টেস্টের চার দিন চলে গেছে, এক ইনিংস করেই শেষ হয়নি এখনো। পঞ্চম দিনেও এক দলের প্রথম ইনিংস চলবে। কারণ দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং করতে নামা দল এখনো পিছিয়ে ২৯ রানে এবং হাতে আছে ৭ উইকেট। এরপরও যদি পাল্লেকেলে টেস্টে রেজাল্ট হয়, তাহলে এটিকে মহানাটকীয় বললেও মনে হয় কম বলা হবে। 'মহা মহা মহানাটকীয়' বলে হয়তো বা বিস্ময়ের মাত্রার কিছুটা প্রকাশ করা যাবে।

উৎপলশুভ্রডটকমের ইউটিউব চ্যানেলে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা টেস্ট সিরিজের নিয়মিত আয়োজন শুভ্র.আলাপের আজকের শোর নাম ছিল তাই 'পাল্লেকেলেতে রান উৎসব', যাতে উৎপল শুভ্রর অতিথি ছিলেন জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার এনামুল হক জুনিয়র। টেস্ট তো ড্র-ই হচ্ছে, আলাপের শুরুটা হলো এই প্রসঙ্গ দিয়ে। অনুমিতভাবে ড্রয়ের সম্ভাবনা বেশি দেখলেও এনামুলের মনে একটু ভয় আছে। কারণ হিসেবে টেনে আনলেন দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটিং ধসের অতীত ইতিহাস। তাঁর মতে, 'সেকেন্ড ইনিংসের হিস্ট্রি কিন্তু কখনোই ভালো নয় আমাদের। এখন তো মনে হচ্ছে, এই যে খেলার মাঝে মাঝে এত বিরতি পড়েছে, প্রথম দিনের পর দ্বিতীয় দিনে আমরা একটু স্লো খেলেছি, এগুলোই আমাদের অনেক এগিয়ে দিয়েছে। কারণ আমাদের মাথায় কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসের ভয় কিন্তু সবসময়ই থাকে।'

উৎপল শুভ্রও উড়িয়ে দিতে পারলেন না এনামের এই শঙ্কাকে। বছর চারেক আগেই নিউজিল্যান্ডে প্রথম ইনিংসে ৫৯৫ রানে ডিক্লেয়ার করেও হেরেছে বাংলাদেশ, এই স্মৃতি যে ভোলেননি তিনি। নইলে এই টেস্ট যে ড্রয়েই শেষ হচ্ছে, এ নিয়ে সর্বস্ব বাজি ধরে ফেলতেও আপত্তি ছিল না তাঁর। 

এ তো গেল ভবিষ্যতের কথা, কিন্তু চতুর্থ দিন পর্যন্ত টেস্টে যা হয়ে গেল, তা দেখে কী মনে হচ্ছে দুজনের? বাংলাদেশের বোলাররা আরেকটু ভালো বল করতে পারতেন কি না? প্রশ্নটা করার আগে নিজের মনে উঁকি দিয়ে যাওয়া ভাবনাটাও জানিয়ে দিলেন উৎপল শুভ্র। এই টেস্টের সঙ্গে ২০১৩ সালের গল টেস্টের যে অনেকাংশেই সাদৃশ্য খুঁজে পাচ্ছেন তিনি। রানবন্যার ম্যাচ তো বটেই, চিরাচরিত শ্রীলঙ্কান স্পিনিং উইকেটের বদলে সেই টেস্টের মতোই ব্যাটিং উইকেটও এবার দেখা যাচ্ছে পাল্লেকেলেতে। তৃতীয় দিন শেষ বিকেলে দু'একটা বল দেখে উইকেট থেকে স্পিনারদের সাহায্য পাওয়ার কিছু আশা জাগলেও তা সত্যি হয়নি। ব্যাটিং-স্বর্গ বলতে যা বোঝায়, এই উইকেট ঠিক তা-ই।

