এই টেস্টে ফল আনতে গেলে যে মহা-নাটকের দরকার পড়বে, তা বুঝতে গেলে মহাকাশবিদ্যায় পারদর্শী হতে হতো না। আর পাল্লেকেলে টেস্টের পঞ্চম দিনে ওসব নাটক-মহানাটকের কিছুই হলো না, উল্টো বৃষ্টিবাধায় খেলা সমাপ্ত হলো নির্ধারিত সময়ের বেশ আগেই। এবং অনুমিতভাবেই, বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা সিরিজের প্রথম টেস্টে জয়-পরাজয়ের নিক্তিতে আলাদা করা যায়নি কোনো দলকে।

উৎপলশুভ্রডটকমের ইউটিউব চ্যানেলে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা টেস্ট সিরিজের নিয়মিত আয়োজন শুভ্র.আলাপের আজকের শোর নাম ছিল তাই 'শেষ পর্যন্ত অমীমাংসাতেই শেষ', যাতে উৎপল শুভ্রর অতিথি ছিলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও ম্যানেজার গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। আগের দিন এনামুল হক জুনিয়র অতিথি হয়ে এসে জানিয়েছিলেন, অতীতে বহুবারই ব্যাটিং ধসের মুখে পড়ে হারতে হয়েছে বলে একটু হলেও পরাজয়ের শঙ্কা আছে তাঁর মনে। তাঁর কাছে শুভ্রর প্রথম প্রশ্নটাই তাই ছিল, টেস্টের শেষ দিনের খেলা শুরুর আগে তিনি কী ভাবছিলেন?

লিপু জানিয়ে দিলেন, শেষ দিনে কোনো নাটকীয়তার সম্ভাবনা তিনি দেখেননি, 'শেষ দিনে অসম্ভব কিছু হবে বলে আমার মনে হচ্ছিল না।' মনে হওয়ার কারণ উইকেট, আগে টেস্ট ম্যাচের উইকেট যেমন হতো, গত কিছুদিনে তা অনেক বদলে গেছে বলে একটু যেন আক্ষেপই করলেন লিপু, 'উইকেট তো আসলে কথা বলে, প্রতিদিনই কিছু না কিছু অবনতি হয় উইকেটের। প্রথম দিনে উইকেটের ক্যারেক্টার এক রকম থাকত, দুই-তিন নম্বর দিনে একরকম ভালো, চার নম্বর দিনে গিয়ে উইকেট ক্র‍্যাক করতে শুরু করেছে, ব্যাটসম্যানদের স্কিল দেখানোর সুযোগ এসেছে। ডে ফাইভে হয়তো একটা লড়াইয়ের চিত্র দেখতাম আমরা, একটা পক্ষ থাকত জেতার জন্য, একটা পক্ষ থাকত ম্যাচ বাঁচানোর জন্য। তো এই টেস্ট ম্যাচের যে চরিত্র ছিল, করুণারত্নের একটা এজ ছাড়া মোস্ট অব দ্য ব্যাটসম্যানই কিন্তু বল মিডল করেছে। মানেটা যা দাঁড়াচ্ছে, এখানে উইকেটের বাউন্স-পেস সম্পর্কে ব্যাটসম্যানরা সুনিশ্চিত, সুইং নেই, ফুটমার্কে ল্যান্ড করে দুয়েকটা ব্যতিক্রম টার্নও উল্লেখ করার মতো নয়। সব মিলিয়ে এটা তাই একটা ট্রু উইকেট। আগের চার দিনেও উইকেটের তেমন অবনতি হয়নি বলে পঞ্চম দিনে গিয়ে উইকেটের অবনতি হবে বলেও ভাবিনি আমি। ধরেই নিয়েছিলাম, কেউ যদি চরম বাজে কিছু না করে, তাহলে এই ম্যাচ থেকে ফলাফল বের করাটা কঠিনই হবে। সেই অনুযায়ীই সব হয়েছে।'

বৃষ্টিতে ভিজছে পাল্লেকেলের স্কোরবোর্ড। শেষ দিনের শেষ সেশনটা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে এই বৃষ্টি। ছবি: শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট

তবে তামিমের ক্যাচ নিয়ে রিভিউয়ের সময়টায় একটু টেনশনে ছিলেন তিনিও, 'তামিমের রিভিউয়ের সময় একটু ভয় লেগেছিল। পায়ে লেগে ক্যাচ হয়েছে কিনা তা যখন চেক করা হচ্ছিল, তখন শঙ্কা হয়নি, তা কথা বলব না। আমি বছরটা ভুলে গিয়েছি, তবে শ্রীলঙ্কায় গিয়েই আমরা ৩০ ওভারে অলআউট হয়ে গিয়েছি, এমন রেকর্ডও কিন্তু আছে (উৎপল শুভ্র তখন মনে করিয়ে দেন, সালটা ২০০৭। মাঠে যাওয়ার পরে আধঘণ্টা-চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই খেলা শেষ হয়ে গিয়েছিল) তবে সে উইকেটের চিত্রটা কিন্তু ভিন্ন ছিল। উইকেটে প্রাণ ছিল, বল মুভ করছিল। এখানে (পাল্লেকেলেতে) যেমন ব্যাটসম্যানদের জন্য ছিল, সেখানে বোলারদের জন্য ছিল। মাঝে দুর্ভাগ্যবশত দুটি উইকেট আমাদের পড়ে গেছে। নইলে হয়তো বিনা উইকেটে এরকম এক শর কাছাকাছি রানেই শেষ হতো। উইকেট পুরোই ব্যাটিং প্যারাডাইস ছিল। দুদলের ওপরের ছয়-ছয় বারো ব্যাটসম্যানের মোটামুটি আটজনই রান করেছে। মাত্র চারজনই ক্যাশ-ইন করতে পারেনি এ উইকেটের।'

