তিনি নিজে বাঁহাতি স্পিনার, তার ওপর এখনো অব্যাহত খেলোয়াড়ি জীবন দুই দশকেরও বেশি, বাংলাদেশের অন্য বাঁহাতি স্পিনারদের সম্পর্কে জানার জন্য তাঁর চাইতে ভালো আর কজনকেই বা পাওয়া যাবে! বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা টেস্ট সিরিজে উৎপলশুভ্রডটকম-এর নিয়মিত আয়োজন শুভ্র.আলাপের শনিবারের শো-এর অতিথি এনামুল হক জুনিয়রকে তাই এ প্রশ্নের মুখেই ফেলে দিলেন উৎপল শুভ্র। তাঁর আগে-পরের ও সমসাময়িক চার বাঁহাতি স্পিনারকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন তিনি?

এনামুল হক মনি, মোহাম্মদ রফিক, সাকিব আল হাসান ও আবদুর রাজ্জাক, প্রত্যেকের বোলিং নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন এনামুল হক। তাঁর মুখেই না হয় শুনুন: 

এনামুল হক মনি

এনামুল হক মনির খুব বেশি ম্যাচ আমার দেখা হয়নি। তবে যতটুকু দেখেছি, ফ্লাইট, আস্তে বল করা মিলিয়ে তাঁকে ট্র্যাডিশনাল লেফট আর্ম স্পিনারই মনে হয়েছে। সত্যি কথা বলতে, আমার লেফট আর্ম স্পিন বোলিংটা তাঁকে দেখেই শেখা, ফ্লাইট দেওয়াটাও তাঁর থেকেই শিখেছি। আমি এনামুল হক জুনিয়রও তো হয়েছি ওনার কারণেই।

মোহাম্মদ রফিক

রফিক ভাইয়ের যে জিনিসটা হলো, তিনিই শিখিয়েছেন, আপনার যদি লাইন-লেংথ ভালো থাকে, বলে টার্ন না থাকা সত্ত্বেও ইউ ক্যান বি সাকসেসফুল। আমার বলের লাইন-লেংথ ভালো থাকলে বলে খুব বেশি কাজ দরকার নাই, আমি ওসব ব্যবহার করেই এক শটা (টেস্টে রফিকের ১০০ উইকেট) উইকেট নিতে পারব, সাকসেসফুল হতে পারব। শুধু বাংলাদেশকেই নয়, ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটকেই রফিক ভাই এটা শিখিয়েছেন যে, জায়গামতো বল রাখতে পারলেই আমি উইকেট পাব। ধৈর্যের খেলাটাও রফিক ভাইয়ের কাছেই শিখেছি।  

 ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টের এই ছবিতে হাবিবুল বাশার ও মাশরাফি বিন মুর্তজার সঙ্গে আছেন দুই বাাঁহাতি স্পিনার মোহাম্মদ রফিক ও এনামুল হক জুনিয়রও। ছবি: মীর ফরিদ/এপি

