মেহরাব হোসেন অপির বয়স তখন মোটে বারো। গা থেকে দস্যিপনার খোলসটা খুলে পড়েনি, ক্রিকেটটা ভালো লাগে বলেই খেলেন। ক্রিকেটকে যে পেশা হিসেবেই বেছে নেবেন, এ নিয়েও বোধ হয় দোনামনায় ভুগছেন তখনো। বাংলাদেশ যে ওয়ানডে স্ট্যাটাসই পায়নি! আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সুযোগই মেলে কালেভদ্রে, বার দুই এশিয়া কাপে খেলে সুযোগ হলো ১৯৯০ সালে অস্ট্রেলেশিয়া কাপে খেলার। তাতে প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ হয়ে এসেছিল নিউজিল্যান্ড, অনুমিতভাবেই বাংলাদেশ হেরেছিল ১৬১ রানের বিশাল ব্যবধানে। তবে একটা ব্যক্তিগত অর্জনের আলোয় অবশ্য উদ্ভাসিত হয়েছিল ম্যাচটি, ১২৬ বলে ৫৪ রান করে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের প্রথম হাফ সেঞ্চুরি করেছিলেন আজহার হোসেন সান্টু। সম্পর্কে যিনি মেহরাব হোসেন অপির চাচা।

উৎপলশুভ্রডটকমের ইউটিউব চ্যানেলের নিয়মিত আয়োজন শুভ্র.আলাপে অপিকে আজহার হোসেনের সেই হাফ-সেঞ্চুরিতে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন উৎপল শুভ্র। অপি জানালেন, ম্যাচটা তিনি দেখছিলেন বাবার কোলে বসে , 'তখন কিন্তু আমাদের দেশে ডিশ অ্যান্টেনা ছিল না, হাঁড়ি-পাতিল লাগিয়ে দূরদর্শন দেখা যেত। দূরদর্শনের মাধ্যমে সেই ম্যাচটা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।'

জনশ্রুতি আছে, চাচা হাফ-সেঞ্চুরি করার পরেই দেশের পক্ষে ওয়ানডেতে প্রথম সেঞ্চুরিটা তিনিই করবেন, বাবাকে এমন কথা দিয়েছিলেন অপি। আসলেই কি এমন কিছু বলেছিলেন অপি? আসল গল্পটা খুব এর চেয়েও দারুণ, '(চাচা) যখন হাফ সেঞ্চুরিটি করলেন, আমার বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব আহ্লাদ করে বললেন, "বাবা, তুমিও একদিন জাতীয় দলে খেলবা আর বাংলাদেশের হয়ে প্রথম সেঞ্চুরিটা কিন্তু তুমিই করবা।" আমিও ছেলেমানুষের মতো বলে ফেলেছিলাম, "আচ্ছা, ঠিক আছে।"

বাবার উচ্ছ্বাসে আলোড়িত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতিই বাস্তব রূপ পেয়েছিল নয় বছর পর। বাংলাদেশের হয়ে প্রথম সেঞ্চুরিটি অপিই করবেন, বিধাতাই যেন লিখে রেখেছিলেন এমন চিত্রনাট্য। নইলে অপি সেঞ্চুরি পাবার দিন পাঁচেক আগেই তো শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ পৌঁছে গিয়েছিলেন মাইলফলকের হাতছোঁয়া দূরত্বে। ১৯৯৯ সালের  ত্রিদেশীয় মেরিল ইন্টারন্যাশনাল টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় ম্যাচে ১৪৪ বলে করে ফেলেছিলেন ৯৫, কিন্তু বাঁহাতি স্পিনার মোহাম্মদ শেখের বলটার লাইন মিস করে হয়ে গেলেন এলবিডব্লিউ!

বাংলাদেশের পক্ষে ওয়ানডেতে প্রথম সেঞ্চুরির পর মেহরাব হোসেন অপি। ২৫ মার্চ ১৯৯৯। ছবি: ফিরোজ চৌধুরী

বিদ্যুতের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া সুযোগটা যখন অপির কাছে এলো, তিনি কিন্তু আর ভুল করেননি। একই টুর্নামেন্টে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে সেঞ্চুরি করে অমরত্ব নিশ্চিত করে ফেলেন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে । ইনিংসের আক্রমণাত্মক মেজাজটাও টের পাওয়া যাচ্ছে স্কোরকার্ড দেখে। ১১৬ বলে করেছিলেন ১০১ রান। সেই সময়ের বিবেচনায় বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের জন্য যেটিকে একরকম অকল্পনীয়ই বলতে হবে। অপি বলছেন, সেঞ্চুরিটা করার পর প্রথমে বাবার ছবিটাই ভেসে উঠেছিল তাঁর চোখের সামনে। বাবাকে দেওয়া কথা তিনি রাখতে পেরেছেন, খেলোয়াড়ি জীবনে এটাকেই সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মানেন, এতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

বাবা কিন্তু তখন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে নেই, ঢাকাতেই ছিলেন না তিনি। কর্মসূত্রে অপির বাবা তখন চট্টগ্রামে, খেলা দেখেছিলেন চট্টগ্রাম কাস্টমসের ক্যান্টিনে বসে। নাম না জানা আরও অগুনতি দর্শকের সঙ্গে। বাংলাদেশের যে ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরির দিকে যাচ্ছেন, তাঁর বাবা যে এখানেই বসে আছেন, বাকিদের তা অনুমান করার কথা নয়। সেটি তারা জানলেন অপির সেঞ্চুরি হয়ে যাওয়ার পর। বাবার মুখে শোনা গল্পটাই উৎপল শুভ্র ও শুভ্র.আলাপের দর্শককে শোনালেন অপি, 'সেঞ্চুরি হওয়ার পরে বাবা চিৎকার করে উঠেছিলেন, "আমার ছেলে" বলে। লোকে তখন নাকি বলেছিল, "ধুর মিয়া, চাপা মারার আর জায়গা পান না!" তিনি কাউকে বিশ্বাস করাতে পারেননি যে, আমি তাঁর ছেলে।'

বাংলাদেশের পক্ষে ওয়ানডেতে প্রথম হাফ সেঞ্চুরির ইনিংসটি খেলার সময় অপির চাচা আজহার হোসেন সান্টু (ডানে)। শারজায় ১৯৯০ অস্ট্রেলেশিয়া কাপে ছবিতে তাঁর সঙ্গী জাহিদ রাজ্জাক মাসুম। ছবি: আজহার হোসেন সান্টুর ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে

বাবার সঙ্গে কি ম্যাচশেষে কথা হয়েছিল অপির? কথা হয়েছিল, তবে টুর্নামেন্ট শেষে বাসায় ফেরার পরে। অবশ্য পুরো অর্জনে তিনি এতটাই আচ্ছন্ন ছিলেন তখনো, বার কয়েক 'ধন্যবাদ' উচ্চারণের বাইরে কিছু বলতেই পারেননি অপিকে।

তবে অপির মনে দাগ কেটে আছে তাঁর মাকে দেওয়া বাবার ধন্যবাদটা। 'বাবা আমার মার পেটে চুমু দিয়ে বলেছিল, "কী একটা সোনার ছেলে উপহার দিলে তুমি! অনেক থ্যাংকস তোমাকে।"

ধন্যবাদটা খুব সম্ভবত গোটা দেশের তরফ থেকেই ওই রত্নগর্ভা মায়ের প্রাপ্য।

আরও পড়ুন...
অপির চোখে তাঁর সময়ের অন্য তিন ওপেনার বিদ্যুৎ-জাভেদ-রোকন
রমন লাম্বাকে কীভাবে ভুলবেন অপি!