‌‘আমি তো নিজে জানি, যে ছেলেটি আমার পাগলের মতো ফ্যান, আমিও আসলে তার মতোই। এই বয়সী অন্য সব তরুণের মতো আমারও স্বপ্ন আছে, উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে, আছে অনিশ্চয়তাও। আমি হয়তো ক্রিকেটটা ভালো খেলি, এই যা!’

১৯৯৮ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ব্যাঙ্গালোর টেস্টের দ্বিতীয় দিন লাঞ্চের সময় ভারতীয় ড্রেসিংরুমের বাইরে বসে ইন্টারভিউ করছি রাহুল দ্রাবিড়কে। এই চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম তাঁর হোমগ্রাউন্ড, তাঁকে দেখতে পেয়ে পাশের গ্যালারি থেকে ওঠা ‌‘রাহুল’ ‌‘রাহুল’ চিৎকার তাই ক্রমশই জোরালো। সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই দ্রাবিড়ের অমন চমকে দেওয়ার মতো কথা।

চমকে দেওয়ার মতো, কারণ রাহুল দ্রাবিড় যে দেশের হয়ে খেলেন, সেই দেশটির নাম ভারত। এই উপমহাদেশ ছাড়া আর সব টেস্ট খেলুড়ে দেশের ক্রিকেটাররাই রাহুল দ্রাবিড়ের কথাগুলো বলবেন এবং তা চমকে যাওয়ার মতো কিছু হবে না। হ্যামিল্টনে স্যার রিচার্ড হ্যাডলিকে দেখেছি একা একা রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে, সিডনিতে স্টিভ ওয়াহ মাঝে মধ্যেই সুপার স্টোরে কেনাকাটা করতে যান, লোকজন ‌‘‌হাই’ ‌‘হ্যালো’ বলে, এ পর্যন্তই। এমনকি পাশের দেশ শ্রীলঙ্কাতেও কলম্বোর হোটেলের বাইরে দাঁড়িয়ে আধঘণ্টা কথা বলতে পারেন সনাৎ জয়াসুরিয়া। কিন্তু ভারতে টেন্ডুলকার-দ্রাবিড়-সৌরভরা ভারতের কোনো রাস্তায় বেরোলে দাঙ্গা শুরু হবে কিনা, এর পক্ষে বাজির কোনো দরই নেই। নিশ্চিত কোনো বিষয় নিয়ে তো আর বাজি হয় না।

খেলোয়াড়ি জীবনেই মাঠের বাইরে রাহুল দ্রাবিড়ের এমন ছবি পরিচিত ছিল সবার কাছে। ছবি: দ্য হিন্দু বিজনেস লাইন

ভারতে ক্রিকেটাররা শুধুই একজন খেলোয়াড় নন, তাঁরা একেকজন ‌‘ডেমি গড’, তাঁদের ঘিরে যে ক্রেজ, অন্যান্য দেশে তা বরাদ্দ থাকে শুধু মুভি স্টারদের জন্যই। সেই ভারতের একজন ক্রিকেট তারকা হয়ে মাটিতে পা রাখাটা বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন কাজ। এ কারণেই চমকে দিয়েছিল রাহুল দ্রাবিড়ের কথাগুলো। এখানেই থেমে গেলে কথা ছিল, কিন্তু তাঁকে তারকা বলাতেও বিস্ময়করভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন দ্রাবিড়, ‌‘বিশ্বাস করুন, আমার কাছে খ্যাতি হচ্ছে ক্রিকেটে ভালো করার একটি বাই প্রোডাক্ট। আমি কখনোই খ্যাতির জন্য ক্রিকেট খেলিনি। ভালো করতে পারলে খ্যাতি আসবে, আসবে টাকা, কিন্তু এর কোনোটিই আমার মূল প্রেরণা নয়। ছোটবেলা থেকেই আমি বিশ্বসেরাদের সঙ্গে সমানে সমানে লড়ার স্বপ্ন দেখে এসেছি। এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি উদ্দীপ্ত করে, আর কিছু নয়।’

