এমন একটা সময় ছিল, যখন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ বলতেই বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানের চোখের সামনে ভেসে উঠত মুত্তিয়া মুরালিধরনের মুখ। ডেলিভারি দেওয়ার মুহূর্তে দাঁতমুখ খিঁচানো মুরালিধরনের মূর্তি কখনো কখনো হয়তো ঘুমের মধ্যেও দেখা দিত দুঃস্বপ্ন হয়ে। এ নিয়ে সবচেয়ে ক্ল্যাসিক উক্তিটা করেছিলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা।

২০০৭ সালে শ্রীলঙ্কা ট্যুরে একটা টেস্ট ম্যাচে তাঁর আগে শাহাদাতকে ব্যাটিং করতে পাঠানোয় অবাক হয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে জানলাম, মুরালি নামেই প্রায় অজ্ঞান হয়ে যান মাশরাফি। মাশরাফি তা জানিয়ে ছিলেনও খুব মজা করে, ‘মুরালি যখন বোলিং করে, তখন আমার মনে হয়, একসঙ্গে সাত-আটজন বোলার বোলিং করছে। ওর বল আমি কিছুই বুঝি না।‘

মুরালিধরন বহুদিন হলো গত হয়েছেন। তাঁর শূন্যস্থান অনেকটাই পূরণ করে ফেলা রঙ্গনা হেরাথও তা-ই। এবারের সিরিজের শুরু থেকেই তাই একটা ব্যাপারে মোটামুটি সবাই একমত হয়ে গিয়েছিলেন যে, ইতিহাসে এই প্রথম বাংলাদেশের স্পিন অ্যাটাক শ্রীলঙ্কার চেয়ে ভালো। সিরিজের প্রথম টেস্টের পর সেই ধারণা থেকে সরে আসারও কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু কে জানত, বাংলাদেশকে বধিবে যে, গোকূলে বাড়িছে সে।

যে লেগ স্পিনার ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গাকে মনে করা হচ্ছিল শ্রীলঙ্কার স্পিন ভবিষ্যৎ, অবলীলায় তাঁকে বাদ দিয়ে দিয়ে দ্বিতীয় টেস্টে শ্রীলঙ্কান নির্বাচকেরা নামিয়ে দিলেন আনাকোড়া বাঁহাতি স্পিনার প্রাভিন জয়াবিক্রমাকে। বয়স মাত্র ২২, ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলেছেন মাত্র ১০টি। তাঁর সঙ্গে এর আগে মাত্র একটি টেস্ট খেলা রমেশ মেন্ডিসকে জুড়ে দেওয়ার যে সাহসী সিদ্ধান্ত নির্বাচকদের, তাতে ম্যাচ-সেরার পুরস্কারের ট্রফিটা আমার তাঁদের হাতেই তুলে দিতে ইচ্ছা করছে।

জয়াবিক্রমায় পরে আসি। কারণ তাঁকে নিয়ে অনেক কিছু বলার আছে। রমেশ মেন্ডিসটা তাই আগে সেরে নেওয়া ভালো। একমাত্র টেস্টটি খেলেছেন বছরের শুরুতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গলে। তাতে দুই ইনিংসে একটি করে উইকেট। বোলিং দেখেও আহামরি কিছু বলে মনে হয়নি। না হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছুও নয়। শ্রীলঙ্কার ঘরোয়া ক্রিকেটেও তো তাঁর পরিচিতি –লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যান, যে মোটামুটি অফ স্পিন করতে পারে। সেই ‘মোটামুটি’ অফ স্পিন করতে পারা রমেশ মেন্ডিসই দুই ইনিংস মিলিয়ে ৬ উইকেট নিয়ে নিলেন। বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসটা তো ধ্বংস হলো মূলত তাঁর হাতেই। তামিম, মুমিনুল ও মুশফিকুরের আসল তিনটি উইকেটই তাঁর। অফ স্পিনারের স্বপ্নের বলও বেশ কটিই বেরিয়েছে তাঁর হাত থেকে। যার একটিতে তুলে নিয়েছেন সিরিজে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান তামিম ইকবালকে। 

