নন্দিনী রানাতুঙ্গা কি শুধুই অর্জুনা রানাতুঙ্গার মা? নাকি শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটেরই মা! অর্জুনা রানাতুঙ্গা শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের এমনই অবিসংবাদিত মহানায়ক যে, শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট ইতিহাসে পরিষ্কার দুটি অধ্যায়—অর্জুনার আগে ও অর্জুনার পরে। শুধু তাঁকে জন্ম দেওয়ার কারণেই নন্দিনী রানাতুঙ্গাকে ‘শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের মা’ বলে ডাকা যেত। কিন্তু শুধু তো অর্জুনা রানাতুঙ্গা নন, শ্রীলঙ্কার পক্ষে খেলেছেন নন্দিনী রানাতুঙ্গার আরও তিন ছেলে।

বড় ছেলে ধাম্মিকা রানাতুঙ্গা খেলেছেন দুটি টেস্ট ও চারটি ওয়ানডে। ছয় ছেলের মধ্যে চার নম্বর সঞ্জীবা খেলেছেন নয়টি টেস্ট ও ১৩টি ওয়ানডে। ধাম্মিকা আর অর্জুনার ছোট নিশান্থা টেস্ট না খেললেও খেলেছেন দুটি ওয়ানডে। নন্দিনী রানাতুঙ্গাকে কী বলে ডাকবেন! রত্মগর্ভা? ক্রিকেটার-গর্ভা বলেই ডাকুন না!

‘ক্রিকেটের বাইবেল’ বলে খ্যাত উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালমানাকে মার্থা গ্রেসের অবিচুয়ারি ছাপা হয়েছে। মার্থা গ্রেস ডব্লিউ জি গ্রেসের মা। ডব্লিউ জি গ্রেস ছাড়াও মার্থার আরও দুই ছেলে জর্জ ফ্রেডেরিক ও এডওয়ার্ড মিলসও টেস্ট খেলেছেন। মাত্র একটি করে। ইংলিশ ক্রিকেটে গ্রেসদের যে অবদান, শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটে রানাতুঙ্গাদের তার চেয়ে অনেক বেশি। চার ভাইয়ের দেশের পক্ষে খেলার উদাহরণ ক্রিকেট ইতিহাসে আর একটিই আছে। আমির বী’র চার ছেলে ওয়াজির, হানিফ, মুশতাক ও সাদিক মোহাম্মদ খেলেছেন পাকিস্তানের পক্ষে। উইজডেন অ্যালমানাকে মার্থা গ্রেসের অবিচুয়ারি ছাপা হলে আমির বী ও নন্দিনী রানাতুঙ্গারও নয় কেন?

নন্দিনী রানাতুঙ্গা শুনে হাসেন। ‘এখনই আবার অবিচুয়ারির কথা উঠছে কেন? আমি আরও অনেক দিন বাঁচব’—কেন তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই, টেলিফোনে তা বুঝিয়ে বলার পর বললেন রানাতুঙ্গা ভাইদের মা। টেলিফোনে ঠিকানা দিলেন, ২০/৩ টিচবোর্ন লেন, কলম্বো-১০। দিলেন আসল ঠিকানাটাও—খুঁজে পেতে সমস্যা হলে ‘অর্জুনাদের বাড়ি কোনটা’ বললেই হবে। বাড়ির সামনে ছোট্ট একটা আঙিনা, সেটিকে রাস্তা থেকে আলাদা করেছে বড় একটা গেট। কলিং বেলের শব্দ শুনে নন্দিনী রানাতুঙ্গা নিজেই বেরিয়ে এলেন হাসিমুখে। বিশাল বাড়ি, কিন্তু একেবারেই সাদামাঠা সাজসজ্জা। বসার ঘরে সোফা, ডাইনিং টেবিল আর একটা বইয়ের আলমারি ছাড়া আর কিছুই নেই। ছেলেরা যে যার সংসার পেতেছে। অর্জুনার ছেলেমেয়ে ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করে, স্ত্রী সমুদুরাও তাঁদের সঙ্গেই থাকেন, বাবার পথ ধরে রাজনীতিতে আসা অর্জুনার মাসের কদিন শ্রীলঙ্কায়, কদিন ইংল্যান্ডে কাটে। রানাতুঙ্গাদের বাবা রেগি রানাতুঙ্গা শ্রীলঙ্কান সরকারের প্রতিমন্ত্রী, তিনিও এখানে থাকেন না। দুজন কাজের লোক নিয়ে এ বাড়িতে একাই দিন কাটে নন্দিনী রানাতুঙ্গার।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছেন নন্দিনী রানাতুঙ্গার চার ছেলে: ধাম্মিকা, অর্জুনা, সঞ্জীবা ও নিশান্থা রানাতুঙ্গা

