সেই আদ্যিকালে বেঁধে দেওয়া চিত্রনাট্যই আবার মঞ্চস্থ হলো পাল্লেকেলেতে। শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং চলাকালীন ব্যাটিং-স্বর্গ মনে হওয়া উইকেট ভোল পাল্টে ফেলল বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে নামতেই। যে উইকেটে ৭ উইকেটে ৪৯৩ করে প্রতিপক্ষ ঘোষণা করল প্রথম ইনিংস, সেখানে বাংলাদেশ টিকতে পারল না এক দিনও। শেষ বিকেলে ১৭ রানে প্রতিপক্ষের ২ উইকেট তুলে নিয়েও অস্বস্তির বিষবাষ্প উড়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশ শিবিরে। কারণ, প্রথম ইনিংসে ২৫১ রানে অলআউট হয়ে শ্রীলঙ্কার চাইতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই পিছিয়ে পড়েছে ২৫৯ রানে।

এই ব্যাটিং ব্যর্থতার পুরো দায়টাই কি উইকেটের? হঠাৎ করেই কি তা চরিত্র বদলে ফেলল? প্রথম দুই দিনের খেলা দেখে ড্রকেই যেখানে মনে হচ্ছিল টেস্টের ভবিতব্য, সেখানে তৃতীয় দিনে এসে পরাজয়ের কালো ছায়া কেন-ই বা গ্রাস করল বাংলাদেশকে? এসব প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করতেই উৎপলশুভ্রডটকম-এর ইউটিউব চ্যানেলে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা সিরিজ উপলক্ষে নিয়মিত আয়োজন শুভ্র.আলাপে আজ অতিথি হয়ে এসেছিলেন ক্রিকেট কোচ ও বিশ্লেষক নাজমূল আবেদীন ফাহিম।

অনেকেরই অজানা তাঁর আরেকটা পরিচয়ও জানা গেল এই অনুষ্ঠানের সৌজন্যেই। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কিউরেটর হিসেবে প্রায় চার বছর কাজ করেছেন ফাহিম।

সেই অভিজ্ঞতা থেকেই উইকেট বানানোর প্রক্রিয়া এবং সেটির আচরণের কার্যকারণের চমৎকার ব্যাখ্যা করলেন। এই টেস্টের উইকেট সম্পর্কে বললেন, শুরুর দিন থেকেই তিনি ধারণা করছিলেন, উইকেট কিছুটা টার্ন করবেই; তবে তার মাত্রা যে এমন হবে, এতটা তিনি একদমই ভাবেননি। কেন এমন হলো, তার সম্ভাব্য কারণটাও বললেন। দ্বিতীয় টেস্টের উইকেটের ঘাস ছেঁটে ফেলার কারণেই উইকেটের মাটি সরাসরি রোদ পেয়েছে বেশি, তাই শুকিয়েও গেছে তাড়াতাড়ি। উইকেটের আর্দ্রতা প্রথম দু'দিনে যা-ও কিছুটা ছিল, তৃতীয় দিনে তা বলতে গেলে একদমই উধাও। সঙ্গে বোলারদের ফুটমার্ক মিলে-টিলে তৃতীয় দিনের শেষ দুই সেশনে উইকেটে এমন টার্ন আর বাউন্স।

কিন্তু এই টার্ন আর বাউন্স কেবল শ্রীলঙ্কান স্পিনারদের বলগুলোতেই দেখা গেল কেন? তৃতীয় দিনের শুরুতেও যে মিনিট পনের বোলিং করেছে বাংলাদেশ, তখনও তো উইকেটে যে এমন ঘূর্ণিফাঁদ লুকিয়ে আছে, তার পূর্বাভাস মেলেনি। এরই মধ্যে এক দর্শক জিজ্ঞাসা করে বসলেন, শ্রীলঙ্কান স্পিনারদের বলের গতি কমিয়ে দেওয়াটাই টার্ন আর বাউন্স আদায়ের মূল কারণ কি না!