সাকিব আল হাসান

সাকিব তো সাকিবই। এখনকার না, তখনকার সাকিব। তখনকার সাকিব এই জন্যে বলছি, সাকিব যখন প্রথম এসেছিল, ওর দুর্দান্ত ভ্যারিয়েশন ছিল। স্পিনের বিপক্ষে মাহেলা (জয়াবর্ধনে) তো টপ ক্লাস ব্যাটসম্যান। আমার মনে আছে, পুরোপুরি ফর্মে থাকা মাহেলাও ওর অ্যাগেইনস্টে স্ট্রাগল করছিল। ওকে ডিফেন্স করবে, নাকি ছাড়বে, এমন একটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গিয়েছিল মাহেলা। কারণ, সাকিবের তখন এমন একটা বল ছিল, সেইম অ্যাকশনে সেইম জায়গায় পড়ে একবার ঘুরত, একবার ভেতরে ঢুকত। আমরা এমনও বলতাম, সাকিব নিজেও জানে না, কোন বলটায় কী হবে। ওই সাকিবকে আমি এখনো খুঁজি। হয়তো টি-২০ ক্রিকেট বা অন্য কোনো কারণে সাকিবের ওই বলটা চেঞ্জ হয়ে গেছে এখন। তবে সাউথ আফ্রিকায় গিয়ে ও যে ৬ উইকেট পেয়েছিল, জ্যাক ক্যালিস-এবি ডি ভিলিয়ার্সের বিপক্ষে যে বলগুলো করেছিল, ওরা পর্যন্ত স্ট্রাগল করছিল সাকিবের অ্যাগেইনস্টে। ওই সাকিবকে বাংলাদেশের ওয়ান অব দ্য বেস্ট লেফট আর্ম স্পিনারই বলব আমি। ওর বলে ডিফেন্স করাটা দুরূহ ছিল তখন। মাঠে খেলি কিংবা না খেলি, সে সময়ের সাকিবের বল আমি খুবই এনজয় করতাম, ওই সাকিবকেই আমি বেশি ফলো করতাম।

হয়তো বা ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট খুব বেশি খেলে না, এ কারণে ওর বোলিংয়ের রিদমটা নষ্ট হয়ে থাকতে পারে এখন। তবে ও যদি লাল বলের ক্রিকেটে কনসেনট্রেট করে, ওর সেই বলটা ফেরত আসতে খুব বেশি সময় না-ও লাগতে পারে। কারণ সাকিব খুবই স্মার্ট ক্রিকেটার। ওর কী করা উচিত বা কী করতে হবে, এটা সাকিব খুব ভালো করেই জানে।

আবদুর রাজ্জাক রাজ

রাজ ভাইয়ের কথা যদি বলি, তাঁর লাল বলের খেলাটা, লাল বলের ক্যারিশমাগুলো কিন্তু অনেক পরে এসেছে। কিন্তু তখন ওয়ানডেতে রাজ ভাই ছিল ওয়ান অব দ্য বেস্ট লেফট-আর্ম স্পিনার। একদিক থেকে রাজ ভাইকে আনলাকিই বলব আমি। কেননা যখন উনি লাল বলের বোলিংটা শিখে গেছেন, বা কীভাবে লাল বলে বল করতে হয় তা বুঝে গেছেন, তখনই আর টেস্ট খেলার সুযোগ পাননি তিনি। বিসিএলে এক টিমে খেলার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, লাল বলে কীভাবে বল করতে হয়, কোন পেসে বল করতে হয়, কোন ব্যাটসম্যানকে কোন জায়গায় কীভাবে বল করতে হয়, সব রপ্ত করে ফেলেছিলেন উনি। আর ওনার ভ্যারিয়েশনের কারণে ঘাসের উইকেটে পাঁচ উইকেট আছে তাঁর।

জানি না, কী জন্য উনাকে খেলানো হয় নাই, তবে বাংলাদেশ লাল বলে রাজ ভাইয়ের প্রাইম টাইমটাই মিস করেছে সম্ভবত। ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসেও লাল বলে আমাদের অনেক ম্যাচ জেতাতে পারতেন তিনি। লাল বলের বোলিংটা শিখে যাওয়ার পরও রাজ ভাইকে আমরা ইউজ করতে পারিনি, এটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যই একটা স্যাড স্টোরি। 

'পাল্লেকেলেতে রান উৎসব' শিরোনামে আলাপ শুরু হলেও শুভ্র.আলাপে এনামুল হক জুনিয়রের সঙ্গে উৎপল শুভ্রর আলোচনা গড়িয়েছে এ ডাল থেকে ও ডালে। ইউটিউবে পুরো ভিডিওটাই দেখতে পারেন।

আর শুধু চার বাঁহাতি স্পিনার নিয়ে এনামের ভাবনাটুকু শুনতে এবং দেখতে পারেন এখানে: