ক্রিকেটার তামিমের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা কী? প্রশ্নটা এর আগেও অসংখ্যজনকে অসংখ্য জায়গায় করা হয়েছে, অনেকে অনেক উত্তর দিয়েছেন। যার কিছু হয়তো মিলেও গেছে। তবে গতকাল রাতে উৎপলশুভ্রডটকমের ইউটিউব শো শুভ্র.আলাপে উৎপল শুভ্র যাঁকে প্রশ্নটা করলেন, তাঁর উত্তরটা একটু বাড়তি আগ্রহ জাগাতে বাধ্য। শুভ্র.আলাপে যে এদিনের অতিথির নাম যে নাফিস ইকবাল! পরিচয় বোধ হয় না দিলেই চলে। তারপরও যদি বলতেই হয়, তিনি তামিম ইকবালের বড় ভাই।

যদিও প্রশ্ন করার আগে নাফিসকে ভ্রাতৃত্বের পরিচয়টা ভুলে যেতে বললেন উৎপল শুভ্র। ঠিক যেমন করে তাঁরা নিজেদের ক্রিকেটার সত্ত্বাকে দূরে সরিয়ে রাখেন ব্যক্তিগত আলাপে। উৎপল শুভ্রকে তামিমই জানিয়েছেন অবাক করা এই তথ্যটা, বড় ভাই নাফিসের সঙ্গে আলাপে ক্রিকেটটা নাকি মনের ভুলেও উঠে আসে না।

নাফিসও সহমত জানাচ্ছেন অনুজের কথায়, 'আমরা একদমই খেলা নিয়ে কথা বলি না। একদমই না। আমরা তামিম কী জানি, হি ইজ ভেরি সাকসেসফুল। আমি তামিমকে গিয়ে জ্ঞান দেব যে "এই করিস, ওই করিস", এটার তাই কোনো অর্থ হয় না। এটা অবশ্য এই ভেবে না যে, আমি কিছু বললে তামিম ভাববে, "ও আমাকে কী বলবে!" উই জাস্ট ডোন্ট টক অ্যাবাউট ক্রিকেট। আমরা দুনিয়ার আলাপ করি, হাসি-ঠাট্টা করি, সবই করি। ক্রিকেট নিয়ে খুবই রেয়ারলি আলাপ করি। খুবই রেয়ার।'

আর ক্রিকেটার হিসেবে তামিমকে মূল্যায়নের সময় অগ্রজ পরিচয় ভুলে যাওয়ার কথা! নাফিস বলছেন, উৎপল শুভ্র না বললেও তিনি তা-ই করতেন। গণমাধ্যমে কথা বলার সময় 'তামিম ইকবালের বড় ভাই' জাতীয় পরিচয়কে ত্রিসীমাতেও ঘেঁষতে না দেওয়ার কাজটা তিনি বহুদিন ধরেই মানছেন। 

তো ক্রিকেটার তামিম সম্পর্কে কী বললেন বিশ্লেষক নাফিস? তাঁর চোখে, খেলোয়াড় হিসেবে তামিমের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো ফোকাস থাকতে পারার ক্ষমতা, নিজের খেলাটাকে দারুণভাবে ভালোবাসা। এমনকি তামিম 'বেশ আবেগপ্রবণ' বলে যে কথাটা চালু আছে ক্রিকেটমহলে, নাফিস ইকবাল দিচ্ছেন সম্পূর্ণ পাল্টা তথ্য, 'ওর কলিজা অনেক বড়। একটা মানুষের খারাপ লাগা থাকেই, কিন্তু ও কোনোদিন প্রকাশ করে না। ও জানে, হি ক্যান ওভারকাম ইট। যেখানে আমি থাকলে হয়তো মেন্টালি ব্রেকডাউন হয়ে যেতাম, ও যায় না।'

কিন্তু এরপরও কেন চাউর হলো তামিমের আবেগপ্রবণ পরিচয়টা? সমালোচনা নিয়ে একটু বেশিই স্পর্শকাতর তিনি? উৎপল শুভ্র নাফিসকে প্রশ্নটা করেছিলেন এভাবে, সাকিব কোনোকিছু গায়ে মাখেন না বলে সবাই জানেন, মু্শফিক নিজের ভেতর গুটিয়ে থাকেন, আর মাশরাফি তো মাশরাফির মতোই। তাহলে 'তামিম ইজ ভেরি সেনসিটিভ' কথাটাই কেন এমন স্থায়ী হয়ে গেছে সবার মনে?

