শুভ্রদার সঙ্গে পরিচয়ের দিনক্ষণ এখন আর মনে করতে পারি না। নিশ্চিত ক্লু একটা ছিল বটে। যখন থেকে মূলত টারজানের মায়া কাটিয়ে ইত্তেফাকের বদলে ঘরে ভোরের কাগজ রাখা শুরু হলো। কিন্তু আসল কথা হলো এই যে, তারিখ মনে নাই। সময়টার জন্য যে মনকে এত ডন বৈঠক আর আসন করাচ্ছি, তার কারণ কী আসলে? আমি কবে থেকে উৎপল শুভ্রকে চিনি, তা দিয়ে কী আসে যায়! কী মানে তৈরি করে? করে করে। মানে তো একটু আছেই। কোথাও যেন শঙ্খ বাজে, কোনো যে মানে নেই সেটাই মানে। আমার প্রায় ৪৭-এর জীবনের কতটা জুড়ে একজন দুইটি সুন্দর শব্দ হয়ে জড়িয়ে থাকলেন, তার আহ্নিক দাগ না থাক, বার্ষিকও কি থাকবে না? 

আচ্ছা ধরে নেই, সালটা ১৯৯৪। ২০ বছর বয়স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে নাম রেজিস্ট্রি আছে, তবে পড়ি কার্ল মার্কস আর তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব। বিভাগের লাইব্রেরি ঘরে গোটা ত্রিশেক কাগজ আসে রোজ। সবাই কত কী জেনে ফেলে সেসব পড়ে পড়ে। আমি সোজা খেলার পাতা, যেখানে উৎপল শুভ্র লেখেন। কখনো মোস্তফা মামুন। আমি তখন যা পড়ি, সেসবের অনেকগুলোতে এখনও দাঁত বসাতে পারি না। সেসময় কিন্তু দিব্যি পড়তাম, কিছুটা যেন বুঝতাম বলেও মনে করতাম। মজদুরের অধিকার আর পুঁজিবাদের ফাঁদের রূপ চিহ্নিতকরণ বাদ দিয়ে মুখ গুঁজে খেলার খবর পড়া বা গলা ফাটিয়ে হই হই করা আমার কমরেডদের কপালে ভাঁজ ফেলে দিত। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে, তাবড় সমাজতন্ত্রীরা রাতারাতি বুঝে ফেলেছেন লাল পতাকা, কড়া লাল বই তাদের জীবন বা যৌবন কতটা বর্ণহীন করে দিয়েছে। তাই তারা ছুটছেন পুষিয়ে নিতে, মেলা আর খেলা এইসব ভোরের বা আজকের কাগজ সেইসব বিচ্যুতদেরই শয়তানি। তারা বলতেন। আমিও মানতাম, কিন্তু জানতাম শওকত ওসমান। সেসময় তাকে বেইলি রোডের সাগর পাবলিশার্সে পাওয়া যেত মাঝে মধ্যে। আমাকে বলেছিলেন, ফাঁদে প্রবেশ সহজ, নিষ্ক্রমণ ঠ্যালা, বিপরীত কিচ্ছা কিন্তু রমনীর বেলা। 

খেলার মাঠে সেসময় অনেক কিছু নিয়েই মোহামেডান-আবাহনী চলে৷ ম্যারাডোনাকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার ফিফার ষড়যন্ত্র কি না, রোমারিও-বেবেতোর বানানো স্বর্গীয় মুহূর্তগুলো সত্ত্বেও ব্রাজিল আর আগের মতো নাই, সাম্প্রাস আর আগাসির সার্ভ-রিটার্ন, মাইকেল জনসনের জুতার দাম, ঘানার আবেদি পেলে ছাড়া ছেলে-বুড়া কারও কথাই ফুরায় না৷ এত কাছে এসেও আইসিসি না জিততে পারার ব্যথা সয়ে আমাদের ভাঙা হৃদয় তখন পাকিস্তান, ভারত আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কায় ভাগ ভাগ৷ ফেয়ারব্রাদার, ওয়াসিম আকরাম ঢাকা লিগে খেলেন, অথচ দাপট বেশি সামারাসেকারার৷ সেদিনের কথা যখন উঠলই, আরেকটা ঘটনা বলি, মোহামেডান শ্রীলঙ্কার পেসার গ্রায়েম ল্যাবরয়কে নিয়ে এল, নাসির আহমেদ নাসু উইকেটের এত পেছনে দাঁড়ালেন যে, গ্যালারি থেকে মনে হল আরেক পা পেছালেই বাউন্ডারির দড়ি৷ 

