গর্ডন গ্রিনিজ অবশ্যই খুব খুশি, কিন্তু এখনই উৎসবে মেতে ওঠার সময় হয়েছে বলে মনে করেন না তিনি। আগামী শনিবার ফাইনালে কেনিয়াকে হারিয়ে শিরোপা জয় পর্যন্ত উৎসবটাকে স্থগিত রাখতে চান বাংলাদেশ দলের কোচ। গ্রিনিজ বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ কী জানেন, তাই শুধু বিশ্বকাপ খেলতে পারাটাকেই তাঁর কাছে খুব বড় মনে না হওয়া স্বাভাবিক। তার ওপর পেশাদারি একটা নির্লিপ্ততা তো তাঁর মধ্যে কিছুটা থাকবেই। তবে আমাদের সে দায় নেই। আমাদের এত খুঁতখুঁতে না হলেও চলে। ফাইনাল জিতলে ভালো, আইসিসির সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে সন্দেহাতীত শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে। তবে সেটা নিয়ে পরে ভাবলেও চলবে। ফাইনালে উঠেই বাংলাদেশ হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছে বিশ্বকাপ-স্বপ্ন। যে দেশের মানুষ তিন বছর আগে স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় পুড়েছে, এরপর থেকে নিয়ত তাড়িয়ে বেড়িয়েছে সেই দুঃস্বপ্ন, তাদের জন্য ‌‘বাংলাদেশ ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ খেলবে’-এটাই কি উৎসবের যথেষ্ট উপলক্ষ নয়?

অবশ্যই যথেষ্ট। কুয়ালালামপুরের কিলাত ক্লাব মাঠে হাজারখানেক বাংলাদেশি দর্শকই উল্লাসের যে তীব্রতম রূপ দেখালেন, তা দেখতে দেখতেই অনুমান করার চেষ্টা করেছি, দেশে এখন কী হচ্ছে। গত মঙ্গলবার স্কটল্যান্ডের সামনে ২৪৩ রানের স্কোর দাঁড় করিয়েই বিশ্বকাপের সঙ্গে দূরত্বটা এক ঝটকায় কমিয়ে ফেলেছিলেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। কাল বাকি কাজটা বোলাররা অনায়াসেই সেরেছেন। ৪৪.৫ ওভারে ১৭১ রানেই স্কটল্যান্ড শেষ। ৭২ রানের বিশাল জয় বাংলাদেশকে পৌঁছে দিয়েছে স্বপ্নের ঠিকানায়। নাইরোবিতে অস্ত গিয়েছিল যে ক্রিকেট সম্ভাবনার সূর্য, কাল তা উদিত হলো কুয়ালালামপুরের আকাশে।

কাজ থেকে ছুটি নিয়ে ছুটে এসেছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তাদেরকে কৃতজ্ঞতা জানাতেই হয়। সেটাই জানাচ্ছেন আকরাম খান। ছবি: শামসুল হক টেংকু

নাইরোবির যন্ত্রণায় দেশবাসীর চেয়েও বেশি দগ্ধ হয়েছিলেন ক্রিকেটাররা, তাঁরা নিজেরা সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তবে দেশের মানুষের জন্য যে আনন্দের একটা উপলক্ষ তৈরি করতে পেরেছেন, খেলোয়াড়েরা এটিকেই মানছেন তাঁদের সেরা অর্জন বলে। তাঁরা দেশকে যা দিলেন, তার মূল্য কীভাবে শোধ করবে জাতি? শোধ করার দায় এখানে নেই। এবারের আইসিসি ট্রফিতে প্রতিটি খেলোয়াড়ের মধ্যেই দেখা গেছে সেই অসাধারণ দেশাত্ববোধ, দেশের জন্য কিছু করার তাড়না, যা থেকে অন্যদের শিক্ষা নেওয়ার আছে অনেক কিছু। প্রচণ্ড চাপ নিয়ে কুয়ালালামপুরে এসেছিলেন ক্রিকেটাররা, অথচ সেই চাপকে তাঁরা উল্টো পরিণত করলেন প্রেরণায়। টানা নয় ম্যাচে অপরাজিত, হল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটিতে সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া আর কোনো ম্যাচে সামান্যতম পরীক্ষারও মুখোমুখি হতে হয়নি বাংলাদেশকে। খড়কুটোর মতো ভেসে গেছে প্রতিপক্ষ দলগুলো। সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে, টেস্ট অঙ্গনের বাইরে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে প্রথম সারিতে। অতীতে যা ঘটেছিল, তা নিছক দুর্ঘটনা!

দুর্ঘটনা এবারও ঘটতে পারত। গর্ডন গ্রিনিজ নামের কালজয়ী এক ক্রিকেটারের হাতে দায়িত্ব সঁপে দেওয়াটাই ছিল তা এড়ানোর পথে প্রথম পদক্ষেপ। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে দলের চেহারা পাল্টে দিয়েছেন গ্রিনিজ। তাঁর সংস্পর্শে এসে খেলোয়াড়েরা নতুন করে উপলব্ধি করেছেন দেশের পক্ষে খেলার অর্থ। গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর মধ্যে গ্রিনিজ পেয়েছেন যোগ্য এক সঙ্গী। সব মিলিয়েই এবারের আইসিসি ট্রফিতে দেখা গেছে অন্য এক বাংলাদেশ দলকে। আকরাম খানের দল এনে দিয়েছে বাংলাদেশের খেলাধুলার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্মরণীয় দিনটি।

তবে এই সাফল্যকে শুধু খেলাধুলার ইতিহাসের মধ্যে আটকে রাখা মনে হয় ঠিক হবে না। কাল কিলাত ক্লাব মাঠে স্বপ্নপূরণের আনন্দে উচ্ছ্বসিত বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়-কর্মকর্তারা প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বারবার ফিরে গেলেন একাত্তরে। সেই আশ্চর্য সুন্দর সময়টার পর 'এমন দিন আর আসেনি বাঙালির জীবনে'-কণ্ঠ থেকে কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হলো একই কথা। একাত্তরে পুরো জাতি যেমন একই লক্ষ্যে একতাবদ্ধ হয়েছিল, এবার শুধুই একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্টকে ঘিরে আবারও ঘুচে গেছে সব ব্যবধান। সব মতের, সব পথের মানুষ আজ এসে দাঁড়িয়েছেন একই জায়গায়। সবার চোখে ছিল একই স্বপ্ন, বিশ্বকাপে উড়বে লাল-সবুজ পতাকা। সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন আমাদের সূর্যসন্তানরা। বন্যা, খরা, আর নিজেদের মধ্যে খুনোখুনির জন্য 'বিখ্যাত' বাংলাদেশ এবার খবর হয়েছে অসহ্য আনন্দদায়ী এক ভিন্ন কারণে। ক্রিকেটারদের কাছে এ দেশের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

তোমাদের অভিনন্দন।