ক্যান্ডি শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে পাল্লেকেলে স্টেডিয়ামের চারপাশটা কী যে সুন্দর! মাঠের সমতলে দাঁড়িয়ে যে সৌন্দর্যটা খুব একটা বোঝা যায় না। বুঝতে হলে স্টেডিয়ামের দোতলা বা তিন তলায় দাঁড়াতে হয়। 

নৈসর্গিক সৌন্দর্য তামিম ইকবালকে ততটা টানে না। তাঁর পছন্দ ব্যস্তসমস্ত সিটি লাইফ। বড় শহর, বড় হোটেল, হাই এন্ড রেস্টুরেন্ট...তারপরও ২০১২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাল্লেকেলে স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচ খেলার পর তামিম ইকবালকে বলতে শুনেছি, 'স্টেডিয়ামের চারপাশের ভিউটা বড় সুন্দর!'

এই টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরি করে ফেললে ভিন্ন কথা বা এখানেই সিরিজের পরের টেস্টে, নইলে সৌন্দর্যের কারণে পাল্লেকেলেকে মনে রাখবেন না তামিম। মনে রাখবেন, তাঁকে একটা দুঃখের চক্কর থেকে বের করে একই রকম আরেকটা দুঃখে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পাল্লেকেলেতে প্রথম টেস্টের প্রথম দিনের সবচেয়ে করুণ দৃশ্য তো ওটাই: ৯০ রানে আউট হয়ে ফিরে আসছেন তামিম ইকবাল। তখন তাঁর কেমন লাগছিল, তা অনুমান করতে পারছি।

লাইনটা পড়ে আপনার একটু বিরক্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। মনে মনে হয়তো বলেছেনও, ‘কী পণ্ডিতি ফলানো হচ্ছে, ৯০ রানে আউট হয়ে ফেরার সময় ব্যাটসম্যানের কেমন লাগতে পারে, এটা কে না অনুমান করতে পারে!’

তাহলে কথাটা একটু বদলে দিই। অনুমান না করে তাহলে তামিম ইকবালের মুখ থেকেই শুনি, তখন তাঁর কেমন লাগছিল। 

‘এটা আসলে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। এত খারাপ লাগছিল যে...এত খারাপ ফিলিং পৃথিবীতে খুব কমই আছে। আউট হয়ে ফিরে আসার পথটা....উফ্, অসহ্য!’

লেখাটা শুরু করলাম পাল্লেকেলে টেস্টের প্রথম দিন চা-বিরতির সময়। যখন তামিম পাল্লেকেলের ড্রেসিংরুমে, আর আমি আমার বাবর রোডের বাসায়। তাহলে তামিমের প্রতিক্রিয়াটা আমি কীভাবে জানলাম? ড্রেসিংরুমে না মোবাইল নিষিদ্ধ!

সেই দীর্ঘ পথ, সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতা....পাল্লেকেলে টেস্টে ৯০ রানে আউট হয়ে ফিরছেন তামিম ইকবাল।

না, প্রতিক্রিয়াটা টাটকা নয়। প্রায় চার বছর আগের। কিন্তু কিছু জিনিস তো চিরকালীন, চার বছর কেন, চল্লিশ বছরেও তা বদলানোর নয়। ২০১৭ সালের ৫ জুন সন্ধ্যায় লন্ডনের গ্রাঞ্জ ইন হোটেলে তামিম যখন নার্ভাস নাইনটিজে কাটা পড়ার দুঃখের কথা বলছিলেন, তখন তা টাটকাই ছিল। কারণ কয়েক ঘণ্টা আগেই  ওই দুঃসহ অভিজ্ঞতার সঙ্গে আবার তাঁর পরিচয় হয়েছে। ওভালে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আউট হয়ে গেছেন ৯৫ রানে। 

এই ’৯৫’ সংখ্যাটাকে তামিম তখন মনেপ্রাণে ঘৃণা করতে শুরু করেছেন। ‘এই ৯৫ আমাকে ভালোই পেয়ে বসেছে। এর চক্কর থেকে যে কবে বেরোতে পারব!’ বলতে বলতে তামিম হেসেছিলেন। বেশি দুঃখে হাসলে তা কেমন দেখায়, আমার তা জানা হয়ে গিয়েছিল।

