ওয়াসিম আকরাম, সনাৎ জয়াসুরিয়া অনেক পরের ব্যাপার। সত্যিকার অর্থে তিনিই ছিলেন ঢাকার ক্রিকেটের প্রথম ভিনদেশী সুপারস্টার। হ্যাঁ, অর্জুনা রানাতুঙ্গার কথা মনে আছে। শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক এরও বছর ছয়েক আগে খেলে গেছেন ঢাকায়। এখন অবিশ্বাস্য শোনাতে পারে, কিন্তু সত্যিটা এই ’৯১-'৯২ মৌসুমের রমন লাম্বার চেয়ে অনেক বেশি অনুজ্জ্বল ছিলেন ’৮৫-'৮৬ মৌসুমের অর্জুনা রানাতুঙ্গা।

মাত্র কিছুদিন আগে ভারতীয় দলে খেলেছেন, আবারও ফিরতে পারেন যে কোনো মুহূর্তে, তাই ১৯৯১ সালের শেষ দিকে যখন আবাহনীতে খেলতে এলেন, তখন রমন লাম্বার পরিচয় ‘ভারতীয় টেস্ট ক্রিকেটার’ই, ‘সাবেক’ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়নি তখনও। বরং কদিনের মধ্যেই উল্টো বিস্ময় এবং প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছিলেন ঢাকার দর্শকদের মনে: ‘এই ব্যাটসম্যান ভারতীয় দলের বাইরে থাকে কীভাবে?’ দামাল সামার ছিল ঢাকায় খেলা তাঁর প্রথম টুর্নামেন্ট, কদিনের মধ্যে রমন লাম্বা নামের অর্থই হয়ে দাঁড়াল সেঞ্চুরি। সেই টুর্নামেন্টে তিনটি সেঞ্চুরি করেছিলেন এই ওপেনার। ঢাকার ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় গর্ব যে দর্শক, ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রথম তাদের ঢল নামানোর কৃতিত্বটাও লাম্বারই প্রাপ্য। সেবারের আবাহনী-মোহামেডান দামাল সামারের ফাইনালে হাজার পঁয়ত্রিশেক দর্শক ভিড় জমিয়েছিল ঢাকা স্টেডিয়ামে। মূল আকর্ষণ ছিলেন দিল্লির ওপেনারই। তিনি ব্যাট করতে নামলেই রান–এই ভাবমূর্তির সঙ্গে ছিল তাঁর দারুণ সুর্দশন চেহারা, দুটো মিলে ঢাকার ক্রিকেটে রমন লাম্বা তখন মাদকতাময় এক নাম।

কেমন ক্রিকেটার ছিলেন রমন লাম্বা? ভারতীয় ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট যে কাউকে জিজ্ঞেস করলে জানবেন, মাত্র ৪টি টেস্ট আর ৩২টি ওয়ানডে খেলার কথা ছিল না তাঁর, এর চেয়ে আরও অনেক বেশি দীর্ঘ হওয়া উচিত ছিল তাঁর ক্যারিয়ার। ১৯৮৬-৮৭ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক। জয়পুরে প্রথম ম্যাচেই ৬৪ রানের দারুণ এক ইনিংস পূবার্ভাস দিয়েছিল স্মরণীয় এক ক্যারিয়ারের। ৬ ম্যাচের সেই সিরিজে আরও একটি ফিফটি (৭৪) ও শেষ ম্যাচটিতে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একমাত্র সেঞ্চুরিটি (১০২) লাম্বাকে এনে দিয়েছিল ম্যান অব দ্য সিরিজের স্বীকৃতিও।

সে সময়কার পিজি হাসপাতাল থেকে রমন লাম্বার মরদেহ বের করে নিয়ে আসছেন আবাহনীর কর্মকর্তারা

এমন শুরুর পর ভারতীয় দলে তাঁর নিয়মিত হয়ে থাকারই কথা ছিল। মাস দুয়েক পর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রত্যাশিতভাবেই টেস্ট অভিষেক হলো। কানপুরে অভিষেক টেস্টে তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে রান আউট হলেন ২৪ রানে, নাগপুরে পরের টেস্টে ওপেন করতে নেমে করলেন ৫৩, কটকে তৃতীয় টেস্টে ৫ নম্বরে ব্যাট করে ২৪। কদিন পর পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে তাঁকে আর ডাকা হয়নি দলে। পরের বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে আবারও দলে ফেরেন লাম্বা, ব্যর্থ হন দুই ইনিংসেই (১ ও ০)। তারপরও এটিই হবে তাঁর শেষ টেস্ট, এ ছিল লাম্বার মৃত্যুর মতোই অকল্পনীয়।

