চার্লস ব্যানারম্যানের সঙ্গে তুমুল তর্ক জুড়ে দিয়েছেন ডব্লিউ জি গ্রেস। অভিযোগ দুটি। এক. তিনি নিজে এলবিডব্লিউ ছিলেন না। ট্রাম্বলের বলটা এমন টার্ন করেছিল যে নির্ঘাত লেগ স্টাম্প মিস করত। দুই. অ্যালেক ব্যানারম্যান প্লাম্ব এলবিডব্লিউ ছিলেন। ছোট ভাইয়ের প্রতি পক্ষপাত করে চার্লস আউট দেননি।

ম্যাচ শেষে এমন কিছুর জন্য প্রস্তুতই ছিলেন চার্লস ব্যানারম্যান। ইংল্যান্ড হেরে গেলে ডব্লিউ জি যে ওই দুটি ডিসিশন নিয়ে চারপাশ সচকিত করে তুলবেন, এটা তাঁর জানাই ছিল। কী বলবেন, সেটাও তাই ভেবে রেখেছিলেন। 'দেখো ডক্টর, আম্পায়ারিংয়ের কোটটা গায়ে দেওয়ার পর কে আমার ভাই, আর কে শত্রু—এসব আমার মাথায় থাকে না। টেস্ট আম্পায়ার হিসেবে আমার প্রথম সিরিজ কোনটা, জানো তো? ১৮৮৭ সালের অ্যাশেজ। অ্যালেক তো তখনো ইংল্যান্ড দলে। সব সময় মাথায় রেখেছি, কেউ যেন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলতে না পারে। আমি আম্পায়ার ছিলাম, এমন যে দুটি টেস্টে অ্যালেক খেলেছে, তাতে একদমই ভালো করেনি। অ্যালেক শুনে মন খারাপ করতে পারে, তবে ও তাড়াতাড়ি আউট হয়ে যাওয়ায় আমি স্বস্তিই পেয়েছিলাম। যাক, ইংল্যান্ড আর কোনো অভিযোগ তুলতে পারবে না।'

সবাই জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে। অ্যালেক ব্যানারম্যান তখনো প্যাড খোলেননি। লোম্যান তাঁর কাঁধে হাত রেখে দুষ্টুমির সুরে বললেন, 'আমিই ওকে রান করতে দিইনি। প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ফেরালাম ৪ রানে। দ্বিতীয় টেস্টের দুই ইনিংসেই ২ রানে। প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসেও আউট করতাম। চার্লস, যত যা-ই বলো, তুমি একটা এলবিডব্লিউ দাওনি বলেই ও ১৫ রানে নটআউট থাকতে পেরেছিল।'

ডব্লিউ জি কিন্তু গজগজ করেই চলেছেন। এবার তাঁর রাগ গিয়ে পড়েছে অ্যালেক ব্যানারম্যানের ওপর। সেটিও শুনতে হচ্ছে চার্লস ব্যানারম্যানকেই, 'কথায় বলে না, স্বভাব যায় না মলে। তোমার ভাই সেটা আজ আবার প্রমাণ করল। একটা চিজ বটে। উইকেটের সঙ্গে যেন পেরেক দিয়ে আটকে রাখে নিজেকে।'

অ্যালেক ব্যানারম্যানের এই 'গুণ' বা 'দোষের' কথা সবারই জানা। ক্রিকেটের আদি যুগে সব দলেই রান-টানের মতো তুচ্ছ বিষয়কে পাত্তা না দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উইকেটে কাটিয়ে দেওয়ার বিস্ময়কর ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটসম্যান ছিলেন, যাদের বলা হতো 'স্টোনওয়ালার'। অ্যালেক ব্যানারম্যান ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান 'স্টোনওয়ালার' প্রজাতির সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতিনিধি। রান করায় অনাগ্রহের দিক থেকে টেস্ট ইতিহাসেই সবার শীর্ষে নাম।

