এখন আর খুব একটা সংশয় নেই। 'গ্রায়েম হিক সিনড্রোম' কথাটি ক্রিকেট অভিধানে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার সময় হয়ে গেছে। আগামী দিনে নিশ্চয়ই এমন ঘটনা আরও ঘটবে, ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখানো কোনো ব্যাটসম্যান ব্যর্থ হবেন টেস্ট ক্রিকেটে। তখন ওই ব্যাটসম্যানের দিকে আঙুল তুলে সবাই বলবেই–'আরেক গ্রায়েম হিক।'

গ্রায়েম হিকের টেস্ট ক্যারিয়ার এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বরং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজে পুনরুজ্জীবনই ঘটেছিল তাঁর। পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৯৯৬ সালে লর্ডস টেস্টের পর মাঝের সময়টায় তাঁকে একদম উপেক্ষা করে আসছিলেন নির্বাচকরা। 'একদম' লেখা অবশ্য ঠিক হলো না, টেস্টে সুযোগ না পেলেও ইংল্যান্ডের ওয়ানডে দলে ছিলেন হিক। ওয়ানডেতে হিকের রেকর্ডও অনেক ভালো। ওয়ানডেতে টেস্ট ক্রিকেটের মতো বাউন্সার দিতে পারে না বোলাররা--কারণ কি এই? হয়তো তাই, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শর্ট পিচড বলের বিপক্ষে হিকের ভয়াবহ অস্বস্তিটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন কার্টলি অ্যামব্রোস অ্যান্ড কোং।

আর স্যাটেলাইটের এই যুগে সামান্যতম দুর্বলতার খবরও ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। হিক উইকেটে এলেই বাউন্সার দিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোটা নিয়মে পরিণত হয় তাই। '৯৬-এর ওই লর্ডস টেস্টে ওয়াকার ইউনিস একটু বেশিই ব্যবহার করেছিলেন ফাস্ট বোলারের সবচেয়ে গর্বের ওই অস্ত্রটি। দুই ইনিংসেই ৪ রানে বোল্ড হয়ে যান হিক। তাঁর নাকাল অবস্থা নির্বাচকদের মনঃস্থির করাতে একটু ভাবার প্রয়োজনও বোধ করায়নি। ওয়াকার ইউনিস তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়েছেন--এই ফিসফিসানিটি যখন প্রায় চিৎকার করে বলার মতো অবস্থায় এসে গেছে, তখনই হিককে আবার ডাকলেন ইংল্যান্ড নির্বাচকেরা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ট্রেন্ট ব্রিজে সিরিজের চতুর্থ টেস্টে প্রত্যাবর্তন লগ্নটি অবশ্য স্মরণীয় করে রাখতে পারেননি, ইংল্যান্ড ৮ উইকেটে জিতে যাওয়ায় দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে হয়নি। প্রথম ইনিংসে টিকেছেন মাত্র ১৭ বল, করতে পেরেছেন মাত্র ৬। হেডিংলিতে সিরিজের শেষ টেস্টের দুই ইনিংসেই ব্যর্থতা (১ ও ২) আবারও তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারে বিরতি টেনে দেওয়ার শঙ্কা জাগিয়েছে। তা যদি না-ও হয়, সেটিকে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে তাঁর চোখ ধাঁধানো রেকর্ডের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার সুযোগ আর নেই হিকের। গত ২৩ মে ৩২-এ পা দিয়েছেন, আর সময় কোথায়?

