‘দ্য প্যাভিলিয়ন’ নামে ক্লাবের যে মূল ভবন, সেটির দেয়ালে ঝোলানো অনেক ছবি। কোনোটা টুর্নামেন্টজয়ী দলের, কোনোটা ক্লাবের নামকরা কোনো খেলোয়াড়ের। সব ছবির নিচেই পরিচিতি দেওয়া। শুধু একটি ছবিতে কিছু লেখা নেই। সেটি কি এই কারণে যে, নর্থডাউন ক্রিকেট ক্লাবে রমন লাম্বার ছবিটাই যথেষ্ট তাঁকে চেনাতে?

সেই সিপাহি বিদ্রোহের সময় ক্লাবটির প্রতিষ্ঠা। ১৫৫ বছরের ইতিহাস। সেই ইতিহাসে রমন লাম্বা এমনই একটা জায়গা নিয়ে আছেন যে, এ নিয়ে শুধু টমাস অ্যান্ড্রুসের সঙ্গেই তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। তা এই টমাস অ্যান্ড্রুসটা কে? বলতে পারেন, এই ক্লাবের প্রাণপুরুষ। ক্লাবের বাইরের দেয়ালে বিশাল একটা হোর্ডিং। ক্লাবের ইতিহাস লেখা আছে, সঙ্গে ১৮৯৫ সালের নর্থডাউন সিসি দলের একটা ছবি। যে দলের সবাই অ্যান্ড্রুস আর তাঁর ভাই-বেরাদর। টমাস অ্যান্ড্রুসের আসল পরিচয় অবশ্য এটা নয়। ইতিহাস তাঁকে মনে রেখেছে টাইটানিক জাহাজের নকশাকারী হিসেবে। টাইটানিকের প্রথম ও শেষ সমুদ্রযাত্রায় তিনিও জাহাজে ছিলেন। জীবনের সবচেয়ে বড় কীর্তির সঙ্গে হারিয়ে গেছেন অতলান্তিকের অতলান্ত জলে।

অ্যান্ড্রুসের পরিচয়টা গতকাল নর্থডাউন ক্রিকেট ক্লাবে গিয়ে আবিষ্কৃত। রমb লাম্বার ব্যাপারটা তা নয়। গত সোমবার বাংলাদেশ দলের প্রস্তুতি ম্যাচ দুটি হয়েছে ওই মাঠেই। বাংলাদেশ দলের শেফ ডি মিশন আহমেদ সাজ্জাদুল আলম সেখানে গিয়ে আবিষ্কার করেন, রমন লাম্বা এই ক্লাবেই খেলে গেছেন অনেক দিন। অপরাধবোধ মেশানো একটা আক্ষেপও যেন ছুঁয়ে গেছে তাঁকে। ওই ক্লাবে লাম্বার ছবি আছে, অথচ আবাহনী ক্লাবে কোনো ছবি নেই।

থাকা উচিত ছিল। যে ক্লাবের হয়ে খেলতে নেমে ক্রিকেট মাঠে জীবন দিয়ে গেছেন, সেই ক্লাবে রমন লাম্বার কোনো স্মৃতিচিহ্ন না-থাকাটা অন্যায়ই বলতে হবে। অথচ স্মৃতিচিহ্ন থাকার কথা ছিল স্টেডিয়ামেও। ১৯৯৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে শর্ট লেগে ফিল্ডিং করার সময় লাম্বার মাথায় বল লেগেছিল। মাটিতে পড়ে গেলেও পরে হেঁটেই মাঠ ছেড়েছিলেন। তখন ভাবাও যায়নি, সেই তাঁর শেষ হাঁটা! তিন দিন পর আটত্রিশেই চলে যান লাম্বা। স্টেডিয়ামের একটা বোলিং প্রান্ত রমন লাম্বার নামে করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল বিসিবি। সেটি ভুলে যেতে সময় লাগেনি। যে স্টেডিয়ামে এই বিয়োগান্ত নাটক, সেই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামই তো আর ক্রিকেটের নেই।