যে চারজন ক্যাশ-ইন করতে পারেননি, তাঁদের মধ্যে সবার ওপরে থাকবেন সাইফ হাসান। প্রথম ইনিংসে আউট হয়েছিলেন শূন্য রানে, দ্বিতীয় ইনিংসে রানের মাত্র এক রানেই প্যাভিলিয়নে ফেরত এসেছেন স্টাম্পের বাইরের বলে ব্যাট পেতে দিয়ে।  অফ স্টাম্পের বাইরের বল তাড়া করতে গিয়ে উইকেট বিলিয়ে আসার দোষে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে নাজমুল হোসেন শান্তকেও। ব্যাটসম্যানদের মধ্যে টেস্ট মেজাজের ঘাটতিকেই এর জন্য দায়ী করছেন গাজী আশরাফ হোসেন লিপু, 'সাইফ যে বলটা খেলেছে, তা স্টাম্প থেকে মিনিমাম ৬-৮ ইঞ্চি দূরে ছিল। যদি টেস্টের মেজাজ থাকত, বলটা কম্ফোর্টেবলি ছেড়ে দেয়া যেত। তাসকিনের বলে করুণারত্নের যে রিভিউটা আমরা নিয়েছিলাম, বলটা কিন্তু স্টাম্প থেকে আধা ইঞ্চি কিংবা এক ইঞ্চির বেশি দূরে ছিল না। করুণারত্নে কিন্তু বলটা ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন।'

এ থেকে লিপু যা বোঝাতে চেয়েছেন, তা হলো ব্যাটিংয়ের সময় অফ স্টাম্প কোথায়, তা মনে রাখাটা খুব জরুরি। তা মনে রাখতে ১৯৯৭ সালে নিউজিল্যান্ডের ঘরোয়া ফার্স্ট ক্লাস টুর্নামেন্ট শেল ট্রফিতে খেলতে বাংলাদেশ যখন ওখানে গিয়েছিল, তখন বাংলাদেশের সাবেক কোচ গর্ডন গ্রিনিজের শেখানো একটা কৌশলের কথা মনে পড়ে গেল লিপুর, 'গর্ডন গ্রিনিজ আকরাম-বুলবুলদের একটা ড্রিল করানোর চেষ্টা করত। চোখ সামনের দিকে থাকবে, ব্যাট দিয়ে তোমার অফ স্টাম্প হিট করতে হবে। বলত, "তোমার পেছনেও একটা চোখ থাকতে হবে। ব্যাট লিফটের মাধ্যমে জানতে হবে, তোমার অফ স্টাম্প কোথায়, কত কাছে আছে!" গোল্লা (জাভেদ ওমর) আবার এটা নিয়ে বালবিন্দর সিং সিন্ধুর ১৯৮৩ বিশ্বকাপের ফাইনালের উদাহরণ দিয়ে খুব মজা করত (গ্রিনিজ বল ছেড়ে দিয়ে বোল্ড হয়েছিলেন)। শান্তদেরও এটা রপ্ত করতে হবে, কত বেশি বল ছাড়া যায়। এ প্রসঙ্গে জিওফ্রি বয়কটের একটা কথা আছে যে, অফ স্টাম্পের বাইরে বল করো। যদি ব্যাটসম্যান খেলে, তাহলে তোমার স্লিপ আছে, গালি আছে, তোমার অলওয়েজ এজ পাওয়ার চান্স আছে। যদি ব্যাটসম্যান ছেড়ে দেয়, তাহলে স্টাম্পের কাছে আসো, যাতে সে খেলতে বাধ্য হয়। আজকে সাইফের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, সে অফার করেছে। কারণ মানসিকভাবে সে ভালো অবস্থায় ছিল না। এখানেই তামিমের সঙ্গে তাঁর পার্থক্যটা বোঝা যায়।'

দ্বিতীয় ইনিংসেও ব্যর্থ সাইফ হাসান। ছবি: শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট

লিপু না তুললেও তামিম সংক্রান্ত আলোচনা কোনো না কোনো সময় উঠতই। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় তামিমের ব্যাটিং অ্যাপ্রোচ ঠিক ছিল কি না, সে ব্যাপারে দর্শক প্রান্ত থেকে প্রশ্ন যে আসবেই, তা বোধ হয় উৎপল শুভ্রও আগে থেকেই অনুমান করতে পেরেছিলেন। তামিম যে আজ দলীয় ৫২ রানের ভেতরেই ৫০ তুলে নিয়েছেন, সঙ্গে সঙ্গে তো একটি বিশ্ব রেকর্ডও গড়ে ফেলেছেন! ১৪৪ বছরের টেস্ট ইতিহাসে এত কম দলীয় সংগ্রহে ফিফটি নেই আর কারও। তামিমের আগে রেকর্ডটি ছিল দুজনের, ২০১৪ সালে ক্রিস গেইল দলীয় ৫৫ রানেই ফিফটি করে ভাগ বসিয়েছিলেন ১৮৯০ সালে জন লিয়ন্সের কীর্তিতে।

তামিমের প্রসঙ্গ তুলেই উৎপল শুভ্র জানিয়ে দিলেন, এই ব্যাটিং অ্যাপ্রোচটা তাঁর পছন্দ হয়েছে, 'আমি আজ শ্রীলঙ্কা যখন ব্যাটিং করছিল, তখনই আমার এক ফ্রেন্ডের প্রশ্নের জবাবে বলেছি, "তামিম যদি তামিমের মতো খেলে, তাহলে বাংলাদেশ হারবে না। কিন্তু তামিম যদি ডিফেন্সিভ খেলে, তাহলে হেরেও যেতে পারে।' সেকেন্ড ইনিংসে সবাই যেখানে ডিফেন্সিভ ব্যাটিংটাই আশা করে, সেখানে তামিম উইকেটে এসে যে অ্যাপ্রোচে ব্যাটিং করেছে, তা আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে।'

এ ধরনের উইকেটে তামিমের ব্যাটিংকে ভালো রাস্তায় গাড়ি চালানোর সঙ্গে তুলনা করে লিপু বলেন, 'কম্পারেটিভলি তামিমের ব্যাটিং আজকাল কিছুটা স্লো হয়ে গিয়েছে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে রিফ্লেক্স কমতে থাকে, অভিজ্ঞতা বাড়ে, সাবধানী হতে হয়, নানা কারণেই মানুষকে স্লো হতে হয়। আবার ভালো কোনো রাস্তা পেলে মানুষ কিন্তু হাই স্পিডে গাড়ি চালাতেই পছন্দ করে, এখানেও (পাল্লেকেলেতে) সম্ভবত তা-ই ঘটেছে। তবে আমি ডাউন দ্য উইকেটে এসে মারার কনসেপ্টের পক্ষপাতী ছিলাম না। কারণ, উইকেটে একটা গুড়া থাকতে পারত, ছোট্ট একটা কণা থাকতে পারত। কপাল খারাপ থাকলে সেখানে বলটা পড়ে দেড়-দুই ইঞ্চি টার্ন করলেই কিন্তু ভিন্ন কিছু হতে পারত। তবে তামিম যে খুব বেশি ডিফেন্সিভ খেলবে না, এটা আমার মগজে ছিল। এত ভালো উইকেটে শট খেলতে, লুজ বল পেলে খেলতে সে যে হেজিটেট করবে না, এটা আমার নলেজে ছিল। আর তামিম যখন ডাউন দ্য উইকেটে এসে দুটো ছয় মারল, তা দেখেও কিন্তু কী পরিমাণে আত্মবিশ্বাস জমা আছে ওর ভেতরে, তা-ও বোঝা গেছে।'

এই ছবিটা তামিমের ইনিংসটা বোঝাতে একটুও সহায়ক নয়। ছবি: শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট

ড্র টেস্ট ম্যাচেও মনস্তাত্ত্বিক জয়ের একটা বিষয় থাকে। সেখানে কে জিতল? প্রথম ইনিংসে লিড নেওয়ার কারণে শ্রীলঙ্কা নাকি দ্বিতীয় ইনিংসেও ভালো করায় বাংলাদেশ? প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের চেয়ে একটু বেশি সময় ব্যাটিং করেছে বলে লিপু শ্রীলঙ্কাকেই হয়তো একটু এগিয়ে রাখতে চাইলেন। তবে তা দ্বিতীয় টেস্টের জন্য নির্ধারক হয়ে দাঁড়ানোর মতো এমন কিছু নয়। বাংলাদেশের একাদশে সাদমানকে না দেখে বিস্ময়ের কথা জানালেন লিপু, প্রশংসা করলেন তাসকিনের বোলিংয়ের। এই টেস্ট ম্যাচ নিয়ে আরও এত কথা হয়েছে যে, সব লিখতে গেলে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটার সম্ভাবনা আছে। কথা তো শুধু টেস্ট নিয়েই নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেট, ক্রিকেট বোর্ড, কোচ রাসেল ডমিঙ্গো, মুমিনুলের অধিনায়কত্ব, তিন ফরম্যাটে তিন অধিনায়কের যৌক্তিকতা এমন আরও কিছু নিয়েই না কথা হয়েছে। দর্শকের প্রশ্নও তো শুধু এই টেস্টেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সব জানতে হলে আসলে আপনাকে ইউটিউবে ভিডিওটা দেখে নিতে হবে।