হিককে আবার টেস্ট দলে না ডেকে নির্বাচকদের উপায় ছিল না। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে তাঁর পারফরম্যান্স সবসময়ই ভুল বুঝিয়ে আসছে--তারপরও এমন একটি কীর্তি গড়েছেন হিক যে, এরপর তাঁকে আরেকটি সুযোগ না দেওয়া খুব অন্যায় হতো। টেস্ট পর্যায়ে হিকের সামর্থ্য সম্পর্কে নির্বাচকদের এতটাই বিরূপ ধারণা ছিল যে, সেই কীর্তির সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু হিককে দলে ডাকেননি তাঁরা। শেষ পর্যন্ত যখন ডেকেছেন, হিকের ফর্মের সঙ্গে গ্রাহাম থর্পের ইনজুরিও ভূমিকা রেখেছে তাতে। যে কীর্তির কথা বলা হচ্ছে, সেটি এবারের ইংলিশ মৌসুমের শুরুতেই। গত মে’র শেষ দিনে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচে জোড়া সেঞ্চুরি নয়, এর আগেও দু’বার একই ম্যাচের দুই ইনিংসে সেঞ্চুরির কৃতিত্ব আছে হিকের। তার পরও সাসেক্সের বিপক্ষে এই দুই সেঞ্চুরির দ্বিতীয়টি হিককে নিয়ে যায় নতুন এক উচ্চতায়। এটি ছিল ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে গ্রায়েম অ্যাশলে হিকের শততম সেঞ্চুরি। ইংল্যান্ড ছাড়া অন্য দেশগুলিতে যেহেতু এতো বেশি ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট খেলার সুযোগ নেই, তাই এই তালিকায় অনুপস্থিত 'গ্রেট' অনেক ব্যাটসম্যানই। ইংল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদেরই জয়জয়কার এতে--এসব যুক্তির পরও ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি করা ব্যাটসম্যানদের অমরত্ব নিয়ে সাধারণত তর্ক করে না কেউ। সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি অবশ্যই গ্রেটনেসের একমাত্র শর্ত নয়, ক্রিকেটের অলটাইম গ্রেটদের সারিতে স্থান পাওয়া অনেকেই তা করতে পারেননি। এটি না করেও কেউ ‘গ্রেট' হতে পারেন, তবে সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি করা একজন ব্যাটসম্যান যে বিশেষ কিছু, এটা মানতেই হবে। কাজটা খুব সহজ নয় বলেই এত বছরে রেকর্ড বুকের এই অংশটিতে নাম উঠেছে মাত্র ২৪ জনের, ২৪তম নামটি গ্রায়েম হিক (এরপর মার্ক রামপ্রকাশও সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি করায় সংখ্যাটা ২৫ হয়ে গেছে। ২০০৮ সালে হিক ক্যারিয়ার শেষ করেছেন ১৩৬ সেঞ্চুরি নিয়ে। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে এর চেয়ে বেশি সেঞ্চুরি আছে মাত্র সাতজনের)।

শুধু কোনোমতে এই মাইলফলকে পৌঁছেছেন হিক, ঘটনা তো তা-ও নয়। তাঁর শততম সেঞ্চুরিটি এসেছে ৫৪৩তম ইনিংসে অর্থাৎ গড়ে ৫.৭৩ ইনিংসে একটি করে সেঞ্চুরি এসেছে তাঁর ব্যাট থেকে। শততম সেঞ্চুরি করতে এর চেয়ে কম ইনিংস খেলতে হয়েছে শুধু দুজনকে–মাত্র ২৯৫ ইনিংসে সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি করে ফেলে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান এ ক্ষেত্রেও তাঁকে অতিমানব বলে ভুল করার সুযোগ দিয়েছেন। স্যার ডন ছাড়া হিকের সামনে আছেন ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যাচারাল ব্যাটসম্যানদের একজন ডেনিস কম্পটন। হিকের চেয়ে ২১ ইনিংস কম লেগেছিল তাঁর।

বয়স-বিচারেও ঈর্ষণীয় হিকের এই অর্জন। শততম সেঞ্চুরি করার দিনটিতে তাঁর বয়স ছিল ৩২ বছর ৮ দিন। এর চেয়ে কম বয়সে একজনই পৌঁছেছেন এই মাইলফলকে । ওয়ালি হ্যামন্ড অবশ্য খুব বেশি এগিয়ে নেই। ১৯৩৫ সালে শততম সেঞ্চুরিতে পৌঁছার দিনটিতে হ্যামন্ড ছিলেন ৩১ বছর ৩৫৯ দিন বয়সী অর্থাৎ মাত্র ১৪ দিনের জন্য সবচেয়ে কম বয়সে এই কীর্তি গড়ার রেকর্ডটি ধরে রাখতে পেরেছেন হ্যামন্ড, ১৬৭টি সেঞ্চুরি নিয়ে এই তালিকায় যাঁর স্থান শুধু স্যার জ্যাক হবস (১৯৯) ও প্যাটসি হেনড্রেন (১৭০)-এর পর।