ছয় ছেলে, তাঁদের বন্ধুবান্ধব, স্বামীর রাজনীতির সূত্রে সারা দিন মানুষের আগাগোনা—একসময় গমগম করা এই বাড়িতে এখন শূন্যতার হাহাকার। নন্দিনী রানাতুঙ্গার খারাপ লাগে না? ‘আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সাংসারিক ব্যস্ততায় ধর্মকর্মের দিকে সেভাবে মন দিতে পারিনি। এখন গৌতম বুদ্ধের দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করি। ছেলেরাও মাঝেমধ্যেই এসে দেখে যায়’—নন্দিনীর মুখে হাসি।

কীর্তিমান ছেলেদের কথা শুনতেই তাঁর কাছে যাওয়া। যা শুনতে শুনতে মনে হলো, এটা তো আসলে রানাতুঙ্গা ভাইদের কৃতিত্বের গল্প নয়, মহিমাময়ী এক মায়ের গল্প। আদর্শে অবিচল মায়ের ত্যাগের বিনিময়ে ছেলেদের বড় হয়ে ওঠার গল্প। খুব গুছিয়ে কথা বলেন, চমৎকার ইংরেজিতে। টেপ রেকর্ডারটা চালু করার পর নিজে থেকেই গড়গড় করে বলে গেলেন রানাতুঙ্গাদের বেড়ে ওঠার গল্প, দু-একবার নির্দিষ্ট  প্রসঙ্গ মনে করিয়ে দেওয়া ছাড়া  প্রশ্নই করতে হলো না।

নন্দিনীর বাবা ছিলেন স্কুলের হেডমাস্টার, মা-ও শিক্ষক। ভাই-মামা-কাকা...আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও শিক্ষকের ছড়াছড়ি। ‘আমাদের পরিবার ছিল মধ্যবিত্ত। প্রাচুর্য ছিল না। কারণ আমার মা-বাবার কাছে সততাটা ছিল সবচেয়ে বড়। আমাদেরও তিনি এ শিক্ষাই দিয়েছেন—সৎ পথে থেকে যা উপার্জন করতে পারবে, তাতেই খুশি থাকবে। আমিও আমার ছেলেদের সেই শিক্ষাই দিয়েছি।’

রেগি ও নন্দিনী রানাতুঙ্গার ছয় সন্তানই ছেলে। চার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের বাইরে যে দুজন—প্রসন্ন ও রুয়ান—তাঁরাও ক্রিকেটার। ‘ওরা ছিল ভীষণ দুষ্ট। পিঠাপিঠি ছয় ভাই, সারা দিন শুধু খেলা আর মারামারি। আমার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলত। ওদের জন্য ঘরের জিনিসপত্র তুলে রাখতে হতো’—স্মৃতিচারণা করার সময় নন্দিনীর মুখে বাৎসল্যের হাসি। হাসতে হাসতেই স্বীকারোক্তি, ‘ওদের বেশি কিছু বলতাম না। কারণ ছোটবেলায় আমি নিজেও খুব দুষ্ট ছিলাম। পাঁচ ভাইয়ের পর আমি বোন, আমাকে পেয়ে মা-বাবা খুব খুশি হয়েছিল। কিন্তু আমার দুরন্তপনা থেকে মা বাবাকে বলত, আমি তো ছেলে-মেয়েতে পার্থক্য দেখি না। মেয়েটাও তো ছেলেগুলোর মতোই দুরন্ত।’

নিজেও ছিলেন খেলোয়াড়। সফট বল ও টেবিল টেনিসে ইউনিভার্সিটি ‘ব্লু’ পেয়েছেন। ছেলেরা সারাক্ষণ খেলতে চাওয়ায় বাবার আপত্তি তাই মার প্রশ্রয়ে পাত্তা পায়নি। ছেলেদের জীবনে বাবার খুব একটা ভূমিকা রাখার সুযোগও ছিল না। তিনি রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। নন্দিনী রানাতুঙ্গা যখন তাই ছয় ছেলেকে সামলিয়েও শিক্ষকতা করতে চাইলেন, তিনি আপত্তি করেছিলেন। নন্দিনী যুক্তি দিয়েছেন, ‘আমি তো টাকার জন্য চাকরি করতে চাচ্ছি না। করতে চাইছি আমার মা-বাবার ঋণ শোধ করতে। তাঁরা আমাকে পড়াশোনা করিয়েছেন, একটা আদর্শে গড়ে তুলেছেন। আমি তার প্রতিদান দিতে চাই।’

