আইপিএল যে খুব নিয়ম করে নিয়মিত দেখা হয়, তা না। এমন না যে, দেখতে ভালো লাগে না। টেস্ট ক্রিকেটের বড় ভক্ত হতে পারি, তাই বলে মাঝেমধ্যে টি-টোয়েন্টি খারাপ কি! ভাত-মাছ খেতে খেতে মাঝেমধ্যে কি ফাস্ট ফুড খেতে ইচ্ছা করে না! 

তাছাড়া ক্রিকেটের চিরন্তন অনুষঙ্গ ব্যাট-বলের লড়াই তো খানিকটা হলেও এতেও আছে। শুধু ব্যাটিং-বোলিংয়ের কথাই বলছি কেন, ক্রিকেট-কাব্যে উপেক্ষিতা ফিল্ডিংও তো টি-টোয়েন্টিতে নতুন মাত্রা পায়। আইপিএল নিয়ে বলতে গিয়ে টি-টোয়েন্টি বলছি, কারণ অনুমান করি, টি-টোয়েন্টির কথা বললে আমার মতো আপনার চোখেও প্রথমেই আইপিএলের ছবিই ভেসে ওঠে। টেস্ট প্লেয়িং প্রায় সব দেশেরই এখন টি-টোয়েন্টি লিগ আছে। তবে আইপিএল হলো আইপিএল, সব টি-টোয়েন্টি লিগের বাবা।  

আইপিএলে টাকার ঝনঝনানি সবচেয়ে বেশি, এটাই একমাত্র কারণ নয়। টাকা তো পান ক্রিকেটার-কোচ বা আইপিএলের সঙ্গে যাঁরা অন্য কোনো ভূমিকায় জড়িয়ে; কোটি কোটি টেলিভিশন দর্শক এতে বুঁদ হয়ে থাকেন কেন? যারা বাজি-টাজি ধরেন, তাদের কথা ভিন্ন। বাকিদের তো আর নগদপ্রাপ্তির কোনো ব্যাপার নেই। 

বিশ্বের সেরা ক্রিকেটারটা খেলেন, বড় কারণ তো অবশ্যই এটা। তবে নিত্য নতুন উদ্ভাবনও মনে হয় একটা কারণ। আইপিএল মানে তো শুধু ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং নয়। দারুণ কমেন্ট্রি, তার চেয়েও দারুণ টেলিভিশন প্রোডাকশন, টিভি পর্দায় ভেসে ওঠা সব গ্রাফিকস....সব মিলিয়ে এ এক রোমাঞ্চক প্যাকেজ। করোনাকাল বলেই শুধু এর সঙ্গে চিয়ার গার্লদের যোগ করা যাচ্ছে না। 

আইপিএল নিয়মিত দেখা হয় না বলেছিলাম। তবে বাসায় কোনো না কোনো টেলিভিশনে তা চলতে থাকে। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাওয়ার পথে কখনো দাঁড়িয়েই একটু দেখি। মাঝেমধ্যে বসে আরেকটু বেশিক্ষণ। তা কখন, এটা বোধ হয় অনুমান করতে পারছেন। টেলিভিশন পর্দায় যখন ওরা দুজন থাকেন।

‘ওরা দুজন’ মানে সাকিব আল হাসান ও মোস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশে যাঁরা বেছে বেছে আইপিএলের ম্যাচ দেখেন, তাঁদের 'মাস্ট ওয়াচ' তালিকাতেও নিশ্চয়ই এই দুজনের ম্যাচ থাকেই। আইপিএলে প্রথম খেলতে গিয়েই মোস্তাফিজ যে আলোড়ন তুলেছিলেন, আইপিএলের ইতিহাসেই তার তুল্য কিছু নেই। তিন/চার দিন আগে মোস্তাফিজের বোলিং দেখে সেই স্মৃতি ফিরে এলো মনে। কাটার বুঝতে না পারা ব্যাটসম্যান আগে খেলে ফেলে বল তুলে দিচ্ছেন 'ভি'-এর মধ্যে। ব্যাটিংয়ের আদি ব্যাকরণ ব্যাটসম্যানকে 'ভি'-এর মধ্যেই খেলতে বলে, মোস্তাফিজের কাটারে ব্যাটসম্যানরা না চাইলেই তা খেলে ফেলেন।

আজ একটু আগে সাকিবের বোলিংয়ের এক ঝলক দেখলাম (২৪ রান দিয়ে ফেলায় করলেনই মাত্র ২ ওভার), ব্যাটিংয়ের প্রায় পুরোটাই। পাঞ্জাব কিংস-দিল্লি ক্যাপিটালস দ্বিতীয় ম্যাচটা দেখতে দেখতেই এই লেখাটা লিখছি। মায়াঙ্ক আগরওয়াল আর কে এল রাহুলের ব্যাটিং টেলিভিশনের সামনে থেকে সরতে দিতে যাচ্ছে না, ব্যাপারটা এমন নয়। এই যা, লাইনটা শেষ করার আগেই আউট হয়ে গেলেন আগরওয়াল। কমেন্টটর্স কার্সের সঙ্গে মিলিয়ে এটাকে বোধ হয় বলা যায় রাইটার্স কার্স!

