তখন তাঁরা যত না বিশ্লেষক, তার চেয়েও প্রকট হয়ে ফুটে উঠছে তাঁদের দর্শক-সত্ত্বা। উৎপল শুভ্র তো 'জয় টু ওয়াচ' বাক্যেই বুঝিয়ে দিলেন লিটন দাসের ব্যাটিং নিয়ে তাঁর মুগ্ধতা। উৎপলশুভ্রডটকমের ইউটিউব চ্যানেলের শুভ্র.আলাপে লিটনের প্রসঙ্গটা এসেছিল এক দর্শকের প্রশ্নের সূত্র ধরে। প্রশ্নটা ছিল, নতুন বলে লিটনের যেহেতু সমস্যা হয় (দর্শকের মত), টেস্টের মতো ওয়ানডেতেও তাঁকে মিডল অর্ডারে খেলানো ভালো কি না। 

প্রশ্নটার জবাব দেওয়ার কথা নাজমূল আবেদীন ফাহিমের। কিন্তু এর ত্রিসীমানাতেও না গিয়ে প্রথমেই বলে নিলেন লিটনকে তিনি কতটা সম্ভাবনাময় মনে করেন, 'আমি বোধ হয় এই একটা প্লেয়ারের ব্যাপারেই কখনো কোনো মন্তব্য করেছিলাম, ও যেদিন প্রথম খেলতে নেমেছিল, আমি ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম, "হেয়ার কামস্ আ স্টার।" আমি এখনো বিশ্বাস করি, ওকে যদি ঠিকভাবে পরিচালনা করা হয়, "ও কত ভালো" এই উপলব্ধি যদি ওর মধ্যে ঢোকানো যায়, তাহলে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে ও।'

ওপেনিং না মিডল অর্ডার– এই প্রশ্নের উত্তরটা দিলেন অন্যভাবে। লিটনের ব্যাটিং টেকনিক নিয়ে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়ে, 'টেকনিক্যালি যদি বলি, আমার কাছে লিটন হলো নাম্বার ওয়ান। ও কতটা মেধাবী, এই ধারণা ওর নিজেরও নাই। আশপাশে যারা আছে, তাদের মধ্যে একমাত্র ওরই ওয়ার্ল্ড ক্লাস ব্যাটসম্যান হবার সব ক্ষমতা আছে। হি ইজ সো স্কিলফুল, সো এফোর্টলেস।' 

লিটনের ব্যাটিংয়ের কথা উঠলেই সবার আগে যা মনে হয়, তা হলো লিটনের ব্যাটিং দেখা চোখের জন্য এক প্রশান্তি। অনেক অনেক রান করেছেন, এমন অনেক ব্যাটসম্যান সম্পর্কেও এমন কথা বলা যায় না। এই প্রসঙ্গেই উৎপল শুভ্র একটা গল্প বললেন। যেখানে টেনে আনলেন অ্যালান বোর্ডারকে। বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের সহজাত সৌন্দর্য নিয়ে এত কাব্য, কিন্তু বোর্ডারের ব্যাটিংয়ে তার লেশমাত্র ছিল না। শুভ্র.আলাপের শোতেই উৎপল শুভ্র জানান, লর্ডসে ধারাভাষ্যকারদের এক আড্ডায় বোর্ডারের ব্যাটিংয়ের রসকষহীনতা নিয়ে বোর্ডারের সামনেই মন্তব্য করে ফেলেছিলেন তিনি। বোর্ডার একটুও রাগ না করে বলেছিলেন, 'সেটা (কাঠখোট্টা ব্যাটিং) তোমাকে বলতে হবে কেন? আমি নিজেই তো সেটা জানি। আমার ব্যাটিং আমার কাছে কখনোই ভালো লাগে নাই। আই হেট টু ওয়াচ মি।'

কিন্তু এই যে লিটনের ব্যাটিংয়ের আয়েসি ভঙ্গিমা, অলস সৌন্দর্য নিয়ে এত কথা, এই সৌন্দর্য মাপার পরিমাপক কী? নাজমূল আবেদীন ফাহিম সেটিরও একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেন, শট খেলতে কার কত কম ঘাম খরচ হয়, কত কম এফোর্টে শটটা খেলা হচ্ছে, এসব থেকেই আসলে সৌন্দর্যটা ফুটে ওঠে। এবং এখানেই লিটন আর সবার চেয়ে আলাদা হয়ে যাচ্ছেন তাঁর চোখে, 'লিটন যখন কোনো কাভার ড্রাইভ করবে, আপনার মনে হবে কিছুই করেনি ও। অথচ বল কিন্তু বাউন্ডারি লাইনের বাইরে চলে গেছে। একটা বল একটু শর্ট অব লেংথ, ওর কোমরের একটু ওপরে আছে, ব্যাকফুটে গিয়ে একটু পাঞ্চ করল, করলও না হয়তো, ব্যাটটা ধরে রাখল কেবল, বলটা কিন্তু বাউন্ডারি লাইনের বাইরে। এই কাজটা লিটনের মতো কেউ পারে না। অ্যাবসোলিউটলি নো বডি। শুধু বাংলাদেশের কথা বলছি না, বিশ্বেই এখন ওর মতো এফোর্টলেস কোনো ব্যাটসম্যান নেই।'

