২০০৩ সালে বাংলাদেশ দলের পাকিস্তান ট্যুর। রশিদ লতিফ তখন পাকিস্তানের অধিনায়ক। পেশোয়ারে তাঁর হোটেল রুমে ইন্টারভিউ করতে গিয়েছি। হঠাৎ পাওয়া অধিনায়কত্ব,পাকিস্তান ক্রিকেটের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, টেস্ট সিরিজে প্রায় সমানে সমান টক্কর দেওয়া বাংলাদেশ দল নিয়ে বিস্ময়...এসব নিয়ে ইন্টারভিউ শেষ করার পর কথায় কথায় সাঈদ আনোয়ারের প্রসঙ্গ উঠল। ওঠার পর রশিদ লতিফের কথা আর শেষই হয় না। আমি টুকটাক সঙ্গত করে যাচ্ছি, এটা-ওটা প্রশ্ন করছি। তখন ভেবেছিলাম, পত্রিকার জন্য প্রশ্নোত্তর ফর্মেই এটাকে আরেকটা ইন্টারভিউ বানাব। হোটেলে ফেরার পর টেপ রেকর্ডারে আবার পুরোটা শুনতে শুনতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলাম।আমার কথাগুলো যে উল্টো সুর কেটে দিচ্ছে। রশিদ লতিফ এমন দারুণ বলেছেন যে, তাঁর জবানিতে পুরোটা লিখলেই বরং সাঈদ আনোয়ার সম্পর্কে পরিষ্কার একটা ধারণা পাওয়া যায়। তা-ই লিখেছিলাম। শুনুন তাহলে রশিদ লতিফের মুখেই–

সাঈদ আনোয়ার এখন আর পাকিস্তান দলে নেই, তবে পাকিস্তান দলের ওপর ওর ছায়া এখনও আছে। আরও অনেক দিন তা থাকবে। ওর মতো ব্যাটসম্যানের শূন্যস্থান পূরণ করা তো সহজ ব্যাপার নয়। গত ১০ বছর পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের মূল ভরসা হয়ে ছিল সাঈদ আনোয়ার। টেস্ট ক্রিকেটেও ওর রেকর্ড খুব ভালো, তবে ওয়ানডের সাঈদ আনোয়ারকেই এগিয়ে রাখব আমি। পাকিস্তানের সর্বকালের সেরা ওয়ানডে ব্যাটসম্যান তো বটেই, ওয়ানডে ক্রিকেটে ভিভ রিচার্ডসের পর ওকেই আমি সেরা বলে মনে করি। ও আমার খুব ভালো বন্ধু বা নিজের দেশের প্লেয়ার, এ জন্য এ কথা বলছি না। ওর রেকর্ডটা দেখলে আপনিই বুঝতে পারবেন, কেন এ কথা বলছি। সব দেশের বিপক্ষে রান করেছে ও। এমন নয় যে, শুধু উপমহাদেশেই রান করেছে, ও রান করেছে সব জায়গায়। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা-কোথায় সেঞ্চুরি করেনি!

সাঈদ আনোয়ার: ওয়ানডেতে যাঁকে ভিভ রিচার্ডসের পর সেরা মনে করতেন রশিদ লতিফ। ছবি: বিওএল নিউজ

সাঈদ আনোয়ার সম্পর্কে বলতে গিয়ে একটু আবেগাক্রান্তই হয়ে পড়ছি। ওর সঙ্গে তো আজকের সম্পর্ক নয়। আমাদের দুজনের বাড়ি একই জায়গায়, করাচির উপকন্ঠে মালির ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে আমাদের বাড়ি। তবে সাঈদের সঙ্গে একেবারে ছোটবেলায় আমার দেখা হয়নি। সাঈদ আনোয়ার নামটি আমি প্রথম শুনি আমার বড় ভাইয়ের মুখে। ও আমার বড় ভাইয়ের সঙ্গে কলেজে পড়ত। ভাইয়া একদিন আমাকে বললেন, সাঈদ আনোয়ার নামে একটি ছেলে খুব ভালো খেলছে। এটি শুনে আমি ভাইয়ার সঙ্গে খেলা দেখতে গেলাম। আমার ব্যাট নিয়ে গিয়েছিলাম, সাঈদ আমার ব্যাট দিয়েই খেলল। ৩০-৩৫ রান করেছিল, তাতেই ওর ব্যাটিং আমার চোখে লেগে যায়। সাঈদের এই এক অভ্যাস ছিল, প্রায়ই আমার ব্যাট দিয়ে ব্যাট করত। গত বিশ্বকাপে (২০০৩) ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরিটিও করেছিল আমার ব্যাট দিয়েই। ওকে দিয়ে সাইন করিয়ে ওই ব্যাট দিয়েই এখনও খেলছি আমি।