সব সময় মাঠে যাওয়া হতো না আমাদের, কারণ সরল, এখনকার মতোই পছন্দের সব খেলা ঢাকায় হতো না৷ ইন্টারনেট-পূর্ব সেই যুগ যে খ্রিস্টপূর্ব যুগের চেয়ে একটু এগিয়ে থাকত, মাঠে না গিয়েও আমরা যে গ্যালারির ওম পেতাম, কারণ আমাদের ছিলেন উৎপল শুভ্র, আর তাঁর দল৷ সেই সব অক্ষরের বিন্যাস তখন আমাদের চোখের সামনে লর্ডস, পার্থ, ফয়সালাবাদ, ফিরোজ শাহ কোটলা৷ আর কিছুদিনের মধ্যে ভাগের ডিশ এন্টেনা আসার পর আমরা বেশি খেলা দেখেছি, কিন্তু হেনরি ব্লোফিল্ড বা টনি গ্রেগের গলা ছাপিয়েও আমরা শুনেছি শুভ্রদাকে৷ সেসময় তাঁর সবচেয়ে বড় যে গুণ আমাকে আকর্ষণ করত, তা হলো তাঁর অনায়াস উইট আর কারও প্রতি খুব বায়াসড না থাকা৷ 

প্রথম আলোতে কাজ করার সুবাদে শুভ্রদাকে কাছ থেকে দেখেছি, খোঁজ পেয়েছি তার অজর গুণের৷ সেগুলোর কথা বলে যত আরাম, লিখে তত স্বস্তি নেই৷ যারা দেখেছেন তারা হয়ত একমত হবেন, শুভ্রদাকে এনালগ বা ডিজিটালি রেকর্ড করা দুঃসাধ্য। তা সে কলম-কিবোর্ডে হোক অথবা ক্যামেরা-টেপে৷ তিনি তাঁর মতো, তাঁরই মতো৷ এই যেমন কথা বলতে বলতে চোখের দিকে তাকালে বুঝবেন, আপনাকে শুনছেন, মাপছেন, নম্বর দিচ্ছেন, পছন্দ হলে নিজের জীবনে ঘটা স্মৃতি বা কথা খুঁজছেন, অপছন্দ করলে আর আপনার ভাগ্য ভালো হলে কাজের দোহাই দিয়ে চোখ সরিয়ে অন্য কিছু দেখতে থাকবেন৷ আর আপনার কথা অপছন্দ হলে আর আপনার ভাগ্যও যদি থাকে খারাপ, তাহলে আপনি সারাজীবন ওই ক্ষণটি মনে রাখবেন৷ 

শুভ্রদার মেজাজকে সবাই ভয় পেতেন কম-বেশি, এমনকি সম্পাদক মহোদয়ও; সবাইকে কম-বেশি এটা সেটা বললেও শুভ্রদাকে কিছু বলার সাহস হতো না তাঁর৷ প্রাক-টেলিভিশন সাংবাদিকতা যুগের সুপারস্টার শুভ্রদাকে ঘাঁটানো মানে হয় রেগেমেগে তাঁর ইঞ্জিনিয়ারিং পেশায় চলে যাওয়া, কমপক্ষে অন্য পত্রিকায় চলে যাওয়া ৷ এই ঝুঁকি বুদ্ধিমান সম্পাদক কেনইবা নিতে চাইবে? আবার এ কথাও সত্য যে, কাজের ক্ষেত্রে তিনি এতই সিনসিয়ার ছিলেন যে, তাঁকে কিছু একটা বলা তত সহজও ছিল না৷ 

খেলাধুলার সাংবাদিকতা তাই কয়েক গুণ বেশি কঠিন। বিশেষ করে লেখালেখি। বিষয়টা জানা, আর এরকম ঘটনা দুনিয়াতে আগেও ঘটেছে, আরও ঘটবে। কী সাংঘাতিক! আর মনে রাখবেন, যেসব কাজ দেখে বা শুনে মনে হয় আমরাও পারি, সেগুলোই বেশি কঠিন আসলে।

একটা মানুষ প্রফেশনে কতটা ডেডিকেটেড হতে পারেন, তা শুভ্রদাকে না দেখলে হয়ত কিছুটা বিশ্বাস হতে পারে, দেখলে আর কিছুতেই বিশ্বাস হতে চায় না। রিপোর্টার ছিলাম বলে অফিসের সময়ের কোনো আগা-মাথা ছিল না। সুযোগ পেলেই তাই খেলাধুলার ঘরে যেতাম। মূলত মামুন থাকলে তার সঙ্গে হাবিজাবি গল্প করতে। গল্পের চেয়ে বকুনি বেশি, খেলা বা সাহিত্যের চেয়ে পরচর্চা। আমাদের উচ্চকিত হাসির সঙ্গে তাল মেলাতে অনেকেরই তখন উঁকিঝুঁকি। শুভ্রদা আসতেন বিকেলের শুরুর দিকে। থমথমে মুখ। হাতে কোনো না কোনো কাগজ, বই বা ডায়েরি। তিনি এলেই আমি চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতাম। যে যার কাজে সিরিয়াস তখন। আমার আধখানা ততক্ষণে দরজার বাইরে। ভদ্রতা করে উৎপল শুভ্র বলতেন, 'বুঝছেন খালেদ, চাকরি-বাকরি আর ভালো লাগে না। কয়টা দিন যদি শুয়ে, বসে পড়ে আর খেলা দেখে কাটিয়ে দিতে পারতাম!'

