জাভেদ ওমর বেলিমের একটা স্বপ্ন ছিল। কোনো একটা আন্তর্জাতিক ম্যাচে এমন কিছু করবেন যে টিভিতে তাঁর ইন্টারভিউ দেখাবে, ঘিরে ধরবে সাংবাদিকেরা। টিভিতে ইন্টারভিউ দেওয়ার, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার ব্যপারটি তাঁর কাছে এতটাই আকর্ষণীয় মনে হয় যে, দলের অন্য কোনো খেলোয়াড়ের সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় বা সংবাদ সম্মেলনের সময় নীরবে পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। গত বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ইনিংসের আদ্যন্ত খেলে ৮৫ রানে অপরাজিত থেকে ফেরার পর তাঁর এই স্বপ্নটা আংশিক পূরণ হয়েছিল। স্টার টিভিতে প্রচারিত হয়েছিল তাঁর সাক্ষাৎকার।

তবে সে ম্যাচে তিনি ভালো খেলেছিলেন বলেই ওই সাক্ষাৎকার। ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার নিয়ে তারপর সাক্ষাৎকার দেওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো বুলাওয়েতে এবং এবং সেটিও তাঁর অভিষেক টেস্টে। সেই স্বপ্নপূরণের মূহুর্তটি যখন এলো, প্রথম বাক্যটি বলেই নির্বাক হয়ে যেতে হলো তাঁকে। সাংবাদিকেরাও তখন নির্বাক, কারণ একটু আগে স্ট্রিক-রিগনট-এনকালা-ওয়াতামবোয়ার সামনে অসীম সাহস করে আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞা নিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো ব্যাটসম্যানকে তখন চেনাই যাচ্ছে না। জাভেদ ওমর বেলিম তখন অঝোরে কাঁদছেন।

এর আগে শুধু বলতে পেরেছেন, ‘আজ আমার খুব ভালো লাগছে আর বারবার মনে পড়ছে আমার বড় ভাই আসিফ বেলিমের কথা। তাঁর জন্যই আজ আমার এখানে আসা।’ এটুকু বলতে বলতেই ভেঙে গেল তাঁর গলা, দেখতে দেখতে দুচোখে অশ্রুর প্লাবন। বেশ কিছুক্ষণ নিজেকে সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণই করতে হলো তাঁকে, ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না, আমি পাঁচ মিনিট পর আপনাদের সঙ্গে কথা বলি।’

পাঁচ মিনিটের জায়গায় পনের মিনিট পর যখন আবার মিনি টেপ রেকর্ডারের সামনে দাঁড়ালেন, তখনও তাঁর চোখেমুখে আনন্দের জায়গায় স্পষ্ট যন্ত্রণার ছাপ। ছয় বছর আগে তাঁর বড় ভাই প্রতিশ্রুতিশীল বাঁহাতি স্পিনার আসিফ বেলিমের আকস্মিক মৃত্যুর সেই বিভীষিকাময় মুুুুহূর্তটি মন থেকে তাড়াতে সময় লাগল আরও বেশ কিছুক্ষণ। টেস্ট ক্রিকেটের ১২৪ বছরের ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় ওপেনার হিসেবে অভিষক টেস্টেই ইনিংসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যাট করেছেন তিনি, আগের দুটি কীর্তি গত শতাব্দীর নয়, উনবিংশ শতাব্দীর ঘটনা।

১৮৯০ সালে লর্ডসে ইংল্যান্ডের জে ই বার্নেট অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাঁর অভিষেক টেস্টে দলের ১৭৫ রানের ইনিংসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যাট করে ৬৭ রানে অপরাজিত ছিলেন, এরপর ১৮৯৮-৯৯ মৌসুমে জোহানেসবার্গে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অভিষেকেই ১৩২ রানে (দলের রান ২৩৭) ব্যাট ক্যারি করেছিলেন ইংল্যান্ডেরই আরেক ব্যাটসম্যান পেলহাম ওয়ার্নার। অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি অবশ্যই বড় ব্যাপার, তবে সেই কীর্তি খুব কম ব্যাটসম্যানের নেই। জাভেদ ওমর সেঞ্চুরি পাননি, কিন্তু টেস্ট ইতিহাসে তিনজনের একজন হয়ে যাওয়ার গৌরবে সেই দুঃখ ভুলেই যাওয়ার কথা।

এসব কীর্তির কথা বলে অন্তত বড় ভাইয়ের মৃত্যুশোক কিছুটা আড়াল করা গেল জাভেদের মন থেকে। অন্য প্রান্তে যখন একের পর এক উইকেট পড়ছে, তখন মনোসংযোগ ধরে রাখতে একটা মন্ত্রই জপেছেন তিনি, ‘আমাকে শেষ পর্যন্ত ব্যাট করতে হবে।’ শেষ ব্যাটসম্যান মঞ্জুরুলকে নিয়ে লাঞ্চের পর আবার যখন মাঠে নামলেন, তখন তা করেছেন আরও বেশি, ‘লাঞ্চের সময়ই আমি জেনেছি, এর আগে মাত্র দুজন ব্যাটসম্যান টেস্টে ব্যাট ক্যারি করেছে। তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেঞ্চুরি হোক বা না হোক, আমি আউট হব না।’

