আগের চেয়ে একটু মোটা হয়েছেন, খুব ভালো করে দেখলে আরও কিছু পরিবর্তনও হয়তো চোখে পড়বে। তবে একটি ব্যাপারে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সাংবাদিকদের আগের মতোই অপছন্দ করেন গর্ডন গ্রিনিজ।

সেন্ট ভিনসেন্টে প্রথম দুটি ওয়ানডেতেই মাঠে ছিলেন, থাকবেন গ্রেনাডাতে তৃতীয় ওয়ানডেতেও। বাংলাদেশ তাঁর পুরোনো দল, তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাসের পথে প্রথম সিঁড়িটিতে পা রাখা—এই স্মৃতিতাড়িত হয়ে নয়। গর্ডন গ্রিনিজ এখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের নির্বাচক, এই দায়িত্বই মাঠ থেকে মাঠে ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছে তাঁকে।

প্রথম ওয়ানডে শেষে দুই অধিনায়কের প্রথাগত সংবাদ সম্মেলনের পর মাঠে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সঙ্গে গল্প করছি। হঠাৎ দেখি, ড্রেসিংরুমের দোতলা থেকে এক শ্বেতাঙ্গ মহিলা হাত নাড়ছেন। আমার উদ্দেশেই সেই হাত নাড়া, এটি বুঝতে পেরে আমি তো মহা বিস্মিত। সেই বিস্ময় ওই মহিলারও চোখে পড়ল, একটু সন্দিহান হয়ে পাশে দাঁড়ানো খালেদ মাসুদকে তাই জিজ্ঞেস করলেন, 'উনি বাংলাদেশের সাংবাদিক না’–এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে খালেদ মাসুদ আমার দিকে তাকালেন, 'আপনি প্যাট্রিসিয়াকে চিনতে পারছেন না!' নামটি শুনেই মনে পড়ে গেল, আরে, এই ভদ্রমহিলা তো গর্ডন গ্রিনিজের স্ত্রী (নাকি পার্টনার?)। গ্রিনিজ-যুগে বাংলাদেশে অনেকবারই দেখা হয়েছে তাঁর সঙ্গে।

পাাট্রিসিয়ার কাছ থেকেই জানলাম, গর্ডন গ্রিনিজ অন্য দুই নির্বাচক ও অধিনায়কের সঙ্গে মিটিং করছেন। একটু আগে শেষ হওয়া ম্যাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য এমনই এক ধাক্কা (হারতে হারতে ১ উইকেটে জিতেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ) যে, গ্রিনিজের অপেক্ষায় ঘণ্টা দেড়েক দাঁড়িয়ে থেকেও সেই মিটিংয়ের সমাপ্তি দেখতে পেলাম না। এর কিছুক্ষণ পর মাঠের কাছেই এক রেস্টুরেন্টে অবশ্য অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা হয়ে গেল। আরো কয়েকজন সঙ্গী-সাথী নিয়ে সেই রেস্টুরেন্টে খেতে ঢুকছেন গর্ডন গ্রিনিজ। সঙ্গীদের মধ্যে একজনের নাম বলা উচিত। স্যার আইজ্যাক ভিভিয়ান আলেকজান্ডার রিচার্ডস।

যে সময়টা বাংলাদেশে ছিলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে এত বেশি অম্লমধুর স্মৃতি (মধুর স্মৃতি খুঁজতে অবশ্য হয়রান হতে হচ্ছে) যে, না চেনার কোনো কারণই নেই। গর্ডন গ্রিনিজ শুধু চিনলেনই না, আবার আমার সঙ্গে দেখা হওয়ায় দারুণ খুশি হয়েছেন, সহাস্য মুখে এমন অবিশ্বাস্য একটা দাবিও করে বসলেন। ইন্টারভিউ চাইতেই অবশ্য পরিচিত চেহারায়, ‘এখন নয়, সেন্ট লুসিয়ায় গিয়ে কথা বলব।' নির্বাচকের কাজটা কেমন লাগছে—এই একটা প্রশ্নের উত্তর অবশ্য পাওয়া গেল, “খেলার চেয়ে একেবারেই আলাদা, অনেক বেশি কঠিনও।'

