প্রথম টেস্টে ৪৫ ওভার বোলিং করে ১৫০ রান খরচে পেয়েছিলেন ১ উইকেট। তখন কে জানত, একদিন গোলগাল চেহারার এই ব্লন্ড তরুণই বিশ্বজোড়া ব্যাটসম্যানদের বিনিদ্র রাতের কারণ হবেন! যে সিডনিতে টেস্ট অভিষেক, সেই সিডনিতেই খেলতে যাচ্ছেন ১৪৫তম টেস্ট। জীবনের শেষ টেস্টও। কাল মেলবোর্নে সংবাদ সম্মেলন ডেকে শেন কিথ ওয়ার্ন জানিয়ে দিলেন, এই অ্যাশেজ সিরিজই শেষ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর সময় এসে গেল।

গত বছর অ্যাশেজ সিরিজ শেষেই ঘোষণাটা দেবেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন। সেই সিরিজে নিজে পেয়েছিলেন ৪০ উইকেট—ক্যারিয়ারের সফলতম সিরিজ শেষে বিদায় নিলে বিদায়টা হতো বিজয়ীর বেশেই। হতো না। দলের পরাজয়ে ব্যক্তিগত জয়ের কী আর মূল্য থাকে! অস্ট্রেলিয়া অ্যাশেজ খুইয়ে বসার দিনই তাই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বিখ্যাত ওই ভস্মাধার দেশকে ফিরিয়ে দিয়ে তবেই যাবেন অবসরে। পার্থে জেতার পর অ্যাশেজ পুনরুদ্ধারের উৎসবের মধ্যেই তাই অধিনায়ক রিকি পন্টিংকে জানিয়ে দিলেন, ‘এই সিরিজই আমার শেষ।’

সেদিন জানিয়েছিলেন পন্টিংকে, পুরো বিশ্বকে জানালেন কাল। অস্ট্রেলিয়া অ্যাশেজ জিতেছে, টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম বোলার হিসেবে ৭০০ উইকেট নেওয়ার গৌরব থেকে নিজে এক পা দূরে দাঁড়িয়ে; যে সিডনিতে শুরু, শেষও হচ্ছে সেই সিডনিতেই—পরিতৃপ্ত ওয়ার্ন তাই ঘোষণা করছেন, ‘আমার মনে হয় না, আমার পাণ্ডুলিপিটা আমি এর চেয়ে ভালো লিখতে পারতাম!’

আসলেই পারতেন না। অবসর নেওয়ার আদর্শ সময় কোনটি—এ নিয়ে বহু প্রচলিত একটা কথা আছে। যখন অবসর নেবে, তখন যেন ‘কেন নয়?’ না বলে সবাই বলে ‘কেন?’ ওয়ার্নের অবসর ঘোষণার কথা শুনে পুরো ক্রিকেট বিশ্বেই চিৎকার উঠেছে—এখনই কেন? এই হাহাকার শুধুই বোলার ওয়ার্নের জন্য নয়। শেন ওয়ার্ন চলে যাওয়া মানেই যে ক্রিকেটের একটু রং হারানো!

এই দৃশ্য নিয়মিতই দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। আরেকটি কোনো কীর্তি বা মাইলফলক ছুঁয়ে বল তুলে ধরেছেন শেন ওয়ার্ন। রিকি পন্টিংও ছিলেন নিয়মিত দর্শকদের একজন

বোলার হিসেবে কত বড় ছিলেন—তা নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে। সর্বকালের সেরা লেগ স্পিনারের স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন অনেক আগেই, শুধু লেগ স্পিনের সীমানায় বেঁধে না রেখে ‘সর্বকালের সেরা স্পিনার’ও বলা হচ্ছে অনেক দিন। এখন এই কথাটাও উঠছে, পেস-স্পিন মিলিয়েই বা তাঁকে সর্বকালের সেরা বোলার বলা হবে না কেন?

টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি উইকেট তাঁর। তবে একদিন হয়তো, হয়তো কেন, নিশ্চিতই বলা যায়, শ্রীলঙ্কান অফ স্পিনার মুত্তিয়া মুরালিধরন ভেঙে দেবেন এই রেকর্ড। তা ভাঙুন, কিন্তু ওয়ার্ন-মহিমা তাতেও কি কমবে? ওয়ার্ন মানে তো শুধুই উইকেট আর রান নয়। বিলুপ্তপ্রায় লেগ স্পিনকে পুনর্জীবন দেওয়ার কৃতিত্ব তাঁর। খেলার মূল কথা যদি হয় বিনোদন, সেটিও ওয়ার্নের চেয়ে বেশি আর কজন দিতে পেরেছে! ওয়ার্নের বোলিং ক্রিকেটকে এমন রূপে-রঙে-রসে সাজিয়ে উপহার দিয়েছে যে, ‘ব্যাটসম্যানদের খেলা’য়ও লেগ স্পিন বোলিং দেখতেই মাঠে ছুটে গেছেন দর্শক। ওয়ার্ন বল হাতে নেওয়ামাত্র শুধু ব্যাটসম্যানদের হৃদকম্পনই বেড়ে যায়নি, গ্যালারির মতো টিভি সেটের সামনে বসা দর্শকও নড়েচড়ে বসেছেন রোমাঞ্চে।

সব মিলিয়ে শেন ওয়ার্ন ছিলেন তাঁর সময়ের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার। এমন নন্দিত, এমন বিতর্কিত, এমন আলোচিত ক্যারিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসেই কি আর কারও ছিল!

শুধু তো আর খেলা নয়, তারকা হতে খেলোয়াড়ি সাফল্যের বাইরেও কিছু লাগে। ওয়ার্নের তো তা ছিলই। অনেকে বলতে পারেন, একটু বেশিই ছিল। বোলিংয়ের মতোই বর্ণময় তাঁর জীবন, সে জীবনই কখনো কখনো মনে করিয়ে দিয়েছে, বল হাতে যতই অতিমানবীয় মনে হোক, ওয়ার্নও বাকি সবার মতো রক্ত-মাংসেরই মানুষ। তাতে তাঁর আকর্ষণটা বেড়েছে বৈ কমেনি! সব মিলিয়ে শেন ওয়ার্ন ছিলেন তাঁর সময়ের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার। এমন নন্দিত, এমন বিতর্কিত, এমন আলোচিত ক্যারিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসেই কি আর কারও ছিল!

দেখুন কী কাণ্ড! ওয়ার্ন প্রসঙ্গে এখনই ‘ছিলেন’ ‘ছিল’ লিখে অতীত বানিয়ে দিচ্ছি তাঁকে। শেন ওয়ার্ন তো এখনো আছেন। মেলবোর্ন আর সিডনি আরও দুটি টেস্টে দেখা যাবে ওই স্পিনের ইন্দ্রজাল। তার পরও ওয়ার্ন থাকবেন। থাকবেন ক্রিকেট ইতিহাসে, রেকর্ডের পাতায়, দর্শকের মনের মণিকোঠায়। কবি সেই কবেই লিখেছেন—‘পাখি উড়ে চলে গেলে তার পালক পড়ে থাকে।’

শেন ওয়ার্ন চলে যাওয়ার পরও অনেক ‘পালক’ই পড়ে থাকবে।