কেউ বা দাবিটা তোলেন জিজ্ঞাসার ভঙ্গিতে, 'কোথায় হারালেন সেই তামিম?' কারও কাছে প্রশ্নসূচক সৌজন্যতাটুকু বাড়াবাড়ি মনে হয় বলে জানিয়ে দেন সরাসরিই, 'আগের তামিম আর নেই।' ব্যাকরণবিদের চোখে বাক্য দুটোর আলাদা প্রকরণ থাকলেও ভাবার্থটা একই, 'যে তামিমকে খুঁজে ফেরেন সবাই, সেই তামিম যেন হারিয়ে গেছেন কোন অজানায়!'

দাবিটা যে কেবল চায়ের দোকানে বসে থাকা দর্শক আড্ডারই খোরাক নয়, তা-ও নিশ্চয়ই নতুন করে বলতে হবে না। যে উৎপলশুভ্রডটকম-এ আপনি এই লেখা পড়ছেন, সেখানেই তামিমের কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন লিখেছিলেন, আগের 'ওই তামিমের মধ্যে যে আগ্রাসী মনোভাব দেখতে পেতাম, কিংবা বোলারদের ওপর আধিপত্য করার চেষ্টা, তামিম কী বলবে জানি না, আমার কিন্তু ওই তামিমই বেশি পছন্দের ছিল।'

কোচরাও চাইছেন আগের তামিমকে। কিন্তু ওই তামিম কেমন ছিলেন?

এমনকি দিনকয়েক আগে এই শুভ্র.আলাপে এসেই নাজমূল আবেদীন ফাহিমও তো বলে গিয়েছেন, 'ক্যারিয়ারের শুরুতে তামিম যে ধরনের ব্যাটিং করত, তখন ওর ব্যাটিংয়ের যে ন্যাচার ছিল, যে ফিলোসফি ছিল, সেখান থেকে তামিম অনেক সরে এসেছে ইদানীং।' তাঁদের কথার সঙ্গে উৎপল শুভ্রও ছিলেন সহাবস্থানেই। যে কারণে তামিমের সঙ্গে অফ দ্য রেকর্ডের এক আলাপে প্রশ্নটা রেখেছিলেন তিনিও, 'ওই তামিম কোথায়?'

চারিদিকে তাঁর ব্যাটিং নিয়ে এত আলোচনা-সমালোচনা হয়, তামিমও বোধ হয় প্রশ্নটির জন্য প্রস্তুতই ছিলেন। একটুও অপ্রস্তুত না হয়ে তামিম তাই উত্তরটা করেছিলেন পাল্টা প্রশ্নে, 'কোন তামিমকে চাইছেন আপনারা?'

২০০৭ বিশ্বকাপের সেই অমর ছবি। এই তামিমকেই চায় সবাই, কিন্তু তামিম কী চান? ছবি: এএফপি

'কোন তামিম মানে? ২০০৭ বিশ্বকাপে জহির খানকে ডাউন দ্য উইকেটে গিয়ে মারা ছক্কার তামিম, ২০১০ ইংল্যান্ডে বীরদর্পে দুটি সেঞ্চুরি করা তামিম, সে বছরই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টের প্রথম দিন প্রথম সেশনেই লাঞ্চের আগেই প্রায় সেঞ্চুরি, ভারতীয় বোলারদের তুলোধুনো করে খেলা দেড় শ রানের ইনিংসের তামিম!'

'আপনি নিশ্চিত, ওই তামিমকেই চাইছেন আপনারা? ওই পরিসংখ্যানেরই তামিম?'

তামিমের এই শেষ প্রশ্নেই খটকা জেগেছিল উৎপল শুভ্রের মনে। তবে কি কোথাও ভুল হচ্ছে? অতঃপর শুরু হলো পরিসংখ্যানে আতশকাচ ফেলা। আর ঘাটাঘাটির পরে তো তাঁর তাজ্জব হবার পালা।

সাফল্য-ব্যর্থতার বিচারে ২০১৫ সালটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের 'বিভাজন রেখা' হিসেবেই কাজ করে। তামিমের ক্যারিয়ারকেও যদি ২০১৫ পূর্ব আর উত্তর যুগে দ্বিখণ্ডিত করা হয়, তবে দেখা যাচ্ছে, অভিষেক থেকে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তামিম ম্যাচ খেলেছিলেন ১৩৫টি। তাতে ২৯.৮৫ গড়ে ৩৯৭১ রান, ৩১টি পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংসের চারটিকেই রূপ দিতে পেরেছিলেন শত রানে। বিপরীতে, ২০১৫ সালের শুরু হতে এখন পর্যন্ত তামিম ম্যাচ খেলেছেন ৭৮টি, তাতে ৩৪৮১ রান তুলেছেন ৫০ ছাড়ানো গড়ে। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ১৩টি সেঞ্চুরির নয়টিই এসেছে এই সময়ে। এই সময়কালে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রান তাঁরই, বিশ্ব ক্রিকেটেই তাঁর চেয়ে বেশি রান আছে আর মাত্র সাতজন ওপেনারের।

তামিম তাই আবারও প্রশ্নই করলেন, 'আপনি যদি দলের কোচ হন, তাহলে কোন খেলোয়াড়টিকে নিবেন? যার ২৯ গড়, ৭৭ স্ট্রাইক রেট? নাকি ৯টা সেঞ্চুরি, পঞ্চাশের ওপরে অ্যাভারেজ?'