বাংলাদেশের ক্রিকেট জাগরণে লাম্বার ভূমিকাও তো এখন বিস্মৃতির আড়ালে। লাম্বার আগেই রানাতুঙ্গারা ঢাকার ক্রিকেটে খেলে গেছেন, পরে তো খেলেছেন নামীদামি আরও কতজনই! কিন্তু ১৯৯১ সালে আবাহনীতে প্রথম খেলতে এসেই লাম্বা যে হইচইটা ফেলে দিয়েছিলেন, তার তুল্য কিছু আর ঘটেনি। চেহারা-ছবি-চালচলনে তারকাদ্যুতি ফুটে বেরোত। ব্যাটেও ছিল রানের বন্যা। ঢাকা লিগে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে দর্শকের ঢল নামার শুরুও সে সময়ই। লাম্বার আকর্ষণী ক্ষমতার বড় ভূমিকা ছিল তাতে।

নর্থডাউন ক্রিকেট ক্লাবেও একই ঘটনা। ১৯৮৪ সালে ২৪ বছরের লাম্বা এই ক্লাবে ‘বিদেশি পেশাদার’ হিসেবে খেলতে এসেই পরিণত হয়েছিলেন মূর্তিমান বিস্ময়ে। ২৯ বছর ধরে এই ক্লাবের মাঠ প্রস্তুত করার দায়িত্বে রেমন্ড মুরল্যান্ড। ৫৮ বছরের এই বুড়ো লাম্বার স্মৃতিচারণা করতে করতে যেন ফিরে যান সেসব দিনে। ‘রমন যখন এখানে খেলতে এল, এখানে ক্রিকেট ছিল একেবারেই শৌখিন। মাঠে এসে সবাই সরাসরি খেলতে নেমে পড়ত। রমন খেলার আগে স্ট্রেচিং করত, ওয়ার্মআপ করত—এসব দেখে সবার চোখ কপালে, এ এসব কী করছে!’

নর্থডাউন ক্রিকেট ক্লাবের কিউরেটর বলছেন, রমন লাম্বা ছিল 'উইমেন-ম্যাগনেট', মেয়েরা পতঙ্গের মতো ছুটে আসত তাঁর কাছে। আসারই কথা, চেহারাটা দেখুন না!প্রথম মৌসুমেই ১৪০০ রান করেছিলেন, উইকেটও নিয়েছিলেন ৪০টি। ৮-৯ বছর নর্থডাউন ক্রিকেট ক্লাবে খেলেছেন, এরপর অন্য ক্লাব-টাব মিলিয়ে এখানে নিয়মিত ছিলেন ১৯৯৬ পর্যন্ত। ভারতের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ৪ টেস্ট ও ৩২টি ওয়ানডেতেই শেষ হয়ে যাওয়ার পর কয়েকটি ম্যাচ খেলেছেন আয়ারল্যান্ডের পক্ষেও। মুরল্যান্ড লাম্বার ব্যাটিংয়ের বর্ণনা দিতে দিতে বারবার ‘ওয়াও’ ‘ওয়াও’ বলার পর আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘শুধু লাম্বার ব্যাটিংয়ের টানেই মাঠে দর্শক অনেক বেড়ে গিয়েছিল। তখন উইকেট ছিল খুব স্লো, শট খেলা ছিল কঠিন। এখন উইকেট যে রকম ফাস্ট, লাম্বা এমন পেলে যে কী করত, ভাবাই যায় না।’ 

ব্যাটসম্যান লাম্বার মতো মুরল্যান্ডের মনে পড়ে রমণীমোহন লাম্বাকেও, ‘পতঙ্গ যেমন পাগল হয়ে আগুনের দিকে ছুটে যায়, সুন্দরী মেয়েরাও তেমনই রমনের টানে ছুটে আসত। ও ছিল 'উইমেন-ম্যাগনেট!’ সেই মেয়েদের মধ্যেই একজনকে লাম্বার মনে ধরে, ১৯৯০ সালে বিয়ে করেন কিম ক্রদারসকে। ঢাকা-ট্র্যাজেডির সময় তাঁদের ঘরে পাঁচ বছরের এক ছেলে আর তিন বছরের এক মেয়ে।

রমন লাম্বার স্মৃতি নর্থডাউন ক্রিকেট ক্লাবে আছে। সবিস্তারে আছে এই ক্লাবের ইতিহাস নিয়ে লেখা বইয়েও। শুধু বাংলাদেশ থেকেই মুছে গেছেন লাম্বা।