পূর্ব কথা: স্বর্গে ক্রিকেট ম্যাচ হচ্ছে। ইংল্যান্ড বনাম অস্ট্রেলিয়া অর্থাৎ ‘ছাইয়ের যুদ্ধ’ মানে অ্যাশেজ। আগেই ঠিক হয়েছে, এই ম্যাচে শুধু তাঁরাই খেলবেন, যাঁরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে টেস্ট খেলেছেন। তবে আজকের ম্যাচটি ৫০ ওভারের, পৃথিবীতে যে নিয়মে ওয়ানডে ক্রিকেট হয়, ঠিক সে নিয়মেই।
                                                                                                                    .................................................................

টসে জিতলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক ডব্লিউ জি গ্রেস। ব্যাটিং না ফিল্ডিং— অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক জো ডার্লিং তা জানতেও চাইলেন না । ডক্টরের ওই বাণী তো ক্রিকেটে অমর হয়ে আছে, ‘টস জিতলে ব্যাটিং করো। সংশয় থাকলে একটু ভাবো, তারপর ব্যাটিং করো। বেশি সংশয় থাকলে টিমমেটদের সঙ্গে আলাপ করো, তারপর ব্যাটিং করো।' এই মতবাদ থেকে এখনো একচুল নড়েননি।

ইংল্যান্ড ব্যাটিং নেওয়ায় ডন ব্র্যাডম্যানের অবশ্য একটু মন খারাপ হলো। সিডনি বার্নসের বোলিং দেখতে তাহলে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে মাঠে ছুটে এসেছেন শুধু এ কারণেই। অন্যদেরও দেখার আগ্রহ আছে। তবে সেটি তো অনেক দেখেছেন। বাকিরা নিয়মিতই খেলেন। কিন্তু সিডনি বার্নসের খেলাটা একটা ঘটনা। ইচ্ছা হলে খেলেন, ইচ্ছা না হলে না। পৃথিবীতে থাকতে যেমন ছিলেন, এখানেও ঠিক তেমন। একই রকম মেজাজি, উদ্ধত, নিজের নিয়মে চলেন।

বার্নসকে নিয়ে ব্র্যাডম্যানের কৌতূহলটা অনেক পুরোনো। সেই পৃথিবীতে থাকতেই। বার্নসের বোলিং দেখেছেন, এমন সবার মুখে ভাঙা রেকর্ডের মতো একই কথা। বোলার হিসেবে বার্নস সবার ওপরে। তিনিই সর্বকালের সেরা।

২৭ টেস্টে ১৮৯ উইকেট আসলেই অবিশ্বাস্য। কী এমন বোলিং করতেন যে গড়ে প্রতি টেস্টে ৭ উইকেট! অন্যদের মুখে ও ইতিহাস ঘেঁটে যা জেনেছেন, তাতে তাঁকে সুনির্দিষ্ট কোনো ক্যাটাগরিতে ফেলা কঠিন। মূলত লেগ ব্রেক করতেন। বল স্পিন তো করাতেনই, সিমের ব্যবহারেও ছিলেন ওস্তাদ। বলে গতিও ছিল অনেক। ফাস্ট মিডিয়ামই বলত অনেকে। বার্নসের অবশ্য নিজেকে 'স্পিনার' বলে পরিচয় দিতেই পছন্দ ।

সব শুনে-টুনে ব্র্যাডম্যানের মনে হয়েছিল, তার খেলা কঠিনতম বোলার বিল ও'রিলি তাহলে কোথায় পিছিয়ে? বার্নসের বোলিংয়ে যা যা ছিল বলা হয়, সেসবের সঙ্গে ও'রিলির তো গুগলিটাও আছে।

প্রশ্নটা প্রকাশও করেছিলেন। কে যেন সিডনি বার্নসকে তা লাগিয়েও ছিল। বার্নস একটুও রাগ না করে নির্বিকার মুখে উত্তর দিয়েছিলেন, 'কথাটা সত্যি। আমার গুগলি ছিল না। আমার ওটার প্রয়োজন পড়েনি।'

মাঠে একটা হুল্লোড় উঠল। জ্যাক হবসের স্টাম্প উড়িয়ে দিয়েছেন স্পফোর্থ। বগলে ব্যাট রেখে গ্লাভস খুলতে খুলতে বেরিয়ে আসা হবসকে দেখতে দেখতেও বার্নসের কথাই ভাবছিলেন ব্র্যাডম্যান।