গ্রায়েম হিকের চেয়ে কম বয়সে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে এক শ সেঞ্চুরি করতে পেরেছেন শুধুই ওয়ালি হ্যামন্ড। ছবি: গেটি ইমেজেস

হিকের ১০০টি সেঞ্চুরির আরও ব্যবচ্ছেদ হতে পারে। সেঞ্চুরি করেছেন ৯৭টি ম্যাচে, ২০০ এর ওপরে স্কোর আছে ১১টি, ৩৯টি ১৫০-এর ওপরে। চার শ'র বেশি স্কোর ১টি, তিন শ'র ওপরেও তাই। তাঁর ১০০ সেঞ্চুরির গড় ১৯৬.৮৬, ২৪টি নট আউট বাদ দিলে তা দাঁড়ায় ১৪৯.৬২। ১০০ সেঞ্চুরির ৭৩টিই এসেছে তাঁর কাউন্টি দল উস্টারশায়ারের পক্ষে, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে বিদেশি খেলোয়াড় হিসেবে খেলেছেন নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্টস ও কুইন্সল্যান্ডের পক্ষে, সেঞ্চুরির সংখ্যা যথাক্রমে ১০ ও ৩। বাকি ১৪টি সেঞ্চুরির ৬টি ইংল্যান্ড দলের হয়ে ট্যুর ম্যাচে, ইংল্যান্ডের পক্ষে টেস্টে ৪টি, বাকি ৪টি জন্মভূমি জিম্বাবুয়ের হয়ে। হিক সেঞ্চুরি করেছেন, এমন মাত্র ১২টি ম্যাচে হেরেছে তাঁর দল। যে দলের বিপক্ষে শততম সেঞ্চুরির রেকর্ড হলো, সেই সাসেক্সই এ ব্যাপারে হিকের জন্য সবচেয়ে যন্ত্রণার নাম। ওদের বিপক্ষে চারবার সেঞ্চুরি করার পরও পরাজয়ের জ্বালায় জ্বলতে হয়েছে হিককে। সাসেক্সের বিপক্ষে ৭টি সেঞ্চুরি আছে তাঁর, কিন্তু তাঁর একটিতেও জয় পায়নি হিকের দল উস্টারশায়ার।

শুধু ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটেরই গ্রেট হয়ে থাকলেন গ্রায়েম হিক। ছবি: গ্রায়েম হিক

এই ১০০ সেঞ্চুরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল আজ থেকে ১৩ বছর আগে। শুধু পরিসংখ্যানের প্রয়োজনই ১৯৮৫ সালের সেই ইংলিশ সামারে ফিরে যাওয়ার একমাত্র কারণ নয়। 'গ্রায়েম হিক' নামের যে রহস্য নিয়ে কথা হচ্ছে, তাঁর বীজটি রোপিত হয়েছিল সেই বছরেই । সে বছর আইসিসির সহযোগী সদস্য দেশগুলির মধ্যে সেরা এবং নয় নম্বর টেস্ট খেলুড়ে দেশ হওয়া যাদের নিশ্চিত ছিল, সেই জিম্বাবুয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ড সফরে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্ল্যামারগনের বিপক্ষে দুই ম্যাচে ২৩০ ও ১৯২ রানের দুটি ইনিংস বেরিয়ে এলো জিম্বাবুয়ে দলের ১৯ বছর বয়সী এক তরুণের ব্যাট থেকে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দলটির বোলিং আক্রমণ ছিল যথেষ্ট ধারালো। সেই ধারকে ভোঁতা বানিয়ে হিক যে ২৩০ রানের ইনিংসটি খেলেছিলেন, সেটিই ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে তাঁর প্রথম সেঞ্চুরি। এটি ছিল তাঁর ২৬তম ইনিংস। এই দুটি ইনিংস শুধু হিকের ক্যারিয়ারেরই নয়, মোড় ঘুরিয়ে দিল তাঁর পুরো জীবনেরই। উস্টারশায়ার কর্তাদের চোখে পড়েছিল এই প্রতিভা, পড়েছিল আরও অনেক দলেরই, তবে সে মৌসুমে হিক খেলতে নামেন উস্টারশায়ারের হয়েই ।

