বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্য্যটাস পাওয়ার পর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে ট্যুর করতে এসেছে ইংল্যান্ড। খেলোয়াড়-কোচ-কর্মকর্তাদের সে বহরে যুক্ত হয়েছেন সেই দেশের বহু নামী ক্রীড়া সাংবাদিক, যাঁদের মধ্যে আছেন উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালম্যানাকের তৎকালীন সম্পাদক ম্যাথু অ্যাঙ্গেল। এনামুল হক নামটির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটল তখনই।

একটু বিস্ময়াভিভূত হয়েই অবশ্য। হবেন না-ই বা কেন! তিনি যে দেশ থেকে এসেছেন, সে দেশে ২০-২১ বছরে কোনো ক্রিকেটারের টেস্ট অভিষেক হলেও তাঁকে 'কিড' বলে সম্বোধন করে সংবাদ মাধ্যম। বাংলাদেশে এসে দেখলেন, ১৬ বছর ৩২০ দিন বয়সী এনামুল হক বলে এক বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিনারকে টেস্ট খেলতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে!

তাঁকে ঘিরে ম্যাথু অ্যাঙ্গেলের কৌতূহল তাই আর ফুরোয় না। গিয়ে ধরলেন পূর্ব পরিচিত উৎপল শুভ্রকে। পরিচয়ের সূত্রও উইজডেন অ্যালম্যানাক। ১৯৯৭ সাল থেকে যেটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেব শুভ্র। তাঁর কাছ থেকে এই-সেই প্রশ্নে বিস্তারিত জেনে নিলেন এনাম সম্পর্কে, কিন্তু সব জেনেও বিস্ময়টা কাটেনি অ্যাঙ্গেলের। বয়স ১৭ হওয়ার আগেই একটা ছেলে টেস্ট ক্রিকেটে বল করছে এবং এত ভালো বল করছে! ছেলেটার বয়স আদপেই ১৭-এর কম কি না, প্রশ্নটা খচখচ করছিল তাঁর মনে। বিদেশি সাংবাদিকের এই নির্দোষ উৎসাহ উৎপল শুভ্র মেটালেন এই বলে, 'দেখো, আমাদের জন্য বার্থ সার্টিফিকেটটা অত ম্যান্ডেটরি না। পরীক্ষার সময় হয়তো স্যাররা কোনো একটা বসিয়ে দেয়, বয়সভিত্তিক দলে খেলতে গেলে পাসপোর্ট করার সময় ক্রিকেট বোর্ড হয়তো কোনো একটা জন্ম-সাল দেয়। বয়সটা ছয় মাস-এক বছর এদিক-ওদিক একটু হয়েই থাকে।'

মজাটা হলো এর পরের বছর। উইজডেনে ওঠা অনেক রেকর্ডের ভিড়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল নবম সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে এনামের টেস্ট খেলার কীর্তিও (২০১৯ সালে নাসিম শাহ তাঁকে নামিয়ে দিয়েছেন এক ধাপ), তবে রেকর্ডের নিচে একটা পাদটীকা জুড়ে দেওয়া হয়েছিল ঠিকই, 'স্থানীয় কিছু মানুষ মনে করেন, বয়সটা ছয় মাস-এক বছর এদিক-সেদিক হলেও হতে পারে।' সব দেখে-টেখে উৎপল শুভ্র মনে মনে বিড়বিড় করলেন, 'হায় রে! তোকে কি লেখার জন্য আমি কথাটা বলেছিলাম!'

তবে নজর কাড়ার জন্য সেই টেস্টে এনামের ভালো বোলিং না করলেও চলত। রোদচশমা পরে বল করতে এসেই তো সবার নজর কেড়ে নিয়েছিলেন তিনি। এনামকে নিয়ে অ্যাঙ্গেলের আগ্রহটা তাই আরও বেড়ে গিয়েছিল। শনিবারের শুভ্র.আলাপে এসে এনাম জানালেন, সানগ্লাস পরে বোলিং করার আসল রহস্য, 'টেস্টের আগে আমার চোখে অ্যালার্জিক রিয়্যাকশন হয়েছিল। টেস্ট ক্যাপ দেওয়ার সময় আমাকে যদি লক্ষ্য করে থাকেন, দেখবেন, আমার চোখগুলো ফোলা ফোলা ছিল। আমাকে তখন আমাদের ট্রেনার বলল, "তুমি আমার সানগ্লাসটা ইউজ করো।" তখন থেকেই আমার সানগ্লাস ইউজ করতে শুরু করা আরকি।'

রোদচশমা পরে বল করাটা এনামুলের সমার্থকই হয়ে গিয়েছিল। ছবি: এএফপি

ওই সিরিজেরই পরের টেস্ট নিয়ে আরও একটি মজার স্মৃতি আছে এনামের। কখনো, কোথাও না বলা সে স্মৃতিটাই উঠে এলো উৎপল শুভ্রের সঙ্গে আলাপচারিতায়। তাঁর ভাষ্যে, 'চট্টগ্রামে তো সেকেন্ড টেস্ট হয়েছিল। তো আমি যখন ব্যাট করতে নামি, অ্যাবডোমিনাল গার্ড নিইনি। তিন বল খেলে ফেলার পরে আমার মনে হয়, গার্ড পড়িনি। তো আম্পায়ার আলিম দারের কাছে গিয়ে বললাম, "আমি তো গার্ড পরিনি।" আমি তো তখন বাচ্চা ছেলে, আমাকে ঝাড়ি দিতে শুরু করেছেন উনি। শর্ট লেগে দাঁড়িয়ে ছিলেন নাসের হুসেইন, সব কথা শুনছিলেন। উনিই আমাকে বললেন, "হাত দিয়ে দেখানোর দরকার নাই। তোমাদের টুয়েলভথ ম্যানকে ডাকো আগে।" তখন আমাদের টুয়েলভথ ম্যান (মনিরুজ্জামান) মনি ভাই, আমরা ডাকতাম তামা ভাই। উনাকে ডাকলাম, ডেকে গার্ডটা নিলাম। স্লিপে তো তখন খুব হাসাহাসি, নাসের হুসেইন শর্ট লেগ থেকে হাসছিল। বলছিল, "এটা স্কুল ক্রিকেট নাকি! এটা টেস্ট ক্রিকেট। তুমি ব্যাট করতে আসছ, গার্ড আনো নাই!" বাচ্চা ছেলে তো, খুব লজ্জা লাগছিল তখন।'

এখানটায় এসে হাসতে হাসতে উৎপল শুভ্র যোগ করেন, 'আসলে তোমার তখন বলা উচিত ছিল, "আরে, তোমাদের যা বোলার, তাতে আমার অ্যাবডোমিনাল গার্ড লাগবে বলে মনে হয়নি। এখন আমার পার্টনার পীড়াপীড়ি করছে বলে নিচ্ছি।"