বাণিজ্যের আগ্রাসনে খেলা অনেক দিনই আর খেলা নেই। ‘আরও টাকা চাই, আরও টাকা’ মন্ত্র জপতে জপতে খেলা পরিণত হয়েছে টাকা কামানোর এক হাতিয়ারে। এমন নতুন কোনো কথা নয়। কিন্তু ফুটবলে যা হচ্ছে, তাতে পুরোনো কথাটাই আবার নতুন করে বলতে হচ্ছে। যা হচ্ছে, তা সবারই মোটামুটি জেনে যাওয়ার কথা। কেন হচ্ছে, এটাও আর বুঝতে না পারার কোনো কারণ নেই। অর্থের লোভ। আরও টাকা চাই, আরও টাকা!

কানাঘুষা শোনা যাচ্ছিল অনেক দিন ধরেই। সেই কবেই তো শুনেছিলাম, ইউরোপের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ধনী ক্লাবগুলো উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের বিকল্প একটা লিগ চালু করতে চরম গোপনীয়তা রক্ষা করে আলাপ আলোচনা করে যাচ্ছে। সেই গুঞ্জন সত্যি বলে প্রমাণিত হলো এমন একটা সময়ে, যখন বিশ্ব করোনাকবলিত। যেটির প্রভাব আর সবকিছুর মতো ফুটবলেও ভালোমতোই পড়েছে। 

খবরটা আপনি এরই মধ্যে জেনে গেছেন ধরে নিয়ে লেখাটা শুরু করেছি। সম্ভাবনা কম জেনেও ভাবছি, যদি কেউ কোনো কারণে এখনো না জেনে থাকেন, সংক্ষেপে তা বলে নেওয়াটা ভালো কি না। একটু তাহলে বলেই নিই। 

খুব সংক্ষেপে বললে ফুটবলকে টালমাটাল করে দেওয়া ঘটনাটা এরকম: প্রভাব, দর্শক সমর্থন, অর্থ সবকিছু বিবেচনায় ইউরোপের সবচেয়ে বড় ১২টি ক্লাব মিলে ইউরোপিয়ান সুপার লিগ (ইএসএল) নামে নতুন একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে যাচ্ছে। ইংল্যান্ডের ‘বিগ সিক্স’ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার সিটি, আর্সেনাল, চেলসি, টটেমহাম আছে এই ১২ ক্লাবের মধ্যে। স্পেন আর ইতালির ক্ষেত্রে কথাটা হবে ‘বিগ থ্রি’। স্পেনের রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা ও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ এবং ইতালির এসি মিলান, জুভেন্টাস ও ইন্টার মিলান। এই ১২টি ক্লাবের মতো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে আরও তিনটি ক্লাব যোগ হবে বলেও জানিয়েছেন ইএসএল আয়োজকেরা। স্থায়ী এই ১৫টি ক্লাবের সঙ্গে কোয়ালিফাই করার শর্তে যোগ হবে আরও ৫টি ক্লাব। কোয়ালিফাই করার শর্ত বা নিয়মটা যদিও এখনো পরিষ্কার নয়। 

তবে যা এরই মধ্যে পরিষ্কার, তা হলো, এই ২০টি ক্লাব দুই গ্রুপে ভাগ হয়ে লিগ পদ্ধতিতে খেলবে। চ্যাম্পিয়নস লিগের মতোই খেলা হবে মিড উইকে। দুই গ্রুপ থেকে তিন-তিন ছয়টি দল কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যাবে। বাকি দুটি দল চূড়ান্ত হবে গ্রুপে চতুর্থ ও পঞ্চম দলের মধ্যে প্লে-অফের মাধ্যমে। এরপর সেমিফাইনাল-ফাইনাল প্রচলিত নিয়মে।

