সেবারের ওই ইংল্যান্ড সিরিজে ঘটনা-দুর্ঘটনার কমতি নেই এমনিতেই। দুর্দান্ত বল করতে থাকা মাশরাফি পড়েছিলেন লম্বা সময়ের চোটে, শুভ্র.আলাপের নিয়মিত দর্শক হয়ে থাকলে ওই সিরিজ দিয়েই এনামুল হক জুনিয়রের আবির্ভাবের গল্পটাও জেনে গিয়েছেন আপনি। তবে এ দু'জনের কেউই নন; ২০০৩ সালের ওই সিরিজের আলোচনার গৌরচন্দ্রিকা হয়েছিল নাফিস ইকবালের ব্যাটে, যাঁর জীবনঘড়ির কাঁটাটা সতেরো পেরিয়ে আঠারো বছরে পা ফেলেনি তখনও।

সিরিজ শুরুর আগেই প্রস্তুতি ম্যাচে ইংলিশ বোলারদের মেরে-কেটে একাকার বানিয়ে খেলেছিলেন ১৬৮ বলে ১১৮ রানের ইনিংস। মাঠের অমন পারফরম্যান্স ছাপিয়ে মাঠের বাইরে সংবাদ সম্মেলনে করা তাঁর মন্তব্যটাই অবশ্য হয়ে উঠেছিল আলোচনার খোরাক, ইংলিশ স্পিনারদের যে 'অর্ডিনারি' বলে এসেছিলেন সেখানে!

এর পরে বহুবার বহু জায়গায় চর্চা হয়েছে নাফিস ইকবালের এই উক্তি নিয়ে। ইংল্যান্ডের পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, 'অ্যাশলি জাইলস জীবনে বোলিং নিয়ে বহু কিছু শুনেছেন, কিন্তু একজন সতেরো বছর বয়সীর কাছ থেকে 'অর্ডিনারি' শব্দটা শুনলেন এই প্রথম…' উৎপল শুভ্র জানাচ্ছেন, এর পর তিনি যতবারই ইংল্যান্ড গেছেন, কোনো না কোনো সাংবাদিক তাঁকে ঠিকই মনে করিয়ে দিয়েছেন নাফিসের ওই তারুণ্যেভরা দুঃসাহসী মন্তব্য।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশ 'এ' দলের হয়ে সেঞ্চুরির পরে, বিকেএসপিতে। ছবি: গেটি ইমেজেস

উৎপলশুভ্রডটকম-এর ইউটিউব চ্যানেলের নিয়মিত আয়োজন শুভ্র.আলাপে নাফিস ইকবালকে অতিথি হিসেবে পেয়ে এই আলাপটা তাই অবধারিতভাবেই উঠেছিল। আসলেই কি ইংরেজ স্পিনারদের 'অর্ডিনারি' বলেছিলেন তিনি? নাফিস বলছেন, বলেছিলেন, তবে এর আগে আরও কিছু কথাও ছিল। কিন্তু খুব সম্ভবত স্টোরিটা জমবে না বলে তা একটু কাঁটছাট করেই প্রকাশ করেছেন সাংবাদিকেরা।

কেন? কী ছিল সেখানে? উত্তরটা দিচ্ছেন নাফিসই, 'এক ইংলিশ সাংবাদিক আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, "হাউ ডিড ইউ ফেল্ট দ্য ইংলিশ ফাস্ট বোলারস্?" আমি জবাব দিয়েছিলাম, "আই ফেল্ট দে আর প্রেটি গুড। অ্যান্ড কম্পেয়ারড্ টু ইংলিশ ফাস্ট বোলিং, স্পিনারস্ ওয়্যার বিট অর্ডিনারি।" কাহিনি এটাই ছিল। এখন আমিই বোঝাতে পারিনি, নাকি ওনারাই ভুল করেছেন... জার্নালিস্টরাও স্বাভাবিকভাবেই এটা এক্সপ্লয়েট করে থাকতে পারেন।"

নিজে সাংবাদিক বলেই হয়তো, সাংবাদিকের চোখটা ধরার চেষ্টা দেখা গেল উৎপল শুভ্রর মধ্যে, 'ইংল্যান্ডের পেসারদের তুলনায় স্পিনাররা অর্ডিনারি' লাইনটা বড্ড ক্লিশে শোনায়। তুলনায় ওই সতেরো/আঠারো বছরের বয়সের এক ছোকরা ব্রিটিশ স্পিনারদের অর্ডিনারি বলছে, জনমনে এটাই সাড়া জাগাবে বেশি।' নাফিস ইকবালের এতে বিশাল কোনো ক্ষতিও হয়ে গেছে বলেও মনে হয় না তাঁর।

স্টিভ হার্মিসন, ম্যাথু হগার্ড, অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফদের মতো বোলারদের সামনে গ্যারেথ বেটি-অ্যাশলি জাইলসদের মতো বোলারদের গড়পড়তা বলাটা কোনো লঙ্কা কাণ্ড ঘটায়নি বলে মনে করেন নাফিসও। কিন্তু একজন ক্রিকেটার হয়ে অন্য এক ক্রিকেটারকে 'অর্ডিনারি' বলাটা খুব অসম্মানজনক কাজ বলে তাঁর কথা এমন করে গণমাধ্যমে আসাটা খুব একটা খুশি করেনি নাফিসকে।

কিন্তু অমন স্ট্রোকের বিচ্ছুরণ ঘটানো নাফিস ইকবালকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খুব একটা দেখা গেল কোথায়? নাফিস বলছেন, বয়সভিত্তিক দলগুলোতে বেশি ভালো খেলাটাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁর অন্তরায়, সঙ্গে গাইড করার মতো কাউকে পাননি বলেও আক্ষেপ আছে নাফিসের, 'আমার ট্যালেন্টের ওপর বিশ্বাসটা একটু বেশি ছিল। কারণ এজ লেভেলে এত ভালো খেলেছিলাম যে, "এখন তো সব অটোমেটিক্যালি আসবে" ভেবে নিয়েছিলাম। ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে গিয়ে কাজটা দ্বিগুণ করতে হবে, এই জিনিসটা আমাকে যে কেউ বোঝাবে, এমন কেউ ছিল না। আমার নিজেরও বোঝা উচিত ছিল, কাজগুলো করা উচিত ছিল।'

নাফিসের ক্যারিয়ারের উজ্জ্বলতম অধ্যায়, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১২১ রানের ম্যাচ বাঁচানো ইনিংস খেলেছিলেন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। ছবি: এএফপি

তা করেননি বলেই ক্যারিয়ারটা থমকে গেছে ১১ টেস্ট আর ১৬ ওয়ানডেতে। তাঁর খেলা সর্বশেষ ওয়ানডেটা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসেরই সবচেয়ে চর্চিত ম্যাচ কি না, তর্ক হতেই পারে। কার্ডিফের ওই ম্যাচে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ যে ছিল অস্ট্রেলিয়া!

আলাপ হলো সেই কার্ডিফ-রূপকথা নিয়েও। আর সবার মধ্যে ২০০৫ সালের ওই অস্ট্রেলিয়া-বধের স্মৃতি কেবল সুখানুভূতি জাগালেও নাফিসের মনে ম্যাচটা সম্ভবত তিতকুটে একটা স্বাদও জাগিয়ে যায়। ১৬ ওয়ানডের ক্যারিয়ারের সর্বশেষটি তো নাফিস খেলেছিলেন সোফিয়া গার্ডেনের ওই ম্যাচেই।

ইংল্যান্ডে সেবারের ন্যাটওয়েস্ট সফরে বাংলাদেশ এরপর ম্যাচ খেলেছিল আরও চারটি। কিন্তু নাফিসের সুযোগ মেলেনি একটিতেও। যে ম্যাচ দেশের ক্রিকেটের গতিপথই বদলে দিলো, সেই ম্যাচের উইনিং কম্বিনেশনটা কেন পরের ম্যাচেই ভেঙে ফেলা হলো, উৎপল শুভ্র এই প্রশ্নের মুখে ফেলেছিলেন বাংলাদেশের সে সময়ের কোচ ডেভ হোয়াটমোরকে। কোচ বলেছিলেন, হোটেলে দেখে, নেটে দেখে তাঁর মনে হয়েছে, নাফিসের একটা বিরতি দরকার। নাফিসের মধ্যে তিনি কোনো কনফিডেন্সের ছাপ খুঁজে পাচ্ছেন না।