অস্ট্রেলিয়ার প্রথম টেস্ট দল। চার্লস ও অ্যালেক ব্যানারম্যান, পেছনের সারির ডান থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয়। ছবি: উইকিমিডিয়া

ডব্লিউ জি গ্রেসের মেজাজ ঠান্ডা করার কৌশলটা সবচেয়ে ভালো জানেন আলফ্রেড শ। হঠাৎই স্বর্গের ম্যাচে পৃথিবীকে টেনে নিয়ে এলেন তিনি, 'অ্যালেকের জন্য অবশ্য আমার একটু দুঃখই হয়। বেচারা একটা টেস্ট সেঞ্চুরির দেখা পেল না। অভিষেকেই কিন্তু ও ৭৩ করেছিল। অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে সর্বোচ্চ ছিল ওটাই। চার্লস, তোমরা দুই ভাই তো একসঙ্গে ওই একটি টেস্টই খেলেছ, তাই না? ও আর ২৭টি রান করতে পারলে তোমাদের দুই ভাইয়েরই টেস্ট অভিষেকে সেঞ্চুরি হয়ে যেত। ভাইদের এই কীর্তি তো এখনো নেই।'

শর কৌশলে কাজ হলো। ভাই প্রসঙ্গ আসায় ডব্লিউ জি গ্রেস একটু আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। এডওয়ার্ড আর ফ্রেডের কথা মনে পড়ে গেল। ১৮৮০ সালে ওভালে তিন ভাইয়ের একই সঙ্গে টেস্ট অভিষেক, বড় ভাই এডওয়ার্ডের সঙ্গেই ওপেন করতে নেমেছিলেন। ছোট ভাই ফ্রেড়ের কথা ভেবেই বেশি খারাপ লাগে। সেটি একমাত্র টেস্টে 'পেয়ার' পেয়েছিল বলে নয়। ওই টেস্ট খেলার দিন পনেরো পরেই একটা ক্লাব ম্যাচে খেলার সময় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে আসতে হয় ওকে। খবরটা পেয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে গিয়েছিলেন ডব্লিউ জি।

ডব্লিউ জির চোখ-মুখ নরম দেখে একটু রসিকতা করার সাহস পেলেন চার্লস ব্যানারম্যান। 'কী ডক্টর, অ্যালেকের ওপর তোমার পুরোনো রাগ, তাই না? পৃথিবীতে অনেক জ্বালিয়েছে তোমাকে। তা ওর কী দোষ বলো। তোমার বোলাররা ওকে আউট করতে পারেনি, এটাকে কি ওর দোষ বলবে?'

ব্যানারম্যানকে স্বস্তি দিয়ে ডব্লিউ জি হাসলেন। ফিল্ডিং দলের ক্যাপ্টেনের জন্য অ্যালেকটা আসলেই একটা যন্ত্রণা ছিল।

সেই যন্ত্রণার সঙ্গে ভালোই পরিচয় হয়েছে ডব্লিউ জির। অ্যালেকের উইকেটে পড়ে থাকার সবচেয়ে বিখ্যাত 'কীর্তি' ১৮৯২ সালের যে সিডনি টেস্টে—যেখানে সাড়ে সাত ঘণ্টা ব্যাট করে তাঁর ৯১–সেই ম্যাচে ডব্লিউ জি ছিলেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক। ওই টেস্টের তিন দিনই উইকেটে ছিল অ্যালেক, ঘণ্টায় রান করার হার ছিল ১২। ওই 'ছ্যাচড়' ইনিংস দেখে তিতিবিরক্ত দর্শকেরা অ্যালেককে নিয়ে যে কবিতা বানিয়েছিল, সেটি এখনো মনে থাকার কারণ বোধ হয় এটাই।

দুই দলের খেলোয়াড়দের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন ডন ব্র্যাডম্যান। তাঁকে দেখে ডব্লিউ জি বললেন, 'এই যে ডন, তুমি টেস্টে এক দিনে ৩০৯ রান করেছিলে না? অ্যালেক ট্রিপল সেঞ্চুরি করলে ওর বোধ হয় এক সপ্তাহ লাগত! আমাদের অনেককে নিয়েই তো অনেক কবিতা লেখা হয়েছে। ওকে নিয়ে লেখা কবিতাটা তোমাকে শোনাই। অনেক মজা পাবে।'