’৯৫-এর চক্কর’ কথাটা যদি না বুঝে থাকেন, তাহলে বলি, তখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তামিম যে চারবার নব্বইয়ের ঘরে আউট হয়েছিলেন, প্রতিবারই তা ৯৫ রানে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর কোনো ব্যাটসম্যান ৯৫ রানে এতবার আউট হননি। নিজের কাছেই প্রশ্নটা নিষ্ঠুর মনে হওয়ার পরও 'সব মনে আছে কি না' জিজ্ঞেস করে তামিমের কাছে জানতে চেয়েছিলাম সেই চারটি আউটের বিস্তারিত। তামিম তা বলেও ছিলেন।

কীভাবে আউট হয়েছিলেন, বোলার কে ছিল, কট আউট হয়ে থাকলে ক্যাচটা কোথায় উঠেছিল, এমনকি ফিল্ডারের নামও। এর আগে কোনো ঘটনা থাকলে তা-ও। ’৯৫-এর চক্কর’-এর কথাটাও বলেছিলেন তখনই। 

‘৯৫’-এর চক্কর থেকে বেরোলেন শেষ পর্যন্ত, কিন্তু তা কি আর কোনো সান্ত্বনা হতে পারে! পাল্লেকেলেতে ৯০ রানে আউট হয়ে তাঁকে যখন ফিরতে দেখছি, লন্ডনের ওই সন্ধ্যায় তামিমের আরেকটা কথা তখন কানে বাজছে, ‘আমি যখন টিভিতে অন্য দলের খেলা দেখি, আমার শত্রুও ৯০ রানে থাকলে চাই না যে, সে সেঞ্চুরির আগে আউট হয়ে যাক। কারণ ওই ফিলিংটা আমি জানি।‘

তামিমের সব নব্বইই অবশ্য এমন। শুধুই একটা সেঞ্চুরির চেয়ে আরও বড় কিছু পেতে পেতে না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস।

বাংলাদেশের পক্ষে টেস্টে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডটা নিয়ে মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে তামিমের একটা স্বাস্থ্যকর লড়াই চলছে। ইনিংসের এক তৃতীয়াংশ পথ পেরোতেই রেকর্ডটা আবার নিজের করে নিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি টেস্ট সেঞ্চুরির যে রেকর্ডটা কেড়ে নিয়েছেন মুমিনুল, তাতে আবার অধিকার ফিরে পাওয়াটাকেও মনে হচ্ছিল শুধুই সময়ের ব্যাপার। একক অধিকার না হলো, দশ সেঞ্চু্রির রেকর্ডে অংশীদারিত্ব তো থাকত। এমন দারুণ একটা ইনিংস, এই দুটি বাড়তি তাৎপর্য যোগ হলে যেটি আরও দারুণ হয়ে যেত।

তামিমের সব নব্বইই অবশ্য এমন। শুধুই একটা সেঞ্চুরির চেয়ে আরও বড় কিছু পেতে পেতে না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। ২০১০ সালের ১২ ডিসেম্বর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচে প্রথম ৯৫। নিজের শহর চট্টগ্রামে খেলা। যেখানে আগে কখনো আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি পাওয়া হয়নি। ছক্কা মেরে মেরে হোম ক্রাউডকে উন্মাতাল করে তুলেছেন। সেঞ্চুরিটা অষ্টম ছক্কায় আনতে গিয়েই সর্বনাশটা হলো। যে দাবেংওয়ার বলে এর আগে দুটি ছক্কা মেরেছেন, তাঁকেই তৃতীয়টা মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে দিলেন ডিপ মিড উইকেটে। ৯৫ রানে আউট হলে ব্যাটসম্যানের খারাপ লাগার জন্য বাড়তি কিছু লাগে না। তবে ঘটনাটা হোম গ্রাউন্ডে হলে দুঃখটা আরও বাড়ে বৈকি!

কী দারুণ সব শটই না খেলেছেন তামিম!

পরের ৯৫ প্রায় তিন বছর পর। কালকের আগে টেস্টে তামিমের একমাত্র নার্ভাস নাইনটিজ। ২০১৩-এর অক্টোবরে মিরপুরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওই টেস্টটার দফারফা করে দিয়েছিল বৃষ্টি। লর্ডস ও ওল্ড ট্রাফোর্ডে মহা আলোচিত দুই সেঞ্চুরির পর টেস্টে তামিমের ব্যাটে প্রায় সাড়ে তিন বছরের সেঞ্চুরি-খরায় অবশ্য বৃষ্টি নামতে নামতেও নামেনি। আগের বলটাতেই স্লিপ সরিয়ে দিয়েছেন নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক। লেট কাটে চার মেরে তার সুযোগ নিয়েছেন তামিম। পরের বলেও তা করতে গিয়ে এক্সস্ট্রা বাউন্সে ক্যাচ উঠে গেল গালিতে।