তবে যে ম্যাচের কথা বললাম, সেটির আগে আমাদের দেখা হয়নি। প্রথম দেখার সময় আমার বয়স ষোল-টোল হবে, সাঈদের হবে আঠার। এর কিছুদিন পরই আমি মালিক ক্যান্টনমেন্ট জিমখানা ক্লাবে যোগ দিলাম, সাঈদ আগে থেকেই ছিল ওই ক্লাবে। আমাদের সিরিয়াস ক্রিকেট খেলা এখানেই শুরু। সাঈদ ইউবিএল (ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিটেড)-এ জয়েন করল, আমিও ওই দলে যোগ দিলাম। ’৮৯ সালে পাকিস্তান দলে প্রথম খেলল সাঈদ, আমি প্রথম খেললাম ’৯২ সালে। সাঈদ তখন দলে ছিল না, ’৯৩ সালে ও দলে ফিরল। ক্লাব থেকে শুরু করে জাতীয় দল পর্যন্ত ১০-১২ বছর আমরা একসঙ্গেই খেলেছি।

অথচ জেনে অবাক হবেন, পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার কোনো ইচ্ছেই সাঈদের ছিল না। পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল, ‘ও’ লেভেলে ৮২ পার্সেন্ট মার্কস ছিল ওর, সাঈদ ক্রিকেট খেলত শখে, একেবারেই সিরিয়াস ছিল না। কিন্তু ওর এমনই প্রতিভা ছিল যে, ক্রিকেট ওর পিছু ছাড়েনি। করাচি অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ওর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখে পাকিস্তানের বড় বড় ডিপার্টমেন্ট ওকে দলে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিল। তখনই যোগ দেয় ইউবিএলে।

সাঈদ আনোয়ারের চোখ ছিল অসাধারণ, টাইমিংও তা-ই। তবে আসল জিনিস ছিল আত্মবিশ্বাস। ব্যাটিং করতে নামলে ম্যালকম মার্শাল বল করছে না কে বল করছে, তাতে ওর কিচ্ছু আসত-যেত না। ও ওর মতোই খেলে যেত।

সেখানে প্রথম বছরই এক হাজারের বেশি রান করার পর ভারতের বিপক্ষে সাইড ম্যাচে খেলার সুযোগ পেয়েই সেঞ্চুরি। পেশোয়ারে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাইড ম্যাচ, সেটিতেও সেঞ্চুরি। এরপর ইমরান খান ওকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যান, সেখানেও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেঞ্চুরি। এভাবেই আস্তে আস্তে ও ক্রিকেটে জড়িয়ে যায়, পড়াশোনায় আর সেভাবে মন দিতে পারেনি। তারপরও ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছিল, ক্রিকেট ছেড়ে ইঞ্চিনিয়ারিং লাইনে থাকলেও ও খুব ভালো করত বলে আমার বিশ্বাস।

সাঈদের ব্যাটিংয়ে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ত, তা হলো আত্মবিশ্বাস। ওর চোখ ছিল অসাধারণ, টাইমিংও তা-ই। তবে আসল জিনিস ছিল ওই আত্মবিশ্বাস। ব্যাটিং করতে নামলে ম্যালকম মার্শাল বল করছে না কে বল করছে, তাতে ওর কিচ্ছু আসত-যেত না। ও ওর মতোই খেলে যেত।

পুরো ক্যারিয়ারেই সাঈদ ওভাবে ব্যাট করেছে। খেলেছে অনেক স্মরণীয় ইনিংসও। সংখ্যাটা এত বেশি যে, কোনটা ছেড়ে কোনটার কথা বলি। করাচি অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ওর দুটি ইনিংসের কথা মনে পড়ছে। কোনো একটা টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল আর ফাইনাল। দুটিতেই ও হান্ড্রেড ফিফটি প্লাস রান করেছিল। সাঈদ তখন চার নম্বরে ব্যাট করে, দুটি ম্যাচেই যখন ব্যাট করতে নেমেছিল, দল ছিল খুব চাপের মধ্যে। 

ওয়ানডেতে ১৯৪ রানের রেকর্ডটি করার সময় তো ও ভারতীয় বোলারদের কাঁদিয়ে ছেড়েছিল। টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেকেই পেয়ার পাওয়ার পর আবার দলে ফিরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৬৭, কলম্বোতে একটি প্রথম ইনিংসে ৯০-এর ঘরে আউট হওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ১৩৫, ওভালে ১৭৬, কলকাতায় ১৮৮…এমন কত ইনিংসের কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে ডারবানের সবুজ উইকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে একটি সেঞ্চুরির কথাও। এমন নয় যে, ও সেঞ্চুরি করেছে আর দল হেরেছে। সাঈদ সেঞ্চুরি করার অর্থই ছিল পাকিস্তানের জয়, খুব কমই এর ব্যতিক্রম হয়েছে। গ্রেট প্লেয়াররা এমনই হয়। ব্রায়ান লারা সেঞ্চুরি করলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ যেমন বলতে গেলে হারেই না, সাঈদ আনোয়ার সেঞ্চুরি করলেও হারত না পাকিস্তান।

ওর মতো এমন আমুদে চরিত্র পাকিস্তান দলে আর দেখিনি। ওকে কখনও সিরিয়াস দেখেছি বলেই তো মনে পড়ে না। ম্যানেজার-কোচ থেকে শুরু করে সবার সঙ্গেই ইয়ার্কি-ফাজলামোতে মেতে থাকত ও।

