এনামুল হক জুনিয়র নিয়ে কথা হবে, আর সেখানে ২০০৫ সালের জিম্বাবুয়ে সিরিজ আসবে না, তা হয় নাকি! উৎপলশুভ্রডটকমের ইউটিউব চ্যানেলে শনিবারের শুভ্র.আলাপে অতিথি হিসেবে আসা এনামুলকে অনুমিতভাবেই ফিরে যেতে হলো সেই সিরিজে। চট্টগ্রাম প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে উইকেট পাননি, দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়ে তিনিই বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের নায়ক।

এতেই রেকর্ড হয়ে গিয়েছিল একটি। সেই সময়ে সবচেয়ে কম বয়সের ইনিংসে ৫ উইকেট নেয়ার রেকর্ড, এর আগে ছিল ওয়াকার ইউনিসের। চট্টগ্রামে ভেঙেছিলেন ওয়াকারের রেকর্ড, ঢাকায় পরের টেস্টে আরেক 'ডব্লিউ' ওয়াসিম আকরামের। এবারের রেকর্ড সবচেয়ে কম বয়সে ম্যাচে ১০ উইকেট নেওয়ার, যা এখনো ভাঙতে পারেনি কেউ। শুধু উইকেটই নেননি, এনামের বোলিংয়েও ছিল ক্লাসিক্যাল বাঁহাতি স্পিনারের প্রতিচ্ছবি। ফ্লাইটের মায়াজাল, লুপ-ড্রিফট...স্পিন বোলিংয়ের ওই প্রদর্শনী দেখে কেমন মুগ্ধ হয়েছিলেন, সবিস্তারে তা বললেন উৎপল শুভ্র। বললেন চট্টগ্রাম টেস্টের পর মোহাম্মদ রফিককে নিয়ে একটা ঘটনাও। ম্যাচশেষে সংবাদ সম্মেলেন উৎপল শুভ্র মোহাম্মদ রফিককে বলেছিলেন, 'এনাম আর আপনি (রফিক) তো দুই রকম। এনামের বলে অনেক বেশি ফ্লাইট, অনেক বেশি লুপ, ডিপ… আপনি তো জোরের ওপরে বল করেন...' তো পুরোটা বলা শেষে রফিকের অভিমত জানতে চাইলে তিনি তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গিমায় বলেন, 'আরে, ওর অল্প বয়স তো! সময় দেন, ঠিক হয়ে যাইব!' যেন এনামের বোলিংয়ে ফ্লাইট-লুপ এগুলো আসলে সমস্যা, তা ঠিক করাটা জরুরি।

কিন্তু যাঁর বলে এত বৈচিত্র্য ছিল, পরের বছর ফতুল্লা টেস্টে বাঁহাতি স্পিনারের জন্য স্বপ্নের এক ডেলিভারিতে মাইকেল ক্লার্ককে যিনি বোল্ড করেছিলেন, বয়স ২৬ না পেরোতেই কেন শেষ হয়ে গেল তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ার? প্রশ্নটা করার পর নিজের পর্যবেক্ষণের কথাও বললেন উৎপল শুভ্র। এনামের পরের দিকের বোলিং দেখে তাঁর মনে হয়েছে, এনাম আসলেই 'ঠিক হয়ে গিয়েছিলেন' রফিকের কথামতো। ওয়ানডে দলে ঢোকার জন্য বলের ফ্লাইট-লুপ কমিয়ে জোরে বল করার দিকে মন ঘুরে গিয়েছিল তাঁর। উৎপল শুভ্রের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়েই এনাম বলতে শুরু করেন তাঁর আক্ষেপের কথা, 'হান্ড্রেড পারসেন্ট এগ্রিড দাদা। খুব ফ্রাস্ট্রেটেড ছিলাম একটা সময়। আমার মনে আছে, (২০০৭) বিশ্বকাপের আগে আগে ১৩ মাস কোনো খেলা ছিল না। ওয়ানডে দলে ছিলাম না, 'এ' দলে খেলছিলাম। সবাই বলাবলি করছিল, আমার নামের পাশে টেস্ট বোলারের তকমা লেগে গেছে। ওয়ানডে দলে খেলতে হলে বলের গতি বাড়াতে হবে। তখন থেকেই আমার বলের রিদমটা চেঞ্জ হতে শুরু করে।'

২০০৬ সালে ফতু্ল্লা টেস্টে মাইকেল ক্লার্ককে বোল্ড করে দেওয়া সেই ড্রিম ডেলিভারি। ছবি: এএফপি

এটা যে ভুল পথে যাত্রা, তা বলার মতো কেউ ছিল বলেও আক্ষেপ করলেন এনাম, 'এখন যেমন প্রত্যেকটা ছেলে, প্রত্যেকটা টিমের সাথে মেন্টর আছে, স্পিন কোচ আছে; টু বি অনেস্ট, তখন আমার কোনো মেন্টর ছিল না। সাকিব এখন হয়তো বা নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার, তবে সালাউদ্দিন ভাই কিন্তু এখনো ওকে খেয়াল করে, পার্থক্যগুলো লক্ষ্য করে। আমার দিকে নজর দেওয়ার মতো কেউ ছিল না তখন। "এনাম, তোমার কিন্তু অনেক কিছু চেঞ্জ হচ্ছে। এরকম করা দরকার," বলার মতোও কেউ ছিল না আমার। এজন্য হয়তো বা বুঝিনি, আমার কী চেঞ্জ হচ্ছে। আমি আসলে মানসিকভাবে অনেক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম তখন, অনেক কিছু চেঞ্জ করতে গিয়ে পুরোটাই চেঞ্জ হয়ে যায় আসলে।'