আলফ্ ভ্যালেন্টাইনের সঙ্গী ছিলেন সনি রামাধিন, প্রাভিন জয়াবিক্রমার রমেশ মেন্ডিস। ছবি: এসএলসি

মেন্ডিস পদবীটা শ্রীলঙ্কায় খুব কমন। টেস্ট যুগে প্রবেশের সময় শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যাটসম্যানের নামও ছিল দিলীপ মেন্ডিস। এরপরও অনেক মেন্ডিস এসেছেন। তবে জয়াবিক্রমা এই প্রথম। সন্ধি বিচ্ছেদ করলে তা জয়+বিক্রমই হবে নিশ্চয়ই। দুটির সার্থকতাই কী দারুণভাবেই না প্রমাণ করলেন এই তরুণ! প্রবল বিক্রম দেখিয়ে জয়ঢঙ্কা বাজিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে কী সরব আবির্ভাব!টেস্ট আবির্ভাবে দশম সেরা বোলিং সব ধরনের বোলার মিলিয়ে। শুধু তাঁর প্রজাতিকে আলাদা করে নিলে তিনিই সেরা। এই গত ২৮ এপ্রিল জন্মদিন গেল আলফ্ ভ্যালেন্টাইনের। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেই বিখ্যাত স্পিন টুইনের অর্ধাংশ, যাঁদের নিয়ে রচিত হয়েছে সেই অমর ক্যালিপসো:..দৌস টু লিটল প্যালস অব মাইন, রামাধিন অ্যান্ড ভ্যালেন্টাইন। সেই ভ্যালেন্টাইনকে দ্বিতীয় স্থানে ঠেলে দিয়ে অভিষেকে কোনো বাঁহাতি স্পিনারের সেরা বোলিং এখন প্রাভিন জয়াবিক্রমার।
  
লিখতে লিখতে মনে হলো, অভিষিক্তদের আগুনে পোড়াটাও যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশের। গত ফেব্রুয়ারিতেই তো চট্টগ্রামে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশকে হারিয়ে দিলেন টেস্ট ক্রিকেটে আরেক নবীন কাইল মেয়ার্স। বাংলাদেশ হেরে গেলে খারাপ তো লাগেই। কিন্তু ক্রিকেটের অনেক মাহাত্ম্যের এটাও একটা যে, প্রতিপক্ষ দলের কেউ অসাধারণ কিছু করে ফেললে দেশাত্মবোধকে একটু আড়ালে ঠেলে দিয়ে মন নিজের অজান্তেই হাততালি দিয়ে ফেলে। কাইল মেয়ার্সের অবিশ্বাস্য ওই ডাবল সেঞ্চুরির পরও দিয়েছিলাম। দুষ্টুমি করে কাকে যেন বলেও ছিলাম, ওয়ানডে সিরিজের তাঁর ব্যাটিং দেখে ফেসবুকে আমার দেওয়া পোস্টটাই কি তাহলে মেয়ার্সকে অনুপ্রাণিত করে অমন একটা ইনিংস খেলাল! আহা, তাহলে নিজের অজান্তে বাংলাদেশের কী ক্ষতিটাই না আমি করে ফেলেছি! তা কী ছিল সেই পোস্ট? ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই দলে একমাত্র কাইল মেয়ার্সের ধমনীতেই মনে হয় ক্যারিবীয় রক্ত বইছে। 

কাইল মেয়ার্স হাততালি দিতে বাধ্য করেছিলেন, বাধ্য করেছেন প্রাভিন জয়াবিক্রমাও। স্পিনারকূলে ব্রাহ্মণ হলেন লেগ স্পিনার। ভালো লেগ স্পিন দেখার মতো রোমাঞ্চ ক্রিকেটে আর কিছুতে নেই। রিচি বেনোর মতো লোক পর্যন্ত বলে গেছেন, ক্রিকেটে স্বর্গীয় বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তা হলো ভালো একজন লেগ স্পিনারের সঙ্গে ভালো একজন ব্যাটসম্যানের দ্বৈরথ। রিচি বেনোকে যাঁরা চেনেন, তাঁরা কখনোই এই সন্দেহ করবেন না যে, বেনো নিজে লেগ স্পিনার ছিলেন বলেই এমন বলেছেন। 