ডব্লিউ জি হাত নাড়িয়ে চোখমুখ নাচিয়ে এমন নাটকীয়ভাবে আবৃত্তি করতে শুরু করলেন যে সবাই হেসেই খুন,

O Bannerman, O Bannerman,

We wish you'd change your manner,

We pay our humble tanner, man,

To see a bit of fun. You're a beggar though to stick it,

But it ain't our sort of cricket;

They haven't hit your wicket.

Yet, you haven't got a run.

                                                                                                       ************

তুমুল হাসির মধ্যে হঠাৎই ছিপছিপে এক শ্যামবর্ণ তরুণ জটলাটার পাশে এসে দাঁড়াল। ছেলেটাকে এর আগেও কয়েকবার দেখেছেন ডব্লিউ জি। খুব বেশি দিন হয়নি এখানে এসেছে। খুব প্রাণচঞ্চল। মুখে সব সময়ই হাসি লেগে থাকে। রোডসেরও মনে পড়ল, একদিন ওকে পেছনের মাঠটায় বাঁহাতি স্পিন করতে দেখেছেন। বোলিংয়ে ফ্লাইট-টাইটের কারবার নেই দেখে একটু বিরক্তও হয়েছেন। আরে, স্পিন বোলিংয়ের আসল কথাই তো হাওয়ায় বল নিয়ে খেলা। পরক্ষণেই অবশ্য তাঁর মনে পড়েছে, ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টির যুগে এসব কথার বোধ হয় আর ভাত নেই। তা ছেলেটা এখানে কী চায়?

বল হাতে মানজারুল ইসলাম রানা, তখনো তিনি কল্পলোকের বাসিন্দা নন। ছবি: এএফপি

প্রশ্নটা করতে হলো না।

হাত কচলাতে কচলাতে নিজেই বলল, 'কিছু মনে করবেন না, প্লিজ; বেশ কিছুদিন ধরেই আমি আড়াল থেকে আপনাদের কথাবার্তা শুনছিলাম। খুব ভালো লেগেছে। অনেক কিছু জানতে পেরেছি। আপনারা সবাই অনেক বড় ক্রিকেটার ছিলেন, অনেক রেকর্ড করেছেন। কিন্তু আমারও যে একটা রেকর্ড আছে, এটা কি জানেন? হবস স্যারের ১৯৭টি ফার্স্ট ক্লাস সেঞ্চুরি বা ডন স্যারের ৯৯.৯৪ ব্যাটিং গড়ের মতো এটি ভাঙাও কিন্তু খুব সহজ নয়।'

সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন।

প্রশ্নটা করলেন ডন, 'কী রেকর্ড করেছ তুমি?’

‘আমার চেয়ে কম বয়সে কোনো টেস্ট ক্রিকেটার এখানে আসেনি। মাঠে আমি আপনাদের মতো বড় কিছু করতে পারিনি, কিন্তু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার সময় এই বিশ্ব রেকর্ডটা সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আমি বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটার। আমার নাম মানজারুল ইসলাম রানা।'

টুপটাপ ঝরে পড়ছে গাছের পাতা। কোথায় যেন ডেকে উঠল একটা পাখি। আর কোনো শব্দ নেই। এতক্ষণের মুখর কলরবে হঠাৎই নেমে এসেছে অদ্ভুত এক নৈঃশব্দ্য। অনেকক্ষণ পর সেটি ভেঙে দিয়ে 'ওহ্ মাই বয়' 'ওহ্ মাই বয়' অস্ফুট আওয়াজ।

রানার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বিড়বিড় করছেন ডব্লিউ জি গ্রেস।

(লেখকের 'কল্পলোকে ক্রিকেটের গল্প' বই থেকে)