দুই বছর ধরে যেকোনো সিরিজের আগে স্যান্ডি গর্ডনের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটে শ্রীলঙ্কান খেলোয়াড়দের। বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের আগেও কেটেছে। এবার জয়াবর্ধনেদের সঙ্গে কথা বলে স্যান্ডি গর্ডন রীতিমতো মুগ্ধ। ক্রীড়া মনস্তত্ত্ববিদ গর্ডন অনেক ক্রিকেট দলের সঙ্গেই কাজ করেছেন, এত তাড়াতাড়ি মানসিকভাবে এতটা উন্নতি করতে দেখেছেন খুব কম দলকেই।

টম মুডি যত দিন ছিলেন, ট্রেভর পেনি ছিলেন শ্রীলঙ্কার সহকারী কোচ। ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফিল্ডারের দায়িত্ব ছিল মূলত ফিল্ডিং। টম মুডি আর ট্রেভর বেলিসের সেতুবন্ধ হিসেবে বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজে পেনিই মূল কোচ। সিরিজ শুরুর আগে তিনি ঘোষণা করলেন, শ্রীলঙ্কা এখন অস্ট্রেলিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পুরোপুরি প্রস্তুত। ফাইনালে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট অমন অপার্থিব একটা ইনিংস না খেললে গত বিশ্বকাপেই (২০০৭) শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাটনটা হাতবদল করে ফেলত বলে তাঁর বিশ্বাস।

মাহেলা জয়াবর্ধনে অধিনায়কত্ব পাওয়ার সময় ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দটা লিখতে হতো। আগে ওয়ানডেতে টুকটাক অধিনায়কত্ব করলেও পুরো সিরিজের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর অভিষেক ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সফরে। সিরিজ শুরুর আগে নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি ঠেকা কাজ চালাচ্ছি। মারভান (আতাপাত্তু) ফিরলেই তাঁর হাতে অধিনায়কত্ব তুলে দেব।’ সেই ‘ঠেকা কাজ’ এমনই চালালেন যে, পেয়ে গেলেন আইসিসির বর্ষসেরা অধিনায়কের স্বীকৃতি। দেড় বছরেই অধিনায়ক হিসেবে বিশ্ব ক্রিকেটে তাঁর এমনই ভাবমূর্তি যে, আইসিসির ক্রিকেট কমিটিতে খেলোয়াড়দের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে তাঁকেই। বাংলাদেশের বিপক্ষে একটি সিরিজ দিয়ে শুরু, বাংলাদেশের বিপক্ষেই আরেকটি সিরিজের আগে মাহেলা জয়াবর্ধনে বলছেন, “বাংলাদেশে সিরিজটি ছিল খুব ‘টাফ’। তবে এবার অন্য রকম হবে। মাঝের সময়টায় আমরা নিজেদের অন্য জায়গায় নিয়ে গেছি।”

ওয়ার্ন-ম্যাকগ্রা উত্তর অস্ট্রেলিয়া আর আগের মতো অজেয় থাকবে কি না, এটা কোটি টাকার প্রশ্ন। তবে না থাকলে তাঁদের জায়গা নেবে কে—এটা মোটেই তা নয়। স্যান্ডি গর্ডন-ট্রেভর পেনি-মাহেলা জয়াবর্ধনে যা বলছেন, পুরো ক্রিকেট বিশ্বই এখন তা বলছে। আসছে শ্রীলঙ্কার দিন। 

তা শ্রীলঙ্কার এমন প্রবল প্রতাপান্বিত হয়ে ওঠার রহস্যটা কী? শ্রীলঙ্কান খেলোয়াড়দের জিজ্ঞেস করুন। একটা উত্তরই পাবেন—আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়া। ‘শ্রীলঙ্কান ব্র্যান্ড অব ক্রিকেট’—গত বিশ্বকাপেই শ্রীলঙ্কানরা প্রথম জোরেশোরে যে কথাটা বলতে শুরু করেছিলেন, এখন তা এই দলের ‘থিম সং’। কুমার সাঙ্গাকারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের মধ্যে ব্যতিক্রম। প্রচুর বই পড়েন, ব্যস্ত ক্রিকেটসূচির মধ্যেও সময় বের করে আইনশাস্ত্রে পড়াশোনা করছেন। ‘শ্রীলঙ্কান ব্র্যান্ড অব ক্রিকেট’ কথাটা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রথম উদ্যোক্তাও তিনি, ‘আমরা মাঝে অন্য দলের মতো খেলার চেষ্টা করে ভুলটা বুঝতে পেরেছি। বুঝতে পেরেছি, সাফল্য পেতে হলে আমাদেরকে আমাদের সহজাত ক্রিকেটটাই খেলতে হবে। আমরা এখন সেটাই খেলছি।’ 

সেই ‘শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট’টা কেমন? মাহেলা জয়াবর্ধনের জবাব, ‘সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে আমাদের খেলা দেখলেই বোঝা যায়, এর একটা আলাদা ধরন আছে। আমি শুধু বলতে পারি, এর মূল কথা হলো নিজেদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশের স্বাধীনতা।’ সাঙ্গাকারা এর সঙ্গে ‘আক্রমণাত্মক মেজাজ’টাকেও যোগ করতে চান, ‘আমি মনে করি, কোনো বল না খেলে ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেও আপনি আপনার আক্রমণাত্মক মানসিকতার প্রকাশ ঘটাতে পারেন।’ 