 ছেলে ধাম্মিকা, অর্জুনা, নিশান্থা, প্রসন্ন, সঞ্জীবা ও রুয়ানের সঙ্গে রেগি ও নন্দিনী রানাতুঙ্গা

২২ বছরের শিক্ষকতা জীবনে উপার্জিত একটি টাকাও নিজের কাজে ব্যয় করেননি, স্কুলে গরিব-অভাবী ছেলেদের সাহায্য করতেই চলে গেছে তা। ২২ বছরের বেশির ভাগই কেটেছে কলম্বোর বিখ্যাত আনন্দ কলেজে। ছয় ছেলেও সেখানেই পড়েছেন। ‘স্কুলে আমি শুধু ওদের মা ছিলাম না, ছিলাম সব ছাত্রের মা। ওদেরও অন্য দশজন ছাত্রের মতোই দেখেছি’—নিজের এই দর্শন ছেলেদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়েছেন মা।

বড় প্রমাণ একটু পরই বলা গল্পটা, “একবার এক ক্লাব ম্যাচে ধাম্মিকা-প্রসন্ন-নিশান্থা অর্জুনার অধিনায়কত্বে খেলছে। অর্জুনার মধ্যে ছোটবেলা থেকেই কর্তৃত্ব করার ব্যাপার ছিল। মাঠেও ও ছিল ভীষণ কড়া। ম্যাচ শেষে ধাম্মিকা এসে আমাকে নালিশ করল, ‘আম্মা, অর্জুনা মাঠে আমার সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে। আমি ওর বড় ভাই, ওর কি এমন করা উচিত?’ আমি ওকে বললাম, ‘ ধাম্মিকা, মাঠে অর্জুনা তোমার ছোট ভাই নয়, ও তোমার অধিনায়ক। মাঠে কখনো ওকে ভাই হিসেবে দেখবে না। যা বললাম, তুমি তা ভেবে দেখো।’ কিছুক্ষণ পর এসে ধাম্মিকা বলল, ‘আম্মা, তুমি ঠিকই বলেছ। আমারই ভুল হয়েছে’।”

ক্রিকেট মাঠে ভাইকে ভাই বলে না দেখার এই নীতি মেনে চলার পরও অর্জুনা রানাতুঙ্গার বিরুদ্ধে ভাইপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে বলে নন্দিনীর দুঃখ আছে, ‘নিশান্থা আর প্রসন্ন দুজনই এসএসসিতে (সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব) খেলত। একদিন নিশান্থা এসে খুব মন খারাপ করে আমাকে বলল, সবাই বলছে আইয়া (বড় ভাই) অধিনায়ক বলেই আমরা সুযোগ পাচ্ছি। আমরা এই ক্লাব ছেড়ে দেব। ওরা দুজন তা-ই করল, এসএসসি ছেড়ে চলে গেল কোল্টসে। সেবার ফাইনালেও উঠল এসএসসি আর কোল্টস। প্রসন্ন-নিশান্থার কোল্টস তাতে হারিয়ে দিল অর্জুনার এসএসসিকে।’

সঞ্জীবা 'জন্মগতভাবেই সাঁতারু' বলে তাঁকে সাঁতারে দিতে বলেছিলেন সাঁতার কোচ।  নন্দিনী যে জবাবটা দিয়েছিলেন, তা সব মা-বাবার শিক্ষণীয় তালিকার এক নম্বরে থাকা উচিত, ‘ও কী করবে, এই সিদ্ধান্ত ও-ই নেবে। আমি শুধু ওকে তোমার কথাটা জানাতে পারি।’