দুই ভাই। ছবি: সংগৃহীত

এর ব্যাখ্যা দিতে তামিমের সবচেয়ে বড় স্পর্শকাতরতার জায়গাটা বলে দিলেন নাফিস। বড় বড় অর্জন থাকার পরও তামিমকে যে প্রতিনিয়ত শুনতে হয় 'ও অমুকের জোরে খেলে', এটাই তামিমকে মানসিকভাবে খুব আহত করে। তামিম-নাফিসের চাচা, সাবেক প্রধান নির্বাচক ও বর্তমানে বোর্ড পরিচালক আকরাম খান যে তাঁর কাজে স্বজনপ্রীতির সুযোগই রাখেন না, এর প্রমাণ দিতে নাফিস ফিরে গেলেন নিজের ক্যারিয়ারে, '২০০৭ সাল থেকে তিনি (আকরাম) সিলেক্টর। কিন্তু আমি তো আর জাতীয় দলেই আসলাম না!'

ক্রিকেটারদের সমালোচনা হবে, তবে তা মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেই সমস্যাটা হয়। উদাহরণও দিলেন নাফিস  'আর সব প্লেয়ারদের তো একটাই কথা, আপনি আমাকে নিয়ে গালাগালি করেন, ঠিক আছে। কিন্তু আপনি আমার মা, আমার বউ, আমার বোনকে নিয়ে কেন? তাদের কী দোষ? এসব আলোচনা যখন আসে, তখন তামিমও একটু সেনসিটিভ হয়ে যায়।'

ক্রিকেটার তামিম ইকবাল চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন বলেও মনে হয় নাফিসের কাছে, 'স্কিল ওয়াইজ, হি ইজ ভেরি ট্যালেন্টেড। কিন্তু ও এরপরও চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসে। সাম হাউ ও সেই চ্যালেঞ্জে জেতে এবং নিজেকে প্রুভ করে বেস্ট হিসেবে। তখন থেকে (শৈশব) এখন পর্যন্ত, এই জিনিসটা ওর মধ্যে একদম অটো।'

তামিমের ক্যারিয়ারে নিজেরও খানিকটা প্রভাব দেখছেন নাফিস। যদিও উল্টোভাবেই। নিজে খুব পরিশ্রমী ছিলেন না, কিন্তু ছোট ভাইকে 'কঠোর পরিশ্রমী' সার্টিফিকেটই দিচ্ছেন নাফিস। সম্ভবত এই গুণটা বড় ভাইয়ের ক্যারিয়ার থেকে শিক্ষা পেয়েই, 'ও দেখেছে, আমার লাইফটা কীভাবে চেঞ্জ হয়েছে। ও তাই প্র‍্যাকটিসে কখনো কম্প্রোমাইজ করে না; সেটা মেন্টালি, ফিজিক্যালি কিংবা স্কিলই হোক। হি টেকস হিজ প্র‍্যাকটিস ভেরি সিরিয়াসলি। লেজেন্ড প্লেয়ার হওয়ার সেরা উদাহরণ হিসেবে তামিম আর মুশফিকের কথাই বলব। সেটা ওয়ার্ক এথিকস্, মেন্টালি--সবদিক থেকেই।'

তামিমের মতো পরিশ্রমটা তিনি করেননি বলে এখন হয়তো বা আক্ষেপেও পোড়েন কিছুটা। একসঙ্গে জাতীয় দলের হয়ে ওপেনিংয়ে নামছেন তামিম-নাফিস, বাবা ইকবাল খানের স্বপ্নটাই যে এই জন্মে পূরণ হলো না!