ইনিংসের শুরুতে উইকেটে তাঁরা দুজন পার্টনার, মাঠের বাইরেও। তাই সাঈদ আনোয়ার ও আমির সোহেলের মধ্যে কমপক্ষে তিনটি মিল বলতে ভাবতে হয় না একটুও। এক. দুজনই ওপেনিং ব্যাটসম্যান। দুই. দুজনই বাঁহাতি। এবং তিন. দুজনই দুর্দান্ত স্ট্রোক প্লেয়ার। তবে এই তিনটির বাইরেও অনেক মিল আছে এই দুই ওপেনারের মধ্যে, সে সবই মাঠের বাইরে। দুজনই পছন্দ করেন একই রকম পোশাক, একই ধরনের মিউজিক এবং আরও অনেক কিছুতেই মিল তাঁদের, আর এটা তাঁদেরই মুখের কথা। এই দুই ওপেনার যে পরস্পরের সবচেয়ে ভালো বন্ধু, সুযোগ পেলেই তা জানিয়ে দেন। অবশ্য তা বলে জানানোর প্রয়োজনও নেই।

সাঈদ আনোয়ারকে দেখলে আপনি ধরে নিতে পারেন, আশেপাশেই কোথাও আমির সোহেল আছেন। উল্টোটাও সত্যি। তবে বেশির ভাগ সময় এসব ধরে নেয়া-টেয়ার ঝামেলায় পড়তে হবে না, এই ওপেনিং পেয়ার একসঙ্গেই বেরোন বেশির ভাগ সময় এবং থাকেন একসঙ্গেই। অন্তত কলম্বোতে সব সময়ই তাঁদের একসঙ্গেই দেখেছি আমি।

তবে দুজন কিন্তু ভিন্ন চরিত্রের। কম্পিউটার সায়েন্সে ব্যাচেলর ডিগ্রিধারী সাঈদ আনোয়ারের কথাবার্তায় চাপল্য বেশি, কথায় কথায় তাঁর মজা করার অভ্যাস। প্রথম পরিচয়েই যা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। সেই পরিচয় বাসিত আলীর রুমে। ভারতীয় বাঁহাতি স্পিনার ভেঙ্কটপতি রাজুও তখন সেখানে, বাসিতের সঙ্গে কথাবার্তা বলেই তাঁর রুমে গেছি। তারপরও টেপ রেকর্ডার অন করার আগে তিনি জানতে চাইলেন, কী ব্যাপারে ইন্টারভিউ করতে চাই। মাঠে চার বা ছয় মারার পর তাঁর মুখে যে রকম একটা হাসি দেখা যায়, মুখে তা ফুটিয়ে আমাকে করা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলেন সাঈদ আনোয়ার, 'এবাউট সেক্স!'

এর কিছুদিন আগেই (১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে) নিউজিল্যান্ড ট্যুরে যাওয়ার পথে দুটি ম্যাচ খেলতে ঢাকায় নেমেছিল পাকিস্তান দল। সেই সময় ভোরের কাগজের আলোকচিত্রী শামসুল হক টেংকু ওদের দারুণ কিছু ছবি তুলেছিলেন। সিঙ্গার ওয়ার্ল্ড সিরিজ কাভার করতে যাওয়ার সময় নিয়ে গিয়েছিলাম তার কয়েকটি। কারণটা বলাই বাহুল্য, ইন্টারভিউ পাওয়ার রাস্তাটা একটু সুগম করা। সেরকমই একটা ছবি পেলেন সাঈদ আনোয়ার, তাঁর ব্যাটিং অ্যাকশন। ছবির ব্যাটসম্যানকে দেখে তিনি একেবারে অভিভূত। বাসিত ও রাজুকে দেখিয়ে গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করলেন, 'হু ইজ দিস এলিগ্যান্ট ব্যাটসম্যান?'

মাঠের বাইরে সাঈদ আনোয়ারকে যতবার দেখেছি, প্রতিবারই একই ঘটনা, কিছু না কিছু নিয়ে মজা করছেন। আমির সোহেলও নিশ্চয়ই তা এনজয় উপভোগ করেন। নইলে দুজনের মধ্যে এমন গভীর বন্ধুত্ব হলো কীভাবে! তবে আমির সোহেলের চরিত্র পুরো বিপরীত।

এরপর তো আরও কতবারই দেখা হয়েছে। মাঠের বাইরে সাঈদ আনোয়ারকে যতবার দেখেছি, প্রতিবারই একই ঘটনা, কিছু না কিছু নিয়ে মজা করছেন। আমির সোহেলও নিশ্চয়ই তা এনজয় করেন। নইলে দুজনের মধ্যে এমন গভীর বন্ধুত্ব হলো কীভাবে! তবে আমির সোহেলের চরিত্র পুরো বিপরীত। যাঁর সঙ্গে কথা বললে আপনার মনে হবে, জীবনটা খুবই সিরিয়াস একটা ব্যাপার এবং তা নিয়ে ইয়ার্কি-ফাজলামো করাটা খুবই গর্হিত একটা কাজ। কণ্ঠটা চমৎকার, ভরাট। ইংরেজি বলেন নিখুঁত উচ্চারণে। এমন সুন্দর গুছিয়ে কথা বলেন যে, শুনতে চমৎকার লাগে।

সাঈদ আনোয়ারও খুব ভালো বলেন, তবে সোহেল এগিয়ে থাকছেন তাঁর ঈশ্বরদত্ত কণ্ঠের কারণে। আচার-আচরণেও একেবারে নিখুঁত আমির সোহেল। দুজনকে একসঙ্গে ইন্টারভিউ করার পর বেশ কবার দেখা হয়েছে। যথারীতি গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করেছেন, 'হাউ আর ইউ?' বলার ভঙ্গিটা এমন, যেন এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তর্কযোগ্যভাবে সেই সময়ের সেরা ওপেনিং জুটির যুগল ইন্টারভিউও সম্ভব হয়েছিল আমির সোহেল সহযোগিতা করেছিলেন বলেই।

বেশি উচ্চাভিলাষী হয়ে যায় ভেবে শুরুতে এমন কোনো পরিকল্পনা তো আমার মাথায়ই ছিল না। বাসিতের রুমেই সাঈদ আনোয়ারকে রাজি করিয়েছি ইন্টারভিউ দিতে। বাসিতের ইন্টারভিউয়ের মাঝপথে উঠে যাওয়ার সময় সাঈদ আনোয়ার বলে গেছেন, 'এটা শেষ করে আমার রুমে আসুন।' কিছুক্ষণের মধ্যেই সাঈদ আনোয়ারের রুমে গিয়ে তাঁর একক ইন্টারভিউ নিতে অপেক্ষা করছি । অপেক্ষা, কারণ সাঈদ আনোয়ার ঢুকে গেছেন বাথরুমে, শেভ-টেভ করে একটা শাওয়ার না নিলে নাকি তাঁর চলছেই না।

এক সময় ট্যুরে গেলে তাঁরা দুজন একে অন্যের ছায়াসঙ্গী হয়েই থাকতেন

এমন সময় আমির সোহেল রুমে ঢুকলেন একটা 'স্পোর্টস্টার' খুঁজতে, তাঁকে দেখেই বিদ্যুৎচমকের মতো মাথায় একটা আইডিয়া খেলে গেল, এই দুই ব্যাটসম্যান সাঈদ আনোয়ার ও আমির সোহেল সম্ভবত বর্তমান বিশ্বের সেরা ওপেনিং পেয়ারের স্রষ্টা। এঁদের একসঙ্গে বসিয়ে ইন্টারভিউ নিলে কেমন হয়! অবশ্যই ভালো হয়। কিন্তু তাঁরা কি রাজি হবেন? আমির সোহেলকে বলতেই রাজি। 'আমি আমার রুমে যাচ্ছি, সাঈদ বেরুলেই ডাকবেন আমাকে' বলে বেরিয়ে গেলেন তিনি। শাওয়ার শেষ করে সাঈদ আনোয়ার বেরিয়ে আসার পর তাঁকে বলা হলো পরিবর্তিত পরিকল্পনার কথা। তিনিও এক কথায় রাজি। তখনো তো জানি না, দুজন এমন হরিহর আত্মা। যা বুঝলাম ইন্টারভিউ শুরু হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। দুজনের মধ্যে সম্পর্কটা এত চমৎকার হওয়ার কারণেই ইন্টারভিউটা দারুণ জমেছিল। ভেবেচিন্তে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন ঠিকই, তবে এর মধ্যেই চলল বিরতিহীন খুনসুটি।

'দ্য ক্রিকেটার পাকিস্তান' ম্যাগাজিনে আমির সোহেলের প্রোফাইলে পড়েছিলাম, ঘরোয়া ক্রিকেটের এক ম্যাচে বাদ পড়ায় তিনি ম্যাচ শুরুর আগের রাতে পিচ খুঁড়ে রেখেছিলেন। পরদিন তাই খেলা হয়নি। আমির সোহেল গল্পটা উড়িয়ে দিয়ে বললেন, 'এসব গল্পে বিশ্বাস করবেন না, এগুলোর কোনো সত্যতা নেই।'