যে স্ট্রাইক রেট নিয়ে প্রবল আপত্তি জনমনে, পরিসংখ্যান বলছে, আগেকার ওই 'বুম বুম' তামিমকে এখনকার তামিম পরাজিত করছেন ১.৭৪ ব্যবধানে। ২০১৫ থেকে তামিম প্রতি ১০০ বলে রান তুলছেন ৭৯.২৯ করে, ২০১৪ পর্যন্ত যা ছিল ৭৭.৫৫।

এই নির্জলা পরিসংখ্যানগুলো নিশ্চয়ই আকাশ ফুঁড়ে হঠাৎ উদয় হয়নি। ইন্টারনেটের এই সহজলভ্যতার দুনিয়ায় চাইলেই তো খুঁজে বের করা যায় এ সমস্ত অঙ্ক। তবুও কেন আগের ওই তামিমেই মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছেন সবাই?

শুভ্র.আলাপেই নাফিস ইকবাল এসে ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেছিলেন এর পেছনের কারণটা, 'ব্যাপারটা হলো, ডাউন দ্য ট্র‍্যাকে এসে যদি মারেন, যেগুলোতে আওয়াজ বেশি হয়, বাংলাদেশের মানুষেরা সেখানে হাততালি বেশি দেয়। একটা ক্ল্যাসিকাল কাভার ড্রাইভ, যেটাতে আওয়াজ নাই, কিন্তু রেজাল্ট একই, সেগুলোকে মনে করে নরমাল একটা শট।'

ডাউন দ্য উইকেটে গেলেই নাকি হাততালি বেশি! ছবি: মোহাম্মদ মানিক

তামিম ইকবালও ব্যাট চালালেন বড় ভাইয়েরই ভঙ্গিমায়, 'যখন শুরু করেছিলাম, তখন হতো কী, প্রথম ওভারে বা সেকেন্ড ওভারে সামনে এগিয়ে একটা চার মেরে দিতাম, একটা ছয় মেরে দিতাম। পরের ২০ বলে কী হচ্ছে, ওটা নিয়ে কারও মাথাব্যথা ছিল না। ওই যে একটা ছয়-চার মেরেছি, তা নিয়েই সবাই খুশি। এখনো ছয়-চার মারছি, কিন্তু ওই ছয়-চারটা মারছি ত্রিশ-চল্লিশ বল পর।'

কিন্তু এতে করে ব্যক্তিগত রান-গড়ের পরিসংখ্যানটা নাহয় সমৃদ্ধ হলো, দল কী ঠিকঠাক উপকৃত হচ্ছে? উৎপল শুভ্রের মতো অনেকেই তো মনে করেন, আগের তামিমের ব্যাটেই বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা বেড়ে যেত অনেকখানি। তামিমের সামনেই একবার যেমন শুভ্র বলেছিলেন, 'তামিম যদি তামিমের মতো খেলেন, দশটা ম্যাচের চারটাতে ক্লিক করলেও বাংলাদেশ চারটাই জিতবে। বাকি ছয়টা হারলেও কিছু আসে-যায় না।'

কিন্তু পরিসংখ্যানের আয়নায় শুভ্র ধরা পড়ে যাচ্ছেন এখানেও। দেখা যাচ্ছে, পুরোনো তামিম (সময়কালটা ২০১৪ পর্যন্ত, তা তো ওপরেই বলা হয়েছে) যেখানে ২৭ ফিফটির ১২টিতে মাঠ ছাড়তে পেরেছিলেন জয়ীর বেশে, পরের তামিম ২৩ ফিফটির ১৫টিতেই জয় এনে দিয়েছেন দলকে। আর ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচটিই ব্যতিক্রম, নইলে এখনকার তামিমের ৯টি ওয়ানডে সেঞ্চুরির ৮টিতেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের জয়ে তামিমের অনস্বীকার্য অবদানটা আরও পরিষ্কার হবে জয় পাওয়া ম্যাচে অন্যদের সঙ্গে তাঁর ব্যবধানটা দেখলে। ২০১৫ থেকে ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশ যে ৪৫ ম্যাচে জয় পেয়েছে, তার ৪১টিতে খেলেছেন তামিম, এ সময়ে ৭২.৫২ গড়ে রান করেছেন ২৪৬৬। রানের বিচারে তামিমের নিকটতম মুশফিকুর রহিম ছিলেন ৪৫ ম্যাচের সবগুলোতেই। তাতে ৫৬.৩৪ গড়ে তাঁর রান ১৮০৩। স্ট্রাইক রেটে অবশ্য তামিমের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছেন তিনি, তামিমের ৮৪.২২ স্ট্রাইক রেটের বিপরীতে মুশফিক ব্যাট করছেন প্রায় ৯৭ ছুঁইছুঁই স্ট্রাইক রেটে।

