শ্রীলঙ্কা: ২৯৩ ও ৪০৫/৬ ডি.। বাংলাদেশ: ১৭৮ ও ৪১৩। ফল: শ্রীলঙ্কা ১০৭ রানে জয়ী

দোষটা মাহেলা জয়াবর্ধনের!

চতুর্থ ইনিংসে যে দলের সর্বোচ্চ স্কোর ২৮৫, সর্বশেষ ১৩ টেস্টে ৩০০ ছোঁয়া কোনো ইনিংস পর্যন্ত নেই, সেই বাংলাদেশের বিপক্ষে এত সাবধানী হওয়ার কী আছে! ৪০৬ রানের লিডকেই যথেষ্ট মনে করে চতুর্থ দিন সকালেই জয়াবর্ধনের ইনিংস ঘোষণা করে দেওয়া উচিত ছিল। নাহ্, মুখে যা-ই বলুন, আসলে বড় রক্ষণাত্মক অধিনায়ক!

জয়াবর্ধনে শুনে হাসেন, ‘আরে, আমি নিজে ব্যাটিং করে বুঝেছি উইকেট খুব ভালো।’

ভালো হলেই বা কী! বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা এর চেয়েও ভালো উইকেটে ব্যাট করেও প্রথম ইনিংসেই বা কবার ৪০০ করেছে! শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তো একবারও নয়। জয়াবর্ধনে ‘অহেতুক’ এত সাবধানী ছিলেন! 

এতক্ষণে আপনিও জেনে গেছেন, জয়াবর্ধনের ওই ‘অহেতুক’ সতর্কতার কারণেই বাংলাদেশ ইতিহাস গড়তে পারল না! কে বলল, পারেনি? কাল মিরপুর স্টেডিয়াম অবিশ্বাসে চোখ কচলে যা দেখল, সেটিও কি নতুন ইতিহাস নয়!
৫২১ রানের অসম্ভব এক লক্ষ্যকে তাড়া করতে নেমে আশরাফুল-সাকিব-মুশফিকুররা শ্রীলঙ্কানদের যে থরহরিকম্প দশা করে দিয়েছিলেন, সেটি যদি কেউ আগাম অনুমান করতে পেরেছিলেন বলে দাবি করেন, তা হলে তিনি নস্ট্রাডামুসের বাবা!

মানুষ স্বপ্ন দেখে। কিন্তু এটি যে বাস্তবতাবিবর্জিত স্বপ্ন। অথচ পঞ্চম দিনের অর্ধেকেরও বেশি সময় ধরে ক্রিকেটীয় যুক্তিকে ছাপিয়ে বারবার হাতছানি দিল সেই স্বপ্নটাই—কেন হবে না? সম্ভব, খুবই সম্ভব।

যেটিকে ‘সম্ভব’ বলে মনে হচ্ছিল, ১৩১ বছরের টেস্ট ইতিহাসে কোনো দল তা করতে পারেনি। করা সম্ভব বলেও কি ভেবেছে কখনো! অথচ ধাম্মিকা প্রসাদের অফ স্টাম্পের বাইরের বলটি সাকিব আল হাসান স্টাম্পে টেনে আনার আগ পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, রহস্যময় এই পৃথিবীতে অলৌকিক কত কিছুই তো হয়। আজও হয়ে যেতে পারে। 

সাকিব যখন ইনিংসের ১২১তম ওভারের দ্বিতীয় বলটির অপেক্ষায়, জয়ের বন্দর তখনো অনেক দূরে। তবে আবছাভাবে হলেও অবশ্যই দৃশ্যমান। প্রয়োজন আরও ১০৯। অনেক রান! কিন্তু সাকিব-মুশফিকুরের ব্যাটিং তা মনে করতে দিচ্ছিল কই! মাঠে শ্রীলঙ্কানদের ঘন ঘন মিনি কনফারেন্স হচ্ছে, দাঁতের কামড়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে জয়াবর্ধনের নখ, ইনিংসে প্রথমবারের মতো উইকেট নেওয়ার প্রতিজ্ঞার সঙ্গে যোগ হয়েছে রান বাঁচানোর চেষ্টাও। তখনই সাকিব আউট! 

প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি থেকে মাত্র একটি বাউন্ডারির দূরত্বে। বিশ্বাসঘাতক ব্যাটটির দিকে অনুযোগভরে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন সাকিব। শুধু কি সেঞ্চুরি না পাওয়ার দুঃখে! অসম্ভব এক স্বপ্নের মৃত্যুশোক কি তার চেয়েও বড় নয়! 

৯৬ রানে সাকিবের আউট হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশকে হাতছানি দিচ্ছিল অলৌকিক কিছুর সম্ভাবনা। ছবি: এএফপি

এই উইকেটটি শুধুই আরেকটি টেস্ট উইকেট নয়—আকর্ণবিস্তৃত হাসিমুখে ধাম্মিকা প্রসাদ তাই দৌড়ে বেড়াতে শুরু করলেন মাঠময়। পেছনে শ্রীলঙ্কার বাকি খেলোয়াড়েরা। ঘাম দিয়ে যে তাদের জ্বর ছেড়েছে! আর ১০ রানের মধ্যেই শেষ ৩ উইকেট হারিয়ে শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশের ইনিংস। সকলই ফুরাল স্বপন প্রায়...