কিন্তু উইকেট যতই বিমাতাসুলভ আচরণ করুক, বাংলাদেশের বোলাররা কি আরও ভালো করতে পারতেন? খেলা দেখে এনামুল হক যা বুঝেছেন, দুয়েকটি বল বাদে উইকেট থেকে পাওয়া যায়নি কিছুই। খুব কঠিন একটা দিন কেটেছে বলে তিনি বরং একটু সমবেদনাই জানালেন বাংলাদেশের বোলারদের প্রতি। বোলাররা, বিশেষ করে তাসকিন আর মিরাজ নিজেদের উজাড় করে দিয়েই বোলিং করেছেন বলে সার্টিফিকেটও দিলেন। তাঁর ভাষ্যে, 'তাসকিনকে দেখে আমার খুব ইম্প্রেসিভ লেগেছে। কনসিস্ট্যান্টলি ৮৬-৮৭ (মাইলে) বল করেছে ও। মিরাজের বোলিংটাও খুব ভালো লেগেছে। মিরাজ-তাইজুল দুজনের বলেই ফ্লাইট দেখেছি। বল স্পিন করাতে চেষ্টা করেছে ওরা। কিন্তু উইকেট হেল্প করেনি সেভাবে।'

টেস্টের চতুর্থ দিনে আলাদাই করা গেল না দিমুথ করুনারত্নে ও ধনঞ্জয়া ডি সিলভাকে। ছবি: শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট

শুভ্র.আলাপে আগের তিন দিনের অতিথিই (আতহার আলী খান, শরফুদ্দৌলা সৈকত ও নাজমূল আবেদীন ফাহিম) উৎপল শুভ্রের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেছিলেন, 'সম্ভবত প্রথমবারের মতো কোনো সিরিজ হচ্ছে, যেখানে শ্রীলঙ্কার চেয়ে বাংলাদেশের স্পিন অ্যাটাক অনেক এগিয়ে।' এনামুলও একমত না হওয়ার কোনো কারণ দেখলেন না। শ্রীলঙ্কা দলে এক সময় কী সব বোলার খেলতেন, তা বোঝাতে গিয়ে মুরালিধরন, রঙ্গনা হেরাথ, চামিন্ডা ভাসের নাম মনে পড়ল তাঁর।এমনও বললেন, 'শ্রীলঙ্কা যদি স্পিনিং উইকেট বানাত, তাহলে আমাদের বোলাররাই ভালো করত। কারণ, তুলনামূলকভাবে আমাদের বোলাররা একটু বেশি এক্সপেরিয়েন্সড। মিরাজ কিংবা তাইজুল কিন্তু অনেকগুলা টেস্ট ম্যাচ খেলে ফেলেছে ইতোমধ্যেই।'

এনামুল হকের আপত্তির জায়গা দেখছেন কেবল একটি ক্ষেত্রেই। ক্যাপ্টেনসি এবং আরও নির্দিষ্ট করে বললে ফিল্ড প্লেসিং। উইকেট আদায়ের চেষ্টার বদলে মুমিনুল হক অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক হয়ে গিয়েছিলেন বলেই মনে হচ্ছে তাঁর, 'মনে হচ্ছিল, আমরা যেন খুব বেশি বিপদে পড়ে গেছি, এজন্যে ফিল্ডিং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রান আটকানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু টেস্টে এভাবে আসলে রান আটকানো যায় না। টেস্ট ক্রিকেটে অল্প হলেও একটু অ্যাটাকিং ফিল্ডিং লাগে।'

ফিল্ড প্লেসমেন্ট নিয়ে কিছু বাক্যব্যয় করলেন উৎপল শুভ্রও। উদাহরণ দিয়েই বললেন, 'কোনো দল যখন প্রথম ইনিংসে ৫৪১ করে, প্রতিপক্ষের ফলো-অন এড়াতেও তো ৩৪২ করতে হবে। এত রান করে ডিফেন্সিভ হবার প্রশ্নই আসে না। হয়তো কিছু মুহূর্ত আসবে, যেমন আজকে লাঞ্চের সময় বা টি-য়ের সময় এসেছে, তখন একটু কম অ্যাটাকিং হতে হবে। কিন্তু ডিফেন্সিভা কখনোই নয়।'

