা ছিল'।

'বলে ফেলুন।'

'রোড সেফটি ওয়ার্ল্ড সিরিজে রফিক-পাইলটরা খেলছেন। আজকে তাদের শেষ ম্যাচে। একটা প্রিভিউ যদি পাঠাতেন!'

বড় পত্রিকায় কাজ করার অভিজ্ঞতার কারণেই হয়তো বা, অফিসে থেকে যে-ই ফোন করুন না কেন, একটু সমীহ করতেন। ডেস্কের শিফট ইন-চার্জের আমতা আমতা করা দেখে বললাম, ‘পাঠাচ্ছি।’ দুপুরে প্রিভিউ পাঠালাম, রাতে খেলা শেষ হওয়ার পরপরই ম্যাচ রিপোর্ট।

পরদিন দুপুরের দিকে শিফট ইন-চার্জকে ফোন দিলাম। বয়সে আমার চেয়ে ছোট। 'ভাই' শব্দটা না জুড়ে আমার নাম মুখে নেন না। আলাপচারিতায় আড্ডার আমেজ এনে জানতে চাইলাম, ‘একটা প্রশ্ন করছি, জাস্ট জানার জন্য, বুড়োদের ম্যাচের প্রিভিউ কেন দিতে হবে বলুন তো, এটা তো কম্পিটিটিভ কোনো টুর্নামেন্ট নয়।’ আমাকে চমকে দিয়ে শিফট ইন-চার্জ বললেন, ‘পাবলিক ডিমান্ড। ম্যাচ চলার সময় মোড়ের চায়ের দোকানটিতে গিয়েছিলাম। টিভিতে খেলা চললে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে! যে খেলা নিয়ে মানুষের এত আগ্রহ, সেটা নিয়ে আমরা যত বেশি নিউজ করব, পাঠক-ভিউ তত বাড়বে।’

পাঠক-ভিউ তাতে বাড়ে কি না, জানি না। কিন্তু প্রায় সব সাইটেই যে এমন ‘খেলো’ বিষয়গুলো বিদ্যমান, তা পরিষ্কার করে দিয়েছে সদ্যই বন্ধ হয়ে যাওয়া এবারের করোনাকালের আইপিএল। সাকিব-মোস্তাফিজদের দলের ম্যাচ হলেও না হয় আলাদা কথা ছিল। কিন্তু আমাদের দুই ক্রিকেটারের দলের ম্যাচ না থাকলেও কোনো কোনো সাইটে টস হওয়ার পরই একটা রিপোর্ট দেখি। ম্যাচের প্রথমার্ধ শেষে আরেকটা এবং ম্যাচ শেষে আরও একটা। 

ভিন দেশের একটা ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট নিয়ে এমন মাতামাতি! পাঠকের চাওয়াটাকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে, কিন্তু তা নিউজের গুরুত্ব এবং রুচিশীলতাকে পরিহার করে নয়। শব্দের বুননে চমৎকার গদ্য, ভিন্ন আঙ্গিকে সৃজনশীল লেখার পাঠক আগেও ছিল, আছে এখনও। উৎপলশুভ্রডটকম সেই সব রুচিশীল পাঠকদের অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে, এটাই শুধু প্রত্যাশা।

* শাহরিয়ার ফিরোজ: প্রথম আলোর সাবেক সহকারী ক্রীড়া সম্পাদক