প্রতিদিনই এই আক্ষেপ করতেন শুভ্রদা, আর প্রতিদিনই অতিমানবীয় নিষ্ঠায় কপির পর কপি এডিট করতেন, নিজে লিখতেন। বেশির ভাগ বড় খেলায় নিজে যেতেন। কত যে নিজেকে বকাবকি করেছেন কিচ্ছু হচ্ছে না বলে, দেশ-বিদেশের অগুণতি প্রেসবক্স সেসব মামলার রাজসাক্ষী।

তাঁর লেখা নিয়ে একটা কথা মনে পড়ল। নিজের লেখা শেষ করে বারান্দায় আবার রিভিশন দিতেন তিনি। এরকম দুয়েকদিন হয়েছে যে, আমাকেও পড়তে দিয়েছেন। মুখে অবশ্য বলছেন, 'দেখেন তো, লেখাটা কত খারাপ হয়েছে। ক্রিটিক্যালি দেখবেন, প্রশংসা করে আমার সময় নষ্ট করবেন না। আমি জানি, আমি ভালো লিখি, মানে ভালো লিখতাম, আজকেরটার আগ পর্যন্ত।' আমি তাঁর চোখে পড়ি, 'সহজ করেই লিখছি, দেখি তুই গান্ডু বুঝিস কি না।' এমনিতে আমি ভক্ত, তাঁর লেখা পড়তে ভালবাসি। কিন্তু পড়তে দিয়ে তাঁর চাউনিতে আমি বুঝতাম কনফিডেন্স। বুঝতাম, নিজের কাজের প্রতি তাঁর ভালবাসা আর সম্মান। 

দুনিয়াজুড়ে ক্রীড়ালেখকেরা কয়েকটি সাধারণ ভ্রমে আচ্ছন্ন থাকেন। মোটা দাগে দুই-একটা বলি। উপমার ব্যবহারে উপমান আর উপমিতের ধড়ে আর মুড়োতে হাসজারু সন্ধি। যেমন কোনো বোলার এত রান দিলেন যেন বড়লোকের বখাটে সন্তানের টাকা ওড়ানো। আবার ধরেন, এই কালের সঙ্গে সেই কালের তুলনা বা সর্বকালের সেরা সন্ধান। কিংবা অসংখ্য ক্লিশের ব্যবহার যেমন, চাপের-মুখে-সেরাটা-বের-করা, চওড়া-কাঁধে-দায়িত্ব, মায়াবী-জাদুকর বা মায়াজাল ইত্যাদি। তাই ক্রীড়ালেখকেরা অনেক সময়ই অনাকর্ষণীয়, মাত্রই সন্ধি-সমাস-অনুপ্রাস শেখা জুনিয়র হাই স্টুডেন্টদের রচনার প্রায়; লেখা সামনে এলে বলতে ইচ্ছে করে, নম্বর দিয়ে দিচ্ছি, পড়তে বলবেন না প্লিজ। 

খেলাধুলার সাংবাদিকতা তাই কয়েক গুণ বেশি কঠিন। বিশেষ করে লেখালেখি। বিষয়টা জানা, আর এরকম ঘটনা দুনিয়াতে আগেও ঘটেছে, আরও ঘটবে। কী সাংঘাতিক! আর মনে রাখবেন, যেসব কাজ দেখে বা শুনে মনে হয় আমরাও পারি, সেগুলোই বেশি কঠিন আসলে। উদাহরণ হিসেবে ফুটবল খেলা বা মান্না দের গানের কথা বলা যায়। আমরা অনেকেই এই সহজ কাজগুলা আসলে পারি না।

শুভ্রদায় ফেরত আসি। ওনার লেখায় কি ক্লিশে নাই? উনি কি তুলনায় কখনো গুলিয়ে ফেলেননি? বিশেষণে বা বিশেষণের অতিশায়নে কি তিনি সবসময় মিতব্যয়ী? সবগুলো প্রশ্নের উত্তর ধনাত্মক হলেও আমার চোখে তিনি এই সময়ের একমাত্র গদ্যলেখক, যাঁর প্রতিটা লেখা আমি টানটান হয়ে পড়ি। তাঁর লেখা উপভোগ করি, তাঁর বুদ্ধি, তাঁর বিবেচনা, তাঁর দেখার চোখ আর দেখানোর দুরবিন সবই আমার মতো অজস্র পাঠককে বিনি সুতায় আটকে রাখে।

শুভ্রদা এই চ্যালেঞ্জ নেন, নিয়েছেন, আশা করি নিতেই থাকবেন। প্রিয় প্রথম আলো ছেড়ে এসে স্বপ্নের জীবন যাপন করে আবার ফিরেছেন। ফিরেছেন নতুন কলম নিয়ে, ফিরেছেন মুকুটের মণিমাণিক্য নিয়ে। নিজেকে প্রকাশের এক মাসের মধ্যে চূড়া থেকে চূড়ায় উঠছেন। কানে কানে বলে রাখি, দশমাংশ মাত্র দেখা যাচ্ছে তার। এখনই এই জাদুকরের জন্য স্যালুট-হাততালি আর উৎপলশুভ্রডটকমে সবার নিমন্ত্রণ।

* খালেদ মুহিউদ্দীন: সাংবাদিক। বর্তমানে ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগের প্রধান।