মাঠে অসহায়ই লেগেছে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের। ছবি: শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট

'কেন অ্যাটাকিং হতেই হবে' বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে জিওফ বয়কটের মুখনিঃসৃত বাণীরও শরণাপন্ন হলেন তিনি, 'যেকোনো ক্রিকেটেই আমরা জানি, একটা উইকেটই আরেকটা উইকেট ডেকে আনে। জিওফ বয়কটের একটা কথা আছে। যা তিনি মূলত ব্যাটিং সাইড সম্পর্কেই বলতেন, "ধরো, তোমার স্কোর ২ উইকেটে ১৫০-২। তাহলে এর সঙ্গে আরও দুই উইকেট অ্যাড করে নেবে। তুমি ধরে নেবে, তোমার রান ৪ উইকেটে ১৫০।" একটা উইকেট মানেই যেহেতু আরেকটা উইকেট পড়ার সম্ভাবনা, স্লিপ তাই কখনোই সরানো উচিত না। প্রথম ইনিংসে ৫৪১ করার পর আমি তো স্লিপ কখনোই সরাব না। এটা বোলারের জন্য খুব ডিসকারেজিং। বোলারের মনটাই তো ভেঙে যায় যে, এজ হলেও তো ক্যাচ হবে না।'

এ প্রসঙ্গে এনামুল হক যোগ করেন, 'তখন হয় কী (স্লিপ সরালে), উইকেট পাওয়ার জিনিসগুলোই কমে যায় একদম। স্লিপ নেই, সিলি নেই, আপনি তখন রান আটকানো বোলিং করছেন। আল্টিমেটলি রানও আটকাতে পারছেন না, কারণ সব ফিল্ডার তখন বাইরে।'

এই সবকিছু মিলিয়েই যা হয়েছে, তার একটা সারসংক্ষেপও টেনেছেন উৎপল শুভ্র। তা বোঝাতে আশ্রয় নিয়েছেন রেকর্ড আর পরিসংখ্যানের। ১৯৯৭ সালের পর এই প্রথম শ্রীলঙ্কার দুই ব্যাটসম্যান (দিমুথ করুনারত্নে ও ধনঞ্জয়া ডি সিলভা) টেস্টের একটা পুরো দিন ব্যাটিং করে ফেললেন। কথাটায় অবশ্য একটু ভুল আছে। প্রেমাদাসায় ভারতের বিপক্ষে ৯৫২ রানের বিশ্ব রেকর্ড গড়া ইনিংসে সনাৎ জয়াসুরিয়া ও রোশান মহানামা ৫৭৬ রানের পার্টনারশিপ রেকর্ড গড়ার পথে টানা দুই দিন ব্যাটিং করেছিলেন। এটাই হয়তো বলতে গিয়েছিলেন তিনি। নইলে শ্রীলঙ্কায় সর্বশেষ দুই ব্যাটসম্যানের সারা দিন ব্যাটিং করার ঘটনা ২০০৬ সালে। যখন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাবে মাহেলা জয়াবর্ধনে ও কুমার সাঙ্গাকারা ৬২৪ রানের রেকর্ড পার্টনারশিপ গড়েছিলেন। 

শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক দিমুথ করুনারত্নের আরেকটি কীর্তির কথাও বললেন উৎপল শুভ্র। এই টেস্টে চার দিনে যে ২৪ ঘণ্টা খেলা হয়েছে, তার পুরোটা সময়ই মাঠে ছিলেন তিনি। ২৩৪ রানে অপরাজিত করুনারত্নের স্ট্যামিনার প্রশংসা করলেন স্বাভাবিকভাবেই। পাল্লেকেলে টেস্ট নিয়ে কথা শেষ করে শুভ্র.আলাপের বাকি অংশটা জুড়ে এনামুল হক জুনিয়রের সঙ্গে তাঁর ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বললেন উৎপল শুভ্র। অনেক প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হওয়া যে ক্যারিয়ার শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পায়নি। সেসব কথা না হয় আরেকটি লেখার জন্য তোলা থাক।