কিন্তু এই সৌন্দর্যটাই কি ব্যাটসম্যানশিপের একমাত্র পরিচায়ক? এত নান্দনিক হয়ে লাভটাই বা কোথায়, ব্যাটিং গড়টা যদি ত্রিশের নিচেই ঘোরাফেরা করে? ফাহিমও এটাই মনে করিয়ে দিলেন, 'এটা (সৌন্দর্য) ব্যাটসম্যানশিপের একটা অংশ, কিন্তু দ্যাট ইজ নট এনাফ। এর বাইরে আরও অনেক কিছু লাগে, যেসব দিয়ে একজন ব্যাটসম্যানের বড় হতে হয়।' এ আলোচনায় উৎপল শুভ্রের মন্তব্যটাও এগিয়েছে সমান্তরালেই, 'বিউটিটা আছে, ঠিক আছে, এর সঙ্গে স্টিলটা যোগ হলে তবেই না বলা যাবে বড় ব্যাটসম্যান।'

উৎপল শুভ্রের চোখে, লিটন ইজ অ্যা জয় টু ওয়াচ। ছবি: এএফপি

কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাঁচ বছর কাটিয়েও লিটন যে এখনো পরিপূর্ণ মাত্রায় বিকশিত হতে পারছেন না, এর পেছনে টিম ম্যানেজমেন্টের অক্ষমতাও কি কোনো অংশে দায়ী? টিম ম্যানেজমেন্ট কী ঠিকঠাক গাইড করতে পারছে তাঁকে? পাঠকের প্রশ্নের জবাবটা সোজা ব্যাটেই দিলেন ফাহিম, 'প্রত্যেকটা প্লেয়ারই হচ্ছে একেকটা মেশিন। কেউ মার্সিডিজ বেঞ্জ, কেউ বিএমডব্লিউ, কেউ টয়োটা, কেউ ফিয়াট। কেউ তাই যখন মেশিনটাকে হ্যান্ডল করে, মেশিনটাকে বোঝা তার জন্য খুব ইম্পর্ট্যান্ট। আমি বা খালেদ মাহমুদ সুজন লিটনকে দেখছি অনেক দিন ধরে। আমরা কিংবা সরওয়ার ইমরান, মোহাম্মদ সালাউদ্দিন ওর নাড়িনক্ষত্র সব জানি। কোথায় কী বললে কী হবে, আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি। কিন্তু বাইরে থেকে যখন একজন কোচ আসে, সে কিন্তু তার প্রেজেন্ট ফর্ম দেখে, পারফরম্যান্স দেখে বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু একদম ইন-ডেপথ বোঝার যে ব্যাপারটা, সেটা ঠিকমতো না হলে, ভালোমতো হেল্প করা মুশকিল কিন্তু। আমি হয়তো গড়পড়তা একটা ওষুধ দিয়ে দেব, কিন্তু তার ক্ষেত্রে সেটা প্রযোজ্য না-ও হতে পারে। তাই তাকে খুব ভালোভাবে জানাটা খুব দরকার। কোন প্লেয়ারের ট্রিগার কোন জায়গায়, কোথায় হাত দিতে হবে, এটা সবার পক্ষে বোঝা ডিফিকাল্ট কিন্তু। প্লেয়ারকে যারা দীর্ঘদিন ধরে জানে, তারাই বুঝতে পারে। এ জন্যেই দেখবেন, যেকোনো দেশের যত নামকরা খেলোয়াড়ই হোক না কেন, কোনো সমস্যায় পড়লে তাদের ছোটবেলার মেন্টর-কোচের কাছে পরামর্শের জন্য ফেরত যায়। আলাপ করে, এটা কী করা যায়, ওটা কী করা যায়। কারণ, দে ক্যান গাইড দেম।'

শুক্রবারের শুভ্র.আলাপ-এর শিরোনাম ছিল, মীমাংসা হচ্ছে পাল্লেকেলেতে? কিন্তু আলোচনা যে শুধু তাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা তো বুঝতেই পারছেন। পুরোটা দেখতে পারেন ইউটিউবে, এই ওয়েবসাইটের ভিডিও সেকশনেও যা পাওয়া যাবে। আর যদি লিটনের ব্যাটিং নিয়ে উৎপল শুভ্রর সঙ্গে নাজমূল আবেদীন ফাহিমের আলাপচারিতার অংশটুকুই শুধু শুনতে চান, তা শুনতে পারেন এখানে: