ডেভ হোয়াটমোরকে বিদায়-অর্ঘ্য

উৎপল শুভ্র

২৯ এপ্রিল ২০২১

ডেভ হোয়াটমোরকে বিদায়-অর্ঘ্য

এমন হাসিমুখেই বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিতে পেরেছিলেন ডেভ হোয়াটমোর, যে তৃপ্তি নেই তাঁর আগে-পরে আর কারও। ছবি: গেটি ইমেজেস

বাংলাদেশ থেকে আর কোনো ক্রিকেট কোচ এভাবে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বিদায় নিতে পারেননি। ‘সুযোগ পেলে আবারও হয়তো বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব নেব’—এটাও বলে যেতে পেরেছেন শুধু একজনই। ডেভ হোয়াটমোর।

প্রথম প্রকাশ: ১ জুন ২০০৭। প্রথম আলো।

রোড নম্বর ১০১, বাড়ি নম্বর ১৬, অ্যাপার্টমেন্ট নম্বর ১০৪, গুলশান-২। দরজা খুলে স্বাগত জানালেন ডেভ হোয়াটমোর। ‘স্যরি, পাওয়ার কাট’ বলে!

সোফায় চেইন খোলা বিশাল একটি ব্যাগ। মেঝেতে স্যুটকেস। হোয়াটমোর বাংলাদেশে তাঁর চার বছরের অধ্যায় শেষ করার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। পরদিন (আজ) দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইট তাঁকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে মেলবোর্নের পথে। পাঁচ মাস পর স্ত্রী-পুত্রের সঙ্গে দেখা হবে আবার। হোয়াটমোরের তর সইছে না।

যাওয়ার আগের দিন তুমুল ব্যস্ততা। চার বছর তো কম সময় নয়। কিছুটা হলেও শিকড় ছড়িয়েছে, সেসব উপড়ে ফেলা কম ঝামেলা নয়। আবার হয়তো নতুন কোনো দেশ, নতুন কোনো দল নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়া। এটাই তো পেশাদার ক্রিকেট কোচের জীবন।

পেশাদার তো বটেই, ডেভ হোয়াটমোর কঠোর বাস্তববাদীও। তারপরও বাংলাদেশে চার বছরের দিকে ফিরে তাকিয়ে তাঁকেও ছুঁয়ে যায় আবেগ। কত স্মৃতি, কত নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়, কত অজানা অভিজ্ঞতা...। ২০০৩ সালে বিশ্বকাপ ধ্বংসস্তূপ-উত্তর বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব নিতে যেদিন ঢাকায় পা রাখলেন, এই দেশটি সম্পর্কে কিছুই জানা ছিল না তাঁর। বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন আরেকটি বিশ্বকাপের পর। যে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ সুপার এইটে খেলেছে। হোয়াটমোর তাই বলতেই পারেন, ‘কিছুটা হলেও বোধহয় সাফল্য পেয়েছি।’

সেই সাফল্যের তৃপ্তি সঙ্গী হচ্ছে। সঙ্গী হচ্ছে হাজারো স্মৃতি। বাংলাদেশে চার বছরে সবচেয়ে বেশি কী ভালো লেগেছে? হোয়াটমোরের উত্তর, ‘শত সমস্যার মধ্যেও মানুষের সুখী থাকার ক্ষমতা। এই দেশে কত সমস্যা! অথচ ধনী-গরিব সবার মুখেই হাসি লেগে আছে।’ সবচেয়ে খারাপ লেগেছে কী—এ প্রশ্নের উত্তরও ঠোঁটের ডগায়, ‘ট্রাফিক জ্যাম আর পাওয়ার কাট।’

বাংলাদেশ দলের অনুশীলনে ডেভ হোয়াটমোর। ছবি: এএফপি

‘ধনী-গরিব’ সবার মুখেই যে হাসি দেখেছেন, সেটা হয়তো তিনি ডেভ হোয়াটমোর বলেই। গত কিছুদিনে হয়তো পরিস্থিতিটা একটু বদলেছে, কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার সময় বাংলাদেশ দলে যেকোনো ক্রিকেটারের চেয়েও বড় তারকা ছিলেন হোয়াটমোর। এর একটা অন্য দিকও ছিল। অ্যাপার্টমেন্টের দরজা দেখিয়ে হোয়াটমোর বললেন, ‘এটির বাইরে পা রাখার সময় আমাকে সব সময় মনে রাখতে হতো আমি একজন পাবলিক ফিগার। কী করি, কী বলি, তা নিয়ে খুব সাবধান থাকতে হতো।’