নাজমূল আবেদীন ফাহিম 'হ্যাঁ' সূচক উত্তরই দিলেন। বাংলাদেশি স্পিনারদের স্পিন করানোর সক্ষমতা নিয়ে আগেই প্রশ্ন তোলা ফাহিম এবারে উত্তরটা দিলেন আরও বিস্তারিত। বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে ব্যাটসম্যানদের নিয়ে খেলার প্রবণতার অভাব দেখছেন তিনি, 'স্পিন বোলিং মানেই কিন্তু ব্যাটসম্যানকে একটু টিজ করা, ধোঁকা দেওয়া, ব্যাটসম্যানের মনের মধ্যে কনফিউশন তৈরির চেষ্টা করা। একটু স্লো করলাম, একটু ফ্লাইট দিলাম, বলটা গ্রিপ করে টার্নটা একটু বেশি হলো, বাউন্সটা বেশি হলো। কোনোটা বা কম হলো, ফ্ল্যাট বল চলে গেল। কিন্তু আমরা মনে করি, গুড লেংথে বল করা মানেই ভালো।'

উৎপল শুভ্র বাংলাদেশের স্পিনারদের বোলিংয়ে ফ্লাইটের খেলা দেখতে না পাওয়ার আক্ষেপ করে জানতে চাইলেন, ওয়ানডেতে রান আটকানো বোলিং বেশি করতে করতেই এই অবস্থা কি না। ফাহিম একমত তো বটেই, কারণ হিসেবে সামনে টানলেন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগকেও। স্পিনের যে মৌলিক কারুকাজ, ফ্লাইট দেওয়া, লুপ দেওয়া; এসবকে নিরুৎসাহিত করে ডিপিএলে তো বলা হয়, 'উইকেট পাও বা না পাও, রান আটকানো চাই কিন্তু'। বোলাররাও তাই বাধ্য হয়ে গতির বৈচিত্র‍্যে ব্যাটসম্যানদের বিভ্রান্ত করার বদলে মন দেন জোরে বল করার ওপর। এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গিয়ে হাহাকার করেন পছন্দসই পিচের আশায়।

প্রাভিন জয়াবিক্রমা, অভিষেক টেস্টেই বল করেছেন অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ প্রবীণের মতো। ছবি: এসএলসি

এ আলোচনায় উৎপল শুভ্রর মনে পড়ে গেল বিষেন সিং বেদির কথা। ফ্লাইটের কারিকুরি, গতির হেরফেরে ব্যাটসম্যানদের বিভ্রান্ত করার কাজটা তাঁর চেয়ে ভালো করে কোনো বাঁহাতি স্পিনার করেছেন বলে তো ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। এক এনামুল হক জুনিয়র কিংবা সাকিব আল হাসানের দু'একটা বল ছাড়া বাংলাদেশি স্পিনাররা এমন মনে রাখার মতো বল কয়টা করেছেন, এটা যেমন মনেই করতে পারলেন না শুভ্র।

অথচ এই দর্শনদারি বোলিংটা করলেন শ্রীলঙ্কান দুই নবীন স্পিনার। রমেশ মেন্ডিস আর প্রাভিন জয়াবিক্রমার বোলিং দেখে কে বলবে, একজনের এটি অভিষেক টেস্ট, আরেকজনের দ্বিতীয়! জয়াবিক্রমা তো ৬-৯২ বোলিং ফিগারে গড়ে ফেলেছেন অভিষেকে সেরা বোলিংয়ের শ্রীলঙ্কান রেকর্ড। নতুন স্পিনারদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে নামিয়ে দিতে শ্রীলঙ্কার নির্বাচকরা ভয় পাননি বলে নির্বাচকদের প্রশংসা দরাজ গলায় করলেন দুজনই।

