সেই দুঃস্বপ্নের বয়স এখন এক মাসেরও বেশি। তবু তার রেশ এখনও সামলে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। রামন লাম্বা নামটা উচ্চারিত হওয়া মাত্র এখনও স্তব্ধ হয়ে যায় একটু আগে চার পাশ কাঁপিয়ে তোলা তুমুল আড্ডা। খুশির মুখে নেমে আসে অদ্ভুত এক বেদনার ছায়া। এক সময় বাংলাদেশের ক্রিকেট অনুরাগীদের কাছে রামন লাম্বা নামের অর্থ ছিল রান আর রান। ২০ ফেব্রুয়ারির দুঃস্বপ্নের পর থেকে তা শোকের প্রতিশব্দ। এক জন জলজ্যান্ত এক মানুষের এভাবে চলে যাওয়াটা এখনও পাষাণভার হয়ে চেপে আছে পুরো দেশের বুকে।

লাম্বা প্রসঙ্গ উঠলেই ছলছলে হয়ে ওঠে জি এস হাসান তামিমের চোখ। এ বার লাম্বা ঢাকায় খেলতে যেতে প্রথমে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। তাঁকে পীড়াপীড়ি করে রাজি করিয়েছিলেন আবাহনী ক্রিকেট দলের ম্যানেজার। এখন তিনি পুড়ছেন অপরাধ বোধে। মহমেডানের তরুণ ওপেনার মেহরাব হোসেন অপি এখনও ভালো করে ঘুমোতে পারেন না। বাংলাদেশ জাতীয় দলের এই ব্যাটসম্যানের পুল করা বলই আঘাত করেছিল ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে দাঁড়ানো লাম্বার মাথায়। মাঠ থেকে হেঁটেই ড্রেসিংরুমে ফিরেছিলেন লাম্বা। তাই সেই মুহূর্তে লাম্বার জন্য উৎকণ্ঠা বা সমবেদনার চেয়ে আউট হওয়ার যন্ত্রণাই বেশি আচ্ছন্ন করে ছিল অপিকে। এক সময় সেই আঘাতই যখন প্রাণঘাতী রূপ নিল সব যুক্তি-বুদ্ধি ছাপিয়ে অসহ্য এক অপরাধবোধ গ্রাস করে ফেলল অপিকে।

'আমার প্রিয় শট পুল' এটা বলতে অপি এখন কেঁপে ওঠেন। অথচ তামিম ও অপি ভাল করেই জানেন, তাঁদের কোনও দোষ নেই। লাম্বাকে নিয়ে গেছে নিয়তির লম্বা হাত। নইলে কেনই বা হেলমেট ছাড়া শর্টলেগে দাঁড়াবেন ? কেনই বা কান দেবেন না সহ-খেলোয়াড় ও আম্পায়ারের সতর্কবাণীতে?

লাম্বা যে দিন আহত হন, তার পরের দিন ছোট্ট করে সেই খবরটা ছাপা হয়েছিল বাংলাদেশের কাগজগুলোতে। এমন চোট, আঘাতের ঘটনা তো ক্রিকেট মাঠে ঘটেই থাকে! ক্রিকেট ইতিহাসে যা হয়নি, সেটাই হবে ঢাকায়, কে জানত তখন! লাম্বার আহত হওয়ার খবর ছাপা হয় একুশে ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশে জাতীয় ছুটি। পত্র-পত্রিকা ছিল বন্ধ। ২৩ ফেব্রুয়ারি সকালে কাগজ দেখে চমকে ওঠে গোটা দেশ। লাম্বা তখন জীবন্মৃত অবস্থায় শুয়ে আছেন হাসপাতালে, ডাক্তার তাঁকে 'ক্লিনিক্যালি ডেড' বলে ঘোষণা করেছেন। শুধু কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবস্থা তখনও বলতে দিচ্ছে না, লাম্বা মৃত। ক্রিকেট মৃত্যুর অন্য নাম হতে পারে, এটা তখনও সবার কল্পনার অতীত। সাম্প্রতিক অতীতে আর কোনও মৃত্যু এভাবে নাড়া দেয়নি বাংলাদেশকে।

আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখকের এই লেখা

রামন লাম্বার চিকিৎসায় কি কোনো ত্রুটি হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। বাংলাদেশের বিশিষ্ট নিউরো-সার্জন ডাঃ রশিদউদ্দিন আহমেদ অস্ত্রোপচার করেছিলেন লাম্বার মস্তিষ্কে। দিল্লি থেকে উড়ে যাওয়া বিশেষজ্ঞ রায় দিয়েছেন, ইনজুরির ভয়াবহতাই মৃত্যুর কারণ। চিকিৎসায় ত্রুটি নয়। তারপরও প্রশ্নটা উঠেছে: অস্ত্রোপচার করতে কি একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল ?