শুধু মাঠের সাঈদ আনোয়ারই নয়, মাঠের বাইরের সাঈদ আনোয়ারকেও আমি খুব মিস করি। ওর মতো এমন আমুদে চরিত্র পাকিস্তান দলে আর দেখিনি। ওকে কখনও সিরিয়াস দেখেছি বলেই তো মনে পড়ে না। ম্যানেজার-কোচ থেকে শুরু করে সবার সঙ্গেই ইয়ার্কি-ফাজলামোতে মেতে থাকত ও। এ জন্যই সিনিয়র-জুনিয়র সব খেলোয়াড়ের সঙ্গেই ওর সমান খাতির ছিল। আমার মনে হয় না, পাকিস্তান দলে এমন খেলোয়াড় আর আসবে, যে ওর মতো টিম ম্যানেজমেন্টের সঙ্গেও দুষ্টুমি করতে পারবে। ওর দুষ্টুমির কোনো সীমা-পরিসীমা ছিল না। হয়তো সিরিয়াস মুখ করে কাউকে এমন একটা কথা বানিয়ে বলল যে, তা নিয়ে আরেকজনের সঙ্গে ঝগড়া লেগে গেল, কারও মোবাইলে হয়তো কোনো গালি লিখে দিল। অস্ট্রেলিয়া সফরের একটি ঘটনা মনে পড়ছে। সে সফরের পাকিস্তান দলের ম্যানেজার ছিলেন ব্রিগেডিয়ার নাসির। ওনার কণ্ঠের সঙ্গে ইজাজ আহমেদের কণ্ঠের খুব মিল ছিল। সাঈদ হোটেলের টেলিফোন ডাইভার্ট করে ব্রিগেডিয়ার সাহেবেরটা ইজাজের রুমে লাগিয়ে দিল, আর ইজাজেরটা লাগিয়ে দিল ব্রিগেডিয়ারের রুমে। এরপর ব্রিগেডিয়ারের ফোন এলে তা যায় ইজাজের কাছে, ইজাজেরটা যায় ব্রিগেডিয়ারের কাছে। এ নিয়ে অনেক মজা হয়েছিল সেবার।

'দাড়ি-টাড়িতে অন্যরকম দেখালেও সাঈদ এখনও আগের মতোই দুষ্টুমি করে, মজার মজার জোক বলে'

মেয়ের মৃত্যু সাঈদ আনোয়ারকে পাল্টে দিয়েছে ঠিকই, তবে আমাদের কাছে ও এখনো সেই পুরোনো সাঈদই আছে। দাড়ি-টাড়িতে ওকে অন্য রকম দেখালেও এখনও আগের মতোই দুষ্টুমি করে, মজার মজার সব ‘জোক’ বলে। যদিও ওর সঙ্গে এখন দেখা হয় খুবই কম। আমিও খেলা নিয়ে ব্যস্ত। সাঈদও প্রায়ই ১৫ দিন-এক মাসের জন্য পাকিস্তানের ছোট ছোট শহরে চলে যায়। সেখানে গিয়ে মানুষকে ইসলামের পথে আসতে বলে। পরিবার, বন্ধু-বান্ধবকে সময় দিতে পারে না। তারপরও যখনই ওর সঙ্গে দেখা হয়, সময়টা খুব ভালো কাটে। ওর বদলে যাওয়া নিয়ে রসিকতাও হয়। ও আমাকে ওর পথে আসতে বলে, আমি বলি, তোর এত দিনে মনে হয়েছে, তুই মুসলমান আর আমি তো ছোটবেলা থেকেই মুসলমান।

আসলে একেক জনের একেক পথ। আমার হয়তো নিয়মিত নামাজ পড়া হয় না, আমি মানবতাবাদে বিশ্বাসী, আশপাশের মানুষকে সাহায্য করাটাকেও আমি মনে করি ধর্ম। আমি চাই খেলোয়াড়ি জীবনে যেন কোনো ভুল না করি, যেটি নিয়ে পরে আমাকে অনুশোচনায় ভুগতে হয়। পাকিস্তানে একজন ক্রিকেটার জাতীয় দলে খেললে সে ১৫টি পরিবারকে দেখে। একাডেমির মাধ্যমে ক্রিকেটার তৈরির করার যে কাজটা আমি করছি, তা দিয়ে অনেকের উপকারই করছি। সাঈদও এটা মানে। 

তবে মানার পর এমন একটা রসিকতা করে, যেটি আমি আপনাদের বলতে পারব না। এটা আমাদের মধ্যেই থাকুক।

আরও পড়ুন......
ক্রিকেট, জীবন–সবই অন্য চোখে দেখছেন সাঈদ আনোয়ার
একসঙ্গে সাঈদ আনোয়ার-আমির সোহেল
সাঈদ আনোয়ার-আমির সোহেল: ইন্টারভিউয়ে যা লেখা হয়নি
সাঈদ আনোয়ার: অন্তত সেদিনের ‘বেস্ট