শ্রীলঙ্কা বলেই সনাৎ জয়াসুরিয়া নিজের অনন্য স্টাইল না বদলেও এত বছর খেলে যেতে পেরেছেন। ছবি: গেটি ইমেজেস

শুধুই শ্রীলঙ্কানদের দাবি হলে উড়িয়ে দেওয়া যেত, বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের কাছেও শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটটা একেবারেই অন্য রকম বলে মনে হয়। মাশরাফি বিন মুর্তজার কাছে তা এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চেয়ে পুরোপুরি ভিন্ন, ‘ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের খেলার মধ্যে অনেক মিল আছে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার খেলাটা কোথায় যেন আলাদা।’ ‘কোথায় যেন’তে শুধু ব্যাটিং-বোলিং নয়, জয়াবর্ধনের অধিনায়কত্বেও সেই ভিন্নতা চোখে পড়ে তাঁর। 

হাবিবুল বাশারের চোখে শ্রীলঙ্কা আলাদা হয়ে যায় আক্রমণমনস্কতার কারণে, ‘ওরা খুব অ্যাটাকিং ক্রিকেট খেলে। ওদের ব্যাটসম্যানরা যেমন অ্যাটাকিং, বোলাররাও তা-ই। তবে দলে ও রকম প্লেয়ার আছে বলেই ওরা এমন খেলতে পারে।’

শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের যে ভিন্ন দর্শনের কথা বলছেন জয়াবর্ধনে-সাঙ্গাকারা, সেটির কারণেই হয়তো এই দ্বীপদেশটি এমন অজস্র ‘ও রকম প্লেয়ার’ উৎপন্ন করতে পারছে। হাবিবুল ধারণাটা সমর্থন করলেন।

ব্যাটিং-বোলিংয়ে নিজেদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশের যে স্বাধীনতার কথা বলছেন জয়াবর্ধনে, এর বড় প্রমাণ তো চোখের সামনেই। সনাৎ জয়াসুরিয়ার ব্যাটিং আর লাসিথ মালিঙ্গা ও মুত্তিয়া মুরালিধরনের বোলিংই আপনাকে বুঝিয়ে দেবে, শ্রীলঙ্কা আসলেই খেলোয়াড়দের স্বতঃস্ফূর্ততায় বিশ্বাসী। বিশ্বের আর কোনো দলে যে মালিঙ্গা আর মুরালির মতো ‘আনঅর্থোডক্স’ বোলার নেই, এটা নিছকই কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না। গত বিশ্বকাপের সময় ভিভ রিচার্ডস মালিঙ্গা প্রসঙ্গে বলছিলেন, ‘আমি নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যান থাকার সময় অনেকটা মালিঙ্গার মতো অ্যাকশনের ফিদেল এডওয়ার্ডসকে দলে নিয়েছিলাম বলে খুব সমালোচনা হয়েছিল। লোকজন বোঝে না, একটু ব্যতিক্রমী কিছুর কার্যকরী হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।’

শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের প্রথা বিরোধিতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার বড় উদাহরণ লাসিথ মালিঙ্গা

শ্রীলঙ্কানরা যে বোঝে, মালিঙ্গা-মুরালিই এর বড় প্রমাণ। প্রমাণ পাওয়া গেল কাল বিকেলে বাংলাদেশ দলের নেটেও। স্থানীয় কিছু তরুণ বোলার বল করছেন, তাঁদের মধ্যে এক পেসার আর এক স্পিনারকে দেখিয়ে বাংলাদেশের পেসার মোহাম্মদ শরীফ বললেন, ‘ওই বোলার দুজনের অ্যাকশনটা একটু দেখুন।’

বাংলাদেশের ক্রিকেটে অদ্ভুত অ্যাকশনের বোলারদের একটা অদ্ভুত নাম আছে—‘ক্যাকরা বোলার।’ চার বার শ্রীলঙ্কা সফরের অভিজ্ঞতা থেকে শরীফের উপলব্ধি, ‘শ্রীলঙ্কার মতো এত ক্যাকরা বোলার আর কোনো দেশে নেই।’

শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের নিজস্ব ধরন নিয়ে শ্রীলঙ্কান খেলোয়াড়দের এত অহঙ্কার, অথচ সেই শ্রীলঙ্কাই আবার অস্ট্রেলীয় কোচের বাইরে কিছু ভাবতে পারে না! এটা কি স্ববিরোধিতা নয়? শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের উত্থানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সব অস্ট্রেলীয় কোচদের নাম—ডেভ হোয়াটমোর, ব্রুস ইয়ার্ডলি, জন ডাইসন, টম মুডি। যে ট্রেভর বেলিস আসছেন, তিনিও অস্ট্রেলীয়। জয়াবর্ধনের কাছে এরও উত্তর আছে, ‘এদের কেউই আমাদের নিজস্ব খেলাটা বদলানোর চেষ্টা করেননি।’

অস্ট্রেলীয় কোচের প্রতি পক্ষপাতের কারণটা ভালো বোঝা যাবে সাঙ্গাকারার কথায়, ‘আমরা আক্রমণাত্মক হতে চাই শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে, নির্দিষ্ট একটা পরিকল্পনা মাথায় রেখে।’ ক্রিকেটে পরিকল্পনা-শৃঙ্খলা এই শব্দগুলো এখন তো অস্ট্রেলীয়দেরই নামান্তর।