যে কাউন্টি ক্রিকেট তাঁর ব্যাটে রানের বন্যায় ভাসছে ১৩ বছর ধরে, তাতে সূচনাটা কিন্তু ভালো হয়নি। সমারসেটের বিপক্ষে অপরাজিত ১৭৪ রানের ইনিংসটির মাধ্যমে তৃতীয় ফার্স্ট ক্লাস সেঞ্চুরি পাওয়ার আগে উস্টারশায়ারের পক্ষে প্রথম ১০ ইনিংসের ৭টিতে বোল্ড আউটের গ্লানিতে ডুবতে হয়েছিল হিককে। উস্টারশায়ারের পক্ষে ১৩তম ইনিংসটিতে আরও একটি সেঞ্চুরি করেন হিক, ইংলিশ ক্রিকেটে প্রথম মৌসুমে তাঁর সেঞ্চুরি এই দুটিই। তখনো জিম্বাবুয়ে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেননি; ইংল্যান্ডের পক্ষে সুযোগ পাবেনই, সেই আত্মবিশ্বাস তো আর তখনই থাকার কথা নয়। পরের মৌসুমে জিম্বাবুয়ের মাটিতে খেলা দুটি ইনিংসই সম্ভবত তাঁকে জিম্বাবুয়ে ছাড়ার আত্মবিশ্বাস যোগায়। তখন তো আর 'এ' টিমের ধারণা চালু হয়নি। ‘ইয়াং অস্ট্রেলিয়ানস' নাম দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় দলটি গিয়েছিল জিম্বাবুয়ে সফরে। অস্ট্রেলীয় বোলিংকে চূর্ণ করে দুটি সেঞ্চুরি করেন হিক। প্রথমটিতে ডেভ গিলবার্ট, ব্রুস রিড ও টনি ডোডেমাইড ভুগেছিলেন। মাঝখানে এক ইনিংসে ব্যর্থতার পর দ্বিতীয় সেঞ্চুরিটি করেন, তখন এঁদের সঙ্গে যোগ হয়েছিলেন স্টিভ ওয়াহ। এই চারজনই পরে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে টেস্ট খেলেছেন, স্টিভ ওয়াহ তো খেলছেন এখনো।

পরের মৌসুমে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে ৬টি সেঞ্চুরিই মনঃস্থির করে দেয় হিকের। জিম্বাবুয়ের হয়ে '৮৭ সালের প্রুডেন্সিয়াল বিশ্বকাপ খেলা হিক জন্মভূমির মায়া ছেড়ে অপেক্ষা করতে থাকেন ইংল্যান্ডের পক্ষে খেলার সুযোগের। পরবর্তী বছরগুলিতে তাঁর ব্যাটে রানের যে প্লাবন, তাতে ইংল্যান্ড তো পারলে অনেক আগেই দলে নিয়ে নিত তাঁকে, বিশেষ করে ১৯৮৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হাতে যখন আবার অপমানের চূড়ান্ত হতে হচ্ছিল। তখন হিকের দুর্দান্ত ফর্ম একটা আক্ষেপের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইংরেজদের জন্য। সে বছর টন্টনে সমারসেটের বিপক্ষে তাঁর ২৬তম ফার্স্ট ক্লাস সেঞ্চুরিটি করেন হিক। এতেই অবশ্য চমকে ওঠার কিছু নেই। চমকটি ছিল রানে, ৪০৫ রান করে অপরাজিত ছিলেন হিক, '৯৪ সালে ব্রায়ান লারার অপরাজিত ৫০১ রানের আগ পর্যন্ত এটি ছিল এই শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের মাটিতে সর্বোচ্চ স্কোর। কয়েকদিন পর যাদের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিল ইংল্যান্ড, সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে উস্টারশায়ারের হয়ে খেলেন ১৭২ রানের এক ইনিংস; ১৫০ রানের মাথায় মে'র মধ্যে সহস্র রান পূর্ণ করার কীর্তিটি এসে যায় হিকের অধিকারে।