গত পরশু বিকেলে সেন্ট ভিনসেন্ট থেকে একই ফ্লাইটে গ্রেনাডায় এলাম। বাংলাদেশ দলও একই ফ্লাইটে। সেন্ট ভিনসেন্ট বিমানবন্দরে অপেক্ষা করার সময়টাতে অনেকবারই দেখা হলো, টুকটাক কথাও। বাংলাদেশে থাকার সময়টার সঙ্গে একটা বড় পার্থক্যও চোখে পড়ল। গ্রিনিজ যখন বাংলাদেশের কোচ, কখন চিনতে পারবেন আর কখন পারবেন না—এ ছিল এক বিষম ধাঁধা। এখানে দেখা হলেই চিনতে পারছেন এবং হাসিমুখে কুশল বিনিময়ও করছেন! অতিথি হিসেবে এসেছি, তাঁর কিছু দায়িত্ব আছে—এটা মনে করিয়ে দেওয়ার পর বিরাট এক হাসি দিয়ে বললেন, ‘ওয়েলকাম টু ওয়েস্ট ইন্ডিজ।'

স্বাগত জানাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে গেলেই এক বুলি, ‘বলেছি তো, সেন্ট লুসিয়ায় গিয়ে কথা বলব।' বাংলাদেশের দুটি ম্যাচ দেখলেন, টেলিভিশনে আপনাকে দেখা গেছে, বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে সবাই উদগ্রীব—এ কথার জবাব, 'তাদের অপেক্ষা করতে বলো।' কথাগুলো কাটা কাটা, তবে সেগুলো বলছেন হাসিমুখে, আগের মতো রুক্ষ নয় কণ্ঠটা।

একবার কপট বিরক্তির সুরে বললেন, 'তুমি সেই আগের মতো নাছোড়বান্দাই আছো।'

'তোমারও তো আগের মতোই আমার সঙ্গে কথা বলতে অনীহা' বলতেই গ্রিনিজ সংশোধন করে দিলেন, 'তোমার সঙ্গে নয়। প্রেসের সঙ্গেই কথা বলতে আমার অনীহা।'

সেই খেলোয়াড়ি জীবন থেকেই এটি পরিষ্কার করে দিয়ে এসেছেন এবং এ ব্যাপারে তিনি একেবারেই সাম্যবাদী, ওয়েস্ট ইন্ডিজ-বাংলাদেশ কোনো ভেদাভেদ নেই। পছন্দ-অপছন্দ একপক্ষীয় থাকে না। এ কারণেই গর্ডন গ্রিনিজকে পছন্দ করেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজে এমন কোনো সাংবাদিক থাকলেও তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়নি এখনো। যাঁদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, একটা জায়গায় তাঁরা সবাই এক বিন্দুতে দাঁড়িয়ে, 'আমি গর্ডনের সঙ্গে কথা বলি না।' সেন্ট ভিনসেন্ট বিমানবন্দরেই যেমন ওয়েস্ট ইন্ডিজের খুব জনপ্রিয় রেডিও ধারাভাষ্যকার ফাজির মোহাম্মদ ভিভ রিচার্ডসকে দেখেই উঠে গিয়ে তাঁর সঙ্গে অনেকক্ষণ আড্ডা দিলেন, গর্ডন গ্রিনিজ সামনে দাঁড়িয়ে থাকার পরও তাঁকে দেখতে পেলেন না। গর্ডন গ্রিনিজও যে তাঁকে দেখতে পাননি, তা তো বলাই বাহুল্য।

সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈরিতা থাকলেও খেলোয়াড়দের সঙ্গে গ্রিনিজের অন্য রূপ। ২০০৭ বিশ্বকাপের সময়কার এই ছবিতেই যেমন জাভেদ ওমর আর হাবিবুল বাশারের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল গ্রিনিজকে দেখতে পাচ্ছেন আপনারা। ছবিতে আছেন গ্রিনিজের স্ত্রী প্যাট্রিসিয়াও। ছবি: বিসিবি

সেন্ট লুসিয়ার জন্য প্রতিশ্রুত ইন্টারভিউটা সেন্ট ভিনসেন্ট বিমানবন্দরেই সেরে ফেলার উদ্দেশ্য নিয়ে গ্রিনিজকে বললাম, 'এখনো আপনি বাংলাদেশের মানুষের মনে অনেকটা জায়গা নিয়ে আছেন।'

বুকের বাঁ দিকে হাত রেখে গ্রিনিজ জবাব দিলেন, ‘বাংলাদেশও আমার মনের অনেকটা জুড়ে আছে।'

প্রথম দুটি ওয়ানডের বাংলাদেশ কি গর্ডন গ্রিনিজকে চমকে দেয়নি?

তখনো বাংলাদেশের ঘোরে আছেন বলে উত্তর দিয়ে দিলেন, 'না, একটুও না। তিন-চার বছর ধরে বাংলাদেশ এই পর্যায়ে খেলছে। এখন তো একটু ভালো করারই কথা। বাংলাদেশের সমস্যা হয়েছে, শুরুতেই অনেক বেশি শক্তিশালী দলের সঙ্গে খেলতে হয়েছে।'

বাংলাদেশের এই দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড়কেই তো প্রথম দেখছেন.., কথা শেষ হওয়ার আগেই বললেন, ‘অনেককেই আমি চিনি। সুমন, সুজন, মোহাম্মদ রফিক, মুশফিক, হান্নান, বিশ্বকাপের আগে আশরাফুলকেও দেখেছি।'

পরের প্রশ্নে যাওয়ার আগেই বুঝে ফেললেন 'ফাঁদ'টা, হাসিতে তা প্রকাশ করে বললেন, 'নট নাউ, বাট উই উইল টক।'

বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সামনে অবশ্য গর্ডন গ্রিনিজের একেবারেই অন্য চেহারা। দ্বিতীয় ওয়ানডের পর ড্রেসিংরুমের ওপরের ব্যালকনি থেকে মাঠে দাঁড়ানো মুশফিক বাবুকে ইশারা করে দেখালেন, মিড উইকেটের ওপর দিয়ে ছক্কা মারা উচিত ছিল তাঁর। মুশফিক কীভাবে কাভারে ক্যাচ তুলে দিয়েছেন, অঙ্গভঙ্গি করে দেখালেন তা-ও। গত পরশুও বিমানবন্দরে তাঁকে ঘিরে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের তুমুল আড্ডা। গ্রিনিজ কোচ থাকার সময় কবে কাকে কী বলেছিলেন, সেই স্মৃতিচারণায় ব্যস্ত সবাই। গ্রিপ ঠিক করার জন্য গ্রিনিজ ব্যাটের সঙ্গে তাঁর হাত বেঁধে দিয়েছিলেন, সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দিলেন হান্নান সরকার। পাশে দাঁড়িয়ে এই আড্ডার প্রায় অংশ হয়ে গেছি, এমন সময় গর্ডন গ্রিনিজের চোখ পড়ল। মুখে কিছু বললেন না, তবে হাসিমুখে হাত দিয়ে এমন একটা ভঙ্গি করলেন যার একটাই অর্থ, ‘এখানেও তুমি!'

গর্ডন গ্রিনিজকে চিনি বলে মনে মনে কী ভাবছিলেন, সেটাও ভালোই অনুমান করতে পারলাম। 'পৃথিবীতে এই সাংবাদিক প্রজাতিটা না থাকলে কী এমন হতো!'