ছোট ভাইদের ক্রিকেটে পথ দেখিয়েছেন বড় ভাই ধাম্মিকাই, ‘আমার ছয় ছেলের মধ্যে ধাম্মিকাই ক্রিকেটে বেশি নিবেদিতপ্রাণ ছিল। আর ছোট্ট অর্জুনাকে দেখে কোচ বলেছিল, ও জন্মগত ক্রিকেটার। এটাই দুজনের পার্থক্য।’ পরে সঞ্জীবা কোচের কাছে সার্টিফিকেট পান, ‘ও অর্জুনার চেয়েও প্রতিভাবান।’ সঞ্জীবা সাঁতারেও খুব ভালো ছিলেন। আনন্দ কলেজে শুধু ক্রিকেট নয়, রানাতুঙ্গা ভাইরা অ্যাথলেটিকস করতেন, সাঁতার করতেন। সাঁতার কোচ একদিন নন্দিনীকে বললেন, ‘সঞ্জীবা জন্মগতভাবেই সাঁতারু। সাঁতারে ও খুব ভালো করবে। কিন্তু ওর ক্রিকেটে আগ্রহ বেশি। ওকে বলুন সাঁতারে মন দিতে।’ নন্দিনী যে জবাবটা দিয়েছিলেন, তা শুনে মনে হলো এটি তো সব মা-বাবার শিক্ষণীয় তালিকার এক নম্বরে থাকা উচিত, ‘ও কী করবে, এই সিদ্ধান্ত ও-ই নেবে। আমি শুধু ওকে তোমার কথাটা জানাতে পারি।’ সঞ্জীবাকে তা জানিয়ে বলেছেন, ‘কোচ এ কথা বলেছে, তাই তোমাকে বললাম। তুমি ভেবে দেখো।’

ছেলেদের আনন্দ কলেজে ভর্তি করানোও তাঁদের ক্রীড়াপ্রীতির কারণে। এ জন্য নন্দিনী রানাতুঙ্গাকে কম দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি। তখন কলম্বোতে রানাতুঙ্গাদের থাকার জায়গা ছিল না। কলম্বো থেকে ২১ মাইল দূরে গাম্পাহা থেকে ছেলেদের নিয়ে প্রতিদিন সকালে ট্রেনে করে আনন্দ কলেজে আসতে হতো নন্দিনীকে। এর আগ পর্যন্ত গাম্পাহার এক স্কুলেই পড়তেন রানাতুঙ্গা ভাইয়েরা। একদিন স্কুলের প্রিন্সিপাল তাঁকে ডেকে বললেন, ‘তোমার ছেলেরা খুব প্রতিভাবান। ওদের আনন্দ কলেজে ভর্তি করে দাও।’ ২১ মাইল দূরের কলম্বোতে আনন্দ কলেজ, তারপরও ছেলেদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তা-ই করলেন নন্দিনী। অন্ধকার থাকতে ঘুম থেকে উঠতে হতো, সবার নাশতা-টাশতা রেডি করে ছেলেদের তৈরি করে ট্রেনে কলম্বো-যাত্রা। স্কুল শেষ হওয়ার পর ছেলেদের খেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা। বাড়িতে ফিরতে বেশির ভাগ দিনই বেজে যেত রাত সাতটা-আটটা। ফেরার পর ছেলেদের পড়ানোর দায়িত্বও তাঁর। নন্দিনীর মুখে শোনার আগেই এই গল্প শুনেছি অর্জুনা রানাতুঙ্গার কাছে। ১৯৯৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের আগের দিন লাহোরে তাঁর হোটেল রুমে সে দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে চোখ ভিজে এসেছিল প্রবল প্রতাপান্বিত শ্রীলঙ্কান অধিনায়কের।

নন্দিনী এখন যে বাড়িতে থাকেন, একসময় সেটি ছিল শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের তীর্থস্থান। সেটি শুধু রানাতুঙ্গা ভাইদের জন্যই নয়, কলম্বোর বাইরের কত ক্রিকেটার যে এই বাড়িতে থেকেছেন তার হিসাব নেই। ‘ছেলেরা প্রায়ই এসে বলত, আম্মা, অমুক ছেলেটার কলম্বোতে থাকার জায়গা নেই। আমাদের এখানে নিয়ে আসি? আমি কখনোই আপত্তি করিনি। মেঝেতে ঢালাও বিছানা হতো। কখনো কখনো এমন হতো যে ঘরভর্তি মানুষের জন্য দরজা খোলাই কঠিন হয়ে যেত।’

অর্জুনা রানাতুঙ্গার সঙ্গে সনাৎ জয়াসুরিয়া। মাতারা থেকে কলম্বোতে আসার পর জয়াসুরিয়ার আশ্রয় ছিল রানাতুঙ্গাদের বাড়ি। ছবি: এপিএ