কথাগুলো একটু অন্য রকম। তা রাহুল দ্রাবিড়ও যে একটু অন্যরকম, সেটি তো এখন ক্রিকেট বিশ্বের জানাই। ক্রিকেট খেলোয়াড় আর ক্রিকেটারের মধ্যে অনেক পার্থক্য, রাহুল দ্রাবিড় হলেন ক্রিকেটার। যেকোনো মাঠে গিয়েই তিনি খোঁজ করেন ক্রিকেট মিউজিয়ামের, তাঁর বেডসাইড টেবিলে সব সময়ই দেখা যায় একটা-দুটো বই। ক্রিকেট ইতিহাসের মনোযোগী ছাত্র তিনি।

তাঁর কথাবার্তায় তাই জেট যুগের ক্রিকেটারদের সঙ্গে বেমানান মননশীলতার ছাপ। শুধু তাঁর কথা বা ব্যক্তিত্ব দিয়েই নয়, ব্যাটিং দিয়েও এখন ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দিচ্ছেন দ্রাবিড়। বিশ্বসেরাদের সঙ্গে সমানে সমানে লড়ার যে আশৈশব স্বপ্ন তাঁর, সেটিও অনেক দিন থেকে আর শুধুই স্বপ্ন নয়। বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান কে-এই তর্কে গত এক দশকে শচীন টেন্ডুলকারের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পেরেছেন শুধু দুজন। ব্রায়ান লারা আর স্টিভ ওয়াহ। ইংল্যান্ড সফরের পর এই দুজনকে সরিয়ে টেন্ডুলকারের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন রাহুল দ্রাবিড়। টেস্ট-ওয়ানডে মিলিয়ে হয়তো টেন্ডুলকারই সেরা, তবে শুধু টেস্ট ক্রিকেটের বিবেচনায় দ্রাবিড়ই বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান কিনা, এই আলোচনা কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। নইলে চেন্নাই টেস্টের আগে ভিভ রিচার্ডস তাঁর কলামে কেন লিখবেন, ‌‘দ্রাবিড়কে তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দিতে পারা না পারাতেই নিহিত ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাফল্যের সম্ভাবনা!’

‌"বিশ্বাস করুন, আমার কাছে খ্যাতি হচ্ছে ক্রিকেটে ভালো করার একটি বাই প্রোডাক্ট। আমি কখনোই খ্যাতির জন্য ক্রিকেট খেলিনি। ভালো করতে পারলে খ্যাতি আসবে, আসবে টাকা, কিন্তু এর কোনোটিই আমার মূল প্রেরণা নয়।"

ইংল্যান্ডে টানা তিন ইনিংসে সেঞ্চুরি করেছেন দ্রাবিড়, দেশে ফিরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চতুর্থ ইনিংসেও। তবে দ্রাবিড়কে যে অনেকেই বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান বলতে শুরু করেছেন, সেটি শুধুই টানা চার ইনিংসে সেঞ্চুরির কারণে নয়। টানা চার ইনিংসে সেঞ্চুরি তো ডন ব্র্যাডম্যানের নেই, নেই গ্যারি সোবার্সেরও, ভিভ রিচার্ডসও তা করতে পারেননি। তাই বলে কেউই তাঁদের বাদ দিয়ে সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে এভারটন উইকস, জ্যাক ফিঙ্গলটন বা অ্যালান মেলভিলের কথা বলবেন না। অথচ দ্রাবিড়ের আগে টেস্ট ক্রিকেটে টানা চার ইনিংসে সেঞ্চুরি ছিল শুধু এই তিনজনেরই।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিখ্যাত ‌‘তিন ডব্লিউ'-এর একজন উইকস তো চারেই থেমে থাকেননি, সেঞ্চুরি করেছিলেন পঞ্চম ইনিংসেও। টানা ষষ্ঠ ইনিংসেও সেঞ্চুরি হয়েই যাচ্ছিল, দুর্ভাগ্য…নিছক দুর্ভাগ্যই বঞ্চিত করেছিল তাঁকে। ৯০ রানে আউট হয়ে গিয়েছিলেন উইকস। ৪৮ টেস্টে ১৫টি সেঞ্চুরি উইকসকে তাও সর্বকালের সেরাদের দলেই রাখে। ফিঙ্গলটন-মেলভিলের ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নই আসে না। সাংবাদিক এবং ক্রিকেট লেখক হিসেবে আরও বেশি খ্যাতি পাওয়া অস্ট্রেলিয়ান ফিঙ্গলটনের ১৮ টেস্টে ৫টি সেঞ্চুরি। দক্ষিণ আফ্রিকান মেলভিলের তো ১১ টেস্টে ওই টানা ৪টি সেঞ্চুরিই সম্বল।