বিষেণ সিং বেদির মতো নিয়মকে প্রমাণ করা দুয়েকটা ব্যতিক্রমকে বাদ দিলে বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিন যেখানে সবচেয়ে কম গ্ল্যামারাস। সেই বাঁহাতি স্পিনে প্রতিপক্ষ দেশের একজন সাংবাদিককে হাততালি দিতে বাধ্য করাটা মনে হয় ওই রেকর্ডের চেয়েও কম অর্জন নয়। শুধু বোলিংয়ের ক-খ লাইন-লেংথ দিয়ে তা আদায় করা যায় না। জয়াবিক্রমা তা আদায় করেছেন ফ্লাইট-টার্ন, বয়স এবং অভিজ্ঞতার তুলনায় অনেক পরিণত ক্রিকেট মস্তিষ্কের পরিচয় দিয়ে। সঙ্গে অশ্রীলঙ্কান চনমনে চেহারা আর ওই ভুবনজয়ী হাসির কিছুটা ভূমিকা তো আছেই। 

শ্রীলঙ্কান উৎসবের মধ্যমণি। এমনই পারফরম্যান্স যে, প্রতিপক্ষেরও প্রাভিন জয়াবিক্রমার জন্য হাততালি না দিয়ে উপায় নেই। ছবি: এসএলসি

অন্য দেশের ক্রিকেটারকে নিয়ে এত কাব্য করছি বলে অনেকে রাগ করতে পারেন। আমাদের তো আবার দেশাত্মবোধ খুব প্রবল। আর ক্রিকেট হয়ে গেছে জাতীয়তাবোধ প্রকাশের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। সেই ঝুঁকি নিয়েও না লিখে যে পারছি না! খেলায় নিজের দেশের জয় কে না চায়! কিন্তু দারুণ কোনো পারফরম্যান্স দেখলে সেই জিগীষাকে হারিয়ে খেলাটাও কি কখনো কখনো জিতে যায় না! 

তখনই যায়, যখন আপনি খেলাটার শুধু উপরিতলের দর্শক নন। নিজেকে খুব ক্রিকেটবোদ্ধা বলে প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে এটা লিখছি না। ক্রিকেটের অনেক সৌন্দর্যের মধ্যে এটাও একটা যে, মাঠে আপনি প্রাণপণ লড়বেন, অমঙ্গল কামনা করবেন প্রতিপক্ষের, কিন্তু আপনার সেই চেষ্টা, সেই কামনা বিফল করে দিয়ে কাউকে দারুণ কিছু করে ফেলতে দেখলে আপনি প্রতিপক্ষকেও বাহবা দেবেন। লেখার টানে অন্য দিকে চলে গিয়ে প্রসঙ্গটা যখন চলেই এলো, আরেকটা কথাও বলে ফেলি। বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে আমার অনেক স্বপ্নের মধ্যে এমন একটা দৃশ্য দেখার স্বপ্নও কিন্তু আছে–দারুণ ব্যাটিং করতে থাকা কোনো ব্যাটসম্যান যেন আউট হয়ে যান, মিরপুরের গ্যালারি কায়মনোবাক্যে এই কামনা করছে। সেটিকে নিস্ফল প্রমাণ করে সেই ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করে ফেলার পর সেই গ্যালারিই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে।

অন্য স্বপ্নগুলো পূরণ হলেও হতে পারে। তবে ক্রিকেট নিয়ে চারপাশে যে জঙ্গিপনা দেখি, তাতে ইহজন্মে এই স্বপ্ন পূরণ হবে বলে খুব একটা আশাবাদী নই।