আসলেই কি তাই! বাংলাদেশের এই ৪১৩ কি ফুরিয়ে যাওয়ার মতো! বরং আরও অনেক অনেক দিন বাংলাদেশ গর্বভরে ফিরে তাকাবে এই ইনিংসটির দিকে। বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা নিয়ে নিয়মিত প্রশ্ন তোলা সমালোচকরাও তাকাবে এবং একটু আমতা-আমতা করবে। 

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ রান—তবে এই পরিসংখ্যান তো শুধুই বাংলাদেশের সীমানায় বন্দী। মাহাত্ম্যটা পুরো বুঝতে আপনাকে তাকাতে হবে টেস্ট ইতিহাসের দিকে। যেখানে দেখবেন, টেস্ট ক্রিকেটে এর চেয়ে বড় চতুর্থ ইনিংস আছে মাত্র ১০টি। ম্যাচের শেষ ইনিংসে এত রান করেও কোনো দলকে পরাজয়ের দুঃখে পুড়তে হয়েছে মাত্র পাঁচবার। 

সাকিব-মুশফিকুরের ১১১ রানের জুটিতে স্বপ্নের সলতেটি আলো ছড়িয়েছে, তবে তা জ্বালানোর কৃতিত্ব মোহাম্মদ আশরাফুলের। দলের দাবি তো ছিলই, তার চেয়ে বড় ছিল তাঁর নিজের কাছে নিজের দাবি। ওয়ানডেতে মাঝেমধ্যে রান পেলেও টেস্ট ম্যাচে ব্যাটিং যেন দুর্বোধ্য এক ধাঁধা হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে। ম্যাচের পর ম্যাচে মাথা নিচু করে ফিরে আসা আশরাফুল বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের প্রতীক থেকে হয়ে গিয়েছিলেন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের পাত্র। টেস্টে পঞ্চম সেঞ্চুরিটি এল তাই মুক্তির আনন্দ হয়ে। চামিন্ডা ভাসকে মিড অফের ওপর দিয়ে এক বাউন্সে চার মেরে সেঞ্চুরির পর বেরিয়ে এল এত দিনের জমে থাকা দুঃখ-হতাশা-অসহায়ত্ব...। শোনাল রণহুঙ্কারের মতো। আসলে যা বুক থেকে পাথর নেমে যাওয়ার স্বস্তি।

দীর্ঘদিনের রানখরা কাটানো মোহাম্মদ আশরাফুলের দারুণ এক সেঞ্চুরিই শুরু করে দিয়েছিল স্বপ্নযাত্রার। ছবি: শা. হ. টেংকু

দিনের শুরুতে ৭০ রানে অপরাজিত। বাকি ৩০ রান করতে লাগল মাত্র ২৯ বল, যাতে ৫টি চার। আউট হলেন ভাসের পরের ওভারে। লেগ স্টাম্পের লাইনে পড়া বলটি হয়তো স্টাম্পেই লাগত। তবে ‘হয়তো’ শব্দটিতেই সুপ্ত হয়ে আছে আক্ষেপটা—আহা, বাকনর তো আঙুলটা না তুললেও পারতেন!

আশরাফুলকে যিনি ‘মাই সান’ বলে ডাকেন, সেই বাকনর ঠিকই আঙুল তুললেন। ‘নিয়ম’মতো এরপর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার কথা। কিন্তু সাকিব আর মুশফিকুর নিয়মের বাইরে গিয়ে বুঝিয়ে দিতে শুরু করলেন, ৭-৮ নম্বরে ব্যাট করার মতো ব্যাটসম্যান তাঁরা নন। এত দিন যাঁর হাতে বল দেখলেই বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের যমদূত দেখা হয়ে যেত, সেই মুরালিধরনকেও মনে হলো রক্তমাংসের মানুষ! যথারীতি ম্যাচে ১০ উইকেট। তবে প্রথম ইনিংসে যার ৪৯ রানে ৬ উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেট পেতে তাঁকেই খরচ করতে হলো ১৪১ রান! মুরালি এরপরও উইকেট নেবেন, তবে মুরালিকে দেখেই বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কাঁপাকাঁপিটা হয়তো বন্ধ হবে এবার। এটিও বড় অর্জন। তবে ‘ব্যতিক্রমী’ হয়ে এই টেস্ট থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন বোধ হয়, বিজিত দল হয়েও জয়ী দলের চেয়ে বেশি বাহবা পাওয়া। 

ম্যাচে যথারীতি ১০ উইকেট নিয়েছিলেন মুরালিধরন। তবে প্রথম ইনিংসে যেখানে ৪৯ রানে ৬ উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসের ৪ উইকেটের জন্য খরচ করতে হয়েছিল ১৪১ রান!! ছবি: এএফপি

প্রাপ্তির খাতায় যোগ হলো বছরটা ভালোভাবে শেষ করতে পারার তৃপ্তিও। সেটি আরও মধুর হয়ে উঠছে আগের বছরের শেষ দিনটির সঙ্গে তুলনায়। কুইন্সটাউন ওয়ানডেতে ৯৩ রানে অলআউট হওয়ার পর ৬ ওভারেই নিউজিল্যান্ডের তা টপকে যাওয়া—২০০৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর লজ্জায় অধোবদন করে দিয়েছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরও পরাজয়ই। তার পরও আশরাফুল হাসতে পারছেন, ‘আমরাও যে পারি, ক্রিকেট বিশ্বকে তা বোঝাতে পেরেছি।’ 

পরাজয়কে উপহার ভাবতে কেমন লাগে! তার পরও পরাজয়ের কথা ভুলে গিয়ে এই ৪১৩-কে যে নববর্ষের উপহার ভাবতেই ইচ্ছে করছে! 

হ্যাপি নিউ ইয়ার মোহাম্মদ আশরাফুল! হ্যাপি নিউ ইয়ার বাংলাদেশ!