২০ ফেব্রুয়ারি শেষ দুপুরে আঘাত পান লাম্বা, অস্ত্রোপচার হয়েছে ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে। সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রোপচার করলে কি লাম্বাকে বাঁচানো যেত? এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই। তবে নরি কন্ট্রাক্টর, ফিল সিমন্সরা প্রায় একই রকম চোট পাওয়ার পরও সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রোপচার করায় বেঁচে উঠেছেন। সিমন্স তো তারপরও খেলেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। তবে লাম্বার ইনজুরি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ, কন্ট্রাক্টর-সিমন্স চোট পেয়েছিলেন ব্যাটিংয়ের সময়। লাম্বা ছিলেন ব্যাট থেকে কয়েক ফুট দূরে। তাই তাঁকে আঘাত করা বলটির গতি বোলারের হাত থেকে বেরিয়ে আসা বলের চেয়ে অবশ্যই অনেক বেশি হওয়ার কথা।

এটাও মনে হচ্ছে যে, লাম্বার মৃত্যু ক্রিকেটে স্থায়ী চিহ্ন রাখবে। এই দুর্ঘটনার পরপরই বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড ক্লোজ-ইন পজিশনে ফিল্ডিংয়ের সময় হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করতে উদ্যোগী হয়েছে। বোর্ড প্রেসিডেন্ট ও আই সি সি নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী আই সি সি-র আগামী সভায় এটা প্রস্তাব আকারে পেশ করবেন বলেও জানিয়েছেন। এখনই দেখা যাচ্ছে, ঢাকার মাঠে ক্লোজ-ইন পজিশনে হেলমেট ছাড়া কেউ ফিল্ডিং করছেন না।

রামন লাম্বার স্মরণে একটা চ্যারিটি ম্যাচ হয়েছে। খুব বেশি দর্শক আসেননি বলে প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থও ওঠেনি। তার পরও লিগের আয়োজকরা তহবিল থেকে কিছু যোগ করে মোট চার লাখ টাকা তুলে দিয়েছেন লাম্বার আইরিশ স্ত্রী কিম লাম্বার হাতে। লাম্বার স্মৃতি ধরে রাখতে একটা টুনামেন্ট আয়োজন করারও চিন্তাভাবনা চলছে। সর্বোচ্চ স্তরে এখনও তা ভবিষ্যতের ব্যাপার হয়ে থাকলেও 'রামন লাম্বা স্মৃতি টুনামেন্ট' নামে একাধিক প্রতিযোগিতা এরই মধ্যে আয়োজিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়।

প্রশ্ন জাগতেই পারে, তা হলে কি বাংলাদেশে খুব জনপ্রিয় ছিলেন রামন লাম্বা? লাম্বার মৃত্যুতে শোকের তীব্রতা এ ব্যাপারে ভুল বোঝাতেই পারে। আসলে লাম্বার মৃত্যুর ধরনটাই আবেগের এমন ঢেউ জাগিয়েছে সবার মনে যে কারও ক্ষেত্রেই এমন হতো।

ঢাকা স্টেডিয়ামে লাম্বার ইন্টারভিউ করছি। অক্টোবর, ১৯৯২

ঢাকার ক্রিকেটে একটা ব্যাপারে পথিকৃৎ মানতে হবে লাম্বাকে। '৯১-তে রমন লাম্বা যখন আবাহনীতে খেলতে ঢাকায় যান, তখন তা ছিল রীতিমত একটা বিস্ফোরণ। কারণ ঢাকা তখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের প্রিয় চারণক্ষেত্র হয়ে ওঠেনি। তা ছাড়া লাম্বার সামর্থ্যের পরিচয় আগেই জানা ছিল ঢাকার দর্শকদের। বছর দেড়েক আগে, হায়দরাবাদ ব্লুজ দলের হয়ে বাংলাদেশ সফরে রানের বন্যা বয়ে গিয়েছিল লাম্বার ব্যাটে। আবাহনীর পক্ষেও সেই একই ধারাবাহিকতা থেকে গেছে তার ব্যাট। লাম্বা তখন সব অর্থেই বড় তারকা। কিন্তু রান করার পরও তাঁকে পরের বছর আর দলে নেয়নি আবাহনী।

