'আমি রুমে প্যাকেট ফেলে এসেছি। একটা সিগারেট হবে?'

হবে না আবার, যে সাংবাদিকের কাছে সিগারেট চাওয়া হলো, তিনি তো দিতে পেরেই কৃতার্থ। যিনি চাইছেন, তাঁর নাম যে শেন ওয়ার্ন। এই মর্ত্যধামে আবির্ভূত সেরা স্পিনার।

সিগারেট ধরিয়ে তিন সাংবাদিকের পাশে দাঁড়িয়ে টানতে শুরু করতেই ওয়ার্নকে সংবাদ সম্মেলনে যাওয়ার তাড়া দিতে শুরু করলেন অস্ট্রেলিয়া দলের মিডিয়া ম্যানেজার। ওয়ার্ন ছেলেমানুষের মতো সাংবাদিকদের দেখিয়ে বললেন, 'আরে, ওদেরও তো ভেতরে যেতে হবে। তবেই না সংবাদ সম্মেলন শুরু হবে।' পাশে এমন অন্তরঙ্গ ভঙ্গিমায় ওয়ার্ন, এক সাংবাদিকের ইচ্ছে হলো একটা ছবিতে দৃশ্যটা স্থায়ী করে রাখার। এবার হাত নেড়ে ওয়ার্নের আপত্তি, 'না না, এখন নয়।' আপত্তি কেন? সিগারেট খাচ্ছেন বলে? ওয়ার্ন যে 'শিকল ধূমপায়ী' (চেইন স্মোকারের পরিভাষা!), সেটি তো ক্রিকেট বিশ্বে মোটামুটি সবারই জানা। তাহলে ধূমপান নিবারক দ্রব্যাদি প্রস্তুতকারী কোনো কোম্পানির সঙ্গে আবার চুক্তি-টুক্তি করেছেন নাকি, এর আগে যেমন করেছিলেন একবার?

সংবাদ সম্মেলেন ঢোকার আগে শেন ওয়ার্ন বললেন, 'আমি রুমে প্যাকেট ফেলে এসেছি। একটা সিগারেট হবে?' এপ্রিল ২০০৬। হোটেল সোনারগাঁও। ঢাকা

প্রশ্নটা শুনে ওয়ার্ন রীতিমতো বিস্মিত, 'এটি তো সাত-আট বছর আগের কথা। তাও মনে রেখেছ?' যখন বলা হলো, 'তোমার সব কিছুই আমরা মনে রাখি', ওয়ার্ন দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বললেন, তাহলে তো তুমি মনে হয় আমার সম্পর্কেও বেশি জানো!' এরপর চোখ টিপে যোগ করলেন, 'যা পড়ো, তার সবই বিশ্বাস কোরো না।' শেন ওয়ার্নের বড় সমস্যা এটাই। তাঁকে নিয়ে মাঠের বাইরে এত সব রটনা, তার কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যা—এই ব্যাখ্যা দিতে গেলে তাঁর আর ক্রিকেট খেলার সময় থাকবে না। তবে এটাও সত্যি, 'যা রটে, তা কিছুটা বটে' নয়, ওয়ার্নের ক্ষেত্রে তার ‘বেশির ভাগই বটে'। নইলে এক দশকের সংসার ভেঙে স্ত্রী সিমোন কেন চলে যাবেন?

একটা সময় মৃতপ্রায় লেগ স্পিন বোলিংকে পুনর্জীবন দেওয়ার কৃতিত্ব তাঁর। ওয়ার্ন ওয়ার্ন হয়েছেন বল হাতে তাঁর কারিকুরি করার ক্ষমতার কারণেই। তবে ওয়ার্নের আকর্ষণ তাতেই শেষ নয়। তাঁর হাঁটাচলা, আবেদন করার ধরন, লাইফস্টাইল—সবকিছু মিলিয়েই শেন ওয়ার্ন ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন। অনেকে বলতে পারেন, সবচেয়ে বড় তারকাই বা নন কেন? ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই সতীর্থরা তাঁকে নিকনেম দিয়েছিল 'হলিউড’। আর সেই থেকে ওয়ার্নও সেটির যৌক্তিকতা প্রমাণের দায়টাও যেন কাঁধে তুলে নিয়েছেন। 'এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটিজ'–এর জন্য আর কোনো ক্রিকেটারের এতবার সংবাদ শিরোনাম হওয়ার ঘটনা নেই। যৌন কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে ডোপিংয়ের দায়ে নিষিদ্ধ হওয়া—কী নেই তাঁর বায়োডাটায়! সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন বাস্তব এক ‘সোপ অপেরা'। সিগারেট খাওয়া নিয়ে যে চুক্তির কথা বলা হলো, সেটিই দেখুন না। ধূমপান ছাড়তে সাহায্য করে, এমন ওষুধ প্রস্তুতকারক এক কোম্পানির সঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থের চুক্তি হয়েছিল—অন্তত এক বছর ধূমপান করবেন না, আর তাঁরা ওয়ার্নকে ব্যবহার করবেন বিজ্ঞাপনে। গোপনে করেছেন কি না কে জানে, তবে জনসমক্ষে অনেক দিন করেননি। চুক্তির শেষ পর্যায়ে গিয়ে আর পারলেন না, নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়ে মাঠেই সিগারেট ধরিয়ে ফেললেন, আর এক কিশোর সেই ছবি তুলে ফেলল। ওয়ার্ন তাঁর ক্যামেরা ট্যামেরা কেড়ে নিয়ে এমনই হুলস্থুল বাঁধিয়ে দিলেন যে, চুক্তি-টুক্তির অপমৃত্যু তো হলোই, ভুল কারণে খবরও হয়ে গেলেন আরেকবার।

বলের আগে-পরের ওয়ার্নও সমান আকর্ষণীয়। ছবি: গেটি ইমেজেস

কী বললেন? লোকটি সুবিধের নয়। তাতে অতি সরলীকরণ হয়ে যায় না! কেন ভুলে যান, ওয়ার্ন সর্বকালের সেরা লেগ স্পিনার হতে পারেন, কিন্তু তিনিও তো মানুষ এবং তাঁর মানবীয় সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। বরং এসবের জন্যই ওয়ার্নকে দূর আকাশের মনে না হয়ে আমরা যারা সাধারণ, তাদেরই একজন বলে মনে হয়। তাঁর আকর্ষণী ক্ষমতা এতে আরও বাড়ে কি না, সেই তর্কও হতে পারে।

সব সময়ই চনমনে, সপ্রতিভ—কোথাও শেন ওয়ার্নের উপস্থিতি মানেই এক ঝলক তাজা হাওয়া। কালই যেমন সংবাদ সম্মেলন কক্ষে গিয়ে বসার পর ফটো সাংবাদিকদের কাজ আর শেষ হচ্ছে না দেখে তাঁদের সরিয়ে দেওয়ায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেন। এমন নাটকীয় ভঙ্গিতেই করলেন যে, কারও রাগ করারও উপায় থাকল না।

মুরালিধরনের সঙ্গে তাঁর অনেক দিনের লড়াই। ক্রিকেটীয় লড়াই-ই, টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড নিয়ে লড়াই। কিছুদিন আগে ওয়ার্ন বলে দিয়েছেন, তাঁর রেকর্ড খুব বেশিদিন থাকবে না। কারণ কেউ কেউ বড় বেশি সস্তা উইকেট পেয়ে যাচ্ছে।

ওয়ার্নের সঙ্গে শুধু ক্রিকেটীয় লড়াই-ই ছিল। ২০০৫ সালের এই ছবিতেই দেখুন না, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ফিকা বিশ্ব একাদশের হয়ে খেলার সময় কেমন আলাপ করছেন দুজনে। ছবি: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস

'কেউ কেউ'টা যে মুরালিধরন, সেটা বুঝতে কারোরই সমস্যা হয়নি। শ্রীলঙ্কায় গত সফরে এক সাংবাদিক মুরালির প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে উত্তর পেয়েছিলেন, 'এটা ওয়ার্নকেই জিজ্ঞেস করুন।' এর ক'দিন পরই সামনে ওয়ার্ন, ওই সাংবাদিক সুযোগটা ছাড়লেন না। অন্য কেউ হলে হয়তো এড়িয়ে যেতেন, তাহলে আর তিনি ওয়ার্ন কেন? তথ্য-প্রমাণ দিয়ে তিনি বরং বুঝিয়ে দিলেন, আসলে কী বলতে চেয়েছিলেন। 'যখন আমাকে ওর সঙ্গে তুলনা করতে বলা হয়েছিল, তখন আমি বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টই খেলিনি, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলেছি মাত্র একটি। আর মুরালি বাংলাদেশের বিপক্ষে ৭ না ৮ টেস্টে ৯০ উইকেট নিয়েছে আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও নিয়েছে বেশ কিছু। এই দু'দেশের বিপক্ষেই ওর দেড় শ উইকেট। আমি মুরালিকে আক্রমণ করার জন্য ও কথা বলিনি। আমি আগেই বলেছি মুরালি টেস্টে ১ হাজার উইকেট পাবে, এখনো তা-ই বলছি।'

ওয়ার্নের দেওয়া পরিসংখ্যানে সামান্য ভুল আছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে ৭ না ৮ টেস্টে ৯০ নয়, ৬ টেস্টে মুরালির ৫০ উইকেট। তবে এর আগেই তো অন্য এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়ে দিয়েছেন, কম্পিউটারের চেয়ে নিজের মস্তিষ্কের ওপরই তাঁর বেশি নির্ভরতা।

কম্পিউটার ভুল করে না, মস্তিষ্ক করে। তারপরও কম্পিউটার নিছকই একটা যন্ত্র। মস্তিষ্কের বহুমাত্রিকতার কাছে সেটি আর কী! লেগ স্পিনের মতো শিল্প যাঁর হাতে ফুল হয়ে ফোটে, ‘যান্ত্রিক' শব্দটাই তো তাঁর সঙ্গে যায় না!