হাঁটা দূরত্বের বঙ্গোপসাগরের মতো মনে উথালপাতাল ঢেউ। কিন্তু মুখে সেটি প্রকাশ করতে পারছেন না। মাত্র দু-তিনটি শব্দই উচ্চারণ করতে পারেন। তার মধ্যে একটি ‘আলহামদুলিল্লাহ’। বারবার সেটিই বলছেন আর অঝোরে কাঁদছেন। ‘খুব খুশি বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু উনি বোঝাতে পারছিলেন না, শুধুই কাঁদছিলেন’—মুমিনুল হকের কণ্ঠটাও ভেজা ভেজা শোনায়।

এই ‘উনি’ মালেকা জয়নব। বছর খানেক আগে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে যাঁকে নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই যমে-মানুষে টানাটানি হয়েছে। শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে গিয়েছিল। অনেক দিন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে থেকে তাতে চেতনা ফিরেছে। এখন আস্তে আস্তে হাঁটতে পারেন। তবে বাক্শক্তি ফিরে পাননি এখনো। পরিচয়টা অসম্পূর্ণ থাকছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না বলা হচ্ছে, উনি মুমিনুল হকের মা। 

সেই ছেলেবেলা থেকে চোখে খেলা করা স্বপ্ন পূরণের মুহূর্তটিতে সবার আগে মায়ের মুখটাই ভেসে উঠেছে চোখের সামনে। এ কারণেই হয়তো উদযাপনটা ছিল অমন আশ্চর্য নির্লিপ্ত! হেলমেট খুললেন, ব্যাটও তুললেন। কিন্তু সেটি এমন নিরাবেগ ভঙ্গিতে যে, তা দেখে কারও অনুমান করার সাধ্য নেই এইমাত্র প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করেছেন। সেটিও মাত্র ৯৮ বলে।

প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির পথে মুমিনুল। ২০১৩ সালে চট্টগ্রামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। ছবি: এএফপি

চোখের সামনে ভেসে ওঠা মায়ের মুখের সঙ্গে নির্লিপ্ত উদযাপনের সম্পর্ক আরেকটু ব্যাখ্যা দাবি করে। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে মায়ের ওই অসুস্থতায় নিজেকেও যে একটু ‘অপরাধী’ ভাবেন মুমিনুল। বিকেএসপি থেকে এইচএসসি পাস করে বেরোনোর পর খেলার ব্যস্ততায় পড়াশোনায় ছেদ পড়ে গিয়েছিল। অনিশ্চিত ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ভেলায় চড়ে বসা তিন সন্তানের সবচেয়ে ছোট সৌরভের ভবিষ্যত নিয়ে তাই চিন্তার শেষ ছিল না মায়ের। ‘মার কাছে ক্রিকেটটা লটারির মতো। আমাকে শুধু বলতেন, “চেষ্টা করে যা, হলে হবে না হলে নাই।” কিন্তু মনে মনে আমাকে নিয়ে খুব টেনশন করতেন। সেদিনও নাকি খুব টেনশন করছিলেন, প্রেশারের ওষুধ খেতেও ভুলে গিয়েছিলেন। সেই রাতেই ব্রেন হেমারেজ হয়।’

কাল সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরেই মাকে ফোন করেছেন। বাবা-বড় ভাইয়ের কাছ থেকে জেনেছেন, টেলিভিশনে ছেলেকে সেঞ্চুরি করতে দেখার পর থেকেই মায়ের চোখে অবিশ্রাম শ্রাবণ।

দ্বিতীয় দিন শেষে ৭৭ রানে অপরাজিত। এত কাছে কক্সবাজার, সম্ভাব্য প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিটা দেখতে বাড়ির কেউ মাঠে আসবেন না! সকালে হোটেল থেকে বেরোনোর সময়ই মুমিনুল জানিয়ে গেছেন, কখনোই কেউ আসেন না। টেনশন সহ্য করতে পারেন না বলে। কক্সবাজারের একটি হোটেলের ম্যানেজার বাবা তো টেনশনে টেলিভিশনেও মুমিনুলের ব্যাটিং দেখেন না। পান খান আর শুধু পায়চারি করেন।

পায়চারিরত অবস্থায়ই জেনেছেন, ছেলের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিটা ডাবল হতে হতেও হয়নি। আগের তিন টেস্টে দুটি হাফ সেঞ্চুরির পর মুমিনুল এবার প্রতিজ্ঞা করেই নেমেছিলেন, ৫০ হলে সেটিকে ১০০ করতে হবে। কাল খেলা শুরুর আগে সম্প্রচার কর্তৃপক্ষ ইন্টারভিউ নিতে চাইল। মুমিনুল ফিরিয়ে দিলেন এই বলে, ‘এক শ/দেড় শ করলে ইন্টারভিউ নেয়। আমি কী করেছি?’ সেঞ্চুরিকে পাখির চোখ করেছিলেন বোঝাই যাচ্ছে। তবে ‘১৮১’ তাঁর দূরতম কল্পনাতেও ছিল না। এত কাছে গিয়ে ফিরে আসার দুঃখ অবশ্য ঠিকই পোড়াচ্ছে।

১৫০ রানের মাইলফলক ছোঁয়ার পর। অক্টোবর ২০১৩, চট্টগ্রাম। ছবি: এএফপি

পোড়ানোরই কথা। আরও বেশি পোড়াবে যখন জানবেন, টেস্ট ক্রিকেটের অভিজাত এক ক্লাবের মাত্র ৩৬তম সদস্য হওয়ার সুযোগটা কেমন হাত ফসকে গেল! গ্যারি সোবার্সের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিটিই ছিল রেকর্ডভাঙা অপরাজিত ৩৬৫। প্রথম সেঞ্চুরিকেই ট্রিপল বানিয়েছেন আর একজনই—ববি সিম্পসন। এই দুজনের বাইরে আরও ৩৩ জন প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির পাওয়ার আনন্দ দ্বিগুণ করে নিয়েছেন সেটিকে ডাবল বানিয়ে। মুমিনুল মাত্র ১৯ রানের জন্য পারলেন না।

চট্টগ্রাম টেস্টের তৃতীয় দিনটি বাকি সব ছাপিয়ে মুমিনুলের অনেক পাওয়া আর সামান্য না-পাওয়ার গল্পই। যেটি মিশে যাচ্ছে বাংলাদেশের পাওয়া না-পাওয়ার সম্ভাবনার সঙ্গেও। সোয়া ছয় ঘণ্টারও বেশি উইকেটে থেকে খুদে এই ব্যাটসম্যানের ১৮১-ই তো রং চড়িয়েছে টেস্ট বাঁচানোর স্বপ্নে।

আরও পড়ুন ............
লিখেই ফেললাম, মুমিনুল!

(শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বাঁচাতে পেরেছিল সেই টেস্ট ম্যাচ। সেই সময়ে যা ছিল প্রায় জয়ের সমান। মুমিনুলের ১৮১ রানের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি ছাপিয়েও অবশ্য বড় হয়ে উঠেছিল সোহাগ গাজীর একই টেস্টে সেঞ্চুরি ও হ্যাটট্রিকের বিশ্ব রেকর্ড)