আউট তিনি হনওনি। প্রথম ইনিংসে ৬২ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত ৮৫। এই সাফল্যের রহস্য হিসেবে ‘মনোসংযোগ’ আর ‘ধৈর্য’কেই কৃতিত্ব দিলেন তিনি, ‘জানতাম এই টেস্ট বাঁচাতে হলে আমাদেরকে কমপক্ষে দেড় দিন ব্যাট করতে হবে। আমি তাই বাড়তি কোনো ঝুঁকি নিতে যাইনি। স্কয়ার কাটটা আমি খুব ভালো খেলি, তারপরও স্কয়ার কাট করার মতো অনেক বল ছেড়ে দিয়েছি। তবে আবার খুব রক্ষণাত্মক যাতে না হয়ে যাই, মনে রেখেছি সেটাও। এডি বারলো আমাদের বলতেন, "অ্যাটাক ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স। লুজ বল পেলে তাই তা ছেড়ে দিইনি"।'

ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার নিচ্ছেন জাভেদ ওমর। পেছনে দুই দলের অধিনায়ক হিথ স্ট্রিক ও নাঈমুর রহমান

অভিষেক টেস্টেই তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচ, সেটিও আবার পরাজিত দলে থেকে। অথচ নিজেকে এই টেস্টের সন্দেহাতীত সেরা খেলোয়াড় হিসেবে এমনই প্রমাণ করেছেন যে, প্রতিপক্ষেরও তাতে কোনো অভিষোগ নেই। বরং জিম্বাবুইয়ান অধিনায়ক হিথ স্ট্রিক প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বললেন, ‘ওরই এই পুরস্কারটা প্রাপ্য। টেকনিক ভালো, এর সঙ্গে মনোসংযোগ আর প্রয়োগ ক্ষমতার দারুণ সম্মিলন ঘটিয়েছে ও। এই উইকেটে প্রতিদিনই সিমারদের জন্য কিছু না কিছু ছিল, অথচ জাভেদ উল্টো আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বাইরের বল ছেড়ে দেওয়ায় বাধ্য হয়ে তাঁকে খেলানোর মতো বল করার বাড়তি চেষ্টা করতে হয়েছে আমাদেরকে।’

ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচনের দায়িত্বটা ছিল টিভি কমেন্টেটরদের ওপর। ইয়ান বোথাম, আমির সোহেল, ডেভিট হটনের কথা শুনে মনে হলো, এ নিয়ে তাঁদেরকে তেমন ভাবতেই হয়নি। জাভেদ ওমরের ইনিংসের হাইলাইটস দেখানোর সময় তাঁর যে অফ ড্রাইভটি দেখে 'দ্যাটস্ ক্যারারিয়ান। দ্যাটস আ ক্যালিপসো শট' বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন ইয়ান বোথাম, ব্যাটসম্যান নিজেও সেটিকেই বেছে নিলেন তাঁর ইনিংসের সেরা শট হিসেবে। শটের চেয়ে উইকেটে টিকে থাকার সময়টাই তাঁর কাছে বেশি তৃপ্তিকর। সেই টিকে থাকার জন্য বল বাই বল, ওভার বাই ওভার চিন্তা করেছেন তিনি, 'যদি আমি ভাবি, সারা দিন ব্যাট করতে হবে, তাহলে তো আমি তখনই শেষ। এজন্য আমি চিন্তা করি, এই ওভারটা আমাকে খেলতেই হবে। সেটি শেষ হওয়ার পর আরেক ওভার....।'

ট্রেভর চ্যাপেলও এটিকেই মনে করেন জাভেদের বড় গুণ। আরেকটি গুণ ক্রমশই নিজের খেলাকে আরও উপরে তুলে নিয়ে যাওয়া, ‘এখানে আসার আগে ঢাকায় আন্তর্জাতিক একাদশের বিপক্ষেও জাভেদ খুব ভালো একটা সেঞ্চুরি করেছিল। ওই সেঞ্চুরির পর ও ক্রমশই নিজের খেলাকে আরও উপরের দিকে নিয়ে গেছে। মনোসংযোগটা ওর প্রধান শক্তি, এর সঙ্গে এই ইনিংসে যোগ হয়েছে মারার জন্য বল বেছে নেওয়ার ক্ষমতা।‘

ইনিংস ব্যবধানে হারার পরও জাভেদ ওমরের যে কীর্তির কারণে বাংলাদেশ একটু গৌরব অনুভব করতে পারছে, সেজন্য জাভেদের মাকেও কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত। অভিষেক টেস্টে খেলার সুযোগ না পেয়ে জাভেদ এমনই ভেঙে পড়েছিলেন যে, একসময় খেলা ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। তাঁর খেলাপাগল পরিবারই বুঝিয়ে শুনিয়ে আবার ক্রিকেটে মন ফেরায় জাভেদের, ‘আমার মা খুব সাদাসিধে ধরনের। উনি শুধু আমাকে বলেছিলেন, “আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন। তুই একটুও মন খারাপ করিস না”।'

মায়ের সেই কথা সত্যি প্রমাণ হতে পাঁচ মাস লেগে গেছে সত্যি, তবে ‘আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন’ কথাটাতে পুরো আস্থা জন্মে গেছে ছেলের। প্রাসঙ্গিক তথ্য, বিশ্বকাপ ও অভিষেক টেস্টে খেলতে না পারার দুঃখও ভুলে গেছেন জাভেদ ওমর। ‘হারারেতে দ্বিতীয় টেস্টেও এমন কিছু করতে হবে’–এই প্রতিজ্ঞা ছাড়া তাঁর মনে এখন আর কিছু নেই।