তা এই ম্যাচটা যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখব বলে ঠিক করেছি, তার কারণটা কি অনুমান করতে পারেন? বেশি ভাবতে হবে না, আমিই বরং বলে দিই। আজ আইপিএলের জন্মদিন। আইপিএল ক্রিকেটের জন্য ভালো কি খারাপ, এই তর্ক থাকতেই পারে, আছেও। তবে সত্যি তো এটাই, তের বছর আগে এই একটা টি-টোয়েন্টি লিগ ক্রিকেটের গতিপথ চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে। ক্রিকেট ইতিহাসকে এক সময় প্রি-ওয়ার আর পোস্ট ওয়ার মানে যুদ্ধ-পূর্ব আর যুদ্ধ-উত্তর বলে দুই ভাগে ভাগ করা হতো। ২০০৮ সাল থেকে এমনই একটা বিভাজন করে দিয়েছে এই আইপিএল। ক্রিকেটে এখন দুটি ভিন্ন যুগ: আইপিএলের আগে ও আইপিএলের পরে।

আইপিএল মানে আতশবাজিও

গত দশকের সাতের দশকে প্যাকার সিরিজের পর ক্রিকেটে এমন বিপ্লব আর হয়নি। কাকতালীয়ভাবে দুটিরই মূলে টেলিভিশন স্বত্ত্ব নিয়ে ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে টেলিভিশন কোম্পানির বিরোধ। ক্যারি প্যাকার তাঁর চ্যানেল নাইনের জন্য অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট সম্প্রচারের স্বত্ত্ব না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে গোপনে বিশ্বের সেরা ক্রিকেটারদের দলে ভিড়িয়ে চালু করে দিয়েছিলেন ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেট। ফ্লাডলাইট, রঙিন পোশাক, সাদা বল এই ওয়ার্ল্ড সিরিজেরই উপহার। সাদা বলটা যদিও প্যাকারের উদ্ভাবনী তালিকায় ছিল না। শুরুটা হয়েছিল লাল বলেই। কৃত্রিম আলোয় লাল বল দেখতে এমনই সমস্যা হচ্ছিল যে, ক্লোজ ইন ফিল্ডাররা জীবনাশঙ্কার কথা বলে আপত্তি তোলেন। বাধ্য হয়েই সাদা বলের কথা ভাবতে হয়।

ক্যারি প্যাকারকে যদি ওই বিপ্লবের জনক বলা হয়, আইপিএল-বিপ্লবের জনক বলবেন কাকে? অনুমান করি, ললিত মোদির মুখটা আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আইপিএলের প্রথম কয়েকটা আসরে টেলিভিশনে ললিত মোদির চেহারা সবাই এত দেখেছেন যে, কারও পক্ষেই তা ভোলা সম্ভব নয়। আইপিএলের ম্যাচের সময় মাঠে একটা ক্যামেরা নাকি শুধু আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের জন্যই বরাদ্দ থাকত। ললিত মোদি স্টেডিয়ামে পা রাখার পর থেকে তাঁর প্রতিটি মুহূর্তই অনুসরণ করে যেত ওই ক্যামেরা। কোনো কিছুতেই বাড়াবাড়ির ফল ভালো হয় না, এই আপ্তবাক্যের প্রমাণ দিয়ে ললিত মোদিকে এখন ইংল্যান্ডে নির্বাসিত জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

আইপিএলের উদ্বোধনী ম্যাচে ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। ওই ইনিংসের কিছুই নাকি তাঁর মনে নেই!

ললিত মোদিকে ভালো বলুন, বা খারাপ, তা আপনার ইচ্ছা। তবে আইপিএলের জনক তো বলতেই পারেন, তবে তা বলার সময় অবশ্যই সুভাষ চন্দ্রের নামটাও একটু উল্লেখ করতে ভুলবেন না। এই সুভাষ চন্দ্র কে, এটা হয়তো অনেকের এখন মনেও নেই। অথচ সত্যি তো এটাই যে, এই সুভাষ চন্দ্র না থাকলে আইপিএল হতো না। পরে কোনো এক সময় হতো কি হতো না, তা তো আর বলা সম্ভব নয়। তবে ২০০৮ সালের এই দিনেই যে ক্রিকেট বিশ্ব কাঁপিয়ে দিয়ে আইপিএলের সাড়ম্বর আবির্ভাব ঘটত না, এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