তা না হয় করলাম না। তবে মেজাজি হিসেবে খানিকটা বদনাম তো আছেই তাঁর। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই ১৯৯২ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে জরিমানাও দিয়েছিলেন মাঠে বাজে আচরণের জন্য। একটু ঘুরিয়ে অন্যভাবে বললাম, 'ঠিক আছে, পিচ খুঁড়ে রাখার গল্প না হয় মিথ্যা। কিন্তু মাঠেও তো আপনি ভালোই মেজাজ দেখান।'

কথাটা মেনে নিয়ে এর পক্ষে জোরালো যুক্তি দিলেন সোহেল, 'এতে তো আমি কোনো সমস্যা দেখি না।দেখুন, মাঠে খেলাটা যখন চলে, তখন তা বোলার ও ব্যাটসম্যানদের মধ্যে একটা যুদ্ধ। কোনো বোলার যখন আমার ওপর চেপে বসে, তখন হয়তো আমি চুপ করে হজম করব তাঁর কথা। কিন্তু যখনই তাঁকে এক-দুইটা বাউন্ডারি মারব, ঠিকই তা ফিরিয়ে দেব আমি।' পাশ থেকে সাঈদ আনোয়ার যোগ করলেন, 'এটাকে বলতে পারেন প্রফেশনালিজমেরই একটা অংশ।'

মাঠের মধ্যে যেমন, মাঠের বাইরেও তেমন হরিহর আত্মাই ছিলেন তাঁরা দুজন

এই ইন্টারভিউ নেয়ার পরদিন মনটা একটু খারাপ, একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি। দুই ওপেনিং ব্যাটসম্যানের ইন্টারভিউ, অথচ তাঁদের প্রিয় ওপেনারের নামই তো জানা হয়নি। সেদিন সন্ধ্যায় সিঙ্গার ওয়ার্ল্ড সিরিজের চার দলকে (ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কা) স্বাগত জানাতে লঙ্কা ওবেরয় হোটেলের লবিতে পার্টি। সেখানেই ধরলাম দুজনকে। সাঈদ আনোয়ার কথা বলছিলেন অরবিন্দ ডি সিলভার সঙ্গে। তাঁর পাশে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'কাল একটা প্রশ্ন করতে ভুলে গেছি। আপনার প্রিয় ওপেনার কে?'

মুখে হাসি নিয়ে অরবিন্দ ডি সিলভার দিকে তাকিয়ে চোখ নাচালেন আনোয়ার, তারপর গম্ভীরভাবে বললেন, 'ম্যালকম মার্শাল!'

রসিকতাটুকুর রেশ কেটে যাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য বললেন গর্ডন গ্রিনিজের নাম। অথচ আমির সোহেলের উত্তরটা পাওয়াই গেল না। হাতে পানীয় নিয়ে তিনি কথা বলছিলেন আরেক ওপেনার, অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক মার্ক টেলরের সঙ্গে। প্রশ্নটা শুনে সোহেলের মধ্যে প্রথমে বেশ রসিকতার মুড দেখা গেল।

মার্ক টেলরকে দেখিয়ে বললেন, 'ওর সামনে অন্য কারও নাম বললে ও আমাকে মারবে।' মারটা কেমন হতে পারে, তার একটা নমুনাও দেখালেন ঘুষি বাগিয়ে। কিন্তু এরপরই তিনি সিরিয়াস, ‘আই কান্ট সে।'

বললাম, 'ঠিক আছে, মার্ক টেলরের পর আপনার প্রিয় ওপেনার কে?' সোহেল অনড়, ‘আই কান্ট সে।'

'আনোয়ারের সঙ্গে তো আপনার অনেক ব্যাপারেই মিল। ও বলেছে গর্ডন গ্রিনিজের নাম। আপনারও কি তা-ই?'

ভাঙা রেকর্ডের মতো আবারও কানে বাজল, 'আই কান্ট সে নাও।'

বললেন না তো বললেনই না। পরে আমির সোহেলের সঙ্গে যখন বেশ খাতির হয়ে গেছে, চাইলে তখন উত্তরটা জেনে নিতে পারতাম। পত্রিকার জন্য ইন্টারভিউ পাঠিয়ে দিয়েছি বলে আর তাগিদ বোধ করিনি। ধরে নিয়েছি, দুজনের যখন এমন মিল, পছন্দের ওপেনারও হয়তো একই হবে।

(লেখকের 'ষোল তারকার মুখোমুখি' বই থেকে) 

আরও পড়ুন......
ক্রিকেট, জীবন–সবই অন্য চোখে দেখছেন সাঈদ আনোয়ার
একসঙ্গে সাঈদ আনোয়ার-আমির সোহেল
রশিদ লতিফের জবানিতে ব্যাটসম্যান ও মানুষ সাঈদ আনোয়ার
সাঈদ আনোয়ার: অন্তত সেদিনের ‘বেস্ট