তার মানে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে আর খেলবে না এই ২০টি ক্লাব। তবে ফুটবলের প্রতি 'ভালোবাসা এবং কমিটমেন্ট' থেকে ঘরোয়া লিগগুলোতে খেলার সদয় সম্মতি জানিয়েছে তারা। ইউরোপের সবচেয়ে বড় ১২টি ক্লাব বলছিলাম। এই মুহূর্তে জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখ ও ফ্রান্সের প্যারিস সেন্ট জার্মেই-ও বড়ত্বের দাবিদার। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বাকি তিনটি সম্ভাব্য ক্লাবের কথা অনুমান করতে গেলে এই দুটি ক্লাবের কথাই প্রথমে মনে পড়ে। তবে এখন পর্যন্ত যা খবর, তাতে জার্মানি বা ফ্রান্সের কোনো ক্লাব এই ইএসএলে যোগ দিচ্ছে না। সাবেক ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন বরুসিয়া ডর্টমুন্ড প্রকাশ্যেই এই অবস্থানের কথা জানিয়ে দিয়েছে। প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের এমনিতেই যাওয়ার কথা নয়। কাতারি মালিক কি এই দলে যোগ দিয়ে কাতারকে ফিফার রোষানলে পোড়াবে নাকি! যেখানে আগামী বছরই কাতারে বিশ্বকাপ হওয়ার কথা।

অ্যানফিল্ড স্টেডিয়ামের সামনে লিভারপুল সমর্থকেরা জানিয়ে দিচ্ছেন ইএসএল নিয়ে তাদের আপত্তির কথা

তা ইউরোপের বড় ক্লাবগুলো যদি নতুন একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে, তাতে সমস্যাটা কী? এই প্রশ্নটা আপনার মনে জাগতেই পারে। বারবার যে 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' বলছি, উত্তরটা লুকিয়ে সেখানেই। যেকোনো প্রস্তাবে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মতো প্রকাশিত বারো আর অপ্রকাশিত বা এখনো অনির্ধারিত তিন-এই ১৫টি ক্লাব হলো ইএসএলের স্থায়ী সদস্য। তারা কখনো এই প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়বে না। গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ে গেলেও কোনো সমস্যা নেই। অর্থাৎ খেলার মূল যে চেতনা –ওপেন কমপিটিশন–অর্থ, ক্ষমতা আর লোভের কাছে সেটিই তো এখানে হারিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপের ছোট একটা ক্লাবও তো স্বপ্ন দেখতে পারে, একদিন তারা চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলবে। সেই স্বপ্ন বাস্তব হওয়ার অনেক রোমান্টিক গল্পের সাক্ষীও তো হয়ে আছে ফুটবল। ইএসএলের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সেটাই তো হারিয়ে যাবে।

তাতে এই ক্লাব মালিকদের কিছু আসে যায় না, কারণ ফুটবলের বৃহত্তর আবেদন বা ফুটবল ফ্যানদের আবেগের তারা থোড়াই কেয়ার করে।তাদের লক্ষ্য তো একটাই: 'আরও টাকা চাই, আরও টাকা'। এই প্রতিযোগিতার পৃষ্ঠপোষক জেপি মরগ্যানের কাছ থেকে এরই মধ্যে যেটির নিশ্চয়তা মিলেছে। টাকার অংকটা অনুমিতভাবেই গোপন রাখা হয়েছে, তবে শোনা যাচ্ছে, তা নাকি ক্লাবপ্রতি ৪.২১ বিলিয়ন ডলার। ভেঙে বললে যা চার শ একুশ কোটি ডলার। বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তর করার সাহস আমার নাই। আপনার থাকলে করতে পারেন।

ক্লাবগুলো আরও বেশি টাকা পেলে আমার-আপনার সমস্যা কী? সমস্যাটা ফুটবল ফ্যান হিসেবে। চ্যাম্পিয়নস লিগের মজা তো শুধু মূল টুর্নামেন্টই শুরু হয় না, প্রিয় ক্লাব কোয়ালিফাই করতে পারবে কি পারবে না, এটাও তো সমর্থকদের জন্য কম উত্তেজনার জোগানদার নয়। আর ওই স্থায়ী ১৫টি ক্লাব যেখানে জানবে, ভালো করলেও তারা এখানে থাকবে, না করলেও থাকবে; খেলোয়াড়দের মধ্যে কি আর সেই কমপিটিটিভ স্পিরিটটা থাকবে?