প্যাকার সিরিজের সঙ্গে মিলের কথা বলেছিলাম না? এবার তা ব্যাখ্যা করার সময়। এই সুভাষ চন্দ্র নামের ভদ্রলোক ভারতীয় টিভি নেটওয়ার্কের জিটিভির মালিক। ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রচারস্বত্ব চেয়ে পাননি, সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি শুরু করে দিয়েছিলেন ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ। যেটিকে সবাই আইসিএল নামে ডাকে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের রোষানলে যা পরিণত হয় 'নিষিদ্ধ লিগে'। ভারতীয় বোর্ডকে না চটাতে অন্য দেশগুলোও আইসিএলে খেলতে যাওয়া ক্রিকেটারদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। 

সেই আইসিএল কবেই বন্ধ হয়ে গেছে। যা শুরু করার সময় সুভাষ চন্দ্রের কল্পনাতেও থাকার কথা নয়, ওই টি-টোয়েন্টি লিগটা আয়োজন করে তিনি আসলে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটার বীজ বুনে দিচ্ছেন। ললিত মোদি অবশ্য অনেক আগেই এমন কিছু ভেবেছিলেন। এনবিএ বা মেজর লিগ বেসবলের আদলে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট লিগের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবও দিয়ে রেখেছিলেন ভারতীয় বোর্ডকে। কেউ তা পড়েও দেখেনি। বিভিন্ন দেশের তারকা ক্রিকেটাররা দল বেঁধে আইসিএলে নাম লেখাতে শুরু করার পর ধুলা-টুলা ছেড়ে ললিত মোদির দেওয়া পুরোনো ফাইলটা আবার খোলা হলো। ক্রিকেটও বদলে গেল চিরদিনের মতো। সেই বদলটা যে এমন হবে, এটা মনে হয় ললিত মোদিও ভাবেননি। তবে সাফল্যের রেসিপিটা তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন। একসঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিলেন ভারতীয় জনতার দুটি অবসেশন, দুই 'সি' ক্রিকেট আর সিনেমাকে। মাঠে ধুমধাড়াক্কা ক্রিকেট, মাঠের পাশে চিয়ার গার্ল, গ্যালারি বলিউডের তারকারাজি... দর্শকের চোখ ধাঁধিয়ে দিতে আর কি চাই!

করোনার কারণে গ্যালারি এবার দর্শকশূন্য। কিন্তু আইপিএলের জৌলুস একটুও কমেনি

তারপরও নতুন এক অ্যাডভেঞ্জার সফল হতে হলে শুরুটা ভালো হতে হয়। আইপিএলের শুরুটাকে শুধু ভালো বললে কিছুই বলা হয় না, এর চেয়ে ভালো কিছু আর আসলে হতে পারত না। দর্শকে ঠাসা চিন্নাস্বামীতে ব্রেন্ডন ম্যাককালামের ব্যাটেই যেন আসল উদ্বোধন ক্রিকেটের রঙিন অধ্যায়ের। কেকেআরের হয়ে ৭৩ বলে ১৫৮ রানের ওই ইনিংসটা সম্পর্কে ম্যাককালাম আমাকে অবাক করা একটা কথা বলেছিলেন। সেদিনের কিছুই নাকি তাঁর মনে নেই! আমার চোখেমুখে অবিশ্বাস ফুটে উঠতে দেখে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন নিজেই, 'সেঞ্চুরি করেছি, বড় সেঞ্চুরি, এটা তো মনে আছেই। তবে বিশ্বাস করুন, সেদিন আমি যেন একটা ঘোরের মধ্যে ব্যাটিং করেছিলাম। ওই ইনিংসের একটা শটও আমার মনে নেই। পরে যতবার হাইলাইটস দেখেছি; মনে হয়েছে আমি যেন দর্শক হয়ে অন্য কারও ব্যাটিং দেখছি।'

আইপিএল নিয়ে মাতামাতি দিন দিন যে হারে বাড়ছে, বিশ্বের সব ক্রিকেটারের স্বপ্ন হয়ে উঠেছে একটা আইপিএল কন্ট্রাক্ট, যেভাবে মাঝেমধ্যেই বড় হয়ে উঠছে 'দেশ বনাম আইপিএল' বিতর্ক, আমারও কখনো কখনো ম্যাককালামের দশা হয়। ম্যাককালাম যেমন নিজের খেলা ইনিংসের কথাই মনে করতে পারেন না, নিজের চোখেই সব দেখার পরও নিজের গায়ে আমার চিমটি কেটে দেখতে ইচ্ছা হয়, আইপিএল কি আসলেই এভাবে বদলে দিয়েছে ক্রিকেটের চিরন্তন রং!