চেহারা-ছবি, হাসি, বোলিং সবকিছু মিলিয়েই উৎপল শুভ্র রীতিমতো মুগ্ধ প্রাভিন জয়াবিক্রমার বোলিংয়ে। পক্ষপাতদুষ্ট সমর্থকের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে তিনি এমনও বললেন, এই সিরিজে এই প্রথম ক্রিকেটের আসল মজা ব্যাট-বলের একটা লড়াই দেখা গেল। যদিও সেই লড়াইয়ের বলই বিপুল ব্যবধানে জয়ী। সিরিজের শুরু থেকেই শুভ্র.আলাপে সবাই যে এক সুরে বলে যাচ্ছিলেন, বাংলাদেশের স্পিন অ্যাটাক শ্রীলঙ্কার চেয়ে ভালো, সেই ধারণাতেও বড় একটা ধাক্কা লেগেছে বলে মেনে নিলেন শুভ্র ও ফাহিম দুজনই। 

রমেশ মেন্ডিসও মনে রাখার মতো কিছু ডেলিভারি দিয়েছেন। তবে নায়ক তো সন্দেহাতীতভাবে প্রাভিন জয়াবিক্রমাই, যাঁর বোলিং খুব মনে ধরেছে ফাহিমেরও। প্রথম টেস্ট খেলতে নামা মাত্র ২২ বছরের তরুণ বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কীভাবে শিকার করেছেন, তার দারুণ টেকনিক্যাল ব্যাখ্যাও পাওয়া গেল ফাহিমের কাছ থেকে। সিরিজের আগের দুই ইনিংসের মতোই দারুণ ব্যাটিং করা তামিম ইকবালের উইকেটটিও যেমন দারুণ বুদ্ধি করে তুলে নিয়েছেন জয়াবিক্রমা। ওভার দ্য উইকেট থেকে করা বলগুলো তামিম ইকবাল বেশ স্বচ্ছন্দে খেলছেন বলে জয়াবিক্রমা এক বল আগেই রাউন্ড দ্য উইকেটে চলে গিয়েছিলেন। যাওয়ার পর প্রথম বলেই ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে প্রায় ক্যাচ তুলে দেওয়া তামিম দ্বিতীয় বলেই স্লিপে ক্যাচ তুলে প্যাভিলিয়নে ফিরলেন ৯২ রানে। ফাহিম বলছেন, 'প্রথম বলে ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে ক্যাচ ওঠা তামিমকে ডিস্টার্বড করে ফেলেছিল। আমি নিশ্চিত, তামিম ভাবছিল, এর পরের বলটাও যদি এরকমই আসে, আমি কীভাবে খেলব। এই জিনিসটা বোলার কিন্তু ঠিকই ধরে ফেলেছিল। নেক্সট বলটা কিন্তু ওই টাইপেরই ছিল। কিন্তু বলটা টার্ন করেনি, সোজা করে দিয়েছে, যেখানে তামিম ওয়াজ এক্সপেক্টিং দ্য টার্ন। যখন দেখল, (টার্ন) নেই, দ্যাট ওয়াজ টু লেট। দ্যাট ওয়াজ ব্রিলিয়ান্ট।'

বল উইকেটের ডানে-বাঁয়ে ঠেলে রান তোলার ক্ষমতার অভাব দেখা যাচ্ছে সাইফের মধ্যে। ছবি: এসএলসিতবে বাদবাকি বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের আউটগুলোতে বোলিং-কৃতিত্ব বেশি না ব্যাটিং-ব্যর্থতা, এ নিয়ে তর্ক হতেই পারে। নাজমূল আবেদীন ফাহিম ব্যাটসম্যান ধরে ধরে তা বিশ্লেষণের চেষ্টা করলেন। মুমিনুল হককে তিনি কাঠগড়ায় তুলছেন একটি বল মিস করেই টানা কিছু এলেবেলে শট খেলে ফেলার অভিযোগে। নিজের সহজাত ব্যাটিংটা মুমিনুল করেননি বলেই আউট হয়েছেন ফুল টসে। 'মুমিনুল যখন ৪৯-য়ে, দুটি ফুল টস বলেও ও রান বের করতে পারেনি। কারণ ওর মাথায়ই আছে, আস্তে করে সিঙ্গেল নেবে।'

আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অল্প কদিনের পদচারণাতেই প্রকট হয়ে উঠেছে সাইফ হাসানের সিঙ্গেল না নিতে পারার অক্ষমতা। এখন পর্যন্ত ছয় ইনিংসে তাঁর ৫০ রানে সিঙ্গেল মাত্র চারটি। ফাহিম বলছেন, সাইফ সিঙ্গেল না নেওয়াতে বোলারদের লাইন-লেংথ বদলাতে হয়নি। একই ব্যাটসম্যানকে টানা বল করতে পারাটা বোলারদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে কাজ করেছে টনিকের মতো। লিটন দাসের আউটের কারণ হিসাবে ফাহিম দায়ী করছেন তাঁর রক্ষণাত্মক মানসিকতা নিয়ে নামাটাকে। যে বলটায় আউট হয়েছেন, তা ছেড়ে দেওয়া যেত, অনায়াসে ব্যাকফুটে গিয়ে পাঞ্চ তো করা যেতই। কিন্তু ওই যে মনের বাঘ আগেই খেয়ে ফেলেছে তাঁকে। লিটনকেই উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করিয়ে ব্যাটসম্যানদের সহজাত খেলার গুরুত্বটা বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েই বোঝালেন ফাহিম। দারুণ একটা উপমাও দিলেন। পেইন্টাররা যেমন মন খুলে ছবি আঁকেন, ব্যাটসম্যানদের জন্যও তেমনি স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশটা খুব জরুরি।

প্রাভিন জয়াবিক্রমার বোলিংয়ের প্রশংসা করেও তিনি তাই বলছেন, তামিম আর মুমিনুল যখন ব্যাটিং করছিলেন বা মুমিনুল আর মুশফিক, তখন কিন্তু উইকেটও এত ভয়ঙ্কর মনে হয়নি, বোলিংও না। ব্যাটসম্যানরা যে অনেক সময় তাঁদের ব্যাটিং দিয়ে বোলিংকে সহজ আর কঠিন বলে মনে করান, এর উদাহরণ হিসাবেও টানলেন এটিকে। কিন্তু যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। ৩৭ রানে শেষ ৭ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ বড় লিড তুলে দিয়েছে শ্রীলঙ্কার হাতে। চাইলেই বাংলাদেশকে ফলো অন করাতে পারত শ্রীলঙ্কা। তা না করানোতে অবশ্য কোনো বিস্ময় নেই। উইকেটে যেমন টার্ন আর বাউন্স পাচ্ছেন স্পিনাররা, দিমুথ করুনারত্নে কেন চতুর্থ ইনিংসে বাংলাদেশের বদলে নিজেরা ব্যাটিং করার কথা ভাববেন!

নাজমূল আবেদীন ফাহিম 'এখনো সব শেষ হয়ে যায়নি' বলে একটু আশার কথা বললেও উৎপল শুভ্র পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন তাঁর মত। বৃষ্টি ছাড়া এই টেস্টে বাংলাদেশের হার বাঁচানোর আর কোনো উপায় নেই। ফাহিমও মোটামুটি একমত হয়ে শেষ পর্যন্ত 'হারানোর কিছু নেই' ভেবে বাংলাদেশ যেন একটা লড়াই করে, এই প্রত্যাশার কথা জানিয়ে দিলেন।

শুভ্র.আলাপে টেস্ট ম্যাচ নিয়ে আলোচনারই পুরোটা এখানে ধরা গেল না। প্রায় দেড় ঘণ্টার অনুষ্ঠানে আরও কত বিষয় যে এসেছে, তার তো হিসেবই নেই। শুধু টেকনিক্যাল বিশ্লেষণই নয়, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে টুকরো টুকরো গল্পও দর্শকের সঙ্গে শেয়ার করেছেন দুজন। উৎপল শুভ্র যেমন এর আগে অভিষেকে শ্রীলঙ্কার পক্ষে সেরা বোলিংয়ের রেকর্ডটা যাঁর ছিল, সেই উপুল চন্দনা পরিচয়ে ১৯৯৬ বিশ্বকাপের সময় পাকিস্তানে এক অটো রিকশা চালককে অটোগ্রাফ দিতে বাধ্য হওয়ার দারুণ মজার এক গল্প বললেন। এখানে আর তা বলছি না। পুরোটা দেখতে ও শুনতে ইউটিউব তো আছেই।