টানা চার সেঞ্চুরি হয়তো রাহুল দ্রাবিড়কে শচীন টেন্ডুলকারের ছায়া থেকে বের করে এনেছে, তবে এটিই তাঁকে নিয়ে উচ্ছ্বাসের একমাত্র কারণ নয়। ওয়ানডেতে তাঁর কার্যকারিতা নিয়ে মাঝেমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, টেস্ট ক্রিকেটে কখনোই নয়। ’৯৬ সালে ইংল্যান্ড সফরে টেস্ট অভিষেকেই ৯৫ রানের ইনিংসের মাধ্যমে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এরপর আর কখনোই হারায়নি। চার সেঞ্চুরি তাঁকে নতুন করে চিনিয়েছে মাত্র।

মানুষ রাহুল দ্রাবিড়ের মতো তাঁর ব্যাটিংয়ের ছিল শুদ্ধতার ছাপ। ছবি: গেটি ইমেজেস

অভিষেকের পর থেকে ওয়ানডের ধুমধাড়াক্কার এই যুগে ক্রমশই আদর্শ টেস্ট ব্যাটিংয়ের প্রতীক হয়ে উঠছেন দ্রাবিড়। গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশের নিউজিল্যান্ড সফরের সময় মার্টিন ক্রোর মুখে শুনেছিলাম এই কথাটাই। শচীন টেন্ডুলকার, ব্রায়ান লারা, ওয়াহ ভাইদের কথা বলতে বলতেই হঠাৎই চোখমুখ উজ্জ্বল করে মার্টিন ক্রো বলেছিলেন, ‌‘দ্রাবিড়ের ব্যাটিং দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। শুদ্ধ ব্যাটিংয়ের মজাটা পাওয়া যায় ওকে দেখলে।’ চেন্নাই টেস্টের আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোচ রজার হার্পারও দেখলাম একই কথা বলছেন,‌ ‌‘এত নিখুঁত টেস্ট ব্যাটিং দুনিয়ার আর কেউ করে না। শচীনও আপনাকে আউট করার সুযোগ দেবে। রাহুল তা-ও দেবে না।’

ভারতের আর একজন ব্যাটসম্যান সম্পর্কেই এ রকম কথা শোনা যেত। সেই সুনীল গাভাস্কারকে নিয়ে বাঁধা ক্যালিপসো লাইন ‌‘জাস্ট লাইক আ ওয়াল’ এখন দ্রাবিড়কে উদ্দেশ করেও গাইতে চাইছেন অনেকে। গাভাস্কারের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক অজিত ওয়াদেকারও গাভাস্কারের সঙ্গে দ্রাবিড়েরই সবচেয়ে বেশি মিল খুঁজে পান, এরপর জানান আক্ষেপের কথাও,‌ ‌‘ওয়ানডের কারণে টেকনিকে এত ভাঙচুর করতে না হলে টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে ওর জাতটা আরও ভালো বোঝা যেত।’

এখন গাভাস্কারের সঙ্গে তুলনা হচ্ছে। এর আগে হয়েছে বিজয় হাজারের সঙ্গে। গাভাস্কার ছিলেন ওপেনার, কালেভদ্রে ওপেন করলেও দ্রাবিড় মনেপ্রাণে মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। বিজয় হাজারের সঙ্গে তুলনাটাই তাই হয়তো বেশি যুক্তিযুক্ত। কাকতালীয়ভাবে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের মধ্যে একটি কীর্তি আছে শুধু এই তিনজনেরই। টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি। দ্রাবিড়ের সেই কীর্তিও আবার দেশের বাইরে।

দেশের বাইরের পারফরম্যান্সই দ্রাবিড়ের গ্রেটনেসের পথে যাত্রার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। দেশের বাইরে অপরিচিত কন্ডিশনেই ব্যাটসম্যানশিপের চূড়ান্ত পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় দ্রাবিড় লেটার মার্ক পেয়ে উত্তীর্ণ। তাঁর ১৪ টেস্ট সেঞ্চুরির ৯টিই দেশের বাইরে। রাহুল দ্রাবিড়ের সামনে পড়ে আছে আরও অনেকটা পথ। সেই 'পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে.....'

'গ্রেটনেস'।