নিজে উদ্যোগী হয়ে ঢাকা যাওয়ার পর মাঝারি সারির দল জি এম সি সি-তে খেলেন তিনি পরের দুই বছর। প্রথম বছরের মতো না হলেও রান তখনও করেছেন, কিন্তু বাংলাদেশের খেলার জগতে নিয়মটা ভিন্ন। আবাহনী-মহমেডানে না খেলে এখানে সে রকম ‘ক্রেজ’ হওয়া সম্ভব নয় কারও পক্ষে। লাম্বাও তাই শুরুর ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে নিভু নিভু হয়েই জ্বলেছেন সেই দুই বছর। তা ছাড়া তত দিনে ঢাকা আরও অনেক তারকাকে দেখে ফেলেছে। আবাহনী তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা চূড়ান্ত করেও দ্বিতীয় বছর আর দলে নেয়নি তাঁকে, এই অভিযোগ এই প্রতিবেদকের কাছেই করেছিলেন লাম্বা।

কিন্তু প্রথম বছর ওই রকম ‘সার্ভিস’ পাওয়ার পরও আবাহনী কেন লাম্বার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল? কারণ, মাঠে যেমন রান দিয়েছিলেন লাম্বা, মাঠের বাইরেও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবাহনী কর্মকতাদের দিয়েছিলেন কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার স্বাদও। লাম্বার নানা রকম বায়নাক্কা শুনতে শুনতে আবাহনী কর্মকর্তাদের নাকি বিরক্তি এসে গিয়েছিল। এই কারণেই দ্বিতীয় বছর আর সেই যন্ত্রণার দিকে পা বাড়াননি তাঁরা। 

তিন বছর পর, '৯৫-'৯৬ সালে অবশ্য আবার রামন লাম্বাকে দলে নিয়েছিল আবাহনী। কয়েকটা ম্যাচ খেলেই ফিরে যান তিনি, দিল্লির অধিনায়কত্ব পাওয়ায় আর ফেরেননি, আবাহনীকে এক রকম ফাঁকিই দেন। এ বার নাকি সেই লাম্বাই ছিলেন অন্যরকম। হাসিখুশি, মিশুকে, কোনও ভড়ং ছিল না তাঁর মধ্যে। আবাহনী কর্মকর্তা অন্য খেলোয়াড়দের তাই খুব প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন । ঢাকায় প্রথম বছর লাম্বা নামের আকর্ষণের ছিটেফোঁটাই অবশিষ্ট ছিল এ বার। লাম্বা ঢাকার ক্রিকেটের প্রথম সুপারস্টার হতে পারেন, কিন্তু মাঝের সময়টায় যে আরও অনেক রথী-মহারথীর পা পড়েছে ঢাকায়। ওয়াসিম আক্রম, অর্জুন রণতুঙ্গা, সনৎ জয়সূর্য, নিল ফেয়ারব্রাদারদের দেখতে অভ্যস্ত চোখ রামন লাম্বাকে দেখে কেন চকচক করে উঠবে ?

প্রথম-এর অবশ্য একটা আলাদা মর্যাদা থাকেই। রামন লাম্বার নামও তাই হয়তো এমনিতেও মনে থাকত বাংলাদেশের ন্য মানুষের। কিন্তু এখন আর সে সব কিছু নয়--লাম্বা শুধুই এক শোকের অনুভব। যে ঢাকা স্টেডিয়ামে জীবনের শেষ ম্যাচটি খেলেছেন লাম্বা, সেই স্টেডিয়ামের একটা প্রান্ত এখন পরিচিত রামন লাম্বার নামে। অক্টোবর মাসে ঢাকায় বসছে নকআউট বিশ্বকাপের আসর। রামন লাম্বা প্রান্ত থেকে বল করতে আসবেন কার্টলি অ্যামব্রোস, শেন ওয়ার্ন, ম্যাকগ্রাথরা। বারবার উচ্চারিত হবে রামন লাম্বার নাম। ইনিংসের স্বাভাবিক সমাপ্তি টানতে পারলে তাঁকে বাংলাদেশ কতটা মনে রাখত কে জানে, কিন্তু এখন তাঁকে সত্যিই ভোলা সম্ভব নয়।

(আনন্দবাজার পত্রিকার বানানরীতি পরিবর্তন করা হয়নি)।