১৯৮৯-৯০ মৌসুমে পাকিস্তান সফরে গেলেন, এর কদিন আগেই নেহরু কাপে দারুণ খেলেছেন, ৩টি হাফ সেঞ্চুরি করে ওপেনিংয়ে শ্রীকান্তের যোগ্য সঙ্গী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন নিজেকে। পাকিস্তান সফরে করাচিতে প্রথম টেস্টে খেলবেন জেনে রাতে ঘুমুতে গেলেন লাম্বা। সকালে তাঁর পায়ের পাতায় সমস্যা বোধ করলেন, বাধ্য হয়েই সরিয়ে নিলেন নিজেকে। তাঁর জায়গায় সুযোগ পেলেন ফর্মহীন আজহারউদ্দিন, বাকিটুকু এখন ইতিহাস! ইতিহাস গড়ার দিকে এগিয়ে গেলেন আজহার আর লাম্বা নিজেই হয়ে গেলেন ইতিহাস। সে সফরেই লাহোরে খেলা সিরিজের শেষ ওয়ানডেটিই হয়ে রইল তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। লাম্বা ইনজুরির ভার করেছেন–এই সন্দেহে তাঁর বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন নেওয়া হয়েছিল বলে শোনা গিয়েছিল। যদিও ঢাকায় এ কথা জিজ্ঞেস করায় লাম্বা খুবই সরল এক প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমিই বলো, এক বছর পর টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়ে আমি তা ছাড়ব কেন?’

হাসপাতাল থেকে রমন লাম্বার কফিন নিয়ে আসা হচ্ছে আবাহনী ক্লাবে। নিয়ে আসছেন আবাহনীর খেলোয়াড়-কর্মকর্তারাই। পেছনে মানুষের ঢল

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বন্ধ দরজা খুলবে খুলবে করেও আর খোলেনি। অনেক ক্রিকেটার এই অবস্থায় খেলাই ছেড়ে দেয়। কিন্তু রমন লাম্বার কাছে ক্রিকেট ছাড়া জীবনের কোনো অর্থ ছিল না। সে কারণেই খেলে গেছেন রঞ্জি ট্রফির অনুপ্রেরণাহীন পরিবেশে, রান করে গেছেন ক্লান্তিহীনভাবে। গত মৌসুমেই রঞ্জি ট্রফিতে সর্বোচ্চ ১০৩৪ রান করেছেন ৭৪.০০ গড়ে, দিল্লির চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে রঞ্জি ট্রফির এক ম্যাচে করেছেন দুটি সেঞ্চুরি। ’৯৪-'৯৫ মৌসুমে দিল্লির অধিনায়ক হিসেবে খেলেছিলেন ৩১২ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস। ভারতীয় দলে তাঁর সুযোগ করে দেওয়াতেও বড় ভূমিকা ছিল একটি ট্রিপল সেঞ্চুরির। ’৮৬-'৮৭ মৌসুমে জোনভিত্তিক দিলীপ ট্রফির ইতিহাসে প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরিটি এসেছিল রমন লাম্বার ব্যাট থেকেই।

কাল রাত সোয়া ৯টায় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিমানে উঠেছেন যে রমন লাম্বা; তাঁর এসবে আর কিছুই আসে যায় না। ক্রিকেট, রান, অ্যাভারেজের কোনো অর্থ নেই তাঁর কাছে। তারপরও তাঁর প্রথম ও শেষ পরিচয় একটাই–ক্রিকেটার। ক্রিকেটের সঙ্গে কত বছরের সম্পর্ক তাঁর! সেই ছোট্টটি থাকতে দুপুরে নিদ্রাতুর বাবা-মার দৃষ্টি এড়িয়ে নেমে পড়তেন মাঠে, দুচোখে একটাই স্বপ্ন–শুধু ক্রিকেট আর ক্রিকেট। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল সেই বন্ধন। ‘ক্রিকেট আমার পেশা তো বটেই, তবে তার চেয়েও বেশি নেশা’–একথা কতবারই না শুনেছি লাম্বার মুখে।

আবাহনী ক্লাবে রমন লাম্বার কফিনের সামনে শোকাতুর সতীর্থ-সমর্থকেরা

‘নেশা’ বলেই ৩৮ বছর বয়সেও খেলে যাচ্ছিলেন দোর্দণ্ড প্রতাপে। দিল্লি দলের খেলোয়াড় তালিকায় ‘রমন লাম্বা’ নামটি স্থায়ী হয়ে ছিল যেন যুগ যুগ ধরে। দিল্লিতে একটা কৌতুকও তো চালু ছিল, ফিরোজ শাহ যখন কোটলা (টেস্ট ভেন্যু ফিরোজ শাহ কোটলা) নির্মাণ করেন, তখন নাকি সেখানে উপস্থিত ছিলেন রমন লাম্বা! ক্রিকেট তাঁর কাছে এমন অদম্য নেশা ছিল বলেই এই ৩৮ বছর বয়সেও অনেক তরুণ খেলোয়াড়ের জন্যও ঈর্ষণীয় ছিল রমন লম্বার ফিটনেস। খেলার জন্য ভারত থেকে আয়ারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড থেকে বাংলাদেশ এই যে ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি, সেটা শুধুই টাকার জন্য নয়, বড় একটি কারণ ছিল এই নেশা।

কে জানত, বিশ্বের সবচেয়ে নির্দোষ এই নেশাই এমন প্রাণঘাতী রূপ নেবে!

 ্‌আরও পড়ুন: রমন লাম্বাকে কীভাবে ভুলবেন অপি!

                     আবাহনী লাম্বাকে ভুলে গেছে, বেলফাস্টের নর্থডাউন ক্লাব ভোলেনি