সেই ৪০৫-এর পথে। ছবি: গেটি ইমেজেস

ক্রমশ তলিয়ে যেতে থাকা ইংলিশ ক্রিকেট হিকের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই দেখতে পেয়েছিল এক উদ্ধারকর্তাকে। তাঁকে তাড়াতাড়ি দলে নেওয়ার জন্য কোয়ালিফাই করার সময়টা পর্যন্ত সাত বছর থেকে কমিয়ে আনা হয়েছিল পাঁচ বছরে। '৯১ সালে হিক খেলতে পারবেন— এরপর আর ভাবনা নেই, এমন একটা আনন্দে একরকম উৎসবই শুরু হয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ডে।

এরপর কী হয়েছে, ক্রিকেট অনুসারীদের সবারই তা জানা। ১৯৯১ সালে যখন বহু প্রতীক্ষিত, বহু আলোচিত টেস্ট অভিষেক হলো হিকের, প্রতিপক্ষ দলটির নাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ। একজন ডেবুট্যান্টের জন্য প্রতিপক্ষ হিসেবে এর চেয়ে খারাপ দল আর হতে পারে না (দ্বিমত থাকলে মার্ক রামপ্রকাশকেও জিজ্ঞেস করতে পারেন)। টেস্ট ক্রিকেট যে কাউন্টি ক্রিকেট নয়— হিককে এটি বোঝাতে অ্যামব্রোস-ওয়ালশরা সময় নেননি একটুও। এরপর কখনো কখনো তাঁর নামের প্রতি সুবিচার করার ইঙ্গিত দিয়েছেন হিক, ইংল্যান্ডের পক্ষে চারটি সেঞ্চুরির প্রতিটি ইনিংস সমর্থকদের মনে আশা জাগিয়েছে, এবার বোধ হয় টেস্ট ক্রিকেটেও সেই হিককে দেখা যাবে। কিন্তু 'ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটের রাজা কিন্তু টেস্টে ব্যর্থ'—'গ্রায়েম হিক সিনড্রোম' কথাটি ক্রিকেট অভিধানে ঢোকানোর লক্ষ্যেই যেন আবার কাজ শুরু করেছেন এই জিম্বাবুইয়ান। দু'বছর নির্বাসনে থাকার পর আবার ডাক পাওয়ার আগে ৪৬ টেস্টে ৩৬.১০ গড়ে হিকের সংগ্রহ ছিল ২৬৭২ রান। ৪টি সেঞ্চুরি ছাড়াও ছিল পঞ্চাশ পেরোনো ১৫টি স্কোর এবং অফ স্পিন বোলিংয়ে ২২টি উইকেট। ওয়ানডেতেও তাঁর অ্যাভারেজ ৩৬-এর ওপারে (৩৬.৬৮), তবে টেস্টে ৩৬ অ্যাভারেজ যেখানে একজন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানের ব্যর্থতার পরিচায়ক, ওয়ানডেতে তাঁর উল্টো। এ কারণেই ওয়ানডে দলে এখনো অপরিহার্য হয়ে আছেন হিক।

টেস্ট ক্যারিয়ারের শুরুটা খারাপ হলেও ২২তম ইনিংসে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিটি পাওয়ার পর ইংল্যান্ড আবারও নতুন করে মুখ চেয়েছিল হিকের। উস্টারশায়ারের পক্ষে প্রথম সেঞ্চুরি করতে হিকের তো এর চেয়েও চার ইনিংস বেশি লেগেছিল এই ইতিহাস আশাবাদ উজ্জ্বলই করে। কিন্তু ১৯৯৩ সালের ভারত সফরে বোম্বেতে সিরিজের শেষ টেস্টে ১৭৮ রানের ইনিংসটি সেরকম কোনো টার্নিং পয়েন্ট হতে পারেনি হিকের জন্য। এরপর সেঞ্চুরি করেছেন আর মাত্র ৩টি, এর দু'টিই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে (১১০ হেডিংলি, ১৯৯৪ এবং ১৪১ সেঞ্চুরিয়ান পার্ক, ১৯৯৫-৯৬)। এই দুই সেঞ্চুরির মাঝে অপরাজিত ১১৮ রানের ইনিংসটি খেলেছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। অভিষেকের স্মৃতি মনে রাখলে এটিতে হিকের বাড়তি তৃপ্তি পাওয়ারই কথা, যদিও ট্রেন্ট ব্রিজের উইকেট ছিল ধীরগতির, যাতে বাউন্স ছিল একেবারেই কম, সবচেয়ে বড় কথা ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান বোলিং অ্যাটাক ছিল কার্টলি অ্যামব্রোসবিহীন।