ক্যাচটা যে উইলিয়ামসন ধরেছিলেন, তা তো মনে আছেই, বোলারের নামটা আরও বেশি মনে আছে তামিমের। ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ড ট্যুরে আমাকে ইন্টারভিউ দিতে বসে নিল ওয়াগনার তামিমের খুব প্রশংসা করলেন। সেই ট্যুরের তামিম তো প্রশংসা করার মতোই খেলছিলেন। ওয়াগনার বাড়তি যোগ করলেন, ‘আমরা যখন শেষবার বাংলাদেশে গিয়েছিলাম, মিরপুরেও তামিম খুব ভালো খেলেছিল।‘

সেদিনই সন্ধ্যায় কথায় কথায় তামিমকে তা জানাতেই তীব্র শ্লেষভরা কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘তা তো বলবেই। মিরপুরে যে ও আমাকে ৯৫ রানে আউট করেছিল।‘ ব্যাটসম্যানরা নব্বইয়ের ঘরে আউট করা বোলারদের কখনো ভোলেন না। হয়তো ক্ষমাও করেন না।  

মিরপুরে সেঞ্চুরি হলে তা হতো নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তামিমের প্রথম। হয়তো এটা এমন কিছু নয়। একটু অপেক্ষা করতে হলেও সেই সেঞ্চুরি তো ঠিকই পেয়েছেন। কিন্তু পরের ৯৫-এ যা হারিয়েছেন, তা আর কোনোদিন পাওয়ার নয়। নেলসনে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বলের লাইন মিস করে এলবিডব্লু না হলে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ানের নাম মাহমুদউল্লাহ হয় না।

শুরু থেকেই কী দারুণই না ব্যাটিং করেছেন! বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রান, চারের পর চার, তবে সবই নির্ভেজাল ক্রিকেটিং শটে। তা খেলতে খেলতেই একমাত্র স্লিপ ফিল্ডারকে কেন ক্যাচিং প্র্যাকটিস করাতে গেলেন, একমাত্র তামিম ইকবালই তা বলতে পারবেন। না, তামিমও পারবেন না।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যে ৯৫ দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম, সেখানেও সেঞ্চুরি মিস করার বৃহত্তর তাৎপর্য ছিল। একই মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আগের ম্যাচে ১২৮ করেছেন তামিম। এখানেও সেঞ্চুরিটা হলে বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে একাধিক সেঞ্চুরি হতো। বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির রেকর্ড-আঙিনাতেও পা পড়ত তামিমের। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচেই সেঞ্চুরির কীর্তিতে সাঈদ আনোয়ার ও উপুল থারাঙ্গার পাশে লেখা হয়ে যেত তাঁর নামও।

লেগ স্টাম্পের ওপর মিচেল স্টার্কের শর্ট বলে ট্রেডমার্ক সেই এক পায়ে পুল করতে গিয়ে লং লেগে ক্যাচ দেওয়ায় তা হয়নি। তারপরও তামিমের সান্ত্বনা ছিল, ‘যে শটটা আমি ইনিংসজুড়ে সবচেয়ে কন্ট্রোল নিয়ে খেলেছি, সেটাই টপ এজ হয়ে গেল। এটা ব্যাড লাক ছাড়া কিছুই না। বাজে শট খেলে আউট হলে দুঃখটা বেশি হতো।‘

পাল্লেকেলে তামিমকে এই সান্ত্বনা দিতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হবে। শুরু থেকেই কী দারুণই না ব্যাটিং করেছেন! বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রান, চারের পর চার, তবে সবই নির্ভেজাল ক্রিকেটিং শটে। তা খেলতে খেলতেই একমাত্র স্লিপ ফিল্ডারকে কেন ক্যাচিং প্র্যাকটিস করাতে গেলেন, একমাত্র তামিম ইকবালই তা বলতে পারবেন।

না, তামিম ইকবালও পারবেন না। লন্ডনে যা বলেছিলেন, তা-ই হয়তো আবারও বলবেন, ‘আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি। ওপরওয়ালার ওপর বিশ্বাস করি। আমি মনে করি, ভাগ্যে এটাই লেখা ছিল। এটাই হয়েছে।‘

এটাও বোধ হয় ভাগ্যেই লেখা ছিল, একদিন তামিম '৯৫-এর চক্কর' থেকে বেরোবেন ঠিকই, কিন্তু সেই দিনটিও হবে একই রকম যন্ত্রণার নাম।