এ দেশের মানুষের কাছে ডেভ হোয়াটমোরের যে ‘দেবমহিমা’ ছিল, তার প্রমাণ তিনি নিজেও ভালোই পেয়েছেন। পাচ্ছেন বিদায়বেলাতেও। ব্যাগ খুলে একটা চিঠি দেখালেন। সাঈদ আহমেদ নামে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা লিখেছেন, ‘চার বছর বড় অল্প সময়। হোয়াটমোর, প্লিজ, আপনি আরও চার বছর থাকুন!’ বাংলাদেশ-ভারত সিরিজের সময় শেরাটন হোটেলে কে চিঠিটা তাঁর হাতে দিয়ে গেছে, ঠিক মনেও করতে পারেন না হোয়াটমোর। যত্ন করে চিঠিটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, ‘ক্রিকেটীয় সাফল্যের বাইরেও এসব পেতেই হয়তো কোচিংয়ে আছি।’

বাংলাদেশের অনেক কিছুই মিস করবেন। সবচেয়ে বেশি বোধ হয় গুলশান ১০১ নম্বর রোডের ১৬ নম্বর বাড়ির ১০৪ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টটা। ‘বাংলাদেশের চার বছরই আমি এখানে ছিলাম। এটা তাই অনেকটা নিজের বাড়ির মতোই হয়ে গিয়েছিল।’

গত চার বছরে এই অ্যাপার্টমেন্টেই সবচেয়ে বেশি সময় কেটেছে তাঁর। পরিবার-পরিজনহীন একা একা এই অ্যাপার্টমেন্টে নিঃসঙ্গ লাগেনি? ‘কপাল ভালো, আমি আমার নিজের সঙ্গ পছন্দ করি। টেলিভিশন ছিল একটা আশ্রয়—ইএসপিএন-স্টার স্পোর্টস, টেন স্পোর্টস।’ নিজেই রান্না করতেন, কখনো বা সহায় হতো হোম ডেলিভারি। অ্যাপার্টমেন্টের চারপাশে চোখ বুলিয়ে হোয়াটমোর অস্ফুটে বলেন, ‘ভালোই ছিলাম এখানে!’

বিকেলে ক্রিকেট বোর্ডের গুলশান অফিসে ঘরোয়া একটা বিদায় সংবর্ধনা নিতে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বের হলেন। হাতে একতাড়া ১০০ টাকার নোট। এগুলো কেন? বাংলায় হোয়াটমোরের উত্তর, ‘বকশিশ!’ ক্রিকেট বোর্ডে এসে পিয়নদের ডেকে ডেকে ‘বকশিশ’ দিয়ে বাংলাতেই বললেন, ‘দোস্ত, তোমার জন্য!’

ডেভ হোয়াটমোরের সঙ্গে খালেদ মাহমুদ (বাঁয়ে) ও হাবিবুল বাশার (ডানে), হোয়াটমোর অধিনায়ক হিসেবে পেয়েছিলেন এই দু্জনকেই। ছবি: এএফপি

বিদায় সংবর্ধনায় বাংলাদেশ দলের পক্ষ থেকে খেলোয়াড়দের সবার অটোগ্রাফে সাজানো একটা বাঁধানো জার্সি উপহার দেওয়া হলো। ক্রিকেট বোর্ড উপহার দিল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের একমাত্র টেস্ট জয়ের স্মারক—চট্টগ্রাম টেস্টের দু দলের খেলোয়াড়দের অটোগ্রাফ সংবলিত ক্রিকেট ব্যাট। এর বাইরেও কর্মকর্তাদের এঁর-ওঁর উপহার মিলিয়ে যা হয়েছে, তাতে সেসব হোয়াটমোরের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। জাহাজে করে তা মেলবোর্নে পাঠানোর ব্যবস্থা হচ্ছে।

ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তা-সদস্যদের বাইরে বিদায় সংবর্ধনায় উপস্থিত ছিলেন হোয়াটমোর-যুগের দুই বাংলাদেশ অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ ও হাবিবুল বাশার। কেক কেটে হোয়াটমোরকে খাইয়েও দিলেন হাবিবুল।

বাংলাদেশ থেকে আর কোনো ক্রিকেট কোচ এভাবে বিদায় নিতে পারেননি। ‘সুযোগ পেলে আবারও হয়তো বাংলাদেশ দলের দায়িত্ব নেব’—এটাও বলে যেতে পারছেন শুধু একজনই। ডেভ হোয়াটমোর।

আরও পড়ুন: ডেভ হোয়াটমোরের বিদায়ী সাক্ষাৎকার
 

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×