নাফিসের কথা মানলে হোয়াটমোরের শ্যেনচক্ষুর প্রশংসা করতেই হচ্ছে। যদিও ভেতরে ভেতরে উইনিং কম্বিনেশন ধরে রাখবে দল, এমন আশা ছিল নাফিসের, কিন্তু আত্মপ্রত্যয়টা ঠিক ছিল না তাঁর ভেতরে৷ নাফিস বলছেন, 'তখন বয়সটা কম ছিল তো, টেস্ট সিরিজেও রান করতে পারি নাই, এক-দুইটা ওয়ানডেতেও রান করতে পারি নাই; কনফিডেন্স লেভেলের ওপর একটা প্রভাব তো পড়েই। হোয়াটমোর তাই এই দিকটায় পুরোপুরি ঠিক ছিলেন।'

একাদশ থেকে বাদ দেয়াতে হোয়াটমোরের ওপর তাই কোনো রাগ-ক্ষোভও নেই তাঁর। যেটা আছে টেস্ট-ওয়ানডে গুলিয়ে ফেলে তাঁকে দল থেকেই ছেঁটে ফেলাতে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ম্যাচের ঠিক দুই ওয়ানডে আগেই নাফিস ফিফটি করেছিলেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, কিন্তু টেস্ট-ওয়ানডের মিশ্রণে তাঁর লম্বা রান খরাটাই পড়েছিল নির্বাচকদের চোখে। নাফিসের আফসোসটাও সেখানেই, 'আমার দুই ইনিংস আগেই কিন্তু একটা ফিফটি ছিল, ওইসময় ব্রেক দিয়ে পরে কোনো এক সময় ওয়ানডেতে ব্যাক করাতে হয়তোবা পারত।'

হোয়াটমোরের সঙ্গে। ছবি: এএফপি

জাতীয় দলে 'ব্যাক' করার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল ২০০৭ সালে৷ অবশ্য প্রায় দেড় বছর বাদে টেস্ট ক্রিকেটে ফিরছিল পুরো বাংলাদেশ দলই। ভারতের বিপক্ষে ওই সিরিজকে সামনে রেখে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নাফিসও, কিন্তু অনুশীলনে ঘটে যায় আকস্মিক এক দুর্ঘটনা, আর তা ঘটে গিয়েছিল তামিম ইকবালের হাতেই। সেদিন ডাউন দ্য উইকেটে এসে তামিমের মারা একটি বল এসে লাগে নাফিসের মুখে। ফলাফল, চোখের উপরে হাড় ভেঙে যায় তাঁর। এই চোট থেকে সেরে উঠতেই লেগে গিয়েছিল প্রায় মাস ছয়েক, জাতীয় দলে জায়গা হারাতে সময়টা যথেষ্ট।

চোট নাফিসের পিছু ছাড়েনি এরপরও। অ্যাংকেল মচকে যাওয়াতে ক্রিকেট খেলতে পারেননি প্রায় দুই বছর। তবে ক্রিকেটে ফেরার পর জাতীয় দলে তাঁকে ফেরানোর কথা উঠেছিল আবার। ২০০৮ সালের নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে সে সময়ের প্রধান নির্বাচক রফিকুল আলম বিসিবিতে ডেকে ' রেডি থেকো, সামনের সিরিজে তুমি টেস্ট খেলবে' বলে প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিলেন তাঁকে। নাফিসের কথা মানলে, তা রক্ষা করতে পারেননি রফিক। নাফিসকে নেওয়া হয়নি স্কোয়াডে।

কেন? নাফিস তো বহুদিন আগেই মেনে নিয়েছেন, ভাগ্যই তাঁর ক্যারিয়ারের এমন সমাপ্তি লিখে রেখেছিল।