অভিষেক সিরিজেই কার্টলি অ্যামব্রোস ভীষণ ভুগিয়েছেন তাঁকে। ছবি: গেটি ইমেজেস

গ্রায়েম হিক কেন পারলেন না--এ নিয়ে এখন যেমন, তেমনি আগামী দিনগুলিতেও গবেষণা হবে বিস্তর। তাঁর প্রজন্মের সবচেয়ে বিখ্যাত স্কোরারের কেন টেস্ট ক্রিকেটে এমন সাধারণ রূপ? কাউন্টি ক্রিকেট কি তাহলে কোনো মানদণ্ডই নয়? গ্রায়েম হিক কি আগাগোড়াই ওভাররেটেড ছিলেন? বেড়ে ওঠার সময় থেকে হিককে দেখেছেন, পরে কাজ করেছেন পরিণত হিকের সঙ্গেও--এমন একজনকে শেষ প্রশ্নটি করার পর যে জবাব পেয়েছিলাম, এই লেখা লিখতে বসার আগে টেপ রেকর্ডারে তা শুনে নিলাম আবার। গ্রায়েম হিক ইংল্যান্ডে চলে গেছেন বলেই জিম্বাবুইয়ান ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ব্যাটসম্যানের স্বীকৃতি পেয়েছেন যিনি, সেই ডেভিড হটনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম প্রশ্নটা। শুধু ছেলেবেলায় হিককে দেখেছেন বলেই নয়, গত বছর অক্টোবরে নাইরোবিতে প্রেসিডেন্ট কাপ তিন জাতি ক্রিকেটের সময় হটনের ইন্টারভিউয়ে এই প্রশ্নটি রাখার কারণ ছিল আরও। সে মৌসুমে ইংলিশ কাউন্টি উস্টারশায়ারের কোচের দায়িত্ব নিয়েছিলেন হটন, হিকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পুনরুজ্জীবন ঘটানোটাকে অন্যতম মিশন হিসেবে স্থির করেই শুরু করেছিলেন কাজ।

'ওভাররেটেড' শব্দটির তীব্র প্রতিবাদ শুনেছিলাম হটনের মুখে! শুধুই স্বদেশী বলে হিকের প্রতি পক্ষপাত? প্রথমে মনে হয়েছিল তা-ই, পরে হটনের ব্যাখ্যা শুনে সেই ভুল ভেঙেছে। হিক অসম্ভব প্রতিভাবান, তাঁর ক্রিকেটিং সামর্থ্য নিয়ে শ্রদ্ধার শেষ নেই হটনের। তাহলে টেস্ট ক্রিকেটে হিক কেন ব্যর্থ? প্রশ্নটা শেষ হওয়ার আগেই হটনের জবাব ছিল, সমস্যাটা হিকের মনে  ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে ৫৭টি সেঞ্চুরি করে প্রথম টেস্ট খেলায় প্রত্যাশার যে বিশাল পাহাড় তৈরি হয়েছিল, তা-ই টেস্ট ক্রিকেটে হিককে আর হিকের মতো খেলতে দেয়নি। সংক্ষেপে সারলাম, হটনের ব্যাখ্যা ছিল আরও অনেক বিস্তৃত। তবে তাঁর শেষ কথাটাই এখনো কানে বাজে, 'গ্রায়েমের যদি ভিভের (রিচার্ডস) মতো মনের জোর থাকত, ও যে কী করত, তা কল্পনা করাও কঠিন।'

তাঁর অনুরাগীদের যেমন, তেমনি স্বয়ং গ্রায়েম হিককেও এমন ‘যদি’ ‘কিন্তু’ নিয়ে আক্ষেপেই কাটাতে হবে বাকি জীবন!