কলম্বোতে সনাৎ জয়াসুরিয়ার আশ্রয়ও ছিল রানাতু্ঙ্গাদের বাড়ি। “একদিন অর্জুনা এসে আমাকে বলল, মাতারার একটি ছেলে, বাঁহাতি ব্যাটসম্যান, ওকে এখানে এনে রাখতে চাই। সনাৎ এলো। কদিন পর পাকিস্তানে ও প্রথম ট্যুরে (অনূর্ধ্ব-২৩) যাবে, সঞ্জীবাও ছিল ওই দলে। সনাতের ক্রিকেট কিটস নেই। অর্জুনার সঙ্গে তখন গ্রে-নিকলসের ভালো সম্পর্ক, ওদের কাছ থেকে এক সেট নতুন ক্রিকেট কিটস পেয়ে অর্জুনা সঞ্জীবাকে বলল, ‘তুই এটা রেখে তোরগুলো সনাৎকে দিয়ে দে।’ সঞ্জীবা বলল, 'না না, ওকেই নতুনটা দিয়ে দাও।’ শুনে আমার খুব ভালো লেগেছিল।” এটা বলার পর বারবার সতর্ক করে দিলেন লেখার সময় সাবধানী হতে, কোনোভাবেই যেন সনাৎ জয়াসুরিয়ার জন্য তা অপমানকর হয়ে না যায়! তাঁর বাড়িতে এমন মচ্ছব, অন্য কেউ হলে বলার সময় কথায় বিরক্তির রেশ ফুটে বেরোত, আর নন্দিনী রানাতুঙ্গা উল্টো তাঁদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, ‘ছেলেগুলো খুব ভালো। ওরা এখানে এত কষ্ট করে থেকেছে, আমরা যা খেয়েছি, তা-ই খেয়েছে, কখনো আপত্তি করেনি।’

"ক্রিকেটে ওরা কী করেছে, সেটা বড় ব্যাপার নয়। মানুষ হিসেবে ওরা কেমন হয়েছে, সেটাই আমার কাছে বড়।"

১৯৯৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে লাহোর গিয়েছিলেন। গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ঢুকে তাঁর চোখে জল এসে যায়, ‘গ্যালারিতে শুধু শ্রীলঙ্কান পতাকা। মনে হচ্ছিল ম্যাচটা শ্রীলঙ্কাতেই হচ্ছে।’ বিশ্বকাপ জয়ের পর রানাতুঙ্গাকে ঘিরে উন্মাদনা দেখে অনেক সময়ই তাঁর উপলব্ধি হয়েছে, ‘ও আমার একার ছেলে নয়। পুরো জাতির ছেলে।’ ছেলেদের নিয়ে সবচেয়ে গর্বের মুহূর্তটা নিশ্চয়ই অর্জুনা রানাতুঙ্গার নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জয়! তা তো নয়ই, শুনে অবাক হবেন, ছেলেদের কোনো ক্রিকেটীয় কীর্তিও নয়। ‘ক্রিকেটে ওরা কী করেছে, সেটা বড় ব্যাপার নয়। মানুষ হিসেবে ওরা কেমন হয়েছে, সেটাই আমার কাছে বড়’—নন্দিনী রানাতুঙ্গার জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্তটাও তারই প্রমাণ হয়ে আসা একটি ঘটনা।

নিশান্থা শ্রীলঙ্কান টেলিভিশন রূপাভাহিনীর মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় বাছাই কমিটিকে পাশ কাটিয়ে একটি নাটক প্রচার করিয়ে দেওয়ার জন্য এক লোক তাঁকে অনেক টাকা ঘুষ সেধেছিল। নিশান্থা রাজি হননি। এর কিছু দিন পর নিশান্থার ছোট ভাই প্রসন্ন রানাতুঙ্গার সঙ্গে ওই লোকের দেখা হয়ে যায়। প্রসন্নকে ঘটনাটা বলার পর লোকটি বলেন, ‘আমি অন্য পথে আমার কাজ ঠিকই করে নিয়েছি। তবে তোমার মাকে গিয়ে বলো, দারুণ এক ছেলে জন্ম দিয়েছেন উনি।’ প্রসন্ন এসে এই ঘটনা বলার পর নন্দিনী রানাতুঙ্গা আনন্দে কেঁদেছেন। গল্পটা বলার সময়ও নিজেকে সামলাতে পারলেন না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জ্বালিয়ে দেওয়া বাড়িঘর থেকে ছয় ছেলেকে নিয়ে এক বস্ত্রে বেরিয়ে আসার দুঃস্বপ্নের স্মৃতিচারণ করার সময়ও যাঁর কণ্ঠ কাঁপেনি, তাঁর দু চোখেই তখন অঝোর জলের ধারা।

এরপর নন্দিনী রানাতুঙ্গা যখন বলেন, ‘আমি সাধারণ এক মা’, তিনি আরও অসাধারণ হয়ে যান।

আরও পড়ুন:

অর্জুনা রানাতুঙ্গা ও শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের ফার্স্ট ফ্যামিলি