এনামুলের পরের গল্পটা আসলে খুব দ্রুতই বলে ফেলা যায়। ওয়ানডেতে তো নিয়মিত হতে পারেনইনি, অনিয়মিত হয়ে পড়েন টেস্ট দলেও।২০০৯ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়ে এক ম্যাচই খেলেছিলেন, তাতে পেয়েছিলেন তিন-তিন ছয় উইকেট। শুভ্র মনে করেছিলেন, এনামের ক্যারিয়ারের বোধ হয় পুনর্জন্ম হলো। আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখেছিলেন এনামও, 'তখন আমিও মনে করেছিলাম। সাকিবের কাছে এজন্য আমি আসলে কৃতজ্ঞ, ও আমাকে অনেক রেট করেছিল (মাশরাফির ইনজুরিতে সাকিব তখন অধিনায়ক)। আমাকে অনেক হেল্পও করেছিল। জেমি সিডন্সও ভেবেছিল, সাকিবের পাশে সেকেন্ড একজন স্পিনার ও পেয়ে গেছে। আমি কিন্তু ওয়ানডেও খেলেছিলাম তখন...'

সাকিবকে বল করছেন এনামুল। ছবি: টাইগার ক্রিকেট

কিন্তু কোচ-অধিনায়কের দৃষ্টি কাড়ার পরেও যে এনামের ক্যারিয়ারটা গতি পেল না, একে অদৃষ্টের পরিহাস ছাড়া আর কিছুই বলার সুযোগ নেই তাঁর। গ্রেনাডায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেলে পরের বার জাতীয় দলের সাদা জার্সি গায়ে তোলার আগে অপেক্ষা করতে হয়েছে চার বছর। মাঝের সময়টায় তাঁর আততায়ী রূপে হাজির হয়েছিল ইনজুরি। এনামই যেমন বলছেন, 'তখন আমার হ্যামস্ট্রিংয়ের ইনজুরি ছিল, ২০১০ সালে আমার ইংল্যান্ডে যাওয়ার কথা ছিল, তখন আঙুলে ফ্র‍্যাকচার হলো। ২০১৩ সালে জিম্বাবুয়ে গিয়ে তিনটা উইকেট পেয়েছি। কিন্তু ওই টেস্টের রেজাল্টটা যদি অন্যরকম হতো, আমরা জিতে গেলে আমার ক্যারিয়ারটা ঘুরলেও ঘুরতে পারত।'

যাক, সেসব ধূসর অতীত। এরপরও ঘরোয়া ক্রিকেটে এনাম দাপুটে পারফরম্যান্স দেখিয়ে যাচ্ছেন নিয়মিতই। বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারিরর তালিকায় আবদুর রাজ্জাকের পরের নামটা‌ও তাঁর। বয়সটাও সবে ৩৩ পেরোল বলে এনামের জাতীয় দলে ফেরার আশা একদমই শেষ হয়ে যায়নি বলে মনে করছেন উৎপল শুভ্র। এনামও কি তেমনটাই ভাবেন? এনাম ইতিবাচক উত্তরই দিচ্ছেন, 'হ্যাঁ, প্যানডেমিকের আগে আমিও ভেবেছিলাম, আবার কামব্যাক করব। সত্যি বলতে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটটা এ কারণেই খেলে যাচ্ছি এখনো। নইলে ফার্স্ট ক্লাসের এখনো যেই সুযোগ-সুবিধা, সেখানে খেলে আমার সংসার কিন্তু চলবে না। ক্রিকেট খেলাটা এনজয় করি অবশ্যই, তবে এখনো স্বপ্ন দেখি, টেস্ট ক্যারিয়ারটা সুন্দরভাবে শেষ করতে পারব। আমি যদি পারফর্ম করে যেতে পারি, হয়তো বা কোনো একটা সময় নান্নু (প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন) ভাইয়ের মন গলবে। মনে হবে, "দেখি না ছেলেটাকে একটা সুযোগ দিয়ে!"

আর কি কখনো হাতে উঠবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এমন সিরিজ-সেরার পুরস্কার? এনাম আশাবাদী। ছবি: এএফপি

নিজেকে তাই জাতীয় দলের জন্য প্রস্তুতও রাখছেন সবসময়। বলছেন, 'রাতে যেদিন আমার ঘুম হয় না, আমি নিজে নিজে খেলি এখনো মনে মনে। এমন পজিশনে আমি কী বোলিং করতাম, ভাবি। লাস্ট যে টেস্টটা আমরা হারলাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে, বিশেষ করে চট্টগ্রামে, আমার মনে হয়, আমি খেললে হয়তো বা দলকে জেতাতেও পারতাম। এই আশাতেই তাই আছি, কোনো একদিন সুযোগ পাব।'