বার্নসের সঙ্গে খেলেছেন হবস। বাকি সবার মতো তিনিও বার্নসের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে নিঃসংশয়। ও'রিলিকে কাছাকাছিই রেখে বলেছিলেন, ‘সিড বার্নস, এসএফ, আমি তাকে সবার ওপরে রাখি। সে সর্বকালের সেরা বোলার। আমি মনে করি না, এখনো তার চেয়ে ভালো কেউ আছে। আমি স্বীকার করি, তার প্রায় কাছাকাছি এমন কেউ কেউ আছে। যেমন বিল ও'রিলি। এসএফ ব্যাটসম্যানদের ঘৃণা করত। ওর লেগ ব্রেক ছিল, অফ ব্রেক ছিল, আর ছিল গতি। লম্বা হওয়ার কারণে অপ্রীতিকর উচ্চতায় বল তুলতে পারত।‘

সিডনি বার্নস: সর্বকালের সেরা বোলার?

ব্র্যাডম্যান একবার ভাবলেন, শামিয়ানার নিচে গিয়ে বার্নসের সঙ্গে কথা বলবেন। তাঁর তো ব্যাটিংয়ে নামতে দেরি আছে। সাহসে কুলাল না। যেমন বদমেজাজি বলে শুনেছেন, সবার সামনে কি-না-কি বলে বসেন, কে জানে!

মাঠে ফিল্ডিং করতে করতে ভিক্টর ট্রাম্পার ও ক্লেম হিলও পুরোনো আততায়ী'র কথাই ভাবছিলেন। কত দিন পর আবারও সিডনি বার্নসকে খেলবেন! প্রায় ভুলে যেতে বসা সেই রোমাঞ্চটা ফিরে আসছে মনে। ব্যাটিং করতে নামার এখনো কত দেরি, এখনই পেটে প্রজাপতি নাচছে!

সিডনি বার্নসের প্রথম টেস্ট উইকেট ভিক্টর ট্রাম্পার। একই ইনিংসে আউট করেছিলেন ক্লেম হিলকেও। সেটি অস্ট্রেলিয়ায় ১৯০১-০২ সিরিজ। এর আগে দুজনের কেউই বার্নসের নাম শোনেননি। শুনবেনই বা কীভাবে! ইংল্যান্ড দলে তাঁর সুযোগ পাওয়াটাই তো অদ্ভুতভাবে।

এর আগে আট মৌসুমে মাত্র ৭টি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলেছেন। তখন খেলেন ল্যাঙ্কাশায়ার লিগে। কার কাছ থেকে যেন তাঁর কথা শুনে অস্ট্রেলিয়া সফরে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক আর্চি ম্যাকলারেন বার্নসকে নেটে ডাকেন। সে সময়ে ইংল্যান্ডের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন। বছর ছয়েক আগে কাউন্টিতে ৪২৪ রানের যে ইনিংসটি খেলেছেন, ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সেটি ইংল্যান্ডে সর্বোচ্চ স্কোরের রেকর্ড হয়ে থাকবে। অথচ সেই ম্যাকলারেন বার্নসকে খেলতেই পারছিলেন না। একবার উরুতে লাগল বল, আরেকবার হাতে । বার্নস বললেন, 'সরি, স্যার।' ম্যাকলারেন জবাব দিলেন, 'সরি বলার কিছু নেই। তুমি আমার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছ।'

বার্নসের মেজাজ-মর্জির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা ছিল খুব কঠিন। যে ম্যাকলারেন তাঁকে এমন নাটকীয়ভাবে দলে নিলেন, তিনি পর্যন্ত কদিনের মধ্যেই চরম বিরক্ত। সেটিও অস্ট্রেলিয়ায় পা রাখার আগেই। এর প্রমাণ হয়ে থাকা এই গল্পটা সে সময়ের প্রায় সব ক্রিকেটারেরই জানা। অস্ট্রেলিয়াগামী জাহাজ ঝড়ে পড়েছে। এক টিমমেট এসে ম্যাকলারেনকে বললেন, 'জাহাজ তো মনে হচ্ছে ডুবে যাবে।

ম্যাকলারেন উত্তর দিলেন, 'ডুবলে ডুবুক। আমাদের সঙ্গে ওই বার্নস শয়তানটাও ডুববে।”

মনে মনে বার্নসকে 'শয়তান' বলে ট্রাম্পার ও হিলও অনেকবারই গালি দিয়েছেন। কী ভোগানোটাই না ভুগিয়েছে! টেস্টে ট্রাম্পারকে ১৩ বার আউট করেছেন বার্নস। হিলকে ১১ বার। পেশাদারি শ্রদ্ধা অবশ্য পুরো মাত্রাতেই ছিল। যত ব্যাটসম্যানকে বোলিং করেছেন, তাদের মধ্যে তাকেই সেরা মনে করেন—বার্নস এ কথা বলেছেন শুনে কী তৃপ্তিটাই না পেয়েছিলেন ক্লেম হিল!

হিলের মনে পড়ে গেল ১৯১১ সালে মেলবোর্নে বার্নসের ওই স্পেলটা। নতুন বলে ৫ ওভারে মাত্র ১ রান দিয়ে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন। এর মধ্যে হিলও ছিলেন। যে বলটাতে আউট হয়েছিলেন, সেটিও স্পষ্ট মনে আছে। লেগ স্টাম্পের বাইরে পড়ল, আরামে প্যাডের ওপর দিয়ে খেলা যায়। কিন্তু ব্যাট তোলার আগেই দেখলেন, অফ স্টাম্প মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে!একসঙ্গে ডিনার করছেন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের তিন গ্রেট: ক্লেম হিল, ওয়ারউইক আর্মস্ট্রং ও ভিক্টর ট্রাম্পার। ছবিটা অবশ্যই স্বর্গের নয়, তাঁরা যখন মর্ত্যধামে ছিলেন।

সিডনি বার্নস টেস্ট ক্রিকেট থেকে বিদায় নিয়েছিলেন সবচেয়ে বেশি উইকেট নেওয়ার রেকর্ডের মুকুটটা মাথায় নিয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৯১২-১৩ সিরিজে ৪৯ উইকেট নেওয়ার সময়। দক্ষিণ আফ্রিকায় তখন ম্যাটিং উইকেট। বাড়তি বাউন্স পেয়ে বার্নস যাতে রীতিমতো আনপ্লেয়েবল। হিল তখন মাত্রই খেলা ছেড়েছেন। প্রথম চার টেস্টে ৪৯ উইকেট নেওয়ার পর সিডনি বার্নস পঞ্চম টেস্টে খেলেননি শুনে খুবই অবাক হয়েছিলেন। পরে জেনেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার জন্য তাঁকে বিশেষ বোনাস দেওয়ার কথা ছিল। সেটি না পাওয়াতেই খেলতে অস্বীকৃতি জানান। এক টেস্ট কম খেলার পরও এক সিরিজে বার্নসের সবচেয়ে বেশি উইকেট নেওয়ার রেকর্ডটি এখনো কেউ ভাঙতে পারেনি। সেদিনই ব্র্যাডম্যানকে বলছিলেন, 'টেস্ট ক্রিকেটে বড় রেকর্ডগুলোর মধ্যে অবিনশ্বর মনে হয় তিনটিই—তোমার ৯৯.৯৪ ব্যাটিং গড়, জিম লেকারের এক টেস্টে ১৯ উইকেট আর বার্নসের সিরিজে ৪৯ উইকেট।'

একটা জায়গায় কখনোই আপস করেননি বার্নস। মাঠে ঘাম ঝরালে সেটির উপযুক্ত বিনিময়মূল্য চাই। 'কষ্ট বেশি, পয়সা কম বলে কাউন্টি ক্রিকেটেও বলতে গেলে সেভাবে খেলেননি। খেলে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন লিগ ও মাইনর কাউন্টিতে। শুধু শনিবার খেলেই যেখানে কাউন্টিতে সপ্তাহে পাঁচ-ছয় দিন খেলার চেয়ে অনেক বেশি টাকা । ২৭টি টেস্ট যোগ করার পরও প্রায় ৩৬ বছরব্যাপী ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ারে ম্যাচ তাই মাত্র ১৩৩টি। যেখানে ৩২ বছরের ক্যারিয়ারে রোডস খেলেছেন ১১১০টি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ।

টেস্ট ক্রিকেটকেও দেখেছেন একই দৃষ্টিকোণ থেকে। যে কারণে হঠাৎই একটা সিরিজে দেখা যেত, বার্নস নেই। কখনো টানা দু-তিনটি সিরিজও খেলেননি। কখনোবা সিরিজের এক টেস্ট খেলার পরই উধাও। ১৯০২ অ্যাশেজেও তো একটিই টেস্ট খেলেছেন। বার্নসকে প্রতিপক্ষ দলে না দেখলে অবশ্য স্বস্তিই পেতেন হিল। আপন মনেই একটু হাসলেন—ওই সময়ে কোন ব্যাটসম্যানই তা পেত না!

ইংল্যান্ডের ইনিংসে ধস নেমেছে। ১২০ রানেই পড়ে গেছে ৭ উইকেট। ইংল্য্যান্ডের ড্রেসিংরুম তাই একটু থমথমে। মুডটা একটু চাঙা করতে চাইলেন উইলফ্রেড রোডস। সিডনি বার্নসের কাঁধে হাত রেখে বললেন, 'আরে, সিড আছে না! তোমরা এত ভেঙে পড়ছ কেন? নতুন বলে ও ট্রাম্পারকে শুধু তুলে নিক। বাকিটা আমি দেখছি ৷’

পুরো ক্যারিয়ারে ট্রাম্পার ছাড়া কোনো ব্যাটসম্যানকে কখনোই সমস্যা মনে করেননি রোডস। স্বর্গে এসেও সেটি বদলায়নি।

১৯৫১ সালে ওল্ড ট্রাফোর্ডে উইলফ্রেড রোডস ও সিডনি বার্নস। দুজন ছিলেন একে অন্যের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার পর রোডস বন্ধু বার্নসের সাহায্য নিয়েই মাঠে যেতেন। যে দৃশ্য দেখে একটা কবিতাও লিখেছিলেন অ্যালান রস

বার্নসের মুখে হাসি দেখা বিরল সৌভাগ্যের ব্যাপার। অন্য কেউ এই নির্দোষ কথাটা বললেও হয়তো কিছু একটা বলে বসতেন। রোডস বলেই চওড়া একটা হাসি দিলেন। দুজনের বন্ধুত্ব অনেক পুরোনো। রোডস যখন দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেললেন, তাঁকে ধরে ধরে লর্ডসে খেলা দেখাতে নিয়ে যেতেন বার্নস। মৃত্যুর কিছুদিন আগেও এই রুটিনের ব্যতিক্রম হয়নি। পরিচিত সেই দৃশ্য দেখে ক্রিকেট সাংবাদিক ও কবি অ্যালান রস একটা কবিতাও লিখেছিলেন কয়েকটি লাইন ছিল এ রকম—

Then, elbows linked, but straight as sailors
On a tilting deck, they move. One, square-shouldered as a tailor's Model, leans over, whispering in the other's ear:
‘Go easy. Steps here. This end bowling.'
Turning, I watch Barnes guide Rhodes into fresher air,
As if to continue an innings, though Rhodes may only
Play by ear.

স্বর্গে উইলফ্রেড রোডসকে স্বাগতও জানিয়েছিলেন সিডনি বার্নস। দুজনই দীর্ঘজীবী হয়েছেন। রোডস ৯৫ বছর ২১২ দিন পৃথিবীতে ছিলেন। বার্নস রোডসের চেয়ে ঠিক এক বছর এক দিন কম। সাড়ে পাঁচ বছরের ব্যবধানে মৃত্যু আবার তাঁদের পুরোনো বন্ধুত্ব ফিরিয়ে দিয়েছে। কোনো কিছু ফিরে পাওয়ার কথা মনে হলে অবশ্য রোডসের প্রথমেই মনে হয় স্বর্গে এসে আবার দৃষ্টিশক্তি লাভ। আহা, কত দিন পর বার্নসকে আবার দেখতে পেয়েছিলেন!

মাঠে তো স্লেজিং চলেছেই। লাঞ্চের বিরতিতেও স্লেজিং করে যাচ্ছিল অস্ট্রেলিয়ানরা। অগ্রণী ভূমিকায় ওয়ারউইক আর্মস্ট্রং। ভিক্টর ট্রাম্পার পাশেই নক করছিলেন। দৌড়ে এসে আর্মস্ট্রংকে বললেন, 'যাকে যা ইচ্ছা বলো, শুধু বার্নসকে কিছু বলো না। নতুন বলে ওর বোলিংটা কিন্তু আমাকেই খেলতে হবে।'

বার্নস ওয়ার্মআপ করে নিচ্ছেন। ক্যাপ্টেন নতুন বল দেবে কি না, তা নিয়ে একদমই ভাবছেন না। ডব্লিউ জির এই ভুল করার কথা নয়। ১৯১১ সালে সিডনি টেস্টের ওই ঘটনাটা কি ডক্টরের কানেও যায়নি! অধিনায়ক জনি ডগলাস তাঁকে নতুন বল না দিয়ে ফ্র্যাঙ্ক ফস্টারের সঙ্গে নিজেই যখন বোলিং ওপেন করলেন, রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। এরপর ভীষণ রাগ হলো। পরের ইনিংসেও একই ঘটনা। শিক্ষাটা অবশ্য ভালোই দিয়েছিলেন। ডগলাসেরও বুঝতে সমস্যা হয়নি। সবটা ঢেলে দিয়ে বোলিং করলে কি আর বার্নস ম্যাচে ১৭৯ রানে মাত্র ৪ উইকেট পায়! ওই টেস্টে ইংল্যান্ড হেরেছিল। পরের টেস্টে আর ওই ভুল করেনি ডগলাস।

১৯২৮ সালে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ড সফরে আসা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একটা ক্লাব দলের হয়ে খেলেছিলেন বার্নস। পরে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা বলে, ৫৪ বছরের সিডনি বার্নসকে খেলতেই নাকি তাঁদের সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়েছে।

বার্নসের মনে হয়েছিল, ডগলাস বুঝি তার সঙ্গে একটা ঝামেলা করতে চাইছে। কেউ এমন চাইলে তিনি পিছিয়ে যাওয়ার লোক নন। সেবার ব্যতিক্রম হয়েছিল ডগলাসের ব্যাকগ্রাউন্ড জানতেন বলে। ১৯০৮ লন্ডন অলিম্পিকে মিডলওয়েট বক্সিংয়ে গোল্ড মেডেল জিতেছিলেন ডগলাস। ওর সঙ্গে লাগতে যাওয়াটা বোকার মতো কাজ হতো।

ডগলাসের প্রতিভা শুধু বক্সিং আর ক্রিকেটেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ইংল্যান্ডের পক্ষে ফুটবলও খেলেছেন। ডগলাসকে নিয়ে আরেকটা কাহিনি মনে পড়ে গেল বার্নসের। অস্ট্রেলিয়ায় এমন ঠুকঠুক করে ব্যাটিং করছিল যে দর্শকেরা ‘জনি ওন্ট হিট টুডে' বলে ব্যারাকিং করতে শুরু করে। ঘটনা হলো, ডগলাসের পুরো নাম ছিল জন উইলিয়াম হেনরি টাইলার ডগলাস। সংক্ষেপে J. W. H. T. Douglas. ওই J. W. H. T. ইনিশিয়ালটাকেই Johnny Won't Hit Today বানিয়ে ফেলেছিল দর্শকেরা। ডগলাস অবশ্য তাতে থোড়াই কেয়ার করেছে। দর্শকেরা যত বেশি চেঁচাচ্ছিল, ও তত বেশি ডেড ব্যাটে খেলে যাচ্ছিল। বেচারার মৃত্যুটা হয়েছিল বড় করুণ। জাহাজডুবিতে। একটা বিজনেস ট্যুর শেষে বাবার সঙ্গে ইংল্যান্ডে ফিরছিল। কুয়াশায় তাদের জাহাজ আরেকটি জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা খায়। বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে ডুবে যায় ডগলাস। এটা ১৯৩০ সালের কথা। সে বছরই ওয়েলসের হয়ে শেষ ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচটি খেলেছিলেন বার্নস। বয়স তখন ৫৭। চাইলে আরও খেলতে পারতেন। আগের বছরই তো স্টাফোর্ডশায়ারের হয়ে ৮.২১ গড়ে ৭৬ উইকেট নিয়েছেন।

এর আগের বছর অর্থাৎ ১৯২৮ সালে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ড সফরে এসেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ওদের বিপক্ষে একটা ক্লাব দলের হয়ে খেলেছিলেন। পরে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা বলে, ৫৪ বছরের সিডনি বার্নসকে খেলতেই নাকি তাঁদের সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়েছে।

পিঠে টোকা পড়ায় পেছনে তাকালেন বার্নস। ডব্লিউ জি গ্রেস। মাঠে নামার সময় হয়ে গেছে। প্যাড-ট্যাড পরে রেডি অস্ট্রেলিয়ার দুই ওপেনার। সিডনি বার্নস মাঠে নামলেন।

(লেখকের ‘কল্পলোকে ক্রিকেটের গল্প’ বই থেকে সংক্ষেপিত ও সামান্য পরিবর্তিত)