ওই স্ট্রাইক রেটে ভাস্বর ইনিংস হয়তো তামিমও খেলতে পারবেন, তবে তামিম বলছেন, তাঁর খেলার ধরনে বদলটা এসেছে দলকে উপকার করতেই এবং এ নিয়ে যে যা-ই বলুক, তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। 'এখন আমি আগে নিজের খেলাটা গুছিয়ে নেই। টিমের সেরকম কোনো ক্ষতি যেন না হয়, আর্লি উইকেট না পড়ে যায়; এভাবে টিমের খেলাটাও গুছিয়ে নেই। ক্রিকেটে কিছু কিছু খেলোয়াড়কে খুব আগলি জিনিসগুলো করতে হয়। মানে, দেখতে সুন্দর না কিন্তু টিমের জন্য খুব এফেক্টিভ। সেই খেলাটা খুব একটা অ্যাপ্রিশিয়েট হবে না। প্রোবাবলি আই ডু দ্য আগলি পার্ট। অ্যান্ড আই অ্যাম প্রাউড অব ইট।'

তামিমের 'আগলি' ব্যাটিং নিয়ে শুভ্র.আলাপে আলোচনা হয়েছিল এর আগেই। উৎপল শুভ্রই মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, একবার আড্ডাচ্ছলেই তামিম তাঁকে বলেছিলেন, ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে দুই ইনিংসেই কুৎসিত ব্যাটিং করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানকার দুটি সত্তরোর্ধ্ব রানের ইনিংসের তৃপ্তিটা ছিল অন্যরকম। কারণটাও বলেছিলেন, 'যে ধরনের টার্নিং উইকেট বানানো হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার জন্য, ওই উইকেটে তো আমরাও খেলি না।'

দলের প্রয়োজনে কুৎসিত ব্যাটসম্যান হতেও আপত্তি নেই তামিমের। ছবি: এএফপি

গতকালের শুভ্র.আলাপে তামিম পুনরাবৃত্তি করলেন সে কথারই, 'আমরা কিন্তু কোনো জায়গাতেই ওরকম উইকেটে খেলে অভ্যস্ত না। আপনি যদি কমপেয়ার করেন, (ওই উইকেট) আমার জন্য যতটা ডিফিকাল্ট, ডেভিড ওয়ার্নারের জন্যেও এক্স্যাক্টলি ওই রকমই ডিফিকাল্ট।'

সেই দুরূহ কাজটাই সার্থকতার সঙ্গে করে দলকে জয় এনে দিয়েছিলেন বলে বাড়তি তৃপ্তি আছে তাঁর। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট জয়, শততম টেস্টে শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়--বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে তিন জয়ে বড় অবদান রেখেছিলেন বলে আলাদা একটু গর্বও অনুভব করেন। তামিমের কাছে এসব ইনিংসের মূল্য তাই অনেক সেঞ্চুরির চেয়েও বেশি।

ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের সঙ্গে খেলা ইনিংসগুলো নিয়ে সন্তুষ্টির কারণটা ব্যাখ্যা করলেন গতকালও, 'এই ইনিংসগুলোর সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট যে জিনিসটা ছিল, ওখানে কিন্তু খেলাই হচ্ছিল দুই শ-আড়াই শ রানের। আপনি যদি দেখেন, ফার্স্ট ইনিংসে ব্যাট করে কেউ যদি আড়াই শ রানের বেশি করে, তাহলে মোস্ট লাইকলি দে আর গোয়িং টু উইন দ্য টেস্ট ম্যাচ। ওই আড়াই শ রানেই যদি আপনার সেঞ্চুরি থাকে, সত্তর-আশি রানের একটা ইনিংস থাকে, তাহলে হয়তো সেটা এক শ কাউন্ট হবে না, তবে আমার কাছে সেটার মূল্য এক শর অনেক বেশি।'

তা তামিম এমন সব ম্যাচজয়ী ইনিংস আরও নিয়ম করে খেলতে থাকুন, ম্যাচ জয়ের আনন্দে 'ওই তামিমকে চাই' হাহাকারটা চাপা পড়ে যাবে নিশ্চিত।