গরীবের বানানো ক্লাব চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে বড়লোকেরা। ওল্ড ট্রাফোর্ডের সামনে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের প্রতিবাদী ভক্তরা

উয়েফা এরই মধ্যে এই 'বিদ্রোহী লিগ' ঠেকাতে যা করা দরকার, তা করার হুমকি দিয়েছে। 'হুমকি' কথাটা আমার নিজের কাছেই আপত্তিকর মনে হচ্ছে। আমি বরং বলব, প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়াই দেখিয়েছে। উয়েফা প্রেসিডেন্ট আলেক্সজান্দার সেফেরিনের অনেক কথার মধ্যে একটা কথা তো একেবারে আমার মনের কথার সঙ্গে মিলে গেছে। এটা ফুটবল ফ্যানদের মুখে থুতু ছিটিয়ে দেওয়ার মতো। 

এ নিয়ে ফিসফাস কানে যাওয়ার পর ফিফা তো সেই জানুয়ারিতেই বলে দিয়েছে, ইএসএলে যে ফুটবলাররা খেলবেন, তারা ফিফা অনুমোদিত কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নিতে পারবেন না। ফিফা অনুমোদিত টুর্নামেন্ট বললে প্রথমেই মনে পড়ে বিশ্বকাপের কথা। তার মানে আগামী বিশ্বকাপ কি হবে তারকাবিহীন? বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের বেশির ভাগই তো ইএসএলের ক্লাবগুলোতে খেলেন। ফুটবলাররা কি এটা মেনে নেবেন?

সমস্যা হলো, ফুটবলাররা তো আসলে ক্লাবের দাস। ক্লাব তাদের কিনে নিয়েছে, ক্লাব যেখানে খেলতে বলবে, সেখানেই তারা খেলতে বাধ্য। তারপরও মনে প্রশ্ন জাগে, লিওনেল মেসি কি আগামী বিশ্বকাপটা খেলে তাঁর একমাত্র অপ্রাপ্তিটা ঘোচানোর সুযোগটাকে জলাঞ্জলি দিতে রাজি হবেন? এত এত দেশের এত ফুটবলার বিসর্জন দেবেন বিশ্বকাপের আলোয় আলোকিত হওয়ার বা বিশ্বকাপে আলো ছড়ানোর স্বপ্ন?

সব মিলিয়ে ফু্টবল এমন সংকটে এর আগে কোনোদিন পড়েনি। যেটির ভয়াবহতা বোঝা যায়, যখন এ নিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বা জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল পর্যন্ত কথা বলেন। জনসন যথার্থই বলেছেন, এই ইএসএল ঘরোয়া ফুটবলের বুকে ছুরি চালাবে।

ইউরোপের বড় ফুটবল-দেশগুলোর সব ফেডারেশনই তো উয়েফার সুরেই কথা বলছে। ঘরোয়া ফুটবল থেকে ইএসএলের ক্লাবগুলোকে নিষিদ্ধ করার পথ তারা নিশ্চয়ই খুঁজবে। এই প্রস্তাব তো এরই মধ্যে সাবেক খেলোয়াড়দের অনেকে দিয়ে রেখেছেন। ফুটবলের প্রাণভোমরাই তো ঘরোয়া লিগ, তাতে না খেলে এই ক্লাবগুলো টিকে থাকতে পারবে? আবার এই ক্লাবগুলোকে ছাড়া প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা, সিরি 'আ'রই বা কেমন হতশ্রী দশা হবে!

সব মিলিয়ে ফু্টবল এমন সংকটে এর আগে কোনোদিন পড়েনি। যেটির ভয়াবহতা বোঝা যায়, যখন এ নিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বা জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল পর্যন্ত কথা বলেন। জনসন যথার্থই বলেছেন, এই ইএসএল ঘরোয়া ফুটবলের বুকে ছুরি চালাবে।

শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা দেখার জন্য বিশ্ব জোড়া ফুটবল ভক্তরা এখন উৎকণ্ঠিত অপেক্ষায়। সেই উৎকণ্ঠা আসলেই বিশ্বব্যাপী, কারণ ইউরোপের ফুটবল তো শুধু ইউরোপের নয়, সব দেশেই ছড়িয়ে আছে এর অনুরাগী। আরেকটা কথাও শুনছি, চ্যাম্পিয়নস লিগের টাকার আরও বেশি ভাগ পেতে এটা বড় ক্লাবগুলোর ব্ল্যাকমেইলিং প্লট। আমাদের কারণে বেশি রাজস্ব আসে, আমরা কেন আরও বেশি পাব না? এমনিতে প্রশ্নটা খুব অযৌক্তিক শোনায় না। কিন্তু খেলাটার বৃহত্তর স্বার্থও তো দেখার ব্যাপার আছে। অর্থের দৃষ্টিকোণ থেকে ফুটবল বিশ্ব এমনিতেই 'হ্যাভ' আর 'হ্যাভ নট'-এ বিভক্ত এবং সেই ব্যবধান দিন দিনই বাড়ছে। কোথায় তা কমানোর চেষ্টা হবে, তা না, উল্টো আমরা দেখছি যার আছে, তারই আরও পাওয়ার জন্য লোভের লকলকানি।

ক্রিকেটের 'বিগ থ্রি' আর ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের 'বিগ টুয়েলভ'-এর দেখছি একই গল্প। শ্রীনিবাসনের পতন আর শশাঙ্ক মনোহরের মতো খেলাটার বৃহত্তর স্বার্থকে একজনের উত্থান মিলিয়ে 'বিগ থ্রি'র হাত থেকে সাময়িক মুক্তি মিলেছিল ক্রিকেটের। কিন্তু এই 'বিগ টুয়েলভ'-এর হাত থেকে ফুটবলকে বাঁচাবে কে? 

ইএসএলের এই কাণ্ডকীর্তির সঙ্গে কয়েক বছর আগে ক্রিকেটের ঘটনার সঙ্গে আমি মিল খুঁজে পাচ্ছি। শ্রীনিবাসনের নেতৃত্বে ভারত, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া মিলেও এরকমই করতে চেয়েছিল। রাজস্বের সিংহভাগ পাবে এই তিন দেশ। টেস্ট ক্রিকেট হবে দুই স্তরে, তাতে প্রমোশন-রেলিগেশন থাকবে, কিন্তু তিন দেশের গায়ে কখনো সেই ছোঁয়া লাগবে না।

ইএসএল নিয়ে ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ যা বললেন......

Florentino Perez has hit back at threats from UEFA and FIFA, claiming the European Super League will save football.

(via @elchiringuitotv) pic.twitter.com/oOjD5xgHAk

— ESPN FC (@ESPNFC) April 20, 2021

ক্রিকেটের 'বিগ থ্রি' আর ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের 'বিগ টুয়েলভ'-এর দেখছি একই গল্প। শ্রীনিবাসনের পতন আর শশাঙ্ক মনোহরের মতো খেলাটার বৃহত্তর স্বার্থকে একজনের উত্থান মিলিয়ে 'বিগ থ্রি'র হাত থেকে সাময়িক মুক্তি মিলেছিল ক্রিকেটের। কিন্তু এই 'বিগ টুয়েলভ'-এর হাত থেকে ফুটবলকে বাঁচাবে কে? 

উত্তরটা আমি জানলে অবশ্যই আপনাদের তা জানাতাম।