সারাদিনে ৯০ ওভারই হলো। বাংলাদেশের ৯৭তম ক্রিকেটার হিসেবে বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলামের অভিষেক ঘটল, দিনশেষে স্কোরবোর্ডে ১ উইকেটে ২৯১ রান জমাও হলো। রেকর্ড বইয়ের কিছু পাতায় ওলট-পালট ঘটল, মারভান আতাপাত্তু-সনাৎ জয়াসুরিয়া জুটিকে তিনে ঠেলে উদ্বোধনী উইকেটে শ্রীলঙ্কার মাটিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি গড়লেন করুণারত্নে-থিরিমান্নে। কিছু রেকর্ড যোগও হলো আজ, শ্রীলঙ্কার মাত্র দ্বিতীয় উদ্বোধনী জুটি হিসেবে একই ইনিংসে সেঞ্চুরি করলেন দুই ওপেনারই। কিন্তু ব্যাটে-বলে যে লড়াই দেখার আশায় টিভি পর্দার সামনে বসেছিলেন দর্শক, সেই খেলাটা কি পাল্লেকেলেতে হলো?

উৎপলশুভ্রডটকমের ইউটিউব চ্যানেলের নিয়মিত আয়োজন শুভ্র.আলাপে অতিথি হিসেবে আসা জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার নাফিস ইকবাল অনুমিত উত্তরটাই দিলেন। প্রথমেই বলে নিলেন, এমন একটা দিনে আসলে আলোচনা করার মতো বেশি কিছু থাকে না। এর মূল কারণ অবশ্যই উইকেট। প্রথম টেস্টে নির্জীব এক উইকেটে খেলা দেখে দ্বিতীয় টেস্টে কিছুটা হলেও প্রাণরসে সজীব উইকেটের আশা ছিল তাঁর। রেজাল্ট বের করার জন্য শ্রীলঙ্কানরা টার্নিং কিংবা সিমিং উইকেটের দিকে ঝুঁকবে বলেই অনুমান করেছিলেন তিনি! কিন্তু খেলা দেখতে বসেই তাজ্জব হতে হলো তাঁকে, গত টেস্টের আর এই টেস্টের উইকেটে চরিত্রগত কোনো পার্থক্যই তো চোখে পড়ছে না।

নাফিসের ভাবনার সঙ্গে মিলে গেল উৎপল শুভ্রর কথাও। যদিও শুভ্রর ধারণা ছিল, দ্বিতীয় টেস্টের জন্য সিমিং উইকেটই বানাবে শ্রীলঙ্কা। প্রথম টেস্টেও উইকেটে অনেক ঘাস রেখে হয়তো সেই চেষ্টাই করেছিলেন কিউরেটর। কিন্তু উইকেট কি আর সব সময় কিউরেটরের চাওয়া মেনে চলে! উইকেটে ঘাস থাকার পরও সেটি তাই রূপ নিয়েছিল ব্যাটিং-স্বর্গের। দ্বিতীয় টেস্টেও সিমিং উইকেট আশা করার কারণটা তো গত টেস্টের পাঁচ দিনের শুভ্র.আলাপে অনেকবারই আলোচিত হয়েছে। কারণটা আর কিছুই নয়, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কাগজে-কলমে বাংলাদেশি স্পিনাররা শ্রীলঙ্কান স্পিনারদের চেয়ে কিছুটা হলেও এগিয়ে। প্রথম টেস্টেও এগিয়ে ছিল। দ্বিতীয় টেস্টে তো আরও বেশি। একাদশে থাকা বাংলাদেশি স্পিনারদের সম্মিলিত উইকেটসংখ্যা যেখানে ২৩৬, শ্রীলঙ্কান স্পিনারদের উইকেট তো ২৬-য়ের ওপারেই যাচ্ছে না।

দিমুথ করুনারত্নে ও লাহিরু থিরিমান্নের ওপেনিং জুটিই প্রথম দিনটিকে শ্রীলঙ্কার করে দিয়েছে। ছবি: শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট

স্পিনারদের মধ্যে দুই দল মিলিয়েই সবচেয়ে অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ যিনি, সেই তাইজুলের বোলিংয়ে অবশ্য অভিজ্ঞতার ছাপটা সেভাবে পাওয়া যায়নি। উৎপল শুভ্র তাইজুলের বোলিংয়ের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বললেন, ঘূর্ণিজালে ব্যাটসম্যানদের জড়িয়ে ফেলবেন, এমন বোলার তিনি কখনোই ছিলেন না; মোহাম্মদ রফিকের মতো লাইন-লেংথের ওপর নিয়ন্ত্রণই তাঁর মূল অস্ত্র। এই দক্ষতাবলেই গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের স্পিন বিভাগের বড় ভরসা হয়ে ছিলেন তিনি। এবারের সিরিজে সেই তাইজুলকে খুঁজে পাওয়া একটু কঠিনই হচ্ছে।

নাফিস ইকবালও দ্রুত একমত হয়ে গিয়ে বললেন, আগের মতো এক প্রান্ত থেকে ব্যাটসম্যানদের আটকে রাখা, ধারাবাহিকভাবে এক জায়গায় বল করে যাওয়া তাইজুলকে খুঁজে ফিরছেন তিনিও। তাইজুলকে নিয়ে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অ্যাকশনে বারেবারে রদবদলই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে কি না, এই শঙ্কাও প্রকাশ পেল নাফিস ইকবালের কথায়। 

আর তাসকিন যেন দাঁড়িয়ে তাইজুলের পুরো বিপরীত মেরুতে। দলে ফিরেছেন আগের সেই তাসকিনকে মরুভূমিতে বালিচাপা দিয়েই, তাঁর সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়া বোলিংয়ের প্রশংসা করলেন দুজনই। প্রথম দিন থেকে বাংলাদেশ যদি ইতিবাচক কিছু খুঁজে পেতে চায়, তো সেটা তাসকিনের বোলিংই হবে। পুরো দিনে বাংলাদেশ যে কানাকড়ি সুযোগ তৈরি করেছিল, তার বারো আনাই মিলেছিল তাসকিনের সৌজন্যে।

তবুও যে নামের পাশে উইকেট কলামটা শূন্যই দেখাচ্ছে তাঁর, সে দায়টা নাজমুল হোসেন শান্তকেই নিতে হচ্ছে। দিমুথ করুণারত্নের ব্যক্তিগত ২৮ রানে ফ্লাই স্লিপে ক্যাচ ফেলে তাসকিনকে উইকেট বঞ্চিত করেছেন তিনিই। ক্যাচ মিসকে 'পার্ট অব দ্য গেম' বললেও শান্তর ওই ক্যাচ মিসটাই বাংলাদেশকে খেলা থেকে পিছিয়ে দিয়েছে বলেই ইঙ্গিত নাফিসের। কারণ বল তখনো শক্ত ছিল, ওই একটা উইকেট পড়লে হয়তো আরও পড়ত। এ কারণেই দিনশেষে স্কোরবোর্ডটা খুবই হতাশ করেছে তাঁকে, 'যত ভালো উইকেটই হোক, অ্যাট লিস্ট তিন-চারটা উইকেট পড়া উচিত ছিলই। বাংলাদেশের যে বোলিং অ্যাটাক, আমি মনে করি, (আরও) দুয়েকটা উইকেট নেওয়ার মতো দে আর ক্যাপাবল।'

গত এক-দুই বছর তাসকিন যে পরিশ্রম করেছেন, তার ফলটাই এখন তিনি পাচ্ছেন বলে মনে করছেন নাফিস। সঙ্গে অভিষিক্ত শরিফুলের বোলিংও তাঁর মনে ধরেছে। উইকেটের দুই প্রান্ত থেকেই ধারাবাহিকভাবে ১৩৫-১৩৮ কি.মিতে বল করা বোলিং জুটি বাংলাদেশ খুব একটা পায়নি। তাসকিন আর শরিফুল মিলে সেই অভাব ঘোচাতে পারেন ভেবে ইতোমধ্যেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিয়েছেন নাফিস। সে জন্যে শরিফুলের ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট করে তাঁকে ঠিকঠাক মতো পরিচর্যা করার পরামর্শও বিসিবিকে দিয়েছেন তিনি। ক্যাচ মিস নিয়ে কথা বলতে বলতে তাসকিনেই আচ্ছন্ন থাকায় শরিফুলের কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলেন বলে একটু লজ্জাই পেলেন শুভ্র। নইলে শরিফুলের বোলিং তাঁরও খুব ভালো লেগেছে। করুনারত্নেকে আউট করে সারাদিনে বাংলাদেশকে একমাত্র উইকেটটিও উপহার দিয়েছেন এই শরিফুলই।

টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম উইকেট পাওয়ার আনন্দ! করুনারত্নকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর শরিফুল। ছবি: শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটমোটামুটি নতুন বল আর দ্বিতীয় দিন সকালে উইকেটে আর্দ্রতাকে কাজে লাগিয়ে প্রথম ঘণ্টাতেই উইকেট নেওয়াতেই বাংলাদেশের ফিরে আসার পথ দেখছেন শুভ্র। আর তা নিতে না পারলে রান আটকে রাখার বোলিং করে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছেন না তিনি। তবে তা করতে গিয়ে বেশি রক্ষণাত্মক হয়ে যাওয়া নিয়েও একটু ভয় আছে তাঁর। নাফিস ইকবাল একমত তো হলেনই, বোলারদের জন্য সুনির্দিষ্ট পরামর্শও দিলেন। ব্যাটিংয়ের মতো বোলিংয়েও জুটি গড়ে তুলতে হবে। বাড়াতে হবে ডট বলের সংখ্যা, যেন ওভারপ্রতি রানের সংখ্যাটা আড়াইয়ের ওপরে না ওঠে কোনোক্রমেই। এ ধরনের উইকেটে স্কিলের চেয়ে ধৈর্য ধরাটাই যে নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়, নাফিস মনে করিয়ে দিলেন তাও। সঙ্গে এটাও যে, রান না করতে পারলে যেকোনো ব্যাটসম্যানই অস্থির হয়ে ওঠে।

প্রথম দিন শেষেই টেস্টের ফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে যাওয়াটা বিরাট ঝুঁকিই, কিন্তু উৎপল শুভ্রের সঙ্গে নাফিস ইকবালও যেন ড্রতেই লেখা দেখছেন এই টেস্টের ভবিতব্য। উৎপল শুভ্রর মনে যদিও উইকেট নিয়ে একটু রহস্য আছে। এই টেস্টের উইকেট গত টেস্টের চাইতে শুকনো। আগের টেস্টে ঘাস ছিল বলে উইকেট সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটিংয়ের জন্য আরও ভালো হয়েছে। এই উইকেটে ঘাস না থাকায় টেস্টের শেষ দিকে স্পিনাররা টার্ন পাবেন কি না, এই প্রশ্নটা ঘুরছে তাঁর মনে।

নাফিস ইকবাল অবশ্য সেই সম্ভাবনা খুব একটা দেখছেন না। এই ধরনের উইকেটে রেজাল্ট হতে শেন ওয়ার্ন-স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলদের মতো রিস্ট স্পিনার কিংবা শোয়েব আখতারের মতো এক্সপ্রেস বোলার লাগবেই বলে মত তাঁর, 'ফোর্থ কিংবা ফিফথ ডে-তে গিয়ে কী হবে, সেটা টু আর্লি টু সে। তবে আমার মনে হয় না লাস্ট টেস্টের উইকেটের সঙ্গে এই উইকেটের খুব একটা ডিফারেন্স হবে। বাংলাদেশ যদি বড় একটা টোটাল দাঁড় করাতে পারে, তাহলে এই টেস্টটাও ড্রয়ের দিকেই যাচ্ছে।'

তবে এর সবই পূর্বানুমান। কিন্তু ক্রিকেটে কি আর সবকিছু অনুমান মতো ঘটে? অভাবনীয় অনেক কিছু ঘটে বলেই তো পাঁচ দিনের এই ম্যারাথন লড়াই দেখতে বসতে হয় আপনাকে!

..................................................

শুভ্র.আলাপে উৎপল শুভ্রর সঙ্গে নাফিস ইকবালের আড্ডা বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা টেস্ট দিয়ে শুরু হলেও তা আর তাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নাফিস ইকবালের ক্যারিয়ারের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, ছোট ভাই তামিম ইকবালের সঙ্গে সম্পর্ক, ক্রিকেটার হিসেবে তামিমকে মূল্যায়ন....এমন আরও কত কিছু নিয়ে যে কথা হয়েছে, তার সব বলে শেষ করা যাবে না। পুরো আলোচনা ইউটিউবে দেখতে ও শুনতে পারেন। সেখানে যেতে পারেন এই ওয